মওলিদুন্নবী (দ:)-এর উদযাপন ও অনুমতি (১ম খণ্ড)

মূল: শায়খুল ইসলাম ড: মুহাম্মদ তাহিরুল কাদেরী

অনুবাদ: কাজী সাইফুদ্দীন হোসেন

[Bengali translation of Shaykh Tahirul Qadri’s book “Mawlid al-Nabi: Celebration and Permissibility (1st part). Translator: Kazi Saifuddin Hossain]

[উৎসর্গ: পীর ও মুর্শীদ হযরতুল আল্লামা সৈয়দ এ, জেড, এম, সেহাবউদ্দীন খালেদ আল-কাদেরী আল-চিশ্তী (রহ:)-এর পুণ্যস্মৃতিতে…]

অনুবাদকের আরয

বিসমিল্লাহির রাহমানির রাহীম,

নাহমাদুহু ওয়া নুসল্লি আ’লা রাসূলিহিল কারীম,

আম্মা বা’দ।

শায়খুল ইসলাম ড: মুহাম্মদ তাহিরুল কাদেরী সাহেব বর্তমান ইসলামী বিশ্বের শীর্ষস্থানীয় ও গণ্যমান্য আলেম-এ-দ্বীন। তাঁর সম্পর্কে নতুন করে কিছু বলার সুযোগ আমার নেই। তিনি অসংখ্য গ্রন্থপ্রণেতা, যার মধ্যে ঈদে মীলাদুন্নবী (দ:)-বিষয়ক এই বইখানি অন্যতম। সর্ব-জনাব মুহাম্মদ ইমরান সুলাইমান ও ওয়াক্কাস আহমদ আমীন কর্তৃক ইংরেজিতে অনূদিত এবং মিনহাজুল কুরআন ইন্টারন্যাশানাল কর্তৃক প্রকাশিত প্রায় ৭০০ পৃষ্ঠার এ বইটির বাংলা অনুবাদকর্মে আমি হাত দিয়েছি। আল্লাহ পাক তাঁর হাবীব (দ:)-এর অসীলায় এবং আমার পীর ও মোর্শেদ (রহ:)-এর নেক-নজরে আমাকে কামিয়াব করুন, আমীন।

-কাজী সাইফুদ্দীন হোসেন

মওলিদুন্নবী (দ:)

আল্লাহর নামে আরম্ভ, যিনি পরম দয়ালু, করুণাময়

(হে রাসূল) বলুন: আল্লাহরই অনুগ্রহ ও তাঁরই দয়া (মহানবীকে তাদের মাঝে প্রেরণের মাধ্যমে); সেটারই ওপর তাদের আনন্দ প্রকাশ করা উচিত। তা তাদের সমস্ত ধন-দৌলত হতে শ্রেয়। [আল-কুরআন, ১০:৫৮; মুফতী আহমদ এয়ার খান সাহেব কৃত তাফসীরে নূরুল এরফান বাংলা সংস্করণ]

মহানবী (দ:)-এর হাদীস শরীফ –

আমি হলাম আমার পূর্বপুরুষ (পয়গম্বর) ইবরাহীম (আ:)’এর দোয়া এবং পয়গম্বর ঈসা (আ:)’র প্রদত্ত শুভসংবাদ। (আমার ধরাধামে শুভাগমনের সময়) আমার মা তাঁর (পবিত্র দেহ মোবারক) হতে নূর (তথা আলো/জ্যোতি) প্রত্যক্ষ করেন যা শাম-দেশের অর্থাৎ সিরিয়ার প্রাসাদগুলো আলোকিত করে। [ইমাম আহমদ ইবনে হাম্বল]

শায়খুল ইসলাম ড: মুহাম্মদ তাহিরুল কাদেরী

শায়খুল ইসলাম ড: মুহাম্মদ তাহিরুল কাদেরী সাহেব ১৯৫১ সালে পাকিস্তানের ঝং শহরের আউলিয়া-দরবেশ, আলেম-পণ্ডিত ও শিক্ষকদের এক সম্ভ্রান্ত পরিবারে জন্মগ্রহণ করেন। তাঁর ধর্মীয় শিক্ষার হাতে খড়ি হয় ১২ বছর বয়সে, মাদ্রাসা আল-উলূম আল-শরীয়্যা নামের শিক্ষা প্রতিষ্ঠানে। এই ঐতিহ্যবাহী প্রতিষ্ঠানটি মদীনাতুল মুনাওয়ারায় মহানবী (দ:)-এর বিশিষ্ট সাহাবী হযরত আবূ আইয়ুব আনসারী (রা:)’র আশীর্বাদধন্য বসতঘরেই অবস্থিত। ড: কাদেরী তাঁর পিতা ও সে সময়কার প্রসিদ্ধ উলামাদের কাছে ইসলামবিষয়ক বিভিন্ন শাস্ত্র ও আরবী বিদ্যা শিক্ষা করেন। ধর্মীয় জ্ঞানার্জনের লক্ষ্যে তিনি সারা ইসলামী বিশ্ব ঘুরে বেড়ান; মক্কা মুয়াযযমা, মদীনা মুনাওয়ারা, সিরিয়া, বাগদাদ, লেবানন, মাগরেব তথা পশ্চিমাঞ্চল, ভারত ও পাকিস্তানে অনেক প্রখ্যাত আলেমের অধীনে তিনি ধর্মবিদ্যা শিক্ষা করেন; আর তাঁদের কাছ থেকে হাদীসশাস্ত্র ও অন্যান্য ইসলামী আধ্যাত্মিক জ্ঞানের শাস্ত্রে প্রায় ৫০০ এজাযত ও সনদ লাভ করেন। এর মধ্যে রয়েছে এজাযতের একটি নজিরবিহীন, অনন্য ও মহাসম্মানিত সনদ যা তাঁকে চারজন শিক্ষকের মাধ্যমে সংযুক্ত করেছে সাইয়্যেদুনা শায়খ আবদুল কাদের জিলানী আল-হাসানী ওয়াল হুসাইনী আল-বাগদাদী (রহ:)’র পুত্র শায়খ আবদুর রাযযাক (রহ:)’এর সাথে, ‘ফুতুহাতে মক্কীয়্যা’ গ্রন্থপ্রণেতা শায়খুল আকবর মুহিউদ্দীন ইবনে আরবী আল-দামেশকী (রহ:)’র সাথে এবং মিসরীয় মহান হাদীসশাস্ত্র বিশারদ ইমাম ইবনে হাজর আসকালানী (রহ:)’র সাথেও। অপর একটি সনদ দ্বারা তিনি কেবল একজন শিক্ষকের মাধ্যমে ইমাম ইউসূফ বিন ইসমাঈল নাবহানী (রহ:)’র সাথে যুক্ত রয়েছেন। তাঁর সনদগুলো তাঁরই দুইটি ‘সাবত’ তথা বিস্তারিত তালিকায় প্রকাশিত হয়েছে: ‘আল-জওয়াহির আল-বাহিরা ফীল্ আসানিদ আত্ তাহিরা’ এবং ‘আল-সুবূল আল-ওয়াহাবিয়্যা ফীল্ আসানিদ আল-যাহাবিয়্যা’

শিক্ষা ক্ষেত্রে ড: কাদেরী সাহেব ১৯৭০ সালে পাঞ্জাব বিশ্ববিদ্যালয় হতে স্নাতক প্রথম শ্রেণি (সম্মান) সনদ লাভ করেন। ইসলামিক স্টাডিজ বিষয়ে ১৯৭২ সালে ইউনিভার্সিটি গোল্ড মেডাল-সহ এম,এ, এবং ১৯৭৪ সালে এল,এল,বি, পাশ করার পর তিনি ঝং জেলা কোর্টে আইন পেশার সাথে যুক্ত হন। তিনি ১৯৭৮ সালে লাহোরে চলে আসেন এবং পাঞ্জাব বিশ্ববিদ্যালয়ের আইন বিভাগে প্রভাষকের পদে যোগ দেন; আর ইসলামী আইনশাস্ত্রে তাঁর ডক্টরেট-ও সম্পন্ন করেন। পরবর্তীকালে তাঁকে ইসলামী আইন বিভাগে অধ্যাপক পদে নিয়োগ করা হয় এবং তিনি এল,এল,এম, পর্যায়ে ইসলামী আইন প্রণয়ন বিভাগের প্রধান হিসেবে দায়িত্ব পালন করেন।

ড: তাহিরুল কাদেরী সাহেব পাকিস্তান সুপ্রীম কোর্টের এপেলেট শরীয়াহ বেঞ্চের আইনি উপদেষ্টা এবং কেন্দ্রীয় শিক্ষা মন্ত্রণালয়ের ইসলামী পাঠ্যক্রম উন্নয়নবিষয়ক উপদেষ্টা পদেও দায়িত্ব পালন করেন। অতি অল্প সময়ের মধ্যেই তিনি পাকিস্তানের অন্যতম সেরা ইসলামী আইনজ্ঞ ও পণ্ডিতের সু্খ্যাতি অর্জন করেন এবং ইসলামী বিশ্বে শীর্ষস্থানীয় একজন আলেমে দ্বীন হিসেবে পরিচিতি পান। অসংখ্য গ্রন্থপ্রণেতা, গবেষক ও সুবক্তা ড: কাদেরী সাহেব প্রায় এক সহস্র পুস্তক প্রণয়ন করেছেন, যার মধ্যে চার’শ পঞ্চাশটিরও বেশি বই প্রকাশিত হয়েছে; আর তিনি বিভিন্ন বিষয়ে আরবী, উর্দূ ও ইংরেজি ভাষায় ছয় সহস্রাধিক প্রভাষণও প্রদান করেছেন।

ইসলামের নামে আত্মঘাতী বোমা হামলা ও সন্ত্রাসবাদের মতো জনগুরুত্বপূর্ণ বিষয়ে শায়খুল ইসলাম ড: তাহিরুল কাদেরী সাহেব একটি ঐতিহাসিক ফতোওয়া জারি করেন। এটাকে একটা তাৎপর্যপূর্ণ ও ঐতিহাসিক পদক্ষেপ বলে বিবেচনা করা হয়, কেননা এ-ই প্রথমবার যখন সন্ত্রাসের হোতাদের বিরুদ্ধে এ ধরনের একটি সুস্পষ্ট ও দ্ব্যর্থহীন ইসলামী ডিক্রী তথা ফতোওয়া এতো ব্যাপকভাবে প্রকাশ পায়। ছয়’শ পৃষ্ঠাসম্বলিত মূল ফতোওয়াটি লেখা হয়েছিল উর্দূ ভাষায়, আর এতে বিধৃত হয়েছিল ব্যাপক গবেষণালব্ধ আল-কুরআনের বাণী, মহানবী (দ:)’র হাদীস, আসহাব-এ-কেরাম (রা:)’এর মতামত ও বিশ্ববরেণ্য ইসলামী পণ্ডিতদের সর্বজনগৃহীত লেখনীসমূহ। এই ঐতিহাসিক গবেষণাকর্ম ইংরেজি ও ইন্দোনেশীয় ভাষায় প্রকাশিত হয়েছে; অপরদিকে আরবী, নরওয়েজীয়, ড্যানিশ, হিন্দী ও অন্যান্য প্রধান প্রধান ভাষায় এর অনুবাদের কাজ চলছে। মিসরীয় জামেউল আযহার বিশ্ববিদ্যালয়ের ইসলামী গবেষণা একাডেমী এই ফতোওয়ার ওপর একটি বিস্তারিত বিবরণ লিখেছে এবং এর প্রতিপাদন-ও করেছে।

ড: কাদেরী সাহেব মিনহাজুল কুরআন ইন্টারন্যাশানাল (এম,কিউ,আই) সংস্থাটির প্রতিষ্ঠাতা ও প্রধান পদে দায়িত্বরত। এই সংস্থার শাখা ও সেন্টারগুলো বিশ্বের নব্বইটিরও বেশি দেশে ছড়িয়ে আছে। শায়খ তাহিরুল কাদেরী সাহেব পাকিস্তানের লাহোর শহরে অবস্থিত মিনহাজ বিশ্ববিদ্যালয়ের বোর্ড অফ গভর্নরস্-এর সভাপতি; বিশ্ববিদ্যালয়টি পাকিস্তানের সরকারি সনদপ্রাপ্ত। এছাড়াও তিনি মিনহাজ শিক্ষা সোসাইটির প্রতিষ্ঠাতা, যে সংস্থাটি পাকিস্তানে ছয় শতাধিক বিদ্যালয় ও মহাবিদ্যালয় প্রতিষ্ঠা করেছে। ড: কাদেরী মিনহাজ কল্যাণ ফাউন্ডেশনেরও সভাপতি; যে সংস্থাটি সারা বিশ্বে মানবিক ও সামাজিক কল্যাণমূলক কর্মকাণ্ডে জড়িত।

সূচিপত্র

মুখবন্ধ

প্রথম অধ্যায়

মওলিদুন্নবী (দ:) ও ইসলামের বিভিন্ন নিদর্শন: সঠিক ঐতিহাসিক দৃষ্টিকোণের আলোকে

১.১ আল-কুরআনের প্রদর্শিত হেদায়াত হিসেবে ‘যিকরের’ তাৎপর্য

১.২ পয়গম্বর ইবরাহীম (আ:)’এর দ্বীন (ধর্ম)

পরিচ্ছেদ – ১

আম্বিয়া (আ:)’র স্মরণে (যিকরে): পাঁচ ওয়াক্ত নামায

১.৩ ফজরের নামায: পয়গম্বর আদম (আ:)’এর স্মরণে

১.৪ যোহরের নামায: পয়গম্বর ইবরাহীম (আ:)’এর স্মরণে

১.৫ আসরের নামায: পয়গম্বর উযায়র (আ:)’এর স্মরণে

১.৬ মাগরেবের নামায: পয়গম্বর দাউদ (আ:)’এর স্মরণে

১.৭ ’এশার নামায: মহানবী (দ:)’র স্মরণে

পরিচ্ছেদ – ২

আম্বিয়া (আ:)’র স্মরণে (যিকরে): হজ্জ্বের বিভিন্ন রীতি ও প্রথা

১.৮ এহরাম: হজ্জ্বে আম্বিয়া (আ:)-বৃন্দের পরিধেয় বস্ত্রের স্মরণে

১.৯ তালবিয়া: পয়গম্বর ইবরাহীম (আ:) কর্তৃক হজ্জ্বের প্রতি আহ্বান ও তার উত্তরের স্মরণে

১.১০ তওয়াফ: আম্বিয়া (আ:)’র সুন্নাহ (রীতিনীতি)’র স্মরণে

১.১১ রামল: মহানবী (দ:) ও সাহাবা-এ-কেরাম (রা:)’এর দ্বারা অনুশীলিত তওয়াফ-পদ্ধতির স্মরণে

১.১২ ইদতিবা: সর্বশেষ নবী (দ:)’র সুন্নাহ

১.১৩ কালো পাথর চুম্বন: আল্লাহর প্রিয় বান্দার অনুশীলিত প্রথার স্মরণে

১: ১৪ মাক্বামে ইবরাহীম: পয়গম্বর ইবরাহীম (আ:)’এর স্মরণে

১:১৫ সাফা ও মারওয়া’র সাঈ: হযরত মা হাজেরের সুন্নাহর স্মরণে

১:১৫.১ যমযম কূপ: নামের উৎপত্তির কারণ

১.১৬ আরাফাত, মুযদালিফা ও মিনা: পয়গম্বর আদম (আ:)’এর স্মরণে

১.১৭ আরাফাত ও মুযদালিফায় আদায়কৃত নামাযের একত্রীভবন: মহানবী (দ:)’র সুন্নাহ

১.১৮ পশু কুরবানি: পয়গম্বর ইসমাঈল (আ:)’এর স্মরণে

১.১৮.১ কুরবানির পশু: আল্লাহর চিহ্নগুলোর একটি

১.১৯ কঙ্কর নিক্ষেপ প্রথা: পয়গম্বর ইবরাহীম (আ:)’এর সুন্নাহ

১.১৯.১ একটি আপত্তি

১.১৯.২ আপত্তির প্রতি আমাদের জবাব

দ্বিতীয় অধ্যায়

আনন্দ ও বিষাদময় ঘটনার স্মরণে

২.১ পয়গম্বর মূসা (আ:)’র দিবসের স্মরণে

২.২ পয়গম্বর নূহ (আ:)’এর দিবসের স্মরণে

২.৩ ইসলাম-ধর্মের পূর্ণতাপ্রাপ্তির দিবস: খুশি উদযাপনের দিন (ঈদ)

২.৪ আল-হিজর অতিক্রমকালে মহানবী (দ:)’র নির্দেশ

২.৪.১ আল-হিজরে অবস্থিত সামুদের কুয়ো হতে পানি পানে নিষেধাজ্ঞা

২.৪.২ পয়গম্বর সালেহ (আ:)’এর মাদী উটের সাথে সংশ্লিষ্ট কুয়ো হতে জলপানসম্পর্কিত আদেশ

২.৪.৩ পয়গম্বর সালেহ (আ:)’এর মাদী উটের স্মরণে

২.৪.৪ সামূদের প্রতি বিধানকৃত শাস্তি স্মরণকালে দুঃখ প্রকাশ

২.৪.৫ আল-হিজর অতিক্রমকালে মহানবী (দ:)’র নিজস্ব আমল

২.৪.৫.১ বিবেচনাযোগ্য বিষয়াবলী

২.৫ হস্তীবাহিনীর লোকদের প্রতি অবতীর্ণ শাস্তির স্মরণ এবং মুহাসসির উপত্যকা দ্রুত অতিক্রম

২.৬ হযরত উমর ফারূক (রা:) কর্তৃক ব্যক্ত অনুতাপ

তৃতীয় অধ্যায়

আম্বিয়া (আ:)’র মওলিদের স্মরণ: একটি কুরআনী বিশ্লেষণ

৩.১ মওলূদের পটভূমি

৩.২ আম্বিয়া (আ:)-বৃন্দের স্মরণ: এক ঐশী-প্রথার চর্চা

৩.৩ আম্বিয়া (আ:)’র মওলিদের তাৎপর্য

৩.৩.১ পয়গম্বর আদম (আ:)’এর মওলিদ

৩.৩.২ পয়গম্বর মূসা (আ:)’র মওলিদ

৩.৩.৩ মরিয়ম (আ:)’এর মওলিদ

৩.৩.৪ পয়গম্বর ইয়াহইয়া (আ:)’র মওলিদ

৩.৩.৫ পয়গম্বর ঈসা (আ:)’র মওলিদ

৩.৩.৬ মনোনীত জন – মহানবী (দ:)’র মওলিদ

৩.৪ আম্বিয়া (আ:)’র মওলিদ হতে মহানবী (দ:)’র মওলিদের ধারাবাহিকতা

চতুর্থ অধ্যায়

মওলিদুন্নবী (দ:)’র সমর্থনে আল-কুরআনের দলিল

৪.১ কুরআন নাযেলের উদযাপন হতে দলিল

৪.১.১ লাইলাতুল কদরের রাত ও বেলাদত শরীফের রাতের মধ্যকার তুলনা

৪.২ কোনো নেয়ামত লাভের উদযাপন হতে দলিল

৪.৩ মুক্তি লাভের উদযাপন হতে দলিল

৪.৩.১ সভ্যতা জারি থাকার জন্যে গুরুত্বপূর্ণ প্রয়োজনীয় বিষয়

৪.৪ কোনো খোদায়ী আশীর্বাদ লাভে খুশি প্রকাশ করা আম্বিয়া (আ:)-বৃন্দের সুন্নাত

৪.৪.১ বিবেচনাযোগ্য একটি গুরুত্বপূর্ণ বিষয়

৪.৫ মওলিদুন্নবী (দ:) উদযাপনের পক্ষে খোদায়ী আদেশ

৪.৫.১ ‘ক্বুল’ (বলুন) শব্দটির মধ্যে লুক্কায়িত কুরআনী দর্শন

৪.৫.১.১ আল্লাহতে বিশ্বাসের আগে রাসূল (দ:)-এর প্রতি বিশ্বাস স্থাপনের অপরিহার্যতা

 

৪.৫.১.২ ‘ক্বুল’ (বলুন) শব্দটির ব্যবহার দ্বারা খোদায়ী আজ্ঞার গুরুত্ব ও তাৎপর্য বৃদ্ধি

৪.৫.২ মহানবী (দ:) হলেন আল্লাহর অনুগ্রহ ও দয়া

৪.৫.২.১ একটি কৌতূহলোদ্দীপক বুদ্ধিবৃত্তিক বিষয়

৪.৫.২.২ কুরআন দ্বারা কুরআনের তাফসীর/ব্যাখ্যা

৪.৫.২.২.১ “এবং আল্লাহ-ই সবচেয়ে বেশি ফযল তথা অনুগ্রহশীল” মর্মে আয়াতটির অর্থ

৪.৫.২.২.২ বিখ্যাত তাফসীরগ্রন্থগুলোতে ‘ফযল’ শব্দটির অর্থ

৪.৫.২.২.৩ বিখ্যাত তাফসীরগুলোতে ‘ফযল’ ও ‘রহমত’ (করুণা) শব্দগুলোর অর্থ

৪.৫.২.২.৪ মৌ: আশরাফ আলী থানবীর অভিমত

৪.৫.৩ আমরা কেন ‘ফযল’ ও ‘রহমত’-প্রাপ্তি উদযাপন করবো তার বর্ণনা

৪.৫.৪ আয়াতটিতে (ঐশী আজ্ঞা) সীমিতকরণসূচক শব্দার্থ ব্যবহারের উদ্দেশ্য

৪.৫.৫ আয়াতোল্লিখিত ‘ফাবিযালিকা’ (সেটারই মধ্যে) কথাটি ব্যবহারের গূঢ়রহস্য

৪.৫.৬ ব্যক্তিগত ও সামাজিক পর্যায়ে (ঐশীদানের প্রতি) কৃতজ্ঞতা প্রকাশ

৪.৫.৭ এই আয়াতে পাকে অনেক তাকিদমূলক শব্দের প্রয়োগ

৪.৫.৮ “তা তাদের সমস্ত ধন-দৌলত অপেক্ষা শ্রেয়” মর্মে আয়াতটির তাফসীর (ব্যাখ্যা)

৪.৬ খোদায়ী মহা অনুগ্রহের প্রতি কৃতজ্ঞতা প্রদর্শনের নিদর্শন-ই মওলিদুন্নবী (দ:)’র উদযাপন

৪.৭ ঐশী করুণা ও আশীর্বাদের প্রতি কৃতজ্ঞতা প্রকাশ কেন জরুরি?

৪.৮ কৃতজ্ঞতা প্রকাশের বিভিন্ন প্রচলিত পদ্ধতি

৪.৮.১ খোদায়ী নেয়ামতের স্মরণ ও উল্লেখ (যিকর-তাযকেরা)

৪.৮.২ এবাদত ও বন্দেগী

৪.৮.৩ প্রাপ্ত আশীর্বাদের ঘোষণা প্রদান

৪.৮৩.১ এই আশীর্বাদের ঘোষণা আমরা কীভাবে দেবো?

৪.৮.৪ ঈদ-উৎসব হিসেবে পালন

পঞ্চম অধ্যয়

মওলিদুন্নবী (দ:)’র সমর্থনে হাদীসের দলিল

৫.১ ‘এয়াওমে আশুরা’ (মহররমের ১০ তারিখ) পালনের দলিল

৫.১.১ পয়গম্বর মূসা (আ:)’র দিবসটি উদযাপন

৫.১.২ মহানবী (দ:) কর্তৃক ওই দিবসটি পালন মূসা (আ:)’র সাথে তাঁর সংশ্লিষ্টতার কারণেই

৫.১.৩ ইহুদীদের ‘এয়াওমে আশুরা’কে ঈদ উৎসব হিসেবে পালন

৫.১.৪ মওলিদুন্নবী (দ:)’র পক্ষে ইমাম আসকালানী (রহ:)’র প্রামাণিক দলিল

৫.২ পয়গম্বর নূহ (আ:)’এর দিবস উদযাপনের পক্ষে দালিলিক প্রমাণ

৫.৩ কা’বা শরীফের আচ্ছাদন পরিবর্তন দিবস পালনের প্রামাণ্য দলিল

৫.৪ দ্বীন-ইসলামের পূর্ণতাপ্রাপ্তি দিবসকে ঈদ হিসেবে উদযাপনের দলিল

৫.৫ জুমুআ’ দিবসের মাহাত্ম্য: পয়গম্বর আদম (আ:)’এর সৃষ্টি হয় এদিনে

৫.৫.১ জুমুআ’ দিবস: (রাসূল-দ:-এর প্রতি) সালাওয়াত ও সালাম প্রেরণের দিন

৫.৬ পয়গম্বর ঈসা (আ:)-এর জন্মস্থানের গুরুত্ব ও এর যেয়ারত

৫.৭ মহানবী (দ:) নিজের বেলাদত-দিবস উদযাপন করেন রোযা পালনের মাধ্যমে

৫.৮ মহানবী (দ:) নিজের বেলাদত-দিবস উদযাপন করেন পশু কুরবানীর মাধ্যমে

৫.৯ মহানবী (দ:)’র ধরাধামে শুভাগমনে খুশি প্রকাশ করায় এক কাফেরের শাস্তি লাঘব

৫.৯.১ কেন এক কাফেরের শাস্তি লাঘব করা হয়েছে?

৫.৯.২ একটি আপত্তি ও তার জবাব

৫.৯.৩ একটি সতর্কতামূলক উপদেশ

ষষ্ঠ অধ্যায়

মওলিদুন্নবী (দ:) উদযাপনের ব্যাপারে মুহাদ্দেসীন-এ-কেরাম ও ইমামবৃন্দের দৃষ্টিভঙ্গি

৬.১ হুজ্জা আল-দীন ইমাম মুহাম্মদ বিন যুফার (৪৯৭-৫৬৫ হিজরী)

৬.২ শায়খ মুঈন আল-দীন উমর বিন মুহাম্মদ আল-মাল্লা (জন্ম: ৫৭০ হিজরী)

৬.৩ ইবনে আল-জাওযী (৫১০-৫৭৯ হিজরী)

৬.৪ আবূ আল-খাত্তাব বিন দিহইয়া আল-কালবী (৫৪৪-৬৩৩ হিজরী)

৬.৫ শামস আল-দীন আল-জাযারী (বেসাল: ৬৬০ হিজরী)

৬.৬ ইমাম আবূ শামা (৫৯৯-৬৬৫ হিজরী)

৬.৭ ইমাম সদর আল-দীন মাওহুব বিন উমর আল-জাযারী (বেসাল: ৬৬৫ হিজরী)

৬.৮ ইমাম যাহির আল-দীন জা’ফর আল-তাযনাতী (বেসাল: ৬৮২ হিজরী)

৬.৯ ইবনে তাইমিয়্যা (৬৬১-৭২৮ হিজরী)

৬.১০ ইমাম আবূ আবদ-আল্লাহ বিন আল-হাজ্জ আল-মালেকী (বেসাল: ৭৩৭ হিজরী)

৬.১১ ইমাম শামস আল-দীন আল-যাহাবী (৬৭৩-৭৪৮ হিজরী)

৬.১২ ইমাম কামাল আল-দীন আল-আদফাউয়ী (৬৮৫-৭৪৮ হিজরী)

৬.১৩ তকী আল-দীন আবূ আল-হাসান আল-সুবকী (৬৮৩-৭৫৬ হিজরী)

৬.১৪ ইমাদ আল-দীন বিন কাসীর (৭০১-৭৭৪ হিজরী)

৬.১৪.১ আবূ সাঈদ আল-মুযাফফর (সুলতান গাযী সালাহউদ্দীনের ভগ্নিপতি) কর্তৃক উদযাপিত মওলিদুন্নবী (দ:)

৬.১৫ বুরহান আল-দীন বিন জামা’আ (৭২৫-৭৯০ হিজরী)

৬.১৬ যাইন আল-দীন বিন রাজাব আল-হাম্বলী (৭৩৬-৭৯৫ হিজরী)

৬.১৭ ওলী আল-দীন আবূ যুর’আ আল-ইরাক্বী (৭৬২-৮২৬ হিজরী)

৬.১৮ শামস আল-দীন মুহাম্মদ আল-দিমাশকী (৭৭৭-৮৪২ হিজরী)

৬.১৯ ইবনে হাজর আল-আসকালানী (৭৭৩-৮৫২ হিজরী)

৬.২০ ইমাম শামস আল-দীন আল-সাখাবী (৮৩১-৯০২ হিজরী)

৬.২১ ইমাম জালাল আল-দীন আল-সুয়ুতী (৮৪৯-৯১১ হিজরী)

৬.২২ শিহাব আল-দীন আবূ আল-আব্বাস আল-কসতলানী (৮৫১-৯২৩ হিজরী)

৬.২৩ নাসির আল-দীন বিন আল-তাব্বাখ

৬.২৪ জামাল আল-দীন বিন আবদ্ আল-রাহমান অাল-তাত্তানী

৬.২৫ ইমাম ইউসূফ বিন আলী বিন যারিক্ব আল-শামী

৬.২৬ মুহাম্মদ বিন ইউসূফ আল-সালেহী আল-শামী (বেসাল: ৯৪২ হিজরী)

৬.২৭ ইবনে আল-হাজর আল-হায়তামী আল-মক্কী (৯০৯-৯৭৩ হিজরী)

৬.২৮ মুহাম্মদ বিন জার আল্লাহ বিন যাহিরা আল-হানাফী (বেসাল: ৯৮৬ হিজরী)

৬.২৯ কুতুব আল-দীন আল-হানাফী (বেসাল: ৯৮৮ হিজরী)

৬.৩০ মোল্লা আলী ক্বারী (ইন্তেকাল: ১০১৪ হিজরী) কৃত গবেষণা

৬.৩১ মোজাদ্দেদে আলফে সানী (৯৭১-১০৩৪ হিজরী)

৬.৩২ ইমাম আলী বিন ইবরাহীম আল-হালাবী (৯৭৫-১০৪৪ হিজরী)

৬.৩৩ শায়খ আবদ আল-হক্ব মুহাদ্দীস আল-দেহেলভী (৯৫৮-১০৫২ হিজরী)

৬.৩৪ ইমাম মুহাম্মদ আল-যুরকানী মালেকী (১০৫৫-১১২২ হিজরী)

৬.৩৫ শাহ আবদ আল-রাহীম আল-দেহেলভী (১০৫৪-১১৩১ হিজরী)

৬.৩৬ শায়খ ইসমাঈল আল-হাক্কী (১০৬৩-১১৩৭ হিজরী)

৬.৩৭ শাহ ওলী আল্লাহ মুহাদ্দীস আল-দেহেলভী (১১১৪-১১৭৪ হিজরী)

৬.৩৮ শাহ আবদ আল-আযীয মুহাদ্দীস আল-দেহেলভী (১১৫৯-১২৩৯ হিজরী)

৬.৩৯ আবদ আল্লাহ বিন মুহাম্মদ বিন আবদ আল-ওয়াহহাব আল-নজদী (১১৬৫-১২৪২ হিজরী)

৬.৪০ শাহ আহমদ সাঈদ মুজাদ্দেদী আল-দেহেলভী (ইন্তেকাল: ১২৭৭ হিজরী)

৬.৪১ মুফতী মুহাম্মদ এনায়াত আহমদ আল-কাকাওরাউয়ী (১২২৮-১২৭৯ হিজরী)

৬.৪২ আহমদ আলী সাহারানপুরী (ইন্তেকাল: ১২৯৭ হিজরী)

৬.৪৩ সাইয়্যেদ আহমদ বিন যাইনী আল-দাহলান মক্কী (১২৩৩-১৩০৪ হিজরী)

৬.৪৪ আবদ্ আল-হাই লাখনৌভী (১২৬৪-১৩০৪ হিজরী)

৬.৪৫ নওয়াব সিদ্দীক হাসান খাঁন ভূপালী (মৃত্যু: ১৩০৭ হিজরী)

৬.৪৬ হাজ্বী এমদাদউল্লাহ মুহাজিরে মক্কী (১২৩৩-১৩১৭ হিজরী)

৬.৪৭ নওয়াব ওয়াহিদুজ্জামান (ইন্তেকাল: ১৩৩৮ হিজরী)

৬.৪৮ ইউসূফ বিন ইসমাঈল আল-নাবহানী (১২৬৫-১৩৫০ হিজরী)

৬.৪৯ ড: মুহাম্মদ ইকবাল (১২৯৪-১৩৫৭ হিজরী)

৬.৫০ আশরাফ আলী থানবী (১২৮০-১৩৬২ হিজরী)

৬.৫১ মুফতী রশীদ আহমদ লুধিয়ানবী (জন্ম: ১৩৪১ হিজরী)

৬.৫২ মুফতী মুহাম্মদ মাযহারউল্লাহ আল-দেহেলভী

৬.৫৩ শায়খ মুহাম্মদ রেযা আল-মিসরী সাহেবের গবেষণা

৬.৫৪ দেওবন্দী মৌলভীদের সর্বসম্মত মত

৬.৫৫ মুসলিম বিশ্বে মওলিদুন্নবী (দ:) উদযাপনের ইতিহাস

৬.৫৫.১ মক্কা মোয়াযযমায় মওলিদ উদযাপন

৬.৫৫.১.১ মক্কায় চাক্ষুস সাক্ষীদের বিবরণ

৬.৫৫.২ মদীনা মোনাওয়ারায় মওলিদ উদযাপন

৬.৫৫.৩ মিসর ও পূর্ব-ভূমধ্যসাগরীয় অঞ্চলে মওলিদ উদযাপন

৬.৫৫.৪ কাওস এলাকায় মওলিদ উদযাপন

৬.৫৫.৫ আন্দালূসিয়া (স্পেন) ও রোমে মওলিদ উদযাপন

৬.৫৫.৬ ভারত উপমহাদেশে মওলিদ উদযাপন

৬.৫৬ মওলিদ-বিষয়ক তাৎপর্যপূর্ণ লেখনীসমগ্র

সপ্তম অধ্যায়

যে কারণে প্রথম মুসলমান প্রজন্ম মওলিদ পালন করেননি

৭.১ আসহাব (রা:)-বৃন্দের জন্যে মহানবী (দ:)’র বেসাল শরীফ ছিল চরম বেদনাময়

৭.১.১ দুঃখের সময় প্রকাশ্যে আনন্দ উদযাপনের অনুমতি দেয় না মানব-স্বভাব

৭.২ প্রথম প্রজন্মের খুশি প্রকাশে এই মহাশোক ছিল বড় বাধা

৭.২.১ মহানবী (দ:) হতে বিচ্ছেদ: হযরত আবূ বকর (রা:)’এর বেসালের কারণ

৭.২.২ মহানবী (দ:)’র বেসালে হযরত উমর (রা:)’এর প্রতিক্রিয়া

৭.২.৩ হযরত ফাতেমাতুয্ যাহরা (রা:)’র শোক

৭.২.৪ হযরত আনাস বিন মালেক (রা:)’এর শোক

৭.২.৫ হযরত বিলাল বিন রাবাহ (রা:)’এর শোক

৭.২.৬ হযরত আবদুল্লাহ বিন উমর (রা:)’এর শোক

৭.২.৭ হযরত আবদুল্লাহ বিন যায়দ (রা:)’এর শোক ও তাঁর দৃষ্টিশক্তি লোপ

৭.২.৮ আসহাব (রা:)-বৃন্দের শোকের আরো বর্ণনা

৭.২.৯ মহানবী (দ:)’কে সেবাদানকারী প্রাণিদের শোক

৭.৩ রবিউল আউয়াল মাসে খুশি ও শোক সমানভাবে অনুভূত

৭.৪ সময়ের পরিক্রমণে শোকের ওপর খুশির প্রাধান্য বিস্তার

৭.৫ মহানবী (দ:)’র বেলাদত ও বেসাল উভয়ই রহমতস্বরূপ

৭.৬ রাসূলুল্লাহ (দ:)’এর বেসাল তাঁর উম্মতের জন্যে সুপারিশের এক উৎসস্বরূপ

৭.৭ কোনো খোদায়ী আশীর্বাদপ্রাপ্তিতে খুশি হওয়া আল্লাহতা’লারই বিধান

৭.৮ আমরা তাঁর রহমত পেয়েছি, তবে কেন এই দুঃখ?

৭.৯ শেষ বিচার দিবস অবধি মহানবী (দ:)’র ভবিষ্যদ্বাণী প্রতিষ্ঠিত

৭.১০ খুশি প্রকাশ কোনো বেদআত নয়: এটা মানবপ্রকৃতি

৭.১১ কোনো ঘটনা/অনুষ্ঠান পালন প্রথম প্রজন্মের সংস্কৃতি ছিল না

৭.১১,১ মদীনায় হিজরত

৭.১১.২ মদীনা সনদ

৭.১১.৩ বদর দিবস

৭.১১.৪ মক্কা বিজয়

৭.১১.৫ শবে কদর: কুরআন নাযেলের রাত

৭.১১.৬ নবযুগে নতুন প্রয়োজন

অষ্টম অধ্যায়

মওলিদুন্নবী (দ:)’র গঠনাত্মক উপাদান

পরিচ্ছেদ – ১

মাহফিল ও অনুষ্ঠানের আয়োজন

৮.১ মহানবী (দ:) কর্তৃক তাঁরই সৃষ্টির ঘটনা উল্লেখ যা বেলাদতের আগে ঘটেছিল

৮.২ মহানবী (দ:) কর্তৃক তাঁর বেলাদতের স্মরণে সমাবেশের আয়োজন

৮.৩ মহানবী (দ:)’র গুণ/বৈশিষ্ট্য ও মাহাত্ম্যের স্মরণে বিশেষ মজলিশের আয়োজন

পরিচ্ছেদ – ২

রাসূলুল্লাহ (দ:)’র জীবনী ও গুণাবলী আলোচনা

৮.৪ শরয়ী বিধানের উল্লেখ

৮.৫ নবী পাক (দ:)’এর সহজাত প্রতিভা ও সদাচরণ

৮.৬ মহানবী (দ:)’র শারীরিক বৈশিষ্ট্যের উল্লেখ

৮.৭ রাসূলুল্লাহ (দ:)’এর চমৎকার গুণাবলী ও অসাধারণত্বের বর্ণনা

৮.৮ তাঁর পবিত্র বেলাদতের বিবরণ ও সেসময় সংঘটিত মহান আধ্যাত্মিক নিদর্শনের উল্লেখ

পরিচ্ছেদ – ৩

মহানবী (দ:)’র প্রশংসায় না’ত/কসীদা/শে’র/পদ্যের আবৃত্তি

৮.৯ কুরআন মজীদে নিহিত রাসূলুল্লাহ (দ:)’এর কাব্যিক প্রশংসা

৮.১০ হুযূর পাক (দ:) নিজেই নিজের প্রশংসাসূচক কবিতা শুনেছেন

৮.১০.১ হযরত হাসান বিন সাবেত (রা:) হতে প্রশংসাসূচক কবিতা শ্রবণ

৮.১০.২ হযরত আল-আসওয়াদ বিন সারী’ (রা:) হতে প্রশংসাসূচক কবিতা শ্রবণ

৮.১০.৩ হযরত আবদুল্লাহ বিন রাওয়াহা (রা:) হতে প্রশংসাসূচক কবিতা শ্রবণ

৮.১০.৪ হযরত আমির বিন আকওয়া (রা:) হতে প্রকাশ্য সমাবেশে প্রশংসাসূচক কবিতা শ্রবণ

৮.১০.৫ হযরত আব্বাস বিন আব্দিল মুত্তালিব (রা:) হতে প্রশংসাসূচক কবিতা শ্রবণ

৮.১০.৬ হযরত কা’আব (রা:) হতে প্রশংসাসূচক কবিতা শ্রবণ ও তাঁকে আলখাল্লা দান

৮.১০.৭ হযরত নাবিগা আল-জা’দী (রা:) হতে প্রশংসাসূচক কবিতা শ্রবণ

৮.১০.৮ মদীনাবাসী মেয়েদের দফ (ঢোল)-সহ প্রশংসাসূচক না’ত পরিবেশন

৮.১০.৯ ইমাম বুসিরী (রহ:)’র আরোগ্য লাভ ও রাসূল (দ:) হতে উপহারস্বরূপ তাঁরই জুব্বাপ্রাপ্তি

৮.১১. মহানবী (দ:)’র সম্মানে বন্দনামূলক কাব্য আবৃত্তিকারী সাহাবা (রা:)-বৃন্দের তালিকা

পরিচ্ছেদ – ৪

রাসূলুল্লাহ (দ:)’এর প্রতি সালাত-সালাম পাঠ

৮.১২ মহানবী (দ:)’র প্রতি সালাওয়াত পাঠ আল্লাহরই সুন্নাহ ও বিধান

৮.১৩ সালাত-সালাম প্রেরণের তাৎপর্য

৮.১৪ সালাত-সালামের অনন্ত স্বতন্ত্র মর্যাদা

৮.১৪.১ রাসূল (দ:)’এর প্রতি সালাত-সালামের মাধ্যমেই আল্লাহর কাছে কারো দোয়া কবূল হয়

৮.১৪.২ (নামাযের) তাশাহহুদে সালাত-সালাম

৮.১৪.৩ নামাযের পরে সালাত-সালাম প্রেরণের পক্ষে রাসূল (দ:)-এর নির্দেশ

৮.১৫ সালাওয়াত হুযূর পাক (দ:)’এর কাছে পৌঁছে

৮.১৫.১ সালাত-সালাম হুযূর পাক (দ:)’এর কাছে সরাসরি পৌঁছে

৮.১৫.২ মহানবী (দ:) সরাসরি সালাত-সালাম শোনেন

৮.১৫.৩ হুযূর পাক (দ:) সালাওয়াতের জবাব দেন

৮.১৫.৪ মহানবী (দ:)’র প্রতি ফেরেশতাবৃন্দ সালাত-সালাম পাঠ করেন

পরিচ্ছেদ – ৫

ক্বিয়াম (দাঁড়াবার রীতি)

৮.১৬ ক্বিয়াম বা দাঁড়াবার রীতি কি শুধু আল্লাহরই জন্যে খাস (সুনির্দিষ্ট)?

৮.১৬,১ নামাযের দাঁড়ানো ও বসা অবস্থাগুলো খোদ এবাদত নয়

৮.১৬.২ দাঁড়ানো অবস্থা যদি এবাদত হয়, তাহলে অন্যান্য অবস্থাগুলো কী হবে?

৮.১৬.৩ নামাযের দাঁড়ানো প্রথা এবাদত হয় কোন্ উপায়ে?

৮.১৭  ক্বিয়াম (প্রথাগত দাঁড়ানো) সুন্নাহ’র আলোকে অনুমতিপ্রাপ্ত

৮.১৮ ক্বিয়ামের শ্রেণিকরণ

৮.১৮.১ ক্বিয়াম লিল্ এসতেক্ববাল বা কাউকে স্বাগত জানাতে দাঁড়ানো

৮.১৮.২ ক্বিয়াম লিল্ মুহাব্বাহ বা ভালোবাসা প্রকাশার্থে দাঁড়ানো

৮.১৮.৩ ক্বিয়াম লিল্ ফারহা বা আনন্দ প্রকাশার্থে দাঁড়ানো

৮.১৮.৪ ক্বিয়াম লিত্ তা’যিম বা সম্মানার্থে দাঁড়ানো

৮.১৮.৪.১ ক্বিয়াম লিল্ এসতেক্ববাল ও ক্বিয়াম লিত্ তা’যিমের মধ্যকার পার্থক্য

৮.১৮.৪.২ মহানবী (দ:)’র সম্মানার্থে সাহাবা (রা:)-বৃন্দের চর্চিত দাঁড়ানোর প্রথা

৮.১৮.৪.৩ নামায আল্লাহরই জন্যে; এক্বামত রাসূলুল্লাহ (দ:)’এর জন্যে

৮.১৮.৫ মানুষের মর্যাদার জন্যে দাঁড়ানো (ক্বিয়াম লিল্ একরাম আল-ইনসানি)

৮.১৮.৬ যিকর বা স্মরণের জন্যে দাঁড়ানো (ক্বিয়াম লিয্ যিকর)

৮.১৮.৬.১ মহানবী (দ:)’র যিকর বা স্মরণ হচ্ছে মহান আল্লাহতা’রই যিকর

৮.১৮.৭ শান্তি ও আশীর্বাদ প্রেরণ করতে দাঁড়ানো (ক্বিয়াম লিস্ সালাত ওয়াস্ সালাম)

৮.১৮.৭.১ সালাতের অর্থ: শান্তি ও আশীর্বাদ বর্ষণ/প্রেরণের প্রার্থনা

৮.১৮.৭.২ সালাত শব্দটির আক্ষরিক/আভিধানিক অর্থ

৮,১৮.৭.৩ সালাত শব্দটির আক্ষরিক অর্থের প্রয়োগ

৮.১৮.৮ মহানবী (দ:)’কে অভ্যর্থনা জানাতে মওলিদে দাঁড়ানো হয় না

৮.১৮.৯ মওলিদে দাঁড়ানোর প্রথা মূলতঃ খুশি প্রকাশের উদ্দেশ্যে

৮.১৮.১০ ক্বিয়ামের প্রতি নিষেধাজ্ঞা: এর কারণসমূহ

পরিচ্ছেদ – ৬  

আলোকসজ্জার আয়োজন

৮.১৯ তারকারাজি আতশবাজির মতো নেমে এসেছিল

৮.২০ রাসূলুল্লাহ (দ:)’এর বেলাদত উপলক্ষে মক্কা মুয়াযযমায় মোমবাতি জ্বালানো

পরিচ্ছেদ – ৭

খাবার বণ্টন

৮.২১ মানুষদেরকে খাওয়ানোর চমৎকার গুণ সম্পর্কে কুরআন মজীদের বর্ণনা

৮.২২ অন্যদেরকে খাওয়ানোর জন্যে হাদীসে প্রদত্ত উৎসাহ

পরিচ্ছেদ – ৮

মওলিদের জুলূস্ বা মিছিল

পরিচ্ছেদ – ৯

মওলিদুন্নবী (দ:)’র বিভিন্ন দিক: একটি সংক্ষিপ্ত পর্যালোচনা

৯.১ শরীয়তের দিক

৯.১.১ আল্লাহ’র বর্ষিত রহমত-বরকতের স্মরণ

৯.১.২ খাদ্য-ভর্তি খাঞ্চা অবতীর্ণ হওয়ার দিনটিকে ঈদ হিসেবে উদযাপন

৯.২ ঐতিহাসিক দিক

৯.৩ সাংস্কৃতিক দিক

৯.৪ নির্দেশনামূলক দিক

৯.৪.১ পিতামাতার মৌলিক দায়িত্ব ও কর্তব্য

৯.৪.২ চিন্তার খোরাক

৯.৪.৩ ঈমান হেফাযত বা রক্ষার কৌশল

৯.৫ দা’ওয়া বা ধর্মপ্রচারের দিক

৯.৬ উদ্বুদ্ধকরণের দিক

৯.৬.১ আমল বা ধর্ম অনুশীলনের বাহ্যিক ও অভ্যন্তরীণ বিশেষ দিকসমূহ

৯.৬.২ পুণ্যদায়ক আমলের সারাংশ বা নির্যাস হচ্ছে নবী পাক (দ:)’এর প্রতি ভালোবাসা

৯.৭ আধ্যাত্মিক দিক

দশম অধ্যায়

মওলিদুন্নবী (দ:) উদযাপন কি বেদআত?

১০.১ বেদআতের আক্ষরিক অর্থ

১০.১.১ আল-কুরআন হতে এর অর্থ নিশ্চিতকরণ

১০.২ বেদআতের প্রায়োগিক অর্থ

১০.৩ স্থানীয় (লোকজ) সংস্কৃতির প্রতিটি দিক-ই কি বেদআত?

১০.৩.১ আসহাব (রা:)-বৃন্দের সাংস্কৃতিক আচার ও প্রথা

১০.৩.২ মওলিদুন্নবী (দ:)-এর সাংস্কৃতিক বহিঃপ্রকাশ

১০.৩.২.১ মীলাদুন্নবী (দ:)-এর জুলূস সংস্কৃতির আওতাধীন

১০.৩.২.২ মহানবী (দ:)-এর প্রতি দাঁড়িয়ে সালাত-সালাম পেশ সংস্কৃতির আওতাধীন

১০.৩.২.৩ মওলিদে সাজানো সংস্কৃতির আওতাধীন

১০.৪ বেদআতের প্রকৃত অর্থ

১০.৪.১ ভ্রান্ত ধারণার অপনোদন এবং ‘ফাহুয়া রাদ্দ’ বাক্যটির সঠিক উপলব্ধি

১০.৫ ধর্মে নতুন বিষয়ের প্রবর্তন: রাসূল (দ:)-এর যুগে এর উদ্দিষ্ট অর্থ

১০.৬ খুলাফায়ে রাশেদীনের যুগে উদ্ভূত ’মুহদাসাত আল-উমূর’ (নতুন বিষয়াদি)

১০.৬.১ মিথ্যে নুবুওয়্যত আরোপের সীমা লঙ্ঘনকে বেদআত ঘোষণা করা হয়

১০.৬.২ রিদ্দাহ’র (ধর্মত্যাগের) সীমা লঙ্ঘনকে বেদআত ঘোষণা করা হয়

১০.৬.৩ যাকাত দানে অস্বীকৃতি জ্ঞাপনকারীদের সীমা লঙ্ঘনকে বেদআত ঘোষণা করা হয়

১০.৬.৪ খাওয়ারিজদের (খারেজী গোষ্ঠীর) সীমা লঙ্ঘনকে বেদআত ঘোষণা করা হয়

১০.৬.৪.১ আমাদের যুগে কোনো কিছুকে ’নতুন প্রবর্তিত বিষয়’ (মুহদাসাত আল-উমূর) বলার সঠিক পদ্ধতি কী?

১০.৭ সাহাবা (রা:)-বৃন্দের বর্ণনার আলোকে বেদআতের সংজ্ঞা (ধারণা)

১০.৭.১ আল-কুরআনের সংকলন ও শায়খাইন (প্রথম দুই খলীফা)-এর আচরিত প্রথা

১০.৭.২ জামা’আতে তারাবীহ’র নামায আদায়ের প্রবর্তন

১০.৭.৩ শুক্রবারের জুমু’আর নামাযের আগে দ্বিতীয় আযান

১০.৮ বেদআতের ধারণা এবং কতিপয় সাম্প্রতিককালের উদাহরণ

১০.৮.১ ইসলামী রাষ্ট্রের গোড়াপত্তন (বা প্রতিষ্ঠা)

১০.৮.২ মসজিদ নির্মাণ

১০.৮.৩ কুরআন মজীদের অনুবাদ ও ব্যাখ্যাকরণ

১০.৯ উলামাদের মতানুযায়ী বেদআতের শ্রেণিবিন্যাস

১০.৯.১ ইমাম আল-শাফেঈ (১৫০-২০৪ হিজরী)

১০.৯.২ ইযয আল-দ্বীন বিন আব্দিস্ সালাম (৫৭৭-৬৬০ হিজরী)

১০.৯.৩ মোল্লা আলী ক্বারী আল-হানাফী (ইন্তেক্বাল: ১০১৪ হিজরী)

১০.৯.৩.১ ’প্রত্যেক বেদআত-ই ভ্রান্তি’ – হাদীসটির সঠিক মর্ম উপলব্ধি

১০.১০ বেদআতের শ্রেণিবিভাগ

১০.১০.১ বেদআতে হাসানা (প্রশংসনীয় নতুন প্রথা)-এর উপ-শ্রেণিসমূহ

১০.১০.১.১ আল-বেদআত আল-ওয়াজিবা বা আবশ্যকীয় নতুন প্রথা

১০.১০.১.২ আল-বেদআত আল-মুস্তাহাব্বা/মুস্তাহসানা তথা প্রশংসনীয় নতুন প্রথা

১০.১০.১.৩ আল-বেদআত আল-মুবাহা বা অবস্থাভেদে বৈধ বলে বিবেচিত নতুন প্রথা

১০.১০.২ দূষণীয় বা মন্দ নতুন প্রথার উপ-শ্রেণিসমূহ

১০.১০.২.১ নিষিদ্ধ নতুন প্রথা (আল-বেদআত আল-মুহাররামা)

১০.১০.২.২ অপন্দনীয় নতুন প্রথা (আল-বেদঅাত আল-মাকরুহা)

১০.১০.৩ হাদীসের আলোকে বেদআত শ্রেণিকরণের প্রামাণ্য দলিল

১০.১১ মওলিদুন্নবী (দ:)-এর ভিত্তি আল-কুরআন ও হাদীস শরীফেই নিহিত

১০.১২ উম্মতে মুহাম্মদীয়্যার সংখ্যাগরিষ্ঠ অংশ কোনো ভ্রান্তিতে ঐকমত্য পোষণ করবেন না

১০.১৩ ধর্মের প্রকৃত মর্মবাণী অনুধাবন করা অত্যাবশ্যক

একাদশতম অধ্যায়

মওলিদুন্নবী (দ:)-এর সাথে সংশ্লিষ্ট মতবাদগত বিষয়াদি

১১.১ মওলিদুন্নবী (দ:) শব্দটির প্রয়োগ

১১.১.১ আরবী ভাষাতত্ত্বের বইপত্রে মীলাদ শব্দটির ব্যবহার

১১.১.২ হাদীস ও সীরাহ (জীবনী)-গ্রন্থাবলীতে মীলাদ শব্দটির ব্যবহার

১১.১.৩ সাহিত্যকর্মে মীলাদ শব্দটির ব্যবহার

১১.২ মওলিদুন্নবী (দ:) খুশির ঈদ, শরীয়তের (বিধি মোতাবেক) ঈদ নয়

১১.৩ মহানবী (দ:)-এর গুণাবলী ও মওলিদুন্নবী (দ:)-এর বিবরণ প্রদানে মুহাদ্দেসীনবৃন্দের দৃষ্টিভঙ্গি

১১.৩.১ কিতাব আল-মানাক্বিবের অধ্যায়গুলো বিন্যাসে ইমাম তিরমিযীর গৃহীত পদ্ধতি

১১.৪ মহানবী (দ:)-এর গুণাবলী ও মওলিদুন্নবী (দ:)-এর বিবরণ প্রদানে ইতিহাসবিদদের দৃষ্টিভঙ্গি

১১.৫ মওলিদুন্নবী (দ:)-এর পক্ষে শরীয়তের দলিল দাবি প্রসঙ্গে

১১.৬ মওলিদুন্নবী (দ:)-এর উদযাপন তওহীদেরই বহিঃপ্রকাশ

১১.৭ মওলিদুন্নবী (দ:) উপলক্ষে অর্থব্যয় করা অপচয় নয়

১১.৮ ইসলামের শ্রেষ্ঠত্ব ও মাহাত্ম্য প্রকাশের আয়োজনসমূহ

১১.৯ মওলিদুন্নবী (দ:)-এর মাহফিল আয়োজনের প্রয়োজনীয়তা

১১.১০ যেসব দিক সংস্কারের প্রয়োজন

১১.১১ বাড়াবাড়ি এড়িয়ে চলার আবশ্যকতা

লেখক/গ্রন্থ তালিকা

বর্ণনানুক্রমিক তালিকা

কুরআনের আয়াতের তালিকা

হাদীস ও রেওয়ায়াতের তালিকা

সাধারণ তালিকা

মুখবন্ধ

পয়গম্বর (আ:)-বৃন্দের মাঝে সর্বোচ্চ মর্যাদার আসনে আসীন মহানবী (দ:)-এর আশীর্বাদধন্য ও ঐতিহাসিক বেলাদত তথা ধরাধামে শুভাগমন উপলক্ষে খুশি ও কৃতজ্ঞতা প্রকাশের অভিব্যক্তি-ই হচ্ছে মওলিদুন্নবী (দ:)-এর উদযাপন। এটা এমনই এক প্রশংসনীয় আমল (ধর্মীয় অনুশীলন), যা দ্বারা এমন কি আবূ লাহাবের মতো একজন কাফের-ও উপকার পেয়ে থাকে। রাসূলুল্লাহ (দ:)-এর বেলাদত উপলক্ষে খুশি প্রকাশ করায় আবূ লাহাবের মতো কট্টরপন্থী কাফেরের শাস্তি যদি প্রতি সোমবার লাঘব করা হয়, তাহলে সেই (মু’মিন) মুসলমানের ক্ষেত্রে কী পুরস্কার বরাদ্দ রয়েছে যিনি সারা জীবন এই দিনটি উদযাপন করে আসছেন?

সৃষ্টির সেরা খোদ মহানবী (দ:)-ই নিজের বেলাদত দিবস সোমবারকে সম্মান করতেন। (আল্লাহর প্রতি) শুকরিয়া জানানোর উদ্দেশ্যে তিনি এই দিনটিতে রোযা রাখতেন, কেননা এই দিনেই তিনি পৃথিবীবাসীর কাছে পরিচিত হয়েছিলেন। এ কাজ করে তিনি কৃতজ্ঞতা প্রকাশের খোদায়ী আদেশ-ই পালন করেছিলেন মাত্র, যেহেতু তাঁর সম্মানিত অস্তিত্বের উপলক্ষেই বিশ্বজগতের সব কিছু সৃষ্টি করা হয়েছিল।

মওলিদুন্নবী (দ:)-এর উদযাপন তাতে অংশগ্রহণকারীদের অন্তরে মহাসম্মানিত রাসূলুল্লাহ (দ:)-এর প্রতি সালাত-সালাম প্রেরণের মতো গুরুত্বপূর্ণ দায়িত্ব ও কর্তব্য পালনে উৎসাহ যোগায়, যা অন্তরে (তাঁর সান্নিধ্য লাভের) আকাঙ্ক্ষার অনুভূতি জাগ্রত করে। শরীয়ত অনুযায়ী তাঁর প্রতি সালাওয়াত পাঠের আমলটি ব্যাপক সওয়াবের উৎস, আর তাই উম্মতের সংখ্যাগরিষ্ঠ অংশ মওলিদ’কে উপকারী আমল হিসেবে বিবেচনা করেছেন।

মীলাদের সমাবেশগুলো রাসূলুল্লাহ (দ:)-এর সীরাহ (জীবনী) মোবারকের গুরুত্ব পুনর্ব্যক্ত ও তাঁর প্রতি ভালোবাসা নতুন করে উজ্জীবিত করার ক্ষেত্রে পূর্ণ ভূমিকা রাখে। এই কারণেই মওলিদের মাহফিলে অন্তর্ভুক্ত থাকে মহানবী (দ:)-এর নবুওয়্যতের অনুকরণীয় আদর্শ, তাঁরই গুণাবলী, চারিত্রিক বৈশিষ্ট্য ও মো’জেযাসমূহের তাযকেরা (স্মরণার্থে আলোচনা) এবং বিবরণ। মওলিদুন্নবী (দ:)-এর মূল লক্ষ্য ও উদ্দেশ্য হচ্ছে মহানবী (দ:)-এর মহব্বত ও সান্নিধ্য অর্জন এবং প্রত্যেক মু’মিন মুসলমানের কাছে সবচেয়ে সম্মানিত সত্তা তথা রাসূলুল্লাহ (দ:)-এর সাথে তাঁদের আত্মিক সম্পর্কের বন্ধন সুদৃঢ়ীকরণ। এটা আপনাআপনি-ই শরীয়তের মূল লক্ষ্যকে বাস্তবায়ন করে। তাঁর গুণাবলী ও পূর্ণতাকে স্বীকার করলে কারো অন্তরে সর্বশক্তিমান আল্লাহর প্রতি এবং রাসূলুল্লাহ (দ:)-এর রেসালাতের প্রতি ঈমান মজবুত হয়। মহানবী (দ:)-কে সম্মান প্রদর্শন হচ্ছে ঈমানের সর্বপ্রথম মৌলিক প্রয়োজনীয় শর্ত।

মওলিদুন্নবী (দ:)-এর মাধ্যমে প্রকাশিত খুশি, (আল্লাহ’র) যিকিরের মাহফিল অনুষ্ঠান ও মহানবী (দ:)-এর শানে না’ত-কসীদা-সেমা’ আবৃত্তি, এর পাশাপাশি মানুষের মাঝে খাবার পরিবেশন, এসব-ই আল্লাহর প্রতি কৃতজ্ঞতা প্রকাশের অন্যতম শ্রেষ্ঠ একটি পদ্ধতি। মহানবী (দ:)-কে আমাদের মাঝে প্রেরণ করে মহান আল্লাহতা’লা আমাদেরকে তাঁরই অশেষ, অফুরন্ত রহমত-বরকত-নেয়ামত (মানে আশীর্বাদ) লাভে হক্বদার করেছেন; আর তাই তিনি আমাদের এই সর্বাধিক সেরা পুরস্কারের কথা স্মরণ করিয়ে দিয়েছেন।

আল্রাহতা’লা যেমন রমযান মাসকে কুরআন নাযেলের কারণে অন্যান্য মাসের চেয়ে শ্রেষ্ঠ করেছেন, ঠিক তেমনি রবিউল আউয়াল মাসটিও আলাদা বৈশিষ্ট্যমণ্ডিত হয়েছে এ মর্মে যে এই মাসে কুরআন মজীদ যিনি আমাদের কাছে নিয়ে এসেছিলেন, সেই মহান সত্তা এই ধরাধামে শুভাগমন করেছিলেন। রাসূলুল্লাহ (দ:)-এর আশীর্বাদধন্য বেলাদত দ্বারাই এই মাসটি অন্যান্য সব মাসের চেয়ে অধিকতর পুণ্যময় হয়েছে।

বস্তুত যে রাতে সর্বশ্রেষ্ঠ নবী (দ:)-এর বেলাদত হয়, সেটা লাইলাতুল ক্বদরের রাতের চেয়েও উচ্চ মর্যাদাসম্পন্ন। রাইলাতুল ক্বদরে সর্বপ্রথম আল-কুরআন ও ফেরেশতা অবতীর্ণ হয়। কিন্তু হুযূর পূর নূর (দ:), যাঁর অন্তরে আল-কুরআন নাযেল হয়, তিনি না হলে আমরা কোনো ঐশী শাস্ত্রলিপি পেতাম না, লাইলাতুল ক্বদর-ও পেতাম না, কিংবা খোদ দ্বীন ইসলাম-ও পেতাম না। এসব নেয়ামত হযরত মুহাম্মাদুর রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লামের মাধ্যমেই কেবল অর্জিত হয়েছে। অতএব, তাঁর বেলাদতের রাতটি লাইলাতুল ক্বদরের রাতের চেয়ে শ্রেষ্ঠ।

আল্লাহতা’লা মানবজাতির প্রতি তাঁর অগণিত ও সীমাহীন রহমত-বরকত ও নেয়ামত দান করেছেন। এসব আশীর্বাদ অসংখ্য এবং এগুলো চিরকাল বর্ষিত হতে থাকবে। প্রতিটি নেয়ামত অপর যে কোনো নেয়ামতের মতোই বড়। এতদসত্ত্বেও সর্বশক্তিমান আল্লাহতা’লা নিজের আশীর্বাদগুলো সম্পর্কে গর্ব করেন না। তিনি আমাদের স্বাদগ্রহণের জন্যে আহার্যের এক বিশাল তালিকা মঞ্জুর করেছেন, কিন্তু তিনি তাঁর এই দান স্মরণ করেন না। তিনি আমাদেরকে বিভিন্ন ধরনের পানীয় দ্রব্য দ্বারা সতেজ রেখেছেন, কিন্তু নিজের এই দান সম্পর্কে কোনো গর্ব তিনি করেন না। রাত ও দিনের আবর্তমান চক্রের সুবাদে আমাদের সময় সুনিয়ন্ত্রিত হওয়ার দরুন আমরা বিশ্রাম নিতে পারি এবং জীবনের নানা চাহিদা পূরণ করতে সক্ষম হই; আসমান, জমিন ও দরিয়া, এসব কিছুকেই আমাদের অধীনস্থ করে দেয়া হয়েছে; আমাদেরকে ‘আশরাফুল মাখলুকাত’ তথা আল্লাহতা’লার সেরা সৃষ্টি হিসেবে মনোনীত করা হয়েছে এবং সম্মান ও মর্যাদা-ও মঞ্জুর করা হয়েছে, কিন্তু সর্বশক্তিমান আল্লাহতা’লা তাঁর এসব দান স্মরণ না। আমাদেরকে পিতা-মাতা, ভাই-বোন ও সন্তান-সন্ততি দ্বারা আশীর্বাদধন্য করা হয়েছে; এই বিশ্বজগতের বিশাল ও বিস্তৃত প্রান্তসীমা হতে আরম্ভ করে আমাদের অন্তর্নিহিত সত্তার গভীরে এমন নেয়ামত আমাদের প্রতি মঞ্জুর করা হয়েছে, যা আমাদের মস্তিষ্কের উপলব্ধিরও অতীত; অথচ বিশ্বজগতের প্রভু (’রাব্বুল ‘আলামীন’) হওয়া সত্ত্বেও সর্বশক্তিমান আল্লাহতা’লা তাঁর এ অনুগ্রহ ও আশীর্বাদের গর্ব করেন না। তবে বিশ্বমানবতার জন্যে এমন এক আশীর্বাদ আল্লাহ পাক মঞ্জুর করেছেন, যাঁর খাতিরে তিনি প্রকাশ্য ও স্পষ্টভাবে নিজের করুণা, আশীর্বাদ ও অনুগ্রহের কথা স্মরণ করেন। তিনি ঈমানদার মুসলমানদেরকে এব্যাপারে সচেতন করেছেন এই বলে:

“নিশ্চয় আল্লাহর মহান অনুগ্রহ হয়েছে মুসলমানদের প্রতি যে তাদের মধ্যে তাদেরই মধ্য হতে একজন রাসূল প্রেরণ করেছেন, যিনি তাদের প্রতি তাঁর (খোদার) আয়াতসমূহ পাঠ করেন, আর তাদেরকে কিতাব (আল-ক্বুরআন) ও হিকমত (ইসলামী আধ্যাত্মিক জ্ঞান) শিক্ষা দান করেন, অথচ তারা (ঈমানদার মুসলমানবৃন্দ) নিশ্চয় এর আগে স্পষ্ট গোমরাহীতে ছিল” [আল-ক্বুরআন, ৩:১৬৪; মুফতী আহমদ এয়ার খাঁন (রহ:) কৃত ‘তাফসীরে নূরুল এরফান’]

দ্বীন-ইসলামে আল্লাহতা’লার প্রতি তাঁরই প্রদত্ত আশীর্বাদের জন্যে কৃতজ্ঞতা প্রকাশ করা খেদমতের একটি নিদর্শন মাত্র। এর যৌক্তিকতা আল-ক্বুরআনে উল্লেখিত হয়েছে এভাবে –

“এবং স্মরণ করো, যখন তোমাদের রব্ব শুনিয়ে দিলেন, ‘যদি তোমরা কৃতজ্ঞ হও, তবে আমি তোমাদেরকে আরো অধিক দান করবো এবং যদি অকৃজ্ঞ হও, তবে আমার শাস্তি কঠোর” [আল-ক্বুরআন, ১৪:৭]।

এই আয়াতটি ব্যাখ্যা করে যে খোদাতা’লার নেয়ামতের প্রতি কৃতজ্ঞতা প্রকাশ করার ফলশ্রুতিতে আরো অতিরিক্ত আশীর্বাদ লাভ সম্ভব হয়। খোদায়ী নেয়ামতের প্রতি শুকরিয়া আদায় করাটা এই উম্মতের জন্যে খাস বা সুনির্দিষ্ট নয়, বরং এটা পূর্ববর্তী উম্মাতগুলোর প্রতিও আরোপ করা হয়েছে। উদাহরণস্বরূপ, বনূ ইসরাঈল (ইহুদী) সম্প্রদায় যে আশীর্বাদের কারণে অন্যান্য জাতি-গোষ্ঠীর ওপরে আধিপত্য বিস্তার করতে পেরেছিল এবং ফেরাউনের জুলুম-অত্যাচার হতে মুক্তি পেয়েছিল, সেটা সম্পর্কে স্মরণ করিয়ে দেয়া হয়েছে:

“এবং স্মরণ করো, যখন আমি তোমাদেরকে ফের‘আউনী সম্প্রদায় থেকে নিষ্কৃতি দান করেছি, যারা তোমাদেরকে মর্মান্তিক যন্ত্রণা দিতো, তোমাদের পুত্রদেরকে যবেহ করতো আর তোমাদের কন্যাদেরকে জীবিত রাখতো; এবং এর মধ্যে তোমাদের রব্বের পক্ষ থেকে এক মহা ‘বালা’ নিহিত ছিল (অথবা ছিল এক মহা পুরস্কার)” [আল-ক্বুরআন, ২:৪৯]।

এই আয়াতে করীমা ব্যাখ্যা করে যে দাসত্ব থেকে মুক্তি এমনই এক মহা নেয়ামত যার দরুন এর প্রতি কৃতজ্ঞতা প্রকাশ করা পরবর্তী প্রজন্মগুলোর জন্যেও অত্যাবশ্যক হয়। এর থেকে সিদ্ধান্ত নেয়া যায়, কোনো জাতির মুক্তি অর্জন খোদাতা’লারই দানকৃত একটা উপহার যেটার শোকর-গুজারী করা বাধ্যতামূলক। এই আয়াতটি সাক্ষ্য দেয় এ বাস্তবতার যে, সুশৃঙ্খল পদ্ধতিতে খোদায়ী নেয়ামতের মূল্যায়ন ও খুশি উদযাপন করা জরুরি, যাতে পরবর্তীকালে আগত প্রজন্মগুলো এই আশীর্বাদের মূল্য অনুধাবন করতে পারে এবং এর গুরুত্ব-ও উপলব্ধি করতে সক্ষম হয়।

মানুষ সাধারণতঃ সারা বছরই আল্লাহতা’লার আশীর্বাদগুলোর প্রতি কৃতজ্ঞতা প্রকাশ করে থাকে; তবুও সময়ের পরিক্রমণে সমগ্র উম্মাহকে আল্লাহর মঞ্জুরিকৃত কোনো তাৎপর্যপূর্ণ দিন আগমন করলে এর খুশির বহিঃপ্রকাশ আপনাআপনি সামষ্টিক উদযাপনে রূপ নেয়। কুরআন মজীদে বর্ণিত আছে যে বনূ ইসরাঈল বংশকে ফেরাউনের অত্যাচার-নিপীড়ন থেকে মুক্ত করার পর এবং নীল-নদের স্রোত পার হয়ে নিরাপদে সিনাই উপত্যকায় তাদের প্রবেশের পর তারা মারাত্মক গরম আবহাওয়া ও খরা পরিস্থিতির মুখোমুখি হয়, যার দরুন তাদেরকে ছায়া দেয়ার জন্যে মেঘ পাঠানো হয়। এটা এমন-ই এক আশীর্বাদ ছিল যে আল-কুরআনে এ সম্পর্কে বিবৃত হয়:

“এবং (স্মরণ করো) আমি তোমাদের ওপর মেঘকে ছাউনি করেছি (তিহা উপত্যকায়), আর তোমাদের প্রতি ‘মান্না’ ও ’সালওয়া’ অবতীর্ণ করেছি” [সূরা বাক্বারা, ৫৭ আয়াত]।

ক্বুরআন পাকের অনেক জায়গায় সুনির্দিষ্ট রহমত-বরকত সম্পর্কে উল্লেখ করার সময় (রহমত বর্ষণের) ওইসব দিনের স্মরণার্থে খুশি উদযাপন করার বিধান আল্লাহতা’লা জারি করেছেন। পয়গম্বর (আ:)-মণ্ডলীর অনুশীলিত রীতিও ছিল এটাই। পয়গম্বর ঈসা (আ:) তাঁর উম্মতের জন্যে আসমানী খাদ্য-খাঞ্চা প্রার্থনাকালে আরয করেন এভাবে:

“মরিয়ম-তনয় ঈসা আরয করলেন, ‘হে আল্লাহ, হে আমাদের রব্ব! আমাদের প্রতি আকাশ থেকে একটা খাদ্যভর্তি খাঞ্চা অবতীর্ণ করুন, যা আমাদের জন্যে ঈদ হবে – আমাদের পূর্ববর্তী ও পরবর্তীদের জন্যে; এবং আপনার কাছ থেকে (তা হবে) নিদর্শন” [আল-ক্বুরআন, ৫:১১৪]।

পয়গম্বর ঈসা (আ:)-এর বাস্তব উদাহরণের আলোকে ক্বুরআন মজীদের এই আয়াতটিতে আমাদের সামেনে একটি স্পষ্ট ধারণা ব্যক্ত করা হয়েছে এই মর্মে যে, খোদায়ী নেয়ামত (মানে ঐশী আশীর্বাদ) যে দিনে অবতীর্ণ হয় সেদিনটি কৃতজ্ঞতা প্রকাশের দিবস হিসেবে উদযাপিত হওয়া উচিত। আয়াতটি আরো ইঙ্গিত করে যে কোনো নির্দিষ্ট আশীর্বাদপ্রাপ্তি উপলক্ষে খুশি প্রকাশ শুধু সেসব মানুষ-ই করে থাকেন, যাঁরা ওই আশীর্বাদ যে পয়গম্বর (আ:)-এর প্রতি মঞ্জুর হয়েছে তাঁর সাথে (আত্মিকভাবে) সংশ্লিষ্ট।

আল্লাহতা’লার নেয়ামতপ্রাপ্তির প্রতি খুশি প্রকাশের পাশাপাশি কৃতজ্ঞতা প্রকাশের একটি সাধারণ পদ্ধতি হলো, অন্য সবার সামনে সর্বশক্তিমান আল্লাহতা’লার আশীর্বাদগুলোর বিবরণ প্রদান করা। তাঁর প্রতি এভাবে শুকরিয়া জানানো কুরআন মজীদ হতেও প্রমাণিত, যেমনটি এরশাদ হয়েছে:

 

“এবং আপন রব্বের নি’মাতের খুব চর্চা করুন (হে রাসূল)!” [আল-কুরআন, ৯৩:১১]

প্রথমে সর্বশক্তিমান আল্লাহতা’লার দানকৃত নেয়ামত ও আশীর্বাদ স্মরণের ব্যাপারে আজ্ঞা জারি হয়, যেক্ষেত্রে ওই আশীর্বাদকে অন্তর ও জিহ্বা দ্বারা স্মরণ করা চাই; কিন্তু এই স্মরণ অন্য কারো জন্যে নয়, কেবল সর্বশক্তিমান আল্লাহতা’লারই জন্যে নির্দিষ্ট। অতঃপর এই আশীর্বাদটি উল্লেখ করার বিধান দেয়া হয়েছে, যার দরুন কেউ অন্যান্যদের উপস্থিতিতে এই আশীর্বাদ সম্পর্কে প্রকাশ্যে উল্লেখ করেন এমনভাবে যাতে এর তাৎপর্য মানুষের কাছে স্পষ্ট হয়। এখানে উল্লেখ্য যে, এই স্মরণ (যিকর) একদিকে সর্বশক্তিমান আল্লাহতা’লার সাথে সংশ্লিষ্ট,অপরদিকে তা উল্লেখ করা (তাযকেরা) সৃষ্টির সাথে সংশ্লিষ্ট, যাতে অনেক মানুষ এই স্মরণ করার কাজে ব্যাপৃত হতে পারে। কুরআন মজীদে এরশাদ হয়েছে:

“সুতরাং আমার স্মরণ করো, আমিও তোমাদের চর্চা করবো, আর আমার কৃতজ্ঞতা স্বীকার করো এবং আমার প্রতি অকৃতজ্ঞ হয়ো না।” [সূরা বাক্বারা, ১৫২ আয়াত]

আরেক কথায়, তোমরা আমার নেয়ামতগুলো (ব্যক্তি পর্যায়ে) স্মরণ করো না, বরঞ্চ এমন কৃতজ্ঞতাজ্ঞাপক পরিবেশে তা উল্লেখ করো যার দরুন মানুষেরাও তা শোনতে পায় এবং জানতে পারে। কৃতজ্ঞতা প্রকাশের একটি বাড়তি পন্থা হচ্ছে ঈদের আকারে খুশি উদযাপন করা। পূর্ববর্তী উম্মতগুলো যেদিনটিতে কোনো বিশেষ নেয়ামত লাভ করতেন, সেদিনটি তারা ঈদ হিসেবে উদযাপন করতেন। কুরআন মজীদ হযরত ঈসা (আ:)-এর দোয়া সম্পর্কে বর্ণনা দেয় এভাবে:

“মরিয়ম-তনয় ঈসা আরয করলেন, ‘হে আল্লাহ, হে আমাদের রব্ব! আমাদের প্রতি আকাশ থেকে একটা খাদ্যভর্তি খাঞ্চা অবতীর্ণ করুন, যা আমাদের জন্যে ঈদ হবে – আমাদের পূর্ববর্তী ও পরবর্তীদের জন্যে; এবং আপনার কাছ থেকে (তা হবে) নিদর্শন” [আল-ক্বুরআন, ৫:১১৪]।

এ আয়াতে খাদ্য-খাঞ্চার মতো একটি অস্থায়ী আশীর্বাদ লাভকে ঈদের দিন বলে বর্ণনা করা হয়েছে। এমন কি আজো খৃষ্টান সম্প্রদায় রোববারকে অশীর্বাদপ্রাপ্তির দিন হিসেবে পালন করে থাকেন। খাদ্য-খাঞ্চা প্রেরণের আশীর্বাদ কি কোনো পয়গম্বর প্রেরণের নেয়ামতের সমতুল্য? ওই ধরনের অগণিত আশীর্বাদ-ই তো আমাদের মহাসম্মানিত রহমত (করুণা) ও আশীর্বাদ হযরতে মুহাম্মদুর রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহে ওয়া সাল্লামের খাতিরে বিসর্জন দেয়া যেতে পারে।

সহীহ বুখারী শরীফে বর্ণিত আছে, জনৈক ইহুদী একবার হযরত উমর ফারূক (রা:)-কে বলেন যে আল-কুরআনের [“আজ তোমাদের দ্বীন (ধর্ম)-কে তোমাদেরই জন্যে পূর্ণ করলাম”] আয়াতটি যদি তৌরাতে প্রকাশিত হতো, তাহলে ইহুদী সম্প্রদায় ওই দিনটিকে ঈদ হিসেবে উদযাপন করতো। হযরত উমর (রা:) এ কথার উত্তরে বলেন যে আয়াতটি কোন্ দিনে এবং কোথায় অবতীর্ণ হয়েছিল তা তাঁর স্মরণে আছে: সেটা ছিল আরাফাতের ময়দানে হজ্জ্বের দিন, অধিকন্তু শুক্রবার (উভয় দিন-ই ঈদস্বরূপ)। [আল-বুখারী কৃত সহীহ; কিতাবুল ঈমান, ‘ঈমানের বৃদ্ধি ও হ্রাস’ অধ্যায়, ১:২৫ #৪৫; মুসলিম কৃত সহীহ: কিতাব আল-তাফসীর, ৪:২৩১৩ #৩০১৭; আল-তিরমিযী প্রণীত আল-জামিউস্ সহীহ: আবওয়াব তাফসীর আল-কুরআন (কুরআন তাফসীরের অধ্যায়গুলো), অধ্যায়: ‘সূরা আল-মা’য়েদা’, ৫:২৫০ #৩০৪৩; এবং আল-নাসাঈ রচিত আল-সুনান: কিতাব আল-ঈমান, ‘ঈমানের হ্রাস-বৃদ্ধি’ অধ্যায়, ৮:১১৪ #৫০১২]

একটি প্রশ্ন: যদি ধর্মকে পূর্ণতাদানের বাণী বহনকারী আয়াতে করীমা অবতীর্ণ হওয়ার দিনটি ঈদ হিসেবে গণ্য হতে পারে, তাহলে মানবতার চূড়ান্ত কল্যাণকারী যেদিন ধরাধামে শুভাগমন করেন সেদিনটি কেন ঈদ হিসেবে পরিগণিত হবে না? এই জিজ্ঞাসা শুক্রবার দিনের মর্যাদাময় বৈশিষ্ট্যের পরিপ্রেক্ষিতে চিন্তাশীল ব্যক্তিদের চিন্তার খোরাকও যোগায়।

মহানবী (দ:)-এর হাদীস শরীফেও উল্লেখিত হয়েছে যে তিনি তাঁর বেলাদত তথা ধরাধামে শুভাগমন দিবস উদযাপন উপলক্ষে ছাগল কুরবানী করতেন এবং এর গোস্ত অতিথিদের মাঝে বিতরণ করতেন। হযরত আনাস (রা:)-এর মতানুযায়ী, আম্বিয়াকুল শিরোমণি হযরত মুহাম্মাদুর রাসূলুল্লাহ (সাল্লাল্লাহু আলাইহে ওয়া সাল্লাম) তাঁর নবুওয়্যত ঘোষণার পর আকীকা (নবজাতক শিশুর জন্যে কৃত পশু কুরবানী) পালন করেন। ইমাম জালালউদ্দীন সৈয়ুতী (৮৪৯-৯১১ হিজরী সাল) এই রেওয়ায়াতটিকে প্রামাণ্য দলিল হিসেবে প্রদর্শন করে যুক্তির অবতারণা করেন যে রাসূলুল্লাহ (দ:)-এর দাদা আবদুল মুত্তালিব হুযূরে পাকের (দ:) বেলাদতের সপ্তম দিনে তাঁর আকীকা পালন করেছিলেন, আর আকীকা জীবনে একবার পালন করাই আবশ্যকীয়। অতএব, এটা স্পষ্ট যে মহানবী (দ:)-এর আমলটি আকীকা ছিল না, বরঞ্চ তা ছিল আতিথেয়তা যা তিনি তাঁরই বেলাদতের স্মরণে পালন করেছিলেন। [এই গ্রন্থের পঞ্চম অধ্যায়ে বিস্তারিত আলোচনা করা হবে]

রাসূলুল্লাহ (দ:)-এর চেয়ে শ্রেষ্ঠ কোনো খোদায়ী আশীর্বাদ কল্পনা করা একেবারেই অসম্ভব ব্যাপার। এ উপলক্ষে যে স্পষ্ট আনন্দ ও সুখ ব্যক্ত হয়েছে, তা ঐতিহাসিক বিবরণসমূহ হতে জানা যায়। নবুওয়্যতের গুণাবলী ও বৈশিষ্ট্যবিষয়ক বইপত্রে এমন প্রচুর উদাহরণ বিদ্যমান, যেখানে স্পষ্ট প্রতীয়মান হয় যে সর্বশক্তিমান আল্লাহতা’লা তাঁর মাহবূব (দ:)-এর বেলাদত তথা ধরাধামে শুভাগমন উপলক্ষে আনন্দ ও সুখ অনুভব করেন।

যে বছর মহানবী (দ:)-এর পবিত্র বেলাদত শরীফ (মানে ধরাধামে শুভাগমন) হয়, সেই পুরোটা বছর জুড়ে অনেক আশ্চর্যজনক ও ব্যাখ্যার অতীত বাস্তব ঘটনাবলী প্রত্যক্ষ করা হয়। ওই আশীর্বাদধন্য (বেলাদতের) সময়ে সর্বশক্তিমান আল্লাহতা’লার বর্ষিত বিশেষ রহমত তথা করুণা, যার জন্যে সমগ্র বিশ্বজগত অধীর আগ্রহে শতাব্দীর পর শতাব্দী যাবত অপেক্ষারত ছিল, অবশেষে যখন সেই নির্ধারিত শুভমুহূর্ত উপস্থিত হলো তখন বিশ্বজগতের স্রষ্টা সর্বশক্তিমান আল্লাহতা’লা এই ধরণীর বুকে প্রকাশ করলেন তাঁর সৃষ্টিকুলের মধ্যমণিকে; আর তিনি (মহান প্রভু) এমন নূর (জ্যোতি) বিচ্ছুরণের প্রদর্শনী দিলেন যে পূর্ব হতে পশ্চিম দিগন্ত অবধি আলোয় আলোকিত হলো।

হযরত উসমান বিন আবি আল-আস্ (রহ:) বলেন যে তাঁর মা তাঁকে জানিয়েছিলেন:

“রাসূলুল্লাহ (দ:)-এর পবিত্র বেলাদতের সময় আমি (মা) আমিনা’র কাছে উপস্থিত ছিলাম। ওই মুহূর্তে আমি দেখতে পেলাম তারকারাজি এতো কাছে চলে এসেছে যে (মনে হলো) সেগুলো বুঝি আমার ওপরই পতিত হবে। অতঃপর হুযূরে পাকের (দ:) বেলাদত শরীফ হলে (মা) আমিনা হতে এমন এক জ্যোতি বিচ্ছুরিত হয়, যার দরুন আমরা যে ঘরে ছিলাম সেটা এবং আশপাশের এলাকা আলোকিত হয়ে যায়। এমতাবস্থায়, আমি তাকিয়ে ওই নূর ছাড়া আর অন্য কোনো কিছুই দেখতে পাইনি।” [ইমাম মুহাম্মদ শায়বানী (রহ:) কর্তৃক নিজ ‘আল-আহাদ ওয়াল-মাসা’নী’ গ্রন্থে বর্ণিত, ৬:২৯ #৩২১০ (উম্মে উসমান বিন আবি আল-’আস হতে গৃহীত); আত্ তাবারানী (রহ:) কৃত ‘আল-মু’জাম আল্-কবীর’, ২৫:১৪৭ ও ১৮৬, #৩৫৫ ও ৪৫৭; আল-মাওয়ার্দী প্রণীত ‘আ’লম আল-নবুওয়্যাহ’, ২৪৭ পৃষ্ঠা; আত্ তাবারী রচিত ‘তারিখ আল-উমাম ওয়াল-মুলুক’, ১:৪৫৪; আল-বায়হাক্বী লিখিত ‘দালায়েল আল-নবুওয়্যা ওয়াল-মা’রিফা আহওয়াল সাহিব আল-শরী’আ’, ১:১১১; আবূ নু’য়াইম কৃত ‘দা’লায়েল আল-নবুওয়্যা’, ১৩৫ পৃষ্ঠা, #৭৬; ইবনে আল-জাওযী প্রণীত ‘আল-মুতাযাম ফী তারিখ আল-উমাম ওয়াল-মুলুক’, ২:২৪৭; ইবনে আসাকির রচিত ‘তারিখ দিমাশক আল-কবীর’, ৩:৭৯ ও ‘আল-সীরাহ অাল-নববীয়্যা, ৩:৪৬; ইবনে কাসীর লিখিত ‘আল-বেদায়া ওয়াল-নেহায়া, ২:২৬৪; আল-হায়সামী প্রণীত ‘মজমাউল যাওয়াঈদ ওয়া মানবা’ আল-ফাওয়া’ইদ’, ৮:২২০; ইবনে রাজাব হাম্বলী কৃত ‘লাতা’ইফ আল-মা’আরিফ ফীমা লি-মাওয়াসিম আল-’আম মিন আল-ওয়াযা’ইফ, ১৭৩ পৃষ্ঠা; এবং আল-আসক্বালানী রচিত ‘ফাতহুল বারী’, ৬:৫৮৩]

আবূ উমামা (রা:) বর্ণনা করেন যে তিনি রাসূলুল্লাহ (দ:)-কে জিজ্ঞেস করেন, “এয়া রাসূলাল্লাহ (দ:)! আপনার বিষয়টির আরম্ভ কীভাবে?” হুযূরে পূর নূর (দ:) উত্তর দেন, “আমি হলাম আমার (আদি)-পিতা হযরত ইব্রাহীম (আ:)-এর দোয়া বা প্রার্থনার (জবাব) এবং হযরত ঈসা (আ:)-এর প্রদত্ত খোশ-খবরী (শুভসংবাদ)। (আমার বেলাদতের সময়) আমার মা (আমিনা) তাঁর (পবিত্র শরীর) থেকে নূরের বিচ্ছুরণ প্রত্যক্ষ করেন, যা সিরিয়া-রাজ্যের প্রাসাদগুলোকে আলোকিত করে।” [ইমাম আহমদ ইবনে হাম্বল কর্তৃক নিজ ‘আল-মুসনাদ’ গ্রন্থে বর্ণিত, ৫:২৬২ #২২৩১৫; ইবনে হিব্বান তাঁর ‘আল-সহীহ’, ১৪:৩১৩ #৬৪০৪ গ্রন্থে এসব কথার আলাদা একটি এসনাদ-সহ আরো দীর্ঘ একটি রেওয়ায়াত উদ্ধৃত করেন; আল-বুখারীও নিজস্ব ‘আল-তারিখ অাল-কবীর‘, ৫:৩৪২ #৭৮০৭/১৭৩৬ পুস্তকে ভিন্ন এসনাদ-সহ আরো দীর্ঘ একটি রেওয়ায়াত লিপিবদ্ধ করেন; ইমাম বুখারী নিজস্ব ‘আল-তারিখ আল-আওসাত’, ১:১৩ #৩৩ বইয়ে পৃথক এসনাদ-সহ আরো দীর্ঘ একটি রেওয়ায়াত উদ্ধৃত করেন; ইবনে আবি উসামা রচিত ‘আল-মুসনাদ’, ২:৮৬৭ #৯২৭; আল-রুয়্যানী কৃত ‘আল-মুসনাদ’, ২:২০৯ #১২৬৭; ইবনে আল-জা’দ প্রণীত ‘আল-মুসনাদ’, ৪৯২ #৩৪২৮; আল-তায়্যালিসী লিখিত ‘আল-মুসনাদ, ১৫৫ #১১৪০; আল-তারানী রচিত ‘আল-মু’জাম আল-কবীর‘, ৮:১৭৫ #৭৭২৯; আল-তাবারানী কৃত ‘মুসনাদ আল-শা’মিয়্যীন’ ২:৪০২ #১৫৮২; আল-দায়লামী প্রণীত ‘আল-ফেরদাউস বি-মা’সউর আল-খিতাব’, ১:৪৬ #১১৩; আল-লালকাঈ লিখিত ‘এ’তেক্বাদ আহল আল-সুন্নাহ ওয়াল-জামা’আ, ১:৪২২-৩ #১৪০৪; আবূ নুয়াইম রচিত ‘হিলইয়া আল-আউলিয়া ওয়া তাবাক্বাত আল-আসফিয়া’, ৬:৯০; ইবনে আল-জাওযী কৃত ‘আল-মুনতাযাম ফী তারিখ আল-মুলুক ওয়াল-উমাম’, ২:২৪৮; ইবনে আসাকির প্রণীত ‘আল-সীরাহ আল-নববীয়্যা’, ১:১২৭; ইবনে কাসীর লিখিত ‘আল-বেদায়া ওয়াল-নেহায়া‘, ২:২৭৫, ৩০৬ ও ৩২২; আল-হায়সামী তাঁর রচিত ‘মজমা’ আল-যাওয়া’ঈদ ওয়া মানবা’ আল-ফাওয়া’ঈদ’, ৮:২২২ গ্রন্থে বলেন যে ইমাম আহমদ (রহ:) এটা হাসান (সহীহ) তথা নির্ভরযোগ্য সনদ-সহ বর্ণনা করেছেন; এবং আল-সৈয়ুতী কৃত ‘কেফায়াত আল-তালেব আল-লাবিব ফী খাসায়েস আল-হাবীব’, ১:৭৯]

মা আমিনা (রা:) তাঁর প্রিয় পুত্রের বেলাদত তথা ধরাধামে শুভাগমনের সাথে সম্পর্কিত (অলৌকিক) ঘটনাবলীর ব্যাপারে বলেন:

সৃষ্টিকুল শিরোমণি প্রিয়নবী (দ:)-এর বেলাদত হলে তাঁর সাথে একটি নূর (জ্যোতি) এমনভাবে বিচ্ছুরিত হয়, যার দরুন পূর্ব হতে পশ্চিমে যা কিছু ছিল সবই আলোকিত হয়ে যায়। [সা’আদ কৃত ‘আল-তাবাক্বাত আল-কুবরা’, ১:১০২; ইবনে জাওযী প্রণীত ‘সাফওয়া আল-সাফওয়া’, ১:৫২; ইবনে আসাকির রচিত ‘আল-সীরা আল-নববীয়্যা’, ৩:৪৬; ইবনে কাসীর লিখিত ‘আল-বেদায়া ওয়াল-নেহায়া’, ২:২৬৪; ইবনে রাজাব হাম্বলী কৃত ‘লাতা’ঈফ আল-মা’আরিফ ফীমা’য়া লি-মাওয়াসিম আল-’আম মিন আল-ওয়াযা’ঈফ’, ১৭২ পৃষ্ঠা; আল-সৈয়ুতী প্রণীত ‘কেফা’য়াত আল-তা’লিব আল-লাবীব ফী খাসা’ইস আল-হাবীব’, ১:৭৯; এবং আল-হালাবী রচিত ‘ইনসা’ন আল-’উয়ূন ফী সীরা আল-আমীন আল-মা’মূন’, ১:৮৩]

অন্য এক রেওয়ায়াতে (বিবরণে) মা আমিনা (রা:) নিজের জিসম মোবারক হতে এমন এক নূর বিচ্ছুরণের কথা উল্লেখ করেন, যার দরুন তিনি শাম দেশের বসরায় (বর্তমান ইরাকে) অবস্থিত প্রাসাদগুলো ও বাজার এলাকাগুলো প্রত্যক্ষ করেন; এমন কী তিনি সেখানে চলাচলকারী উটগুলোর গলাও দেখতে পান। [ইবনে সা’আদ কৃত ‘আল-তাবাক্বাত আল-কুবরা’, ১:১০২; আল-তাবারানী প্রণীত ‘আল-মু’জাম আল-কবীর’, ২৪:২১৪ #৫৪৫; ইবনে হিব্বান রচিত ‘আল-সহীহ’, ১৪:৩১৩ #৬৪০৪; আবদুর রাযযাক্ক লিখিত ‘আল-মুসান্নাফ’, ৫:৩১৮; আল-দারিমী কৃত ‘আল-সুনান’, ১:২০ #১৩; আল-শায়বানী প্রণীত ‘আল-আহা’দ ওয়াল মাসা’নী’, ৩:৫৬ #১৩৬৯; আল-হাকীম রচিত ‘আল-মুস্তাদরাক’, ২:৬৭৩ #৪২৩০; আল-হায়সামী নিজ ‘মজমা’ আল-যওয়াঈদ’ (৮:২২২) গ্রন্থে জানান যে ইমাম আহমদ ইবনে হাম্বল ও আল-তাবারানী এই বর্ণনা লিপিবদ্ধ করেছেন, আর ইমাম আহমদের বর্ণনার সনদ হচ্ছে হাসান সহীহ; আল-হায়সামী লিখিত ‘মাওয়া’রিদ আল-যামা’ন ইলা’ যাওয়া’ঈদ ইবনে হিব্বা’ন’, ৫১২ #২০৯৩; ইবনে এসহা’ক্ব রচিত ‘আল-সীরা আল-নববীয়্যা, ১:৯৭ ও ১০৩; ইবনে হিশা’ম কৃত ‘আল-সীরা আল-নববীয়্যা’, ১৬০; ইবনে আসীর প্রণীত ‘আল-কা’মিল ফী আল-তা’রীখ’, ১:৪৫৯; আল-তাবারী লিখিত ‘তা’রীখ আল-উমাম ওয়াল মুলূক’, ১:৪৫৫; ইবনে ’আসা’কির রচিত ‘তা’রীখ দিমাশক্ব আল-কবীর’, ১:১৭১-২; ইবনে ’আসা’কির কৃত ‘তা’রীখ দিমাশক্ব আল-কবীর’, ৩:৪৬৬ এবং ‘আল-সীরা আল-নববীয়্যা’, ৩:৪৬; ইবনে কাসীর প্রণীত ‘আল-বেদা’য়া ওয়াল-নেহা’য়া’, ২:২৬৪ ও ২৭৫; ইবনে রাজাব হাম্বলী লিখিত ‘লাতা’ঈফ আল-মা’আরিফ ফীমা লি-মাওয়া’সিম আল-’আম মিন আল-ওয়াযা’ঈফ’, ১৭৩ পৃষ্ঠা; আল-সৈয়ূতী রচিত ‘কেফা’য়াত আল-তা’লিব আল-লাবীব ফী খাসা’ইস আল-হাবীব’, ১:৭৮; আল-হালাবী কৃত ‘ইনসা’ন আল-’উয়ূন ফী সীরা আল-আমীন আল-মা’মূন’, ১:৮৩; এবং আহমদ বিন যাইনী দাহলা’ন মক্কী প্রণীত ‘আল-সীরা আল-নববীয়্যা’, ১:৪৬]

 

মুহাদ্দেসীন উলামাবৃন্দ (হাদীসশাস্ত্র বিশারদমণ্ডলী) ‘আশূরা’-এর হাদীসগুলোর সাহায্যে মওলিদুন্নবী (দ:) উদযাপনের বৈধতা প্রমাণ করেছেন। ‘এয়াওমে আশূরা’ ইহুদী সম্প্রদায় পালন করে থাকেন। এই দিনটিতে পয়গম্বর মূসা (আ:) ও বনূ ইসরাঈল (ইহুদী সম্প্রদায়) ফেরাউনের উৎপীড়ন হতে মুক্তি লাভ করেছিলেন। ফলে এটা তাঁদের স্বাধীনতা/মুক্তি দিবস, যা তাঁরা নিজেদের কৃতজ্ঞতা প্রকাশার্থে রোযা রেখে উদযাপন করতেন। (মদীনায়) হিজরতের পরে মহানবী (দ:) মদীনাবাসী ইহুদীদের দ্বারা এই প্রথা অনুশীলিত হতে দেখে বলেন, “আমি তাদের চেয়ে পয়গম্বর মূসা (আ:)-এর আরো ঘনিষ্ঠ (পয়গম্বর হওয়ার সূত্রে)।” এমতাবস্থায় কৃতজ্ঞতাস্বরূপ রাসূলুল্লাহ (দ:)-ও ‘এয়াওমে আশূরা’তে রোযা রাখা আরম্ভ করেন এবং তাঁর সাহাবা-এ-কেরাম (রা:)-কেও তা অনুসরণ করতে আদেশ করেন। [আল-বুখা’রী কর্তৃক নিজ ‘সহীহ’ গ্রন্থে বর্ণিত: কিতা’বুস্ সওম (রোযা-সংক্রান্ত বই), ‘এয়াওমে আশূরা’র রোযা’ অধ্যায়, ২:৭০৪ #১৯০০; আল-বুখারী লিখিত ‘সহীহ’: কিতাবুল আম্বিয়া (পয়গম্বরবৃন্দের বই), ‘আল্লাহর বাণী: মূসা (আ:)-এর সংবাদ কি তোমাদের কাছে পৌঁছেছে?’ শীর্ষক অধ্যায়, ৩:১২৪৪ #৩২১৬; আল-বুখারী কৃত ‘সহীহ’: কিতা’ব ফাযা’ইল আল-সাহা’বা (সাহাবাবৃন্দের সৎ গুণাবলীর বই), ‘মহানবী (দ:) মদীনায় তাশরীফ নিলে ইহুদীদের তাঁর কাছে আগমন’ শীর্ষক অধ্যায়, ৩:১৪৩৪ #৩৭২৭; মুসলিম রচিত ‘সহীহ’: কিতা’ব আল-সিয়্যা’ম (রোযা-সংক্রান্ত বই), ‘এয়াওম আল-আশূরা’র রোযা’ অধ্যায়, ২:৭৯৫-৬ #১১৩০; আবূ দাউদ প্রণীত ‘আল-সুনান: কিতা’ব আল-সওম (রোযা-সংক্রান্ত বই), ‘এয়াওম আল-আশূরা’র রোযা’ শীর্ষক অধ্যায়, ২:৩২৬ #২৪৪৪; ইবনে মা’জাহ রচিত কৃত ‘আল-সুনান: কিতাব আল-সিয়্যা’ম’ (রোযা-সংক্রান্ত বই), ‘এয়াওম আল-আশূরা’র রোযা’ শীর্ষক অধ্যায়, ১:৫৫২ #১৭৩৪; আহমদ ইবনে হাম্বল লিখিত ‘আল-মুসনাদ’, ১:২৯১ ও ৩৩৬ #২৬৪৪ ও ৩১১২; এবং আবূ এয়া’লা প্রণীত ‘আল-মুসনাদ’, ৪:৪৪১ #২৫৬৭]   

এ বিষয়ে অসংখ্য বর্ণনা বিদ্যমান, যা থেকে এই সিদ্ধান্ত নেয়া যায় যে ইহুদীরা যদি তাদের পয়গম্বর (মূসা আলাইহিস্ সালাম)-এর বিজয় ও মুক্তিতে খুশি প্রকাশ করতে পারেন, তাহলে মুসলমান হিসেবে আমাদেরও মওলিদুন্নবী (দ:)-এর ব্যাপারে একই রকমের অনুভূতি প্রকাশ করা চাই, আর তা এ বাস্তবতার পরিপ্রেক্ষিতে যে বিশ্বজগতের প্রতি খোদায়ী রহমত, অর্থাৎ, ঐশী করুণা (বিশ্বনবী সাল্লাল্লাহু আলাইহে ওয়া সাল্লাম) বিশ্বমানবতাকে অত্যাচার-অবিচার ও অন্যায় হতে মুক্তি দিতে ধরাধামে শুভাগমন করেছিলেন এই বিশেষ দিনে, যেমনটি আল্লাহতা’লা এরশাদ ফরমান:

“আর (তিনি) তাদের ওপর থেকে (তাদেরই অবাধ্যতাজনিত) ওই কঠিন কষ্টের বোঝা ও গলার শৃঙ্খল যা তাদের ওপর ছিল, তা নামিয়ে অপসারণ করবেন।” [আল-কুরআন, ৭:১৫৭]  

পরিশেষে, মহানবী (দ:)-এর বেলাদতের মাস সমাগত হলে কোনো ঈমানদার মুসলমানের কাছে পৃথিবীতে এর চেয়ে বড় নেয়ামত (আশীর্বাদ) আর কী-ই বা হতে পারে, যখন তিনি অনুভব করেন এর তুলনায় অন্য যে কোনো সুখ একেবারেই অর্থহীন? প্রকৃত সুখ রাসূলুল্লাহ (দ:)-এর বেলাদত শরীফ উপলক্ষে খুশি প্রকাশের মাঝে নিহিত। আমাদের পূর্ববর্তী জাতিগুলো এর চেয়ে কম তাৎপর্যপূর্ণ আশীর্বাদপ্রাপ্তিতে কৃতজ্ঞতা ও খুশি প্রকাশ করতে বাধিত হয়েছিলেন, যে নেয়ামতগুলো ছিল কোনো বিশেষ স্থান বা কালের গণ্ডিতে সীমাবদ্ধ। পক্ষান্তরে, এই অনন্ত, অফুরন্ত সর্বশ্রেষ্ঠ রহমত তথা সর্বাধিক মহিমান্বিত রাসূল (দ:)-এর ধরণীতলে শুভাগমন হচ্ছে সবার জন্যে (ঐশী) করুণা ও কল্যাণের অবিরাম উৎস। অতএব, মুসলমানদেরকে এ উপলক্ষে আবেগ ও খুশির বহিঃপ্রকাশের পাশাপাশি অসীম কৃতজ্ঞতার প্রতিভূ-ও হতে হবে।

আল-কুরআন অত্যন্ত প্রাঞ্জল ভাষায় মানবজাতিকে তাদের প্রতি বর্ষিত আল্লাহতা’লার (খাস্) রহমত (করুণা), বরকত (আশীর্বাদ) ও দয়া তথা মহানবী (দ:)-কে শ্রদ্ধা ও সম্মান করার নির্দেশ দেয়, যিনি শতাব্দীর পর শতাব্দী যাবত আচ্ছন্নকারী অন্ধকার দূর করেন এবং হিংসা-বিদ্বেষ ও পশুত্বর দেয়াল যা মানুষকে বিভিন্ন জাতি-গোষ্ঠীতে বিভক্ত করেছিল, তা ভেঙ্গে চৌচির করে দেন। আল্লাহ পাক এরশাদ ফরমান:

“এবং নিজেদের প্রতি আল্লাহর অনুগ্রহকে স্মরণ করো, যখন তোমাদের মধ্যে শত্রুতা ছিল; তিনি তোমাদের অন্তরগুলোতে সম্প্রীতি সৃষ্টি করে দিয়েছেন। সুতরাং তাঁরই অনুগ্রহক্রমে তোমরা পরস্পর ভ্রাতৃত্ব-বন্ধনে আবদ্ধ হয়ে গিয়েছো।” [আল-কুরআন, ৩:১০৩]   

এই ভগ্ন হৃদয়সমূহের জোড়া লাগানোর এবং বিশ্বমানবের সৌভ্রাতৃত্ব অর্জনের চমৎকার নজির ইতিহাসে আর দ্বিতীয়টি নেই। অতএব, মহান আল্লাহর মনোনীত জনের ধরাধামে শুভাগমন উপলক্ষে আনন্দ উদযাপন ও আল্লাহর প্রতি ঋণী হওয়ার অনুভূতি ও কৃতজ্ঞতা প্রকাশ করাটা অন্য যে কোনো অর্জন বা প্রাপ্তির চেয়ে উম্মাহ’র জন্যে বেশি বাধ্যতামূলক হয়েছে।

 

  • মুহাম্মদ তাহিরুল কাদেরী

 

প্রথম অধ্যায়

মওলিদুন্নবী (দ:) ও ইসলামের বিভিন্ন নিদর্শন: সঠিক ঐতিহাসিক দৃষ্টিকোণের আলোকে

আমাদের আকীদা-বিশ্বাস, ব্যক্তিত্বের উৎকর্ষ ও আধ্যাত্মিক জীবন যিকরের ধারণাকে ঘিরে আবর্তমান, যার অর্থ ‘স্মরণ করিয়ে দেয়া’, ‘স্মরণ করা’ এবং ‘স্মৃতিরক্ষামূলক কর্ম দ্বারা স্মরণীয় করে রাখা (বা উদযাপন করা)’। আমাদের দৈনন্দিন কাজ-কর্ম ও লেনদেন, কথাবার্তা/ভাষণ, উপলব্ধি এবং আমাদের জীবনের সমস্ত বিষয়-ই সেই জ্ঞানের মধ্যে সীমাবদ্ধ যা আমরা অর্জন করেছি এবং নিজেদের মস্তিষ্কে সংরক্ষণ করেছি। এভাবে আমাদের অস্তিত্বের প্রতিটি ধাপ আমাদের স্মৃতিপটে অঙ্কিত হয়েছে, আর এই স্মৃতি-ই আমাদেরকে জীবন চলার ক্ষেত্রে পথপ্রদর্শন করছে। উদাহরণস্বরূপ, কারো সাথে আমাদের সম্পর্কের বিষয়টি নির্ভর করে ওই ব্যক্তির সঙ্গে জড়িত আমাদের স্মৃতির ওপর; আর এরই ভিত্তিতে আমাদের আচার-ব্যবহার ও আচরণ গড়ে ওঠে। স্মৃতিশক্তি ছাড়া কোনো বিষয় সম্পর্কেই বিচার-বিবেচনা করা আমাদের পক্ষে সম্ভবপর নয়; এমন কি আমরা শত্রু হতে মিত্রকে আলাদাভাবে চিনতেও সক্ষম নই। এমতাবস্থায় আমাদের জীবন একদম এলোমেলো, বিক্ষিপ্ত। অতএব, আমাদের সজ্ঞান সচেতনতা আমাদেরই অন্তর্নিহিত স্মৃতিশক্তির ওপর নির্ভরশীল।

১.১ আল-কুরআনের প্রদর্শিত হেদায়াত হিসেবে ‘যিকরের’ তাৎপর্য

মানবজাতির প্রতি দানকৃত আল-কুরআনের হোদায়াত (পথপ্রদর্শন)-এর ভিত্তিস্তম্ভ ‘স্মরণ’ করার (ঐশী) আজ্ঞার ওপরই ভিত্তিশীল। সুতরাং যে ব্যক্তি আল্লাহতা’লা ও তাঁর সর্বশেষ নবী (দ:)-এর প্রতি ঈমান রাখেন, তাঁকে সর্বশক্তিমান আল্লাহতা’লার অবতীর্ণ পূর্ববর্তী ও বর্তমান হেদায়াতগুলোতে একযোগে বিশ্বাস স্থাপন করতে হবে। কুরআন মজীদে ঘোষিত হয়েছে:

“এবং তারাই, যারা ঈমান আনে সেটার ওপর, যা, হে মাহবূব, আপনার প্রতি অবতীর্ণ হয়েছে এবং যা আপনার পূর্বে অবতীর্ণ হয়েছে, আর পরলোকের প্রতি (যারা) বিশ্বাস রাখে।” [আল-ক্বুরআন, ২:৪]  

এখানে ‘স্মরণের’ ভিত্তিতে পূর্ববর্তী ধর্মীয় শাস্ত্রলিপিগুলোর স্বীকৃতিকে এবং তৎপরবর্তী পর্যায়ে ওই স্মৃতি নিজের সারা জীবনে সংরক্ষণ করাকে ঈমানের পূর্ণতা লাভের জন্যে অত্যাবশ্যকীয় উপাদান হিসেবে বর্ণনা করা হয়েছে।

কেউ যখন কোনো কাজ সম্পন্ন করার উদ্দেশ্য করে, সে তখন তা করে তারই (মস্তিষ্কে) জমানো তথ্য অনুসারে। ভালোবাসা, ভয়, বিনয় ও সমর্পণের মতো আবেগ আমাদেরই সংরক্ষিত স্মৃতির দ্বারা আকার-আকৃতি পায়। যদিও এগুলো অন্তরের সাথে জড়িত ভাবানুভূতি, তবুও সংঘটিত মানসিক প্রক্রিয়াগুলো না হলে এগুলোর অস্তিত্ব কোনোভাবেই থাকতো না। অতএব, স্মৃতিশক্তি হচ্ছে আল্লাহতা’লার তরফ থেকে এক বড় নেয়ামত তথা আশীর্বাদ।

(মক্কার) মুশরিকদেরকে প্রকৃত বিশ্বাসের প্রতি আমন্ত্রণ জানানো হলে তারা আপন বৈশিষ্ট্যগত উত্তর দিতো, “আমাদের পূর্বপুরুষদের ধর্মকে আঁকড়ে ধরতে পেরে আমরা সন্তুষ্ট।” আরেক কথায়, তারা নিজেদের শেকড় কেটে ফেলতে অনিচ্ছুক ছিল। নিম্নবর্ণিত আয়াতে এই ধরনের অবিশ্বাসীদের স্মরণ করিয়ে দেয়া হয়েছে যে তাদের পূর্বপুরুষরা ভুল পথ বেছে নেয়ার কারণেই লয়প্রাপ্ত হয়েছিল এবং তাই তাদের পূর্ববর্তীদেরকে যে দাওয়াত দেয়া হয়েছিল, সেই সত্যের দাওয়াত তাদের কবূল করা উচিত। তবে তারা আল্লাহ পাক ও তাঁর রাসূল (দ:)-কে প্রত্যাখ্যান করেছে এবং ফলশ্রুতিতে নিজেরাও ধ্বংসপ্রাপ্ত হয়েছে। কুরআন মজীদ এ বিষয়ে ঘোষণা করে:

“অতঃপর আমি (খোদা) তাঁকে এবং তাঁর সঙ্গিদেরকে স্বীয় এক মহা দয়াস্বরূপ উদ্ধার করেছি এবং যারা আমার নিদর্শনগুলোকে মিথ্যে প্রতিপন্ন করতো তাদেরকে নির্মূল করেছি। আর তারা (কখনো) ঈমান গ্রহণকারী হবার ছিল না।” [আল-ক্বুরআন, ৭:৭২]  

এই আয়াতে করীমায় (মক্কার) অবিশ্বাসীদেরকে ‘স্মরণ করিয়ে’ দেয়া হয়েছে যে তাদের পূর্বপুরুষরা ভুল পথ বেছে নিয়েছিল এবং ফলশ্রুতিতে তারা ধ্বংসপ্রাপ্ত হয়েছিল। অতএব, অবিশ্বাসীরা যেন অবতীর্ণ এই হেদায়াতকে গুরুত্বসহ গ্রহণ করে এবং পূর্ববর্তীদের মতো একই ভুল না করে বসে। অনুরূপভাবে, মুসলমানবৃন্দ-ও পূর্ববর্তী নবী-রাসূল (আ:)-মণ্ডলীর প্রতি অবতীর্ণ ঐশী বাণীর ওপর বিশ্বাস স্থাপন করতে বাধ্য রয়েছেন, যেহেতু সেসব ওহী আল-কুরআনেরই অনুরূপ বার্তা বহন করেছিল। তাই কুরআন মজীদকে সত্য বলে স্বীকার করা যেমন গুরুত্বপূর্ণ, পূর্ববর্তী ওহীগুলোকে স্বীকার করাও তদনুরূপ।

১.২ পয়গম্বর ইবরাহীম (আ:)-এর দ্বীন (ধর্ম)

আমাদের (রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহে ওয়া সাল্লামের) পূর্ববর্তী পয়গম্বর (আ:)-বৃন্দকে স্মরণ করা এবং তাঁদের নবুওয়্যতে বিশ্বাস স্থাপন করা আমাদের ঈমানেরই একটি অবিচ্ছেদ্য অংশ। এই সঙ্গত কারণেই আল-কুরআন বিভিন্ন আয়াতে ইসলাম ধর্মকে ‘মিল্লাত-এ-ইবরাহীম’ (ইবরাহীম আলাইহিস্ সালামের ধর্ম) বলে উল্লেখ করেছে। এরশাদ হয়েছে:

 

১/ “এবং ইব্রাহীমের দ্বীন থেকে কে বিমুখ হবে ওই ব্যক্তি ছাড়া, যে অন্তরের (দিক দিয়ে) নির্বোধ? আর অবশ্যঅবশ্য আমি পৃথিবীতে তাকে মনোনীত করে নিয়েছি; এবং নিশ্চয় তিনি পরকালে আমার খাস্ নৈকট্যের উপযোগীদের অন্তর্ভুক্ত।” [আল-কুরআন, ২:১৩০; মুফতী আহমদ এয়ার খাঁন (রহ:)-এর কৃত ‘তাফসীরে নূরুল এরফান’ বাংলা সংস্করণ]

২/ “এবং কিতাবীরা বল্লো, ‘ইহুদী কিংবা খৃষ্টান হয়ে যাও, সঠিক পথ পাবে!’ (হে হাবীব!) আপনি বলুন, ’বরং আমি তো ইব্রাহীমের দ্বীনকেই গ্রহণ করছি, যিনি সব রকমের বাতিল থেকে মুক্ত ছিলেন; আর তিনি তো ছিলেন না মুশরিকদের অন্তর্ভুক্ত’।” [আল-কুরআন, ২:১৩৫]

৩/ “আপনি বলুন, ‘আল্লাহ সত্যবাদী। কাজেই ইব্রাহীমের দ্বীনের ওপর চলো, যিনি প্রত্যেক বাতিল থেকে আলাদা ছিলেন এবং অংশীবাদীদের অন্তর্ভুক্ত ছিলেন না’।” [আল-কুরঅান, ৩:৯৫]

৪/ “এবং ওই ব্যক্তির চেয়ে কার দ্বীন উত্তম, যিনি আপন চেহারা আল্লাহর জন্যে ঝুঁকিয়ে দিয়েছেন এবং তিনি হন সৎকর্মপরায়ণ; এবং (তিনি) ইব্রাহীমের দ্বীনের অনুসরণ করেছেন, যিনি প্রত্যেক বাতিল থেকে পৃথক ছিলেন? এবং আল্লাহ ইব্রাহীমকে আপন ঘনিষ্ঠ বন্ধুস্বরূপ গ্রহণ করেছেন।” [আল-কুরআন, ৪:১২৫]

৫/ “আপনি বলুন, ‘নিশ্চয় আমার রব্ব (প্রভু) আমাকে সোজা (সহজ, সরল) পথ দেখিয়েছেন; সঠিক দ্বীন, ইব্রাহীমের ধর্মাদর্শ, যিনি সমস্ত বাতিল থেকে পৃথক ছিলেন এবং মুশরিক ছিলেন না’।” [আল-কুরআন, ৬:১৬১]

৬/ “অতঃপর আমি আপনার প্রতি ওহী প্রেরণ করেছি যে ‘ইব্রাহীমের দ্বীনের অনুসরণ করুন, যিনি প্রত্যেক বাতিল থেকে পৃথক ছিলেন এবং মুষরিক ছিলেন না’।” [আল-কুরআন, ১৬:১২৩]

৭/ “এবং আল্লাহর পথে জ্বেহাদ করো যেভাবে করা উচিত। তিনি তোমাদেরকে মনোনীত করেছেন এবং তোমাদের প্রতি দ্বীনের ব্যাপারে কোনো সংকীর্ণতা রাখেননি; তোমাদের পিতা ইব্রাহীমের দ্বীন; আল্লাহ তোমাদের নাম ‘মুসলমান’ রেখেছেন পূর্ববর্তী কিতাবসমূহে এবং এ ক্বুরআনে, যাতে রাসূল তোমাদের রক্ষক ও সাক্ষী হন এবং তোমরা অন্যান্য লোকদের ব্যাপারে সাক্ষ্য দাও। সুতরাং নামায ক্বায়েম করো, যাকাত প্রদান করো এবং আল্লাহর রজ্জুকে শক্তভাবে ধরো। তিনি তোমাদের অভিভাবক – কতোই উত্তম অভিভাবক এবং কতোই উত্তম সাহায্যকারী!” [আল-কুরআন, ২২:৭৮]

আল-কুরআনের ওপরোল্লিখিত আয়াতগুলো প্রত্যেককে পয়গম্বর ইব্রাহীম (আ:)-এর দ্বীনের ওপর অটল, অবিচল থাকতে আদেশ করে। পয়গম্বর ইউসূফ (আ:) কয়েদখানায় তাঁর সাথী দুই জনের স্বপ্নগুলো ব্যাখ্যা করার আগে অনুরূপ ধর্মীয় প্রত্যয় ব্যক্ত করে বলেছিলেন: “এবং আমি আপন পিতৃপুরুষবৃন্দ – ইবরাহীম, ইসহাক্ব, ও ইয়া’ক্বুবের ধর্মকে গ্রহণ করেছি।” [সূরা ইউসূফ, ৩৮ আয়াত]

এই আয়াতে করীমায় পূর্ববর্তী পয়গম্বর (আ:)-বৃন্দের যিকর তথা তাঁদের এবং তাঁদের উম্মতদের বিবরণ স্মরণ করাটা ধর্মের মৌলিক নীতিমালার একটি নীতি হিসেবে প্রণীত হয়েছে; আর এটা আম্বিয়া (আ:)-মণ্ডলীর অনুশীলিত আচার-ও। আল-কুরআন ঘোষণা করে: “নিঃসন্দেহে, হে মাহবূব! আমি আপনার প্রতি ওহী প্রেরণ করেছি, যেমন ওহী নূহ ও তাঁর পরবর্তী আম্বিয়াবৃন্দের প্রতি প্রেরণ করেছি।” [আল-কুরআন, ৪:১৬৩]

পূর্ববর্তী উম্মতদের পয়গম্বর (আ:)-মণ্ডলীর বিবরণগুলো স্মরণ করা এবং হযরত ইবরাহীম (আ:)-এর দ্বীন সম্পর্কে জানার বিষয়টি ঈমানদারদের অন্তর ও মস্তিষ্ককে আলোকোজ্জ্বল করার একটি উৎস। এটা তাঁদের প্রতিটি পদক্ষেপকে সঠিক পথে পরিচালিত করে।

’যিকর’ (স্মরণ) একটি ব্যাপক বিষয়, যার জন্যে (আলাদা) একটা গোটা বই উৎসর্গ করা প্রয়োজন। স্মরণ ( ও উদযাপন) প্রত্যেক মানুষের জীবনের বিভিন্ন পর্যায়ে যে প্রভাব ফেলে থাকে, তা অনুধাবন করেই আল-কুরআন আমাদের মনোযোগ সেদিকে আকর্ষণ করে। এই বিষয়ে যিকর তথা স্মরণের সাথে সংশ্লিষ্ট যেসব শব্দ কুরআন মজীদে ব্যবহৃত হয়েছে, তা যাচাই করাটাই আমাদের জন্যে যথেষ্ট হবে। ‘যিকর’ শব্দটি এই মহাগ্রন্থে আনুমানিক ২৬৭ বার উচ্চারিত হয়েছে, আর এর উদ্দিষ্ট অর্থ – ‘স্মরণ করা’, ‘স্মরণ করানো’ এবং ‘সংরক্ষণ করা’; এটা উপদেশ ও সতর্ক করার বেলায়ও ব্যবহৃত হয়েছে। খোদ আল-কুরআনকেই ‘আল-যিকর’ বলে উল্লেখ করা হয়েছে। পক্ষান্তরে, ‘আল-নিসইয়ান’ শব্দটি কোনো কোনো বিশেষ ক্ষেত্রে যিকরের বিপরীত শব্দ হিসেবে ব্যবহৃত হয়েছে। এর অর্থ হলো, ‘ভুলে যাওয়া’, ‘ভুলে যাওয়ার কারণ হওয়া’, ‘কোনো কিছুকে তাৎপর্যহীন বলে অবহেলা করা’, এবং ‘কোনো কিছুকে পরিত্যাগ করা’। [আল-ফারাহিদী কৃত ‘কিতাবুল আইন‘, ৭:৩০৪-৫; ইবনে মানযূর প্রণীত ‘লিসান আল-আরব’, ১৫:৩২২-৩; এবং ফায়রোয আবাদী, ‘আল-কামূস আল-মুহীত’, ৪:৩৯৮]  

আল্লাহতা’লা মানুষের হেদায়াতের উদ্দেশ্যে যেসব (ঐশী) শিক্ষা যুগে যুগে প্রকাশ করেছিলেন, সেগুলোর নির্যাস ছিল এক ও অভিন্ন; তথাপি মনুষ্য হাতের কারসাজিতে বিকৃতি সাধিত হয়ে সেগুলোর মর্মবাণী হারিয়ে গিয়েছিল। কুরআন মজীদ তাই নিজস্ব হেদায়াতকে সুসংহত করার উদ্দেশ্যে আপন বার্তাকে পুনঃ পুনঃ ব্যক্ত করেছে; এমন কি মহাগ্রন্থের অভ্যন্তরে অবস্থিত আদেশ-নিষেধও ঘনঘন পুনর্ব্যক্ত হয়েছে, যদিও ভিন্ন দৃষ্টিকোণ থেকে এটাকে পাঠকের মস্তিষ্কে তাজা রাখাই উদ্দেশ্য। এ উপায়ে এর তাৎপর্য সম্পর্কে অনুভূতি জাগ্রত হওয়ার উদ্দেশ্যটি সাধিত হয়, যার ফলে এর বিধান মেনে চলার ক্ষেত্রেও প্রত্যেককে সচেতন করে তোলা হয়।

এটা মনে রেখেই এবাদত-বন্দেগীর বিষয়গুলো কীভাবে নবুওয়্যতের প্রচেষ্টাসমূহের উদযাপনের সাথে সংশ্লিষ্ট, তা পরবর্তী অধ্যায়ে বিচার-বিশ্লেষণ করা হবে। উপরন্তু, তাতে আরো ব্যাখ্যা করা হবে কীভাবে পয়গম্বর (আ:)-বৃন্দের জীবনে খুশি-আণন্দ ও দুঃখ-বেদনার ঘটনাগুলো আমাদের মাঝে মানবতা, ভালোবাসা ও শ্রদ্ধাবোধকে আবার ফিরিয়ে এনে থাকে।

পরিচ্ছেদ – ১

আম্বিয়া (আ:)-এর স্মরণে (যিকরে): পাঁচ ওয়াক্ত নামায

সংখ্যাগরিষ্ঠ মুসলমান মওলিদুন্নবী (দ:)-এর ভিত্তিতে ১২ই রবিউল আউয়াল শরীফকে উদযাপন করে থাকেন। তাঁরা আপন অাপন পন্থায় বিশ্বজগতের প্রতি (খোদাতা’লার) মহা করুণা আমাদের পরম শ্রদ্ধেয় মহানবী সাল্লাল্লাহু আলাইহে ওয়া সাল্লামের প্রতি তাঁদের ধর্মীয় আবেগপূর্ণ ভালোবাসা ও ভক্তি এই দিনে ব্যক্ত করে থাকেন। এধরনের ঘটনার উদযাপন এমন-ই একটি বিষয় যা ইসলামের নিদর্শন হিসেবে দৃঢ়ভাবে প্রতিষ্ঠিত।

ইসলাম ধর্মের ভিত্তিস্তম্ভ নিহিত রয়েছে পাঁচ ওয়াক্ত নামায কায়েম করার মধ্যে। এটা প্রত্যেক মুসলমানের ব্যক্তিগত দায়িত্ব ও কর্তব্য, আর ঈমানদারি ও অবিশ্বাসের মাঝে পার্থক্যকারী উপাদান-ও। এসব প্রার্থনা মূলতঃ সর্বশক্তিমান আল্লাহতা’লার প্রতি কৃতজ্ঞতা প্রকাশেরই এক স্মরণীয় উদযাপন, যা আম্বিয়া (আ:)-বৃন্দের দ্বারা বিভিন্ন সময়ে পালন করা হয়েছিল। মহান আল্লাহ পাক এসব আমলকে এতোই মূল্যায়ন করেছিলেন যে তিনি এই স্বেচ্ছা-প্রণোদিত প্রার্থনাগুলোকে ঐশী আজ্ঞা দ্বারা হযরত মুহাম্মাদুর রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহে ওয়া সাল্লামের উম্মতের জন্যে বাধ্যতামূলক করে দিয়েছেন।

ইমাম আল-তাহাবী (হিজরী ২২৯-৩৩১ সাল) পাঁচ ওয়াক্ত ফরয নামাযের ব্যাপারে ইমাম মুহাম্মদ ইবনে আয়েশা (রহ:)-এর একটি বক্তব্য বর্ণনা করেন তাঁরই রচিত ‘শারহ মা’আনী আল-আসা’র’ গ্রন্থে, যা’তে তিনি উল্লেখ করেন:

১.৩ ফজরের নামায: পয়গম্বর আদম (আ:)-এর স্মরণে  

ভোরে (ফজরের ওয়াক্তে) পয়গম্বর আদম আলাইহিস্ সালামের তওবা যখন কবূল করা হয়, তখন তিনি দুই রাক’আত নামায (কৃতজ্ঞতা প্রকাশার্থে) আদায় করেন; ফলে এটা ফজর ওয়াক্তের নামায হিসেবে পরিণত হয়।

১.৪ যোহরের নামায: পয়গম্বর ইবরাহীম (আ:)-এর স্মরণে

পয়গম্বর ইবরাহীম আলাইহিস্ সালাম দুপুরে তাঁর পুত্র পয়গম্বর এসহাক্ব আলাইহিস্ সালামের জন্ম দ্বারা আশীর্বাদধন্য হলে চার রাক’আত নামায আদায় করেন; ফলে এটা যোহর ওয়াক্তের নামায হিসেবে পরিণত হয়।

১.৫ আসরের নামায: পয়গম্বর উযায়র (আ:)-এর স্মরণে

পয়গম্বর উযায়র আলাইহিস্ সালামকে এক ’শ বছর পরে পুনরুত্থিত করে জিজ্ঞেস করা হয়, ‘কতোকাল তুমি এই অবস্থায় ছিলে?’ তিনি আরয করেন, ‘একদিন বা তার কিয়দংশ।’ অতঃপর তিনি চার রাক’আত নামায (শোকরানা) নামায আদায় করেন। এটাই ’আসর ওয়াক্তের নামায হিসেবে পরিণত হয়।

১.৬ মাগরেবের নামায: পয়গম্বর দাউদ (আ:)-এর স্মরণে

বর্ণিত আছে যে সর্ব-পয়গম্বর উযায়র (আলাইহিস্ সালাম) ও দাউদ (আলাইহিস্ সালাম)-কে সূর্যাস্তের সময় ঐশী ক্ষমা মঞ্জুর করা হয়। তাঁরা চার রাক’আত নামায আদায় করার নিয়্যত করেছিলেন, কিন্তু (শারীরিক) দুর্বলতা বা ক্লান্তির কারণে তৃতীয় রাক’আত-শেষে বসে থাকেন (নামায পুরোপুরি সম্পন্ন করতে অক্ষম হয়ে)। ফলে এটা মাগরেব ওয়াক্তের নামায হিসেবে পরিণত হয়, যা তিন রাক’আতবিশিষ্ট।

১.৭ ’এশার নামায: মহানবী (দ:)-এর স্মরণে

’এশা’র নামায, যেটা দিনের সর্বশেষ প্রার্থনা, সেটা যিনি সর্বপ্রথম আদায় করেন তিনি হলেন আমাদের মহানবী মুহাম্মাদুর রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহে ওয়া সাল্লাম। [ইমাম আল-তাহাবী কৃত ‘শারহ মা’আনী আল-আসা’র’: কিতাব আস্ সালাহ (নামাযের বই), অধ্যায়: ‘মধ্য প্রার্থনা তথা নামায’, ১:২২৬ #১০১৪]

এই দুই এবং চার রাক’আত নামায, যেগুলো সম্মানিত পয়গম্বর (আ:)-বৃন্দ কর্তৃক আল্লাহতা’লার দয়া ও করুণার প্রতি কৃতজ্ঞতা প্রকাশের মাধ্যম হিসেবে আদায় করা হয়েছিল, সেগুলো তাঁদের নবুওয়্যত (প্রচার-প্রতিষ্ঠার) মিশন বাস্তবায়ন  প্রচেষ্টার প্রতি শ্রদ্ধাপূর্ণ স্মরণের আমলস্বরূপ বিবেচিত হয়েছে। ফলে আল্লাহতা’লা এসব নামাযের মাধ্যমে সারাটা দিন আমাদেরকে তাঁরই নবী-রাসূল (আ:)-মণ্ডলীর স্মৃতি নিয়মিতভাবে মনে করিয়ে দিচ্ছেন।

একই প্রসঙ্গে ইমাম ইবনে আবেদীন শা’মী (১২৪৪-১৩০৬ হিজরী) তাঁর রচিত ‘রাদ্দ আল-মোহতার ‘আলা দুর্র আল-মোখতার’ গ্রন্থে লিখেন:

কথিত আছে, ফজরের নামায পয়গম্বর আদম (আ:)-এর; যোহর পয়গম্বর দাউদ (আ:)-এর; আসর পয়গম্বর সোলাইমান (আ:)-এর; মাগরেব পয়গম্বর এয়া’ক্বুব (আ:)-এর; আর ‘এশা পয়গম্বর ইয়াহইয়া (আ:)-এর; অতঃপর এসব নামাযের সবগুলো এই উম্মতের জন্যে একত্রিত করা হয়েছে। [ইবনে আবেদীন, রাদ্দ আল-মোহতার ‘আলা দুর্র আল-মোখতার ‘আলা তানউইর আল-আবসার, ১:৩৫১]

এই পবিত্র মুহূর্তগুলো, যেগুলোতে আম্বিয়া (আ:)-বৃন্দ তাঁদের প্রভু খোদাতা’লার প্রতি কৃতজ্ঞতা, বিনয় ও সমর্পণের (আত্মিক) অবস্থায় ছিলেন, সেগুলোকে তিনি (বাধ্যতামূলক) এবাদত-বন্দেগী হিসেবে ঐশী বিধান জারি করেন; যে বিধান সর্বশেষ পয়গম্বর সাল্লাল্লাহু আলাইহে ওয়া সাল্লামের এই উম্মতের জন্যে আল্লাহ পাকের নৈকট্য ও তাঁরই অসীম করুণা অর্জনের এক মাধ্যম হয়ে দাঁড়িয়েছে। ওই প্রসিদ্ধ আম্বিয়া (আ:)-বৃন্দের মকবূল তথা (আল্লাহর দরবারে) গ্রহীত এসব এবাদত-বন্দেগী আমাদের মহানবী (দ:)-এর মধ্যস্থতায় এই উম্মতের প্রতি চিরকাল স্মরণ করার আমল হিসেবে মঞ্জুর করা হয়েছে। ধর্মীয় বিষয়াদিতে যিকর তথা স্মরণ করার গুরুত্বের ব্যাপারে এর চেয়ে আর বড় প্রমাণ কী হতে পারে এই মর্মে যে, ইসলামের বুনিয়াদি স্তম্ভগুলোর মধ্যে মৌলিক একটি স্তম্ভ, অর্থাৎ, পাঁচ ওয়াক্ত নামায-ই হচ্ছে পয়গম্বর (আ:)-বৃন্দের যিকর-তাযকেরা’র ব্যবহারিক এক বহিঃপ্রকাশ?

অতএব, পরিশেষে আমরা এ সিদ্ধান্ত নিতে পারি যে যিকর-তাযকেরা’র আমল বা ঘটনা যেগুলো আল্লাহর দরবারে গৃহীত হয়েছে, সেগুলো কেবল অনুমতিপ্রাপ্ত-ই নয়, বরং সেগুলো ইসলামী চিন্তা-ভাবনা ও দর্শনেরই মৌলভিত্তি। মওলিদুন্নবী (দ:)-এর উদযাপন আল্লাহতা’লার মাহবূব (প্রেমাস্পদ) ও সেরা সৃষ্টি এবং আম্বিয়াকুল শিরোমণি হুযূর পাক সাল্লাল্লাহু আলাইহে ওয়া সাল্লামের ধরাধামে শুভাগমনের স্মরণ বৈ কিছু নয়। এটা এমন-ই এক উদযাপনের নজির যা পুরোপুরি জায়েয এবং আল্লাহতা’লার ঐশী বিধানের সাথে সম্পূর্ণভাবে সঙ্গতিপূর্ণ।

পরিচ্ছেদ – ২

আম্বিয়া (আ:)-এর স্মরণে (যিকরে): হজ্জ্বের বিভিন্ন রীতি ও প্রথা

ঈমানের ঘোষণা ও নামাযের পরে হজ্জ্ব হলো ইসলাম ধর্মের তৃতীয় ভিত্তিস্তম্ভ। হজ্জ্বের মৌলিক বাধ্যবাধকতা এবং এর প্রথাগুলো বাস্তবিকপক্ষে পয়গম্বর ইবরাহীম (আ:), পয়গম্বর ইসমাঈল (আ:) ও মা হাজেরা (রা:)-এর জীবনে ঘটে যাওয়া শৌর্যবীর্যময় ঘটনাগুলোরই উদযাপন।

এই দুই আম্বিয়া (আ:) ও মা হাজেরা (রা:)-এর অটল, অবিচলভাব, নিরন্তর সাধনা ও ত্যাগের স্মৃতি বজায় রাখতে আল্লাহতা’লা উম্মতে মুহাম্মদী (সাল্লাল্লাহু আলাইহে ওয়া সাল্লাম)-এর প্রতি এগুলোকে অত্যাবশ্যকীয় এবাদত-বন্দেগী হিসেবে আদেশ করেছেন। পৃথিবীজুড়ে কোটি কোটি মুসলমান এসব সাধনাকে স্মরণ করতে প্রতি বছর (হজ্জ্বের মওসূমে) মক্কা মোয়াযযমায় সমবেত হন এবং এরই ফলশ্রুতিতে আল্লাহতা’লার রেযামন্দি (সন্তুষ্টি) হাসিল করেন। আল্লাহতা’লা তাঁর আশীর্বাদধন্য প্রিয় বান্দাদের একনিষ্ঠ ও পরম ভালোবাসাপূর্ণ এই ভক্তিমূলক আমল (পুণ্যদায়ক কর্ম)-গুলোর স্মৃতিকে চিরস্থায়ীভাবে সংরক্ষণ করেছেন এবং তিনি ঘোষণা করেছেন যে এগুলো তাঁরই নিদর্শন (আয়াত)।

মক্কা মোয়াযযমায় অবস্থিত পবিত্র কা’বা শরীফ মসজিদচত্বরে প্রবেশ করলে (অন্তরে) ভক্তি ও প্রেম জাগ্রত হয় এবং অঝোর ধারায় অশ্রু ঝরে, যার ফলশ্রুতিতে অন্তরের প্রশান্তি দেখা দেয়। এই পবিত্র স্থানে পদার্পণ করে আল্লাহর বান্দা-সকল মহান প্রভুর ঘর তাওয়াফ (চারদিক প্রদক্ষিণ) করেন এবং ধর্মীয় আবেগসহ মানুষের ভিড় ঠেলে কালো পাথরের দিকে অগ্রসর হতে সাধ্যমতো চেষ্টা করেন, যাতে সেটাকে স্পর্শ ও চুম্বন করা যায়। অতঃপর বান্দা ‘সাঈ’ (সাফা মারওয়া পাহাড়ের মধ্যবর্তী স্থানে দ্রুত হাঁটাহাঁটি) করতে যান। যিলহাজ্জ্ব মাসের নবম দিনে প্রত্যেক হাজ্বী সাহেব/সাহেবা আরাফাতের ময়দানে উপস্থিত হন; সেখানে যোহরআসর ওয়াক্তের নামাযগুলো একত্রে পড়া হয়। মোযদালিফা নামের জায়গায় মাগরেব ‘এশা ওয়াক্তের নামাযগুলো ’এশা’র সময় একত্রে পড়া হয়। অতঃপর মিনা’তে ‘রামী’ তথা কঙ্কর নিক্ষেপ করা হয়, যা শেষ করে পশু কোরবানী দেয়া হয়।

এসব ধর্মীয় প্রথার কোনো যুক্তিসঙ্গত কারণ না থাকলেও এগুলোর উদযাপন ধর্মীয় আবেগ ও ভক্তিরই প্রতিফলন করে। মানব মস্তিষ্ক হয়তো বারংবার এসব প্রথার যুক্তিসঙ্গত কারণ তালাশ করতে পারে, কিন্তু কোনো যুক্তিনির্ভর ব্যাখ্যাতেই সদুত্তর মেলে না। অপর পক্ষে, একই প্রশ্ন যদি কারো আবেগের সামনে স্থাপন করা হয়, তবে এর উত্তরে হজ্জ্বের এসব প্রথার পেছনে যুক্তি দেখানো হবে এই যে, এতে ভক্তি ও ভালোবাসারই এক গোপন ইঙ্গিত লুকিয়ে আছে।

সর্বশক্তিমান খোদাতা’লা তাঁর প্রিয় বান্দাদের এই ভক্তিমূলক আচরণকে এতোখানি কবূল করেছেন যে তিনি শেষ বিচার দিবস অবধি তাঁদের এই সাধনাকে অনুশীলনীয় এবাদত-বন্দেগী হিসেবে পালনের নির্দেশ জারি করেছেন। হজ্জ্বের আকারে এই (আধ্যাত্মিক) সাধনার পুনঃপুনঃ অনুশীলন প্রকৃতপ্রস্তাবে আল্লাহতা’লার ওই সমস্ত আশীর্বাদধন্য পুণ্যবান বান্দাদেরকে স্মরণ করারই একটি রীতি। তাই হজ্জ্ব হলো মূলতঃ (প্রিয় বান্দাদের) এক স্মৃতিচারণমূলক ধর্মীয় অনুষ্ঠান।

আল্লাহর আশীর্বাদধন্য প্রিয় বান্দাদের (পুণ্যদায়ক) কর্ম, এবাদত-বন্দেগী ও কার্যকলাপের স্মৃতির প্রতি হজ্জ্বের রীতিনীতি বাস্তবে কীভাবে শ্রদ্ধা নিবেদন হতে পারে তা এই অধ্যায়ে প্রকাশ করা হবে। অনুরূপভাবে, পয়গম্বর ইবরাহীম (আ:) ও মা হাজেরা (রা:) তাঁদের আমল (পুণ্যদায়ক কর্ম) এমনভাবে পালন করেছিলেন যার দরুন আল্লাহতা’লা তা সম্মানিত করেন এভাবে যে, সর্বশেষ নবী (দ:)-এর উম্মতবৃন্দ তা হজ্জ্বের রীতি হিসেবে আমল করবেন। হজ্জ্বের এই প্রথা যেগুলো যিলহজ্জ্ব মাসের ৮ম হতে ১৩তম দিবসের মধ্যে পালন করা হয়, সেগুলো সম্পর্কে নিচে সংক্ষিপ্ত ব্যাখ্যা দেয়া হলো:

১.৮ এহরাম: হজ্জ্বে আম্বিয়া (আ:)-বৃন্দের পরিধেয় বস্ত্রের স্মরণে

হজ্জ্ব ও উমরাহ পালনের ক্ষেত্রে ‘এহরাম’ (বস্ত্র) বাঁধা হলো একটি বিশেষ তাৎপর্যপূর্ণ বিষয়। কা’বা ঘর যে ব্যক্তি তাওয়াফ করবেন, তাঁর জন্যে এটা পরিধান করা অত্যাবশ্যক। আল্লাহ পাকের আম্বিয়া (আ:)-বৃন্দ হজ্জ্বের সময় যে বস্ত্র পরতেন, এই দুইখানি কাপড় ওই একই পরিচ্ছদ। আল্লাহতা’লা (তাঁদের) এই বসন এতোই পছন্দ করেছেন যে তিনি হাজ্বী সাহেবদের জন্যে নিজেদের গতানুগতিক জামাকাপড় ছেড়ে ওই দুই ফালি কাপড় পরাকে বাধ্যতামূলক করে দিয়েছেন। এই একই দু টুকরো কাপড় গায়ে দিয়ে পৃথিবীর আনাচে-কানাচে থেকে আগত হাজ্বী সাহেবান সত্তরজন পয়গম্বর (আ:)-এর নিজ নিজ নবুওয়্যতকালে এহরাম হিসেবে পরিধানকৃত বস্ত্রের ওই প্রথাটি-ই চর্চা করে থাকেন। নিচে বর্ণিত হাদীসগুলো এই বিষয়টিকে খোলাসা করেছে:

১. হযরত আবূ মূসা আশআরী (রা:) মহানবী (দ:)-এর বাণী উদ্ধৃত করেন, যিনি বলেন, “সত্তরজন পয়গম্বর (আ:) আল-রাওহা (মক্কা ও মদীনার মধ্যবর্তী উপত্যকা)-এর পাথরগুলো পার হন; এঁদের মধ্যে ছিলেন পয়গম্বর মূসা (আ:) যিনি একটি বস্ত্রাবৃত অবস্থায় ও খালি পায়ে আল্লাহতা’লার প্রাচীন ঘরে পৌঁছেন।” [ইমাম আবূ ইয়া’লা কর্তৃক নিজ ‘আল-মুসনাদ’ গ্রন্থে বর্ণিত, ১৩:২০১ ও ২৫৫ #৭২৩১ ও #৭২৭১; হযরত আনাস বিন মালেক (রা:) হতেও ইমাম আবূ ইয়া’লা প্রণীত ’আল-মুসনাদ’ গ্রন্থে, ৭:২৬২ #৪২৭৫; ইমাম দায়লামী রচিত ‘আল-ফেরদৌস বি-মা’সূর আল-খিতা’ব, ৩:৪৩৩ #৫৩২৮; আবূ নুয়াইম লিখিত ‘হিলইয়া’ আল-আউলিয়া’ ওয়া তাবাক্বা’ত অাল-আসফিয়া’, ১:২৬০; ইমাম আল-মুনযিরী নিজের কৃত ‘আল-তারগীব ওয়াল-তারহীব মিন আল-হাদীস আল-শারীফ’, ২:১১৮ #১৭৩৯ গ্রন্থে বলেন যে এই হাদীসের এসনাদ সম্পর্কে কোনো আপত্তি-ই উত্থাপিত হয়নি; ইমাম ইবনে আসাকির-ও এ হাদীসটি উদ্ধৃত করেন নিজ ‘তা’রীখ দিমাশক্ব আল-কবীর’ ২১:১৬৬ পুস্তকে; আর ইমাম আল-হায়সামী এটা বর্ণনা করেন আপন ‘মজমা’ আল-যাওয়াঈদ ওয়া মানবা’আ আল-ফাওয়াঈদ’, ৩:২২০ কিতাবে]    

২. পয়গম্বর মূসা (আ:)-এর ‘এহরাম’ সম্পর্কে হযরত আবদুল্লাহ ইবনে মাসউদ (রা:) বর্ণনা করেন রাসূলুল্লাহ (দ:)-এর হাদীস, যিনি এরশাদ ফরমান, “আমি যেন দেখলাম (পয়গম্বর) মূসা বিন ‘এমরা’ন (আ:) এই উপত্যকায় দুটি ‘ক্বাতওয়া’নী’ (সাদা) বস্ত্র পরেছিলেন।” [ইমাম আবূ ইয়া’লা প্রণীত ‘আল-মুসনা’দ’, ৯:২৭ #৫০৯৩; আল-তাবারানী কৃত ‘আল-মু’জাম আল-কবীর’, ১০:১৪২ #১০,২৫৫; আল-তাবারানী রচিত ‘আল-মু’জাম আল-আওসাত’, ৬:৩০৮ #৬৪৮৭; আবূ নু’য়াইম লিখিত ‘হিলইয়া আল-আউলিয়া ওয়া তাবাক্বা’ত আল-আসফিয়া’, ৪:১৮৯; আল-মুনযিরী তাঁর প্রণীত ‘আল-তারগীব ওয়াল-তারহীব মিন আল-হাদীস আল-শরীফ’, ২:১১৮ #১৭৪০ গ্রন্থে বলেন যে আবূ ইয়া’লা ও আল-তাবারানী এই হাদীসটি ’হাসান’ সনদে বর্ণনা করেছেন; আল-হায়সামীও তাঁর কৃত ‘মজমা’ আল-যাওয়াঈদ ওয়া মানবা’আ আল-ফাওয়াঈদ’, ৩:২২১ পুস্তকে বিবৃত করেন যে আবূ ইয়া’লা ও আল-তাবারানী ’হাসান’ সনদে এই হাদীসটি বর্ণনা করেছেন]

৩. ইমাম আযরাক্বী (জন্ম: ২২৩ হিজরী) সর্বপ্রথম মক্কা মোয়াযযমার একখানি ইতিহাসগ্রন্থ সংকলন করেন, যা ‘আখবার মক্কা ওয়া মা’ জা’য়া ফীহা মিন আল-আসা’র’ নামে প্রসিদ্ধ ছিল। তিনি নিজস্ব এসনাদ-সহ বর্ণনা করেন হযরত আবদুল্লাহ ইবনে মাসউদ (রা:)-এর কথা, যিনি বলেন: “সত্তরজন পয়গম্বর (আ:) হাজ্বী হয়ে আল-রাওহা’র গিরিপথ পেরিয়েছিলেন; তাঁরা পরেছিলেন ‘সূফ’ (পশমী বস্ত্র)।” [ইমাম আযরাক্বী কৃত ‘আখবার মক্কা ওয়া মা’ জা’য়া ফীহা মিন আল-আসা’র’, ১:৭১-৭২]

. হজ্জ্বের অনুষ্ঠানে পয়গম্বর মূসা (আ:)-এর পরিচ্ছদ সম্পর্কে সর্ব-হযরত আবদুল্লাহ ইবনে আব্বাস (রা:) ও আবদুল্লাহ ইবনে উমর (রা:)-এর শিষ্য ইমাম মুজাহিদ ইবনে জুবাইর (রহ:) বলেন: “পয়গম্বর মূসা (আ:) একটি লাল উটের ওপর চড়ে হজ্জ্ব পালন করেন। তিনি আল-রাওহা (এলাকা) অতিক্রম করেন দুটি ’ক্বাতাওয়া’নী’ (সাদা) বস্ত্র গায়ে; এর একটি শরীরের নিম্নভাগ আচ্ছাদনকারী বস্ত্র ছিল, আর অপরটি তাঁর দেহ মোবারককে আবৃত করেছিল। তিনি (এ সময়) কা’বা শরীফকে তওয়াফ (অর্থাৎ, চারদিক প্রদক্ষিণ) করেন।” [প্রাগুক্ত ইমাম আযরাক্বী কৃত ‘আখবার মক্কা ওয়া মা’ জা’য়া ফীহা মিন আল-আসা’র’, ১:৬৭]

. আরেকটি রওয়ায়াত তথা বর্ণনায় সর্ব-পয়গম্বর হূদ (আ:) ও সা’লেহ (আ:)-এর এহরা’ম সম্পর্কে উল্লেখ করা হয়েছে। হযরত আবদুল্লাহ ইবনে আব্বাস (রা:) বর্ণনা করেন যে কোনো এক হজ্জ্ব (মওসূমে) মহানবী (দ:) ‘আসফান উপত্যকা অতিক্রম করার সময় জিজ্ঞেস করেন, ‘ওহে আবূ বকর, এটা কোন্ উপত্যকা?’ হযরত আবূ বকর (রা:) উত্তর দেন, ‘এটা ’আসফা’ন উপত্যকা।’ এমতাবস্থায় রাসূলুল্লাহ (দ:) এরশাদ ফরমান: “হূদ (আ:) ও সালেহ (আ:) এই উপত্যকা অতিক্রম করেছিলেন কম বয়সী লাল উটের পিঠে চড়ে, যেগুলোর গলার দড়ি ছিল তাল গাছের আঁশ দিয়ে তৈরি। তাঁদের (পয়গম্বরবৃন্দের) কোমরের (নিচের) কাপড় ছিল একটি আলখাল্লা, আর বহিরাবরণের বস্ত্র ছিল একখানি কালো ও সাদা ডোরাকাটা ঢিলে জামা। আম্বিয়া (আ:)-বৃন্দ পবিত্র কা’বা গৃহে হজ্জ্ব পালনকালে তালবিয়া (অর্থাৎ, আল্লাহর দরবারে হাজির হওয়ার বাক্যটি) পাঠ করছিলেন। [ইমাম আহমদ ইবনে হাম্বল কৃত ‘আল-মুসনাদ’, ১:২৩২; আল-বায়হাক্বী নিজ ‘শুয়া’ব আল-ঈমান’, ৩:৪৪০ #৪০০৩ গ্রন্থে পয়গম্বর মূসা (আ:) সম্পর্কেও অনুরূপ একটি বর্ণনা উদ্ধৃত করেন; এবং আল-মুনযিরী প্রণীত ‘আল-তারগীব ওয়াল-তারহীব মিন আল-হাদীস আল-শরীফ’, ২:১১৭ #১৭৩৭]

এসব হাদীস থেকে পরিদৃষ্ট হয় যে হজ্জ্ব পালনকালে পয়গম্বর (আ:)-মণ্ডলী সাধারণ বস্ত্র পরিধান করতেন, আর তাঁরা তা পালন করতেন শুধুমাত্র মহান আল্লাহ পাকের সন্তুষ্টি অর্জনের খাতিরেই। তাঁদের জামা ছিল দু টুকরো কাপড়ের সমষ্টি। এগুলোর একটি তাঁদের পবিত্র শরীরের নিম্নভাগকে আবৃত করতো, অপরটি তাঁদের দেহ মোবারককে আবৃত করতো।

আল্লাহতা’লার কাছে এই (দুই টুকরো) বস্ত্রটি এতোই পছন্দনীয় হয়েছিল যে তিনি (এ উম্মতের) হাজ্বীদের পরিধেয় বস্ত্র হিসেবে এটাকে বাধ্যতামূলক করে দেন। ফলে হজ্জ্ব পালনকালে কারো প্রথা বা রীতিগত বস্ত্র পরিধান একেবারেই নিষিদ্ধ করে দেয়া হয়। স্বাভাবিক পরিস্থিতিতে মাথার চুল কামানো অবস্থায় নামায আদায় করাটা ভ্রান্তি ও সুন্নাহ’র পরিপন্থী হিসেবে পরিগণিত হয়, কিন্তু হজ্জ্বের বেলায় তা হয় না। ‘এহরা’ম’ অবস্থায় প্রত্যেক হাজ্বী সাহেব-ই আল্লাহর পবিত্র ঘর কা’বা শরীফের সামনে খালি মাথায় উপস্থিত হন। এরকম খালি মাথায় থাকাটা বিনীত ও সমর্পিত হওয়ার চিহ্ন বহন করে, আর আল্লাহতা’লার কাছেও এটা সবচেয়ে প্রশংসিত।

এর পাশাপাশি নখ ও চুল কাটা এবং মোচ ছাঁটাকে নিষিদ্ধ করা হয়েছে [আল-কা’সানী কৃত ‘বাদা’ঈ আল-সানা’ঈ ফী তারতীব আল-শারা’ঈ, ২:১৯৮], যাতে বাহ্যিকভাবে সকল ক্ষেত্রেই মহান আল্লাহতা’লার পবিত্র পয়গম্বর (আ:)-বৃন্দের প্রবর্তিত রীতিনীতি অনুযায়ী হজ্জ্ব পালন করা যায়।

১.৯ তালবিয়া: পয়গম্বর ইবরাহীম (আ:) কর্তৃক হজ্জ্বের প্রতি আহ্বান ও তার উত্তরের স্মরণে

হ্জ্জ্ব হোক বা উমরাহ, প্রত্যেক হাজ্বী সাহেব ‘এহরা’ম’ বেঁধে একান্ত নিষ্ঠা ও বিনয় সহকারে আল্লাহতা’লার কাছে নিম্নের বাক্যটি উচ্চারণ করে প্রার্থনা করেন: ”আমি হাজির, হে প্রভু, আমি হাজির! আপনার কোনো অংশীদার নেই। নিশ্চয় সমস্ত প্রশংসা, আশীর্বাদ ও সার্বভৌমত্ব আপনারই মালিকানাধীন। আপনার কোনো অংশীদার নেই।” [আল-বুখারী কর্তৃক নিজ সহীহ গ্রন্থে বর্ণিত: কিতাবুল হজ্জ্ব (হজ্জ্বের বই), ‘তালবিয্যা’ অধ্যায়, ২:৫৬১ #১৪৭৪; আল-বুখারী কৃত সহীহ গ্রন্থ:কিতাবুল লিবাস্ (পরিচ্ছদবিষয়ক বই), ‘চুল কলপ/মেহেন্দি’ অধ্যায়, ৫:২২১৩ #৫৫৭১; সহীহ মুসলিম: কিতাবুল হজ্জ্ব, ‘তালবিয়্যা ও এর বিবরণ’ অধ্যায়, ২:৮৪১-৮৪২ #১১৮৪; আল-তিরমিযী প্রণীত ‘আল-জামিউস্ সহীহ’: কিতাবুল হজ্জ্ব’, ’তালবিয়্যা-সংক্রান্ত বর্ণনাসমূহ’ অধ্যায়, ৩:১৮৭-১৮৮ #৮২৫-৮২৬; আবূ দাউদ রচিত ‘আল-সুনান’: কিতাবুল মানাসিক (হজ্জ্বের রীতিনীতি), ‘তালবিয়্যা পালনের পদ্ধতি’ শীর্ষক অধ্যায়, ২:১৬২ #১৮১২; আল-নাসাঈ লিখিত ‘আল-সুনান’: কিতাবুল মানা’সিক আল-হজ্জ্ব, ’তালবিয়্যা পালনের পদ্ধতি’ শীর্ষক অধ্যায়, ৫:১৫৯-১৬০ #২৭৪৭-২৭৫০; এবং ইবনে মাজাহ কৃত ‘আল-সুনান’: কিতাবুল মানা’সিক, ’তালবিয়্যা’ অধ্যায়, ২:৯৭৪ #২৯১৮]

হজ্জ্ব ও উমরাহ’র সময় এই তালবিয়্যা পবিত্র (কা’বা) মসজিদে পাঠ করা হলেও খুব কম সংখ্যক মানুষ-ই এর উৎপত্তি সম্পর্কে জানেন। এটা প্রকৃতপক্ষে আল্লাহর আদেশ পালনার্থে পয়গম্বর ইবরাহীম (আ:)-এর কা’বা ঘর নির্মাণ সুসম্পন্ন করার পর তাঁর আহ্বানের প্রতি প্রায় চার হাজার বছর যাবত সাড়া প্রদানেরই একটি রীতি। এ প্রসঙ্গে আল-কুরআনে বিবৃত হয়েছে:

“এবং (হে ইবরাহীম) মানুষের মধ্যে হজ্জ্বের সাধারণ ঘোষণা করে দাও, তারা তোমার কাছে উপস্থিত হবে পদব্রজে ও প্রত্যেক ক্ষীণকায় উটনীর পিঠে করে, যা দূর-দূরান্তের পথ থেকে আসে।” [আল-ক্বুরআন, ২২:২৭; মুফতী আহমদ এয়ার খাঁন সাহেব কৃত ‘তাফসীরে নূরুল এরফান’ বাংলা সংস্করণ]

রাসূলুল্লাহ (দ:)-এর হাদীস তথা বাণীসমূহে বিবৃত হয় যে পয়গম্বর ইবরাহীম (আ:) আবূ ক্বুবায়স্ পর্বতশিখরে আরোহণ করেন এবং গোটা মনুষ্যকুলের প্রতি এই মর্মে আহ্বান জানান যে হজ্জ্বের উদ্দেশ্যে খোদার ঘরে তাদের হাজির হওয়া উচিত। [ইবনে আবী হা’তিম কর্তৃক নিজ ‘তাফসীর আল-কুরআন আল-’আযীম’ ৮:২৪৮৭-২৪৮৮ গ্রন্থে বর্ণিত; ইবনে জাওযী কৃত ‘যা’দ আল-মাসীর ফী ‘ইলম আল-তাফসীর’, ৫:৪২৩; ইমাম সুয়ূতী প্রণীত ‘আল-দুর্র আল-মানসূর ফী আল-তাফসীর বি আল-মা’সূর’, ৬:৩২; এবং ইবনে ‘আজীবা রচিত ‘আল-বাহর আল-মাদীদ ফী তাফসীর আল-ক্বুরআন আল-মাজীদ’, ৪:৪১০]

স্থান-কালের উর্ধ্বে উঠে এই আহ্বানকে (পৃথিবীতে) মনুষ্য বসতির সর্বত্র পৌঁছে দেয়া হয়। বস্তুতঃ জন্মগ্রহণ করেননি আধ্যাত্মিক জগতের এমন সমস্ত আত্মা-ও এই আহ্বান শুনতে ও দেখতে পান; যিনি-ই এই আহ্বানে সাড়া দিয়ে বলেন ‘আল্লাহুম্মা লাব্বায়েক’ (অর্থাৎ, আমি হাজির), তাঁকেই হজ্জ্ব করার সামর্থ্য মঞ্জুর করা হয় এবং মহান আল্লাহতা’লার ঘরে হাজির হওয়ার অনুমতিও দেয়া হয়, যা নিম্নবর্ণিত হাদীসগুলোতে প্রমাণিত হয়:

১. হযরত আবদুল্লাহ ইবনে আব্বাস (রা:) বর্ণনা করেন হুযূরে পাক (দ:)-এর হাদীস, যিনি বলেন, পয়গম্বর ইবরাহীম (আ:) যখন কা’বা ঘর নির্মাণ করেন, সর্বশক্তিমান আল্লাহতা’লা তাঁর প্রতি এ মর্মে ঐশী প্রত্যাদেশ দেন যেন তিনি মানবজাতিকে হজ্জ্বের দিকে আহ্বান জানান। পয়গম্বর ইবরাহীম (আ:) ঘোষণা করেন, ‘তোমাদের প্রভু (তাঁর) একখানি ঘর নির্দিষ্ট করে দিয়েছেন এবং তোমাদেরকে আদেশ করেছেন যেন তোমরা তাতে হজ্জ্ব সম্পন্ন করো।’ এমন কোনো পাথর, গাছ, পাহাড় বা মাটি ছিল না যেটা এই আহ্বান শুনে না বলেছিল, ’আমি হাজির, হে আল্লাহ, আমি হাজির!’ [আল-হাকীম কর্তৃক নিজ ‘আল-মোস্তাদরাক ‘আলা আল-সহীহাইন’, ২:৬০১ #৪০২৬ গ্রন্থে বর্ণিত; আল-বায়হাক্বী কৃত ‘আল-সুনান আল-কুবরা’, ৫:১৭৬ #৯৬১৩; আল-বায়হাক্বী প্রণীত ‘’শু’আব আল-ঈমান, ৩:৪৩৯ #৩৯৯৮; আল-তাবারী রচিত ‘তা’রিখ আল-উমাম ওয়া আল-মুলূক’, ১:১৫৬; মুজাহিদ লিখিত ‘আল-তাফসীর’, ২:৪২২; আল-জাসসা’স কৃত ‘আহকা’ম আল-ক্বুরআন, ৫:৬৩; আল-তাবারী প্রণীত ‘জামে’ আল-বায়া’ন ফী তাফসীর আল-ক্বুরআ’ন’, ১৭:১৪৪; এবং ইমাম সুয়ূতী রচিত ‘আল-দুর্র আল-মানসূর ফী আল-তাফসীর বি আল-মা’সূর, ৬:৩২]

. হযরত আবদুল্লাহ ইবনে আব্বাস (রা:) বলেন, পয়গম্বর ইবরাহীম (আ:) যখন কা’বা ঘরের নির্মাণ কাজ সুসম্পন্ন করেন, তখন তাঁকে বলা হয়, ‘মানুষকে হজ্জ্বের দিকে আহ্বান করুন।’ তিনি আরয করেন, ‘হে আমার প্রভু, আমার কণ্ঠস্বর (অতোদূর) পৌঁছুবে না।’ সর্বশক্তিমান আল্লাহতা’লা বলেন, ‘উচ্চস্বরে আহ্বান করুন, আমি সমগ্র সৃষ্টিকে তা শোনাবো।’ অতঃপর পয়গম্বর ইবরাহীম (আ:) বলেন, ‘ওহে মানবকুল! মহান আল্লাহ পাক তোমাদের জন্যে হজ্জ্বের বিধান জারি করেছেন।’ বর্ণনাকারী (সাহাবী) আরো যোগ করেন, ‘এই ঘোষণা আসমান ও জমিনে অবস্থিত সকল সৃষ্টি-ই শুনতে পান। তোমরা কি দেখতে পাও না পৃথিবীর দূর-দূরান্ত হতে মানুষ (এ আহ্বানে সাড়া দিতে) কীভাবে তালবিয়্যা পাঠ করতে করতে এসে হাজির হন?’ [ইবনে আবী শায়বা কর্তৃক নিজ ‘আল-মোসান্নাফ’, ৬:৩২৯ #৩১৮১৮ গ্রন্থে বর্ণিত; আল-হা’কিম কৃত ‘আল-মোস্তাদরাক ‘আলা আল-সহীহাইন, ২:৪২১ #৩৪৬৪; আল-বায়হাক্বী প্রণীত ‘আল-সুনান আল-কুবরা’, ৫:১৭৬ #৯৬১৪; আল-মাক্বদাসী রচিত ‘আল-আহা’দীস আল-মুখতা’রা, ১০:২০-২১; আল-তাবারী তাঁর ‘জামে’ আল-বয়া’ন ফী তাফসীর আল-ক্বুরআন’, ১৭:১৪৪ গ্রন্থে সাঈদ বিন জুবায়র হতেও এই বর্ণনাটি লিপিবদ্ধ করেন; আল-সুযূতী লিখিত ‘আল-দুর্র আল-মানসূর ফী আল-তাফসীর বি আল-মা’সূর’, ৬:৩২; ইমাম সুযূতী একই গ্রন্থের (দুররুল মানসূর) ৬:২৩৩-এ এই রওয়ায়াত সাঈদ বিন জুবায়র হতেও বর্ণনা করেন; আল-শওকানী কৃত ‘ফাতহুল ক্বাদীর’, ৩:৪৫০; এবং আ’লূসী প্রণীত ‘রূহু আল-মা’আ’নী ফী তাফসীর আল-ক্বুরআ’ন আল-আযীম ওয়া আল-সাব’ আল-মাসা’নী’, ১৭:১৪৩]  

. “এবং (হে ইবরাহীম) মানুষের মধ্যে হজ্জ্বের সাধারণ ঘোষণা করে দাও” – ক্বুরআন মজীদের এই আয়াতটি প্রসঙ্গে হযরত আবদুল্লাহ ইবনে আব্বাস (রা:) বলেন, পয়গম্বর ইবরাহীম খলীলউল্লাহ (আ:) একটি পাথরের ওপরে দাঁড়িয়ে ঘোষণা করেন, ‘ওহে মানবকুল! হজ্জ্ব তোমাদের প্রতি ফরয করা হয়েছে।’ সকল পুরুষের ঔরসে ও নারীর গর্ভে যারা ছিলেন, তাঁদের সবাইকেই এই আহ্বান শোনানো হয়; আর অনাদিকাল হতে আল্লাহর জ্ঞাত সব মো’মেন বান্দা যাঁদের ভাগ্যে শেষ বিচার দিবস পর্যন্ত হজ্জ্ব নসীব করা হয়েছিল, তাঁরা এ আহ্বানে সাড়া দিয়ে বলেন, ‘আমি হাজির, হে প্রভু, আমি হাজির।’ [আল-তাবারী কর্তৃক নিজ ‘জামে’ আল-বয়া’ন ফী তাফসীর আল-ক্বুরআন’, ১৭:১৪৪; আল-সুয়ূতী কৃত ‘আল-দুর্র আল-মানসূর ফী আল-তাফসীর বি আল-মা’সূর, ৬:৩৩; আল-তাবারী প্রণীত ‘তা’রীখ আল-উমাম ওয়া আল-মুলূক’, ১:১৫৭; এবং আল-’আসক্বালা’নী রচিত ‘ফাতহ্ আল-বা’রী’, ৬:৪০৬]

. হযরত আবূ হুরায়রা (রা:) বর্ণনা করেন রাসূলুল্লাহ (দ:)-এর বাণী; তিনি বলেন, পয়গম্বর ইবরাহীম (আ:) যখন কা’বা ঘরের নির্মাণ কাজ সুসম্পন্ন করেন, তখন আল্লাহতা’লা তাঁকে হজ্জ্বের আহ্বান জানাতে নির্দেশ দেন। এমতাবস্থায় তিনি একটি উঁচু স্থানে উঠে উচ্চস্বরে বলেন, ‘ওহে মানবকুল! তোমাদের প্রভু তোমাদেরই জন্যে একটি ঘর নির্ধারণ করেছেন; অতএব, তোমরা হজ্জ্ব পালন করো এবং আল্লাহর (আহ্বানের) প্রতি সাড়া দাও।’ সকল পুরুষের ঔরসে এবং নারীর গর্ভে যাঁরা ছিলেন, তাঁরা উত্তর দেন, ‘আমরা উত্তর দিচ্ছি! আমরা উত্তর দিচ্ছি! আমি হাজির, হে প্রভু, আমি হাজির!’ হাদীসটির বর্ণনাকারী (সাহাবী) আরো যোগ করেন, যে কেউ আজকাল হজ্জ্ব পালন করলে তিনি সে সকল (নেককার) বান্দার অন্তর্গত, যিনি পয়গম্বর ইবরাহীম (আ:)-এর আহ্বানে যতোবার তালবিয়্যা পাঠের ভিত্তিতে সাড়া দিয়েছিলেন। [আল-ফা’কাহী প্রণীত ‘আখবা’র মক্কা ফী ক্বাদীম আল-দাহর ওয়া হাদীসিহী’, ১:৪৪৬ #৯৭৩; এ হাদীস সংক্ষেপে মুজা’হিদ বিন জুবায়র হতে নিম্নোক্ত বইগুলোতে উদ্ধৃত হয়েছে: ইবনে আবী শায়বা রচিত ‘আল-মুসান্নাফ’, ৬:৩৩০ #৩১,৮২৬; আল-তাবারী লিখিত ‘জামে’ আল-বয়া’ন ফী তাফসীর আল-ক্বুরআন’, ১৭:১৪৫; ইবনে আবদ আল-বার্র প্রণীত ‘আল-তামহীদ লিমা’ ফী আল-মুওয়াত্তা মিন আল-মা’আনী ওয়া আল-আসা’নীদ’, ১৫:১৩১; এবং আল-যায়লাঈ কৃত ‘নাসব আল-রা’এয়া লি আহা’দীস আল-হেদা’এয়া’, ৩:২৩]

’লাব্বায়েক’-এর এক মুহূর্তের এ আহ্বান সহস্র সহস্র বছর আগে জানানো হলেও এই ঐশী সুরের অনুরণন চারদিক থেকেই শোনা যাচ্ছে। হাজ্বী সাহেবান এটা আবৃত্তি করার মাধ্যমে পয়গম্বর ইবরাহীম (আ:)-এর সাথে সম্পর্কিত এ ঘটনার কথা মনে করিয়ে দিচ্ছেন। এতে প্রমাণিত হয় যে অতীতের ঘটনার স্মৃতিচারণ করা দ্বীন ইসলামের শিক্ষার সাথে একদম সঙ্গতিপূর্ণ। অনুরূপভাবে, মওলিদুন্নবী (সাল্লাল্লাহু আলাইহে ওয়া সাল্লাম)-এর উদযাপনের মাধ্যমে আমরা আমাদের প্রিয়নবী (দ:)-এর বেলাদত তথা ধরাধামে শুভাগমনের স্মৃতিচারণ করি এবং তাঁর এ আবির্ভাবের প্রতি খুশি প্রকাশ করি। হুযূরে পূর নূর (দ:)-কে সমাবেশে, তাঁর প্রশংসায় নাত/শে’র/কসীদা/পদ্য আবৃত্তির মাধ্যমে এবং অন্যান্য প্রশংসনীয় আমল দ্বারা স্মরণ করা হয়।

১.১০ তওয়াফ: আম্বিয়া (আ:)-এর সুন্নাহ (রীতিনীতি)-এর স্মরণে

কা’বা গৃহের চারপাশ সাতবার ঘুরে ঘুরে প্রদক্ষিণ করা তওয়াফ হিসেবে পরিচিত। এই তওয়াফ পালন করা পয়গম্বর আলাইহিমুস্ সালামেরই অনুশীলিত একটি রীতি (সুন্নাহ)। নিম্নবর্ণিত রওয়ায়াতগুলোতে এতদসংক্রান্ত বিস্তারিত ব্যাখ্যা রয়েছে:

. হযরত আবদুল্লাহ ইবনে আব্বাস (রা:) বর্ণনা করেন, কা’বা ঘরের ভিত্তিপ্রস্তর স্থাপন, এতে প্রার্থনা ও তওয়াফ যিনি সর্বপ্রথম করেন, তিনি হলেন পয়গম্বর আদম (আলাইহিস্ সালাম)। [আল-আযরাক্বী প্রণীত ‘আখবার মক্কা ওয়া মা’ জা’য়া ফীহা’ মিন আল-আসা’র’, ১:৩৬, ৪০; এবং ইমাম সুয়ূতী রচিত ‘আল-দুর্র আল-মানসূর ফী আল-তাফসীর বি আল-মা’সূর’, ১:৩১৩]  

. ইমাম মুহাম্মদ বিন ইসহাক্ব বিবৃত করেন যে তাঁকে এ মর্মে জানানো হয়েছে, পয়গম্বর আদম (আ:) ধরণীতলে প্রার্থনা করার মতো কোনো বেহেশতী পরিবেশ না পেয়ে দুঃখভারাক্রান্ত ছিলেন। এমতাবস্থায় আল্লাহতা’লা (ফেরেশতাকুলের মাধ্যমে) পয়গম্বর আদম (আ:)-এর জন্যে একটি পবিত্র মসজিদ বানিয়ে দেন এবং সেই স্থানে বসতি করতে তাঁকে আদেশ করেন। হযরত আদম (আ:) মক্কা অভিমুখে যাত্রা করেন এবং তিনি যেখানে বিশ্রাম নেন, সেখানে আল্লাহতা’লা পানির ঝর্ণা সৃষ্টি করে দেন। অতঃপর তিনি মক্কা শরীফ পৌঁছুলে সেখানে তিনি বসতি স্থাপন করে ওই কা’বা গৃহের পাশে আল্লাহর এবাদত-বন্দেগীতে নিমগ্ন হন এবং কা’বা গৃহ তওয়াফ করেন। তাঁর বেসাল (পরলোকে আল্লাহর সাথে মিলনপ্রাপ্তি) না হওয়া পর্যন্ত এই স্থান-ই হয় তাঁর আবাসস্থল। [আল-আযরাক্বী কৃত ‘আখবার মক্কা ওয়া মা’ জা’য়া ফীহা মিন আল-আসা’র’, ১:৩৯; ইবনে আসাকির লিখিত ‘তা’রীখ দিমাশক্ব আল-কবীর’, ৭:৪২৫; এবং আল-মাক্বদাসী প্রণীত ‘আল-বাদ’ ওয়া আল-তা’রীখ’, ৪:৮২]

. খলীফা উমর আল-খাত্তাব (রা:) হযরত কা’আব আল-আহবার (রা:)-কে আল্লাহতা’লার ঘরটি সম্পর্কে জিজ্ঞেস করেন। তিনি উত্তরে বলেন, “আল্লাহতা’লা পয়গম্বর আদম (আ:)-এর সাথে একটি হীরের মোড়কের ভেতরে কা’বা ঘরটি দুনিয়াতে নামিয়ে দেন এবং তাঁকে বলেন, ‘ওহে আদম! আমি আমার গৃহ তোমার সাথে পৃথিবীতে পাঠালাম। এটাকে তওয়াফ করতে হবে এবং এর পাশে এবাদত-বন্দেগীও করতে হবে, ঠিক যেমনটি করা হয় আমার ’আরশে।’ ফেরেশতাকুল ওই ঘরের সাথে অবতীর্ণ হন এবং এর ভিত্তিপ্রস্তর স্থাপন ও এর নির্মাণ কাজ সুসম্পন্ন করেন। হযরত আদম (আ:) এই কা’বা ঘরের তওয়াফ করতেন, যেমনভাবে ’আরশকে ঘিরে তা করা হয়। আর তিনি এর পাশে নামায-দোয়াও আদায় করতেন, যেমনটি তিনি ’আরশের পাশে প্রার্থনা করতেন।” [আল-আযরাক্বী রচিত প্রাগুক্ত ‘আখবার মক্কা ওয়া মা’ জা’য়া ফীহা মিন আল-আসা’র’, ১:৩৯]

. পয়গম্বর আদম (আলাইহিস্ সালাম) ছাড়াও অসংখ্য আম্বিয়া (আলাইহিমুস্ সালাম) কা’বা ঘরের তওয়াফ করেন। এ প্রসঙ্গে প্রখ্যাত তাবেঈ হযরত মুজা’হিদ (রহ:) বলেন, “পঁচাত্তর জন পয়গম্বর (আ:) হজ্জ্ব পালন করেন। এঁরা সবাই কা’বা ঘরকে তওয়াফ করেন।” [আল-আযরাক্বী কৃত প্রাগুক্ত ‘আখবার মক্কা ওয়া মা’ জা’য়া ফীহা মিন আল-আসা’র’, ১:৬৭-৬৮; আল-ফা’কাহী প্রণীত ‘আখবার মক্কা ফী ক্বাদীম অাল-দাহর ওয়া হাদীসিহী’, ৪:২৬৮ #২৫৯৯; এবং আহমদ ইবনে হাম্বল রচিত ‘আল-’ইলাল ওয়া মা’রিফা আল-রিজা’ল’, ৩:১৯৩ #৪৮৩১]

কা’বা শরীফকে সাতবার তওয়াফ করাও পয়গম্বর (আ:)-মণ্ডলীরই রীতি (সুন্নাহ)।

. হযরত আবদুল্লাহ ইবনে আব্বাস (রা:) বর্ণনা করেন: “পয়গম্বর আদম (আ:) হজ্জ্ব পালন করেন এবং কা’বা ঘরকে সাতবার প্রদক্ষিণ (তওয়াফ) করেন।” [আল-আযরাক্বী কৃত প্রাগুক্ত ‘আখবার মক্কা ওয়া মা’ জা’য়া ফীহা মিন আল-আসা’র’, ১:৪৫; এবং আল-সুয়ূতী লিখিত ‘আল-দুর্র আল-মানসূর ফী আল-তাফসীর বি আল-মা’সূর’, ১:৩২০]

. ইমাম আবদুল্লাহ ইবনে আবী সুলাইমান বলেন: পয়গম্বর আদম (আ:) দুনিয়াতে অবতরণের পরে কা’বা ঘরকে সাতবার তওয়াফ করেন। [আল-আযরাক্বী প্রণীত প্রাগুক্ত ‘আখবার মক্কা ওয়া মা’ জা’য়া ফীহা মিন আল-আসা’র’, ১:৪৩]

. ইমাম মুহাম্মদ বিন ইসহাক্ব সর্ব-পয়গম্বর ইবরাহীম (আ:) ও ইসমাঈল (আ:)-এর তওয়াফ প্রসঙ্গে লেখেন: পয়গম্বর ইবরাহীম খলীলউল্লাহ (আলাইহিস্ সালাম) পবিত্র কা’বা ঘর নির্মাণ সুসম্পন্ন করার পর হযরত জিবরীল (আ:) তাঁর কাছে আসেন এবং তাঁকে বলেন, ‘এটাকে সাতবার তাওয়াফ করুন।’ এমতাবস্থায় সর্ব-পয়গম্বর ইবরাহীম (আ:) ও ইসমাঈল (আ:) কা’বা ঘরকে সাতবার তওয়াফ করেন। [আল-আযরাক্বী লিখিত প্রাগুক্ত ‘আখবার মক্কা ওয়া মা’ জা’য়া ফীহা মিন আল-আসা’র’, ১:৬৫; এবং আল-কুরতুবী কৃত ‘আল-জামে’ লি-আহকা’ম আল-ক্বুরআন, ২:১২৯]

সর্বশেষ পয়গম্বর হযরত মুহাম্মাদুর রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহে ওয়া সাল্লাম পূর্ববর্তী আম্বিয়া আলাইহিমুস্ সালামের এই আচরিত প্রথাটিকে কা’বা শরীফের সাতবার তাওয়াফ দ্বারা সংরক্ষণ করেন।

. হযরত উমর ইবনে আল-খাত্তাব (রা:) বর্ণনা করেন: রাসূলুল্লাহ (দ:) মক্কা মোয়াযযমায় প্রবেশ করে কা’বা গৃহকে সাতবার তাওয়াফ করেন। [আল-বুখারী লিখিত ‘সহীহ’: কিতাবুল হাজ্জ্ব, ‘যে ব্যক্তি মাক্বাম-এ-ইবরাহীমের পেছনে তাওয়াফ-পরবর্তী দুই রাক’আত নামায আদায় করেন’ শীর্ষক অধ্যায়, ২:৫৮৮ #১৫৪৭; আল-বুখারী কৃত ‘সহীহ’: কিতাবুল হজ্জ্ব, ‘সাফা ও মারওয়ার মধ্যবর্তী সাঈ সম্পর্কে বর্ণিত বিষয়’ শীর্ষক অধ্যায়, ২:৫৯৩ #১৫৬৩; আল-বুখারী প্রণীত ‘সহীহ’: কিতাবুল হজ্জ্ব, ‘উমরা-শেষে এহরাম খোলার সময়’ শীর্ষক অধ্যায়, ২:৬৩৬ #১৭০০; এবং মুসলিম রচিত ‘আল-সহীহ’: কিতাবুল হজ্জ্ব, ‘হজ্জ্বে এহরাম বাঁধা ব্যক্তির প্রতি আরোপিত বাধ্যবাধকতা’ শীর্ষক অধ্যায়, ২:৯০৬ #১২৩৪]  

. হযরত জাবের ইবনে আব্দিল্লাহ (রা:) বর্ণনা করেন: মহানবী (দ:) মক্কা শরীফে প্রবেশ করলে তিনি কা’বা ঘর সাতবার তওয়াফ করেন। [আল-তিরমিযী রচিত ‘আল-জা’মে’ আল-সহীহ’: কিতাবুল হজ্জ্ব, ‘আল-মারওয়ার আগে আল-সাফা’য় আরম্ভ করা প্রসঙ্গে বর্ণনাসমূহ’ শীর্ষক অধ্যায়, ৩:২১৬ #৮৬২; আল-তিরমিযী কৃত ‘আল-জামে’ আল-সহীহ’: আবওয়াব আল-তাফা’সীর, ‘সূরা আল-বাক্বারা’ শীর্ষক অধ্যায়, ৫: ২১০ #২৯৬৭; আল-নাসাঈ প্রণীত ‘আল-সুনান: কিতাব মানা’সিক আল-হাজ্জ্ব, ‘তাওয়াফ-পরবর্তী দুই রাক’আত নামাযশেষে বক্তব্য’ শীর্ষক অধ্যায়, ৫:২৩৫ #২৯৬১; ইবনে খুযায়মা লিখিত ’আল-সহীহ’, ৪:১৭০ #২৬২০; এবং আল-তাবারানী রচিত ‘’আল-মু’জাম আল-সগীর’, ১:১২৬ #১৮৭]

এসব রওয়ায়াত হতে সহজে সিদ্ধান্ত নেয়া যায় যে তাওয়াফ (সাতবার প্রদক্ষিণসহ) পালন করাটা পয়গম্বর (আ:)-বৃন্দেরই পদাঙ্ক অনুসরণ; এর পালনের মাধ্যমে আমরা পয়গম্বর (আ:)-বৃন্দের পুনঃপুনঃ স্মৃতিচারণ করে থাকি।

১.১১ রামল: মহানবী (দ:) ও সাহাবা-এ-কেরাম (রা:)-এর দ্বারা অনুশীলিত তওয়াফ-পদ্ধতির স্মরণে

তাওয়াফ পালন হজ্জ্বের সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ অংশের একটি। পুরুষ হাজ্বীদের আদেশ করা হয়েছে যেন তাঁরা তাওয়াফ তথা প্রদক্ষিণের প্রথম তিনবার কিছুটা গর্বের সাথেই তা সম্পন্ন করেন। এর ইসলামী পারিভাষিক শব্দ হচ্ছে ‘রামল’। তবে সার্বিকভাবে বলা যায়, গর্বভরে হাঁটা ঔদ্ধত্যেরই একটি চিহ্ন এবং এটা আল্লাহতা’লা পছন্দ করেন না; তবে হজ্জ্বের সময় এর বিপরীত-ই ঘটে থাকে। [নোট: হা’রিসা বিনতে ওয়াহহাব অাল-খুযাঈ (রা:) বর্ণনা করেন যে মহানবী (দ:) এরশাদ ফরমান, “আমি কি তোমাদেরকে বেহেশতী মানুষদের সম্পর্কে জানাবো না? তারা হলো যারা দুর্বল এবং দুর্বল বলে মনে করা হয়। কিন্তু যদি তারা আল্লাহর নামে কসম/শপথ করে, আল্লাহতা’লা তা কার্যকর বা বাস্তবায়ন করে দেন। আমি কি তোমাদেরকে জাহান্নামী লোকদের সম্পর্কে বলবো না? তারা হলো যারা অমার্জিত, উদ্ধত ও অহঙ্কারী।” এ হাদীস বর্ণনা করেন অাল-বুখারী তাঁর ‘সহীহ’: কিতা’ব আল-তাফসীর, সূরা নূন ওয়াল্ ক্বালাম’ শীর্ষক অধ্যায়, ৪:১৮৭০ #৪৬৩৪ গ্রন্থে; আল্-বুখারী প্রণীত ‘আল-সহীহ’: কিতা‘ব আল-আদাব, ’ঔদ্ধত্য’ শীর্ষক অধ্যায়, ৫:২২৫৫ #৫৭২৩; এবং মুসলিম কৃত ‘আল-সহীহ’: কিতা’ব আল-জান্নাহ ওয়া সিফা নাঈমিহা’ ওয়া আহলিহা’, ‘দাম্ভিক জাহান্নামে প্রবেশ করবে এবং দুর্বল জান্নাতে প্রবেশ করবে’ শীর্ষক অধ্যায়, ৪:২১৯০ #২৮৫৩। হযরত আবূ হুরায়রা (রা:) বর্ণনা করেন যে রাসূলুল্লাহ (দ:) এরশাদ ফরমান, “আল্লাহ পাক ঘোষণা করেন: শ্রেষ্ঠত্ব হচ্ছে আমারই ভূষণ এবং অহঙ্কার আমারই পরিধেয়। যে কেউ এগুলোর কোনোটি আমার কাছ থেকে অপসারণ করতে চাইবে, আমি তাকে জাহান্নামে নিক্ষেপ করবো।” এ হাদীস বর্ণনা করেন ইবনে আবী শায়বা নিজ ‘আল-মুসান্নাফ’, ৫:৩২৯ #২৬,৫৭৯ গ্রন্থে; আল-তাবারানী এটা হযরত আলী (ক:) হতে উদ্ধৃত করেন নিজ ‘আল-মু’জাম আল-আওসাত’, ৩:৩৫২ #৩৩৮০ পুস্তকে; আল-ক্বাদা’ঈ কৃত ‘মুসনাদ আল-শিহা’ব’, ২:৩৩১ #১৪৬৪; আল-বায়হাক্বী লিখিত ‘শু’আব আল-ঈমা’ন’, ৬:৩৮০ #৮১৫৭]

এতে নিহিত (ঐশী) জ্ঞান-প্রজ্ঞা এই যে, মদীনায় হিজরতের পরে মুসলমানবৃন্দ অবিরত অনেক সংগ্রামের ফলে দুর্বল ও ক্ষীণকায় হয়ে পড়েন। হুদায়বিয়ার সন্ধি স্থাপিত হওয়ার এক বছর পর তাঁরা মক্কা মোয়াযযমায় উমরাহ হজ্জ্ব পালন করতে ফেরত গেলে তাঁদের শরীরে এই দুর্বলতা দৃশ্যমান হয়। মক্কার কুফফার (অবিশ্বাসী গোষ্ঠী) দেখতে পায় যে মুসলমানবৃন্দ তাওয়াফ পালনে ধীরগতিসম্পন্ন; আর তাই তারা মুসলমানদেরকে এ মর্মে ব্যঙ্গ-বিদ্রূপ করে যে তাঁরা মক্কা ছেড়ে যাওয়ায় এতোই ক্ষীণকায় হয়েছেন, যার দরুন তাঁরা এমন কি ঠিকভাবে হাঁটতেও পারছেন না। এমতাবস্থায় মহানবী (দ:) সম্মানিত সাহাবা-এ-কেরাম (রা:)-কে সাড়ম্বরে হাঁটতে নির্দেশ দেন, যাতে অবিশ্বাসীদের মস্তিষ্ক থেকে এই ধারণা দূর হয়ে যায়। মক্কা বিজয়ের পরে যদিও কোনো অমুসলিম আর সেখানে অবশিষ্ট ছিল না, তবুও তাওয়াফের এ রীতি শতাব্দীর পর শতাব্দী ধরে এই একই রকমভাবে পালিত হয়ে আসছে।

ইমাম মুসলিম তাঁর ‘সহীহ’ গ্রন্থের ‘কিতাবুল হজ্জ্ব’ বইয়ের ‘এসতেহবা’ব আল-রামল ফী আল-তাওয়া’ফ ওয়া আল-উমরা ওয়া ফী আল-তাওয়া’ফ আল-আওয়াল মিন আল-হাজ্জ্ব’ (উমরা‘র তাওয়াফ ও হজ্জ্বের প্রথম তাওয়াফে রামলের বাঞ্ছনীয়তা) শীর্ষক অধ্যায়ে এ বিষয়ে অনেক রওয়ায়াতের উল্লেখ করেন, যা নিম্নে লিপিবদ্ধ হলো:

. হযরত আবদুল্লাহ ইবনে আব্বাস (রা:) বলেন যে প্রিয়নবী (দ:) ও তাঁর মহান সাহাবা-এ-কেরাম (রা:) মদীনা মোনাওয়ারায় এক মহামারী দেখা দিলে শারীরিকভাবে দুর্বল হয়ে পড়েন। তাঁরা (হুদায়বিয়ার সন্ধির এক বছর পর উমরা’র উদ্দেশ্যে) মক্কা মোয়াযযমায় উপস্থিত হওয়ার সময় (সেখানকার) মুশরিক নেতৃবর্গ তাদের অনুসারীদের বলে, ‘তোমাদের কাছে এমন এক জাতি আগমন করবে যারা রোগে দুর্বল হয়ে গিয়েছে।’ এতদশ্রবণে মক্কাবাসী মানুষ কালো পাথরের কাছে গিয়ে বসেন। অতঃপর মুসলমানবৃন্দ সেখানে পৌঁছুলে রাসূলুল্লাহ (দ:) তাঁদেরকে প্রথম তিন তওয়াফ সাড়ম্বরে পালন করতে নির্দেশ দেন এবং দুই কোণার (অর্থাৎ, ইয়েমেনী কোণা ও কালো পাথরের কোণা) মধ্যবর্তী স্থানে হাঁটতে বলেন, যাতে মুশরিকবর্গ তাঁদেরকে শক্ত-সামর্থ্য দেখতে পায়। (এ দৃশ্য দর্শনে) মুশরিকবর্গ বিস্ময়ভরে বলে, ‘তোমরা কি আমাদের এ কথা বিশ্বাস করতে বলো যে এই মানুষগুলো রোগাক্রান্ত হয়ে দুর্বল হয়ে গিয়েছে? সত্যি তারা ভীষণ বলবান এবং তোমরা যা দাবি করছো তা হতে (সম্পূর্ণ) মুক্ত!’ [ইমাম মুসলিম কৃত ‘আল-সহীহ’: কিতাবুল হজ্জ্ব, ‘উমরা‘র তাওয়াফ ও হজ্জ্বের প্রথম তাওয়াফে রামলের বাঞ্ছনীয়তা’ শীর্ষক অধ্যায়, ২:৯২৩ #১২৬৬; ইমাম বুখারী প্রণীত ‘আল-সহীহ’: কিতাবুল হজ্জ্ব, ‘রামল যেভাবে সূচিত হয়’ শীর্ষক অধ্যায়, ২:৫৮১ #১৫২৫; ইমাম আহমদ ইবনে হাম্বল রচিত ‘আল-মুসনাদ’, ১:২৯৪; এবং ইমাম বায়হাক্বী লিখিত ‘আল-সুনান আল-কুবরা’, ৫:৮২ #৯০৫৬]

. হযরত আবদুল্লাহ ইবনে আব্বাস (রা:) আরেকটি রওয়ায়াতে স্পষ্টভাবে বলেন, রাসূলুল্লাহ (দ:) কা’বা ঘরের চারদিক দ্রুত হেঁটে প্রদক্ষিণ (তাওয়াফ) করেন এবং আল-সাফাআল-মারওয়া’র মধ্যবর্তী স্থানে (জোরে) সাঈ করেন, যাতে তিনি তাঁর দৈহিক শক্তি মুশরিকদের দেখাতে সক্ষম হন। [আল-বুখারী কৃত ‘আল-সহীহ’: কিতাবুল হাজ্জ্ব, ‘সাফা ও মারওয়া’র মধ্যবর্তী স্থানে সাঈ সম্পর্কে যা যা বর্ণিত’ শীর্ষক অধ্যায়, ২:৫৯৪ #১৫৬২; মুসলিম প্রণীত ‘সহীহ’: কিতাবুল হজ্জ্ব, ‘উমরা‘র তাওয়াফ ও হজ্জ্বের প্রথম তাওয়াফে রামলের বাঞ্ছনীয়তা’ অধ্যায়, ২:৯২৩ #১২৬৬; আল-তিরমিযী রচিত ‘আল-জামেউস্ সহীহ’: কিতাবুল হজ্জ্ব, ‘সাফা ও মারওয়া’র মধ্যবর্তী স্থানে সাঈ সম্পর্কে যা যা বর্ণিত’ শীর্ষক অধ্যায়, ৩:২১৭ #৮৬৩; আল-নাসাঈ লিখিত ‘আল-সুনান আল-কুবরা’, ২:৪০৫ #৩৯৪১; আল-হুমায়দী কৃত ‘আল-মুসনাদ, ১:২৩২ #৪৯৭; এবং আল-বায়হাক্বী প্রণীত ‘অাল-সুনান আল-কুবরা’, ৫:৮২ #৯০৫৭-৫৮]

. আবূ তোফায়ল আমির বিন ওয়া’সিলা হযরত আবদুল্লাহ ইবনে আব্বাস (রা:) হতে বর্ণনা করেন যে মহানবী (দ:) মক্কা মোয়াযযমায় প্রবেশ করলে অবিশ্বাসীরা বলে, ‘মুহাম্মদ (সাল্লাল্লাহু আলাইহে ওয়া সাল্লাম) ও তাঁর সাথীবৃন্দ ক্ষীণকায় হওয়ার দরুন কা’বা ঘরের তাওয়াফ করতে অক্ষম’। মুশরিকবর্গ তাঁর প্রতি হিংসাবোধ করতে থাকে। এমতাবস্থায় রাসূলুল্লাহ (দ:) সাহাবা (রা:)-বৃন্দকে তওয়াফের প্রথম তিনবার রামল এবং পরবর্তী চারবার হাঁটতে নির্দেশ দেন। [মুসলিম রচিত ‘সহীহ’: কিতাবুল হাজ্জ্ব, ‘উমরা’র তাওয়াফ ও হজ্জ্বের প্রথম তওয়াফে রামলের বাঞ্ছনীয়তা’ শীর্ষক অধ্যায়, ২:৯২১-৯২২ #১২৬৪; ইবনে হিব্বান লিখিত ‘সহীহ’, ৯:১৫৪ #৩৮৪৫; এবং আল-বায়হাক্বী প্রণীত ‘আল-সুনান আল-কুবরা’, ৫:৮২ #৯০৫৭-৯০৫৮]

১.১২ ইদতিবা’: সর্বশেষ নবী (দ:)-এর সুন্নাহ

তাওয়াফ পালনকালে এহরাম-এর কাপড় ডান হাতের বগলের নিচে গোঁজা এবং এর উভয় প্রান্ত বাম কাঁধের ওপরে স্থাপন করাকেই ইদতিবা’ বলে। [ইবনে মানযূর রচিত ‘লিসা’ন আল-আরব’, ৮:২১৬]

আমরা ইতিপূর্বে ব্যাখ্যা করেছি যে, মহাসম্মানিত পয়গম্বর (সাল্লাল্লাহু আলাইহে ওয়া সাল্লাম) (শারীরিক) শক্তি ও সম্ভ্রম-জাগানোর এক প্রদর্শনী দিতে নিজ মহান সাহাবা (রা:)-বৃন্দকে রামল পালন করতে আদেশ করেছিলেন। এর পাশাপাশি তিনি তাওয়াফ পালনকালে এদতেবা’ পালনেরও নির্দেশ দেন, যার নজির তিনি-ই সর্বপ্রথমে স্থাপন করেন (এবং সাহাবা (রা:)-বৃন্দকে এতে নেতৃত্ব দেন)। হজ্জ্বউমরা’র উদ্দেশ্যে যেসব হাজ্বী সাহেব/সাহেবা সফর করেন, তাঁদের জন্যে এই প্রিয় সুন্নাহ’কে আঁকড়ে ধরা বাধ্যতামূলক। হাজ্বীবৃন্দ তাঁদের প্রিয়নবী (দ:)-এর অনুশীলিত এই রীতির স্মারক উদযাপন করে থাকেন।

. হযরত আবদুল্লাহ ইবনে আব্বাস (রা:) বলেন, রাসূলুল্লাহ (দ:) ও তাঁর সাহাবা (রা:)-বৃন্দ ‘জি’রা’না হতে উমরা পালন করতেন। তাঁরা কা’বা ঘরের চারদিকে রামল পালন করতেন এবং নিজেদের (এহরামের) কাপড় (ডান) হাতের বগলের নিচে গুঁজে অপর প্রান্ত বাম কাঁধের ওপরে ছেড়ে দিতেন। [আবূ দাউদ রচিত ‘আল-সুনান’: কিতাবুল মানা’সিক (হজ্বের রীতিনীতিসম্পর্কিত বই), ‘তাওয়াফ পালনকালে এদতেবা’ শীর্ষক অধ্যায়, ২:১৭৭ #১৮৮৪; আহমদ বিন হাম্বল প্রণীত ‘আল-মুসনাদ, ১:৩০৬; আল-তাবারা’নী কৃত ‘আল-মু’জাম আল-কবীর, ১২:৬২ #১২,৪৭৮; বায়হাক্বী লিখিত ‘আল-সুনান আল-কুবরা’, ৫:৭৯ #৯০৩৮-৯০৩৯; এবং আল-মাক্বদাসী রচিত ‘আল-আহা’দীস আল-মুখতা’রা, ১০:২০৭-২০৮ #২১৩-২১৫]

. এয়া’লা বিন উমাইয়া (রা:) বলেন, মহানবী (দ:) সবুজ (এহরামের) কাগড় পরা অবস্থায় এদতেবা’ সহকারে তাওয়াফ পালন করেন। [আবূ দাউদ প্রণীত ‘আল-সুনান’: কিতাবুল মানা’সিক, ‘তাওয়াফ পালনকালে এদতেবা’ শীর্ষক অধ্যায়, ২:১৭৭ #১৮৮৩; আল-তিরমিযী কৃত ‘আল-জামে’ আল-সহীহ’: কিতাবুল হজ্জ্ব, ‘মহানবী (দ:)-এর এদতেবা’ সহকারে তাওয়াফ পালন সম্পর্কে যা যা বর্ণিত’ শীর্ষক অধ্যায়, ৩:২১৪ #৮৫৯; ইবনে মা’জাহ রচিত ‘আল-সুনান: কিতাবুল মানা’সিক, ‘এদতেবা’ শীর্ষক অধ্যায়, ২:৯৮৪ #২৯৫৪; আল-দা’রিমী লিখিত ‘আল-সুনান, ২:৬৫ #১৮৪৩; এবং আল-বায়হাক্বী প্রণীত ‘আল-সুনান আল-কুবরা’, ৫:৭৯ #৯০৩৫]

. আল-তিবী (রহ:) এদতেবা’র অন্তর্নিহিত প্রজ্ঞা ব্যাখ্যাকালে বলেন, এটা স্রেফ সাহসের নিদর্শনস্বরূপ করা হয়েছিল, ঠিক যেমনটি করা হয়েছিল তাওয়াফের সময় রামল পালনের সময়। [আযীম আবা’দী রচিত ‘আওন আল-মা’বূদ আলা’ সুনানে আবী দা’ঊদ’, ৫:২৩৬; এবং মুবা’রাকপূরী লিখিত ‘তোহফা আল-আহওয়াযী ফী শারহে জামে’ তিরমিযী’, ৩:৫০৬]

মক্কা মোয়াযযমায় কুফফার-বর্গের অস্তিত্বের সময়কাল হতে চৌদ্দ’শ বছর পরে আমাদের এই যুগেও প্রিয়নবী (দ:) ও তাঁর সাহাবা (রা:)-বৃন্দের সুন্নাহ (রীতি)-এর অনুকরণে এদতেবা’ পালন করা আমাদের জন্যে বাধ্যতামূলক করা হয়েছে। তাঁদের পদাঙ্ক অনুসরণ করে আমাদের অন্তর ও মস্তিষ্ক (আধ্যাত্মিক জ্ঞানের আলোয়) আলোকিত হয়, আর এতে আমরা ওই ধরনের মিথ্যাচারের বিরুদ্ধে আজো অটল, অবিচল থাকার প্রস্তুতিমূলক শিক্ষা পাই।

১.১৩ কালো পাথর চুম্বন: আল্লাহর প্রিয় বান্দার অনুশীলিত প্রথার স্মরণে

আল-হাজর আল-আসওয়াদ তথা কালো পাথরকে পবিত্র মনে করার কারণগুলোর মধ্যে একটি হলো, এটা জিবরাঈল ফেরেশতা (আ:) বেহেশত থেকে নিয়ে এসেছিলেন [আল-আযরাক্বী কৃত ‘আখবার মক্কা ওয়া মা’ জা’য়া ফীহা’ মিন আল-আসা’র, ১:৬২, ৬৪ এবং ৩২৫; ইবনে আবী শায়বা প্রণীত ‘আল-মুসান্নাফ’, ৩:২৭৫ #১৪,১৪৬; ইবনে আল-জা’আদ লিখিত ‘আল-মুসনাদ’, ১৪৮ পৃষ্ঠা #৯৪০; আল-ফা’কাহী রচিত ‘আখবার মক্কা ফী ক্বাদীম আল-দাহর ওয়া হাদীসিহী’, ১:৯১ #২৫; এবং আল-হায়সামী কৃত ‘মজমা’ আল-যাওয়াঈদ ওয়া মানবা’ আল-ফাওয়াঈদ’, ৩:২৪২]। সর্বশক্তিমান আল্লাহতা’লার আদেশক্রমে পয়গম্বরবৃন্দ (আলাইহিমুস্ সালাম) এই কালো পাথরকে চুম্বন করতেন এবং এসতেসলা’ম তথা সম্ভাষণ জানাতেন। সর্বশেষ নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহে ওয়া সাল্লাম আপন পূর্বসূরী পয়গম্বর ইবরাহীম আলাইহিস্ সালামের সুন্নাহ তথা রীতি অনুসরণ করে নিজ পবিত্র হাত মোবারক দ্বারা কালো পাথরটিকে তার নির্ধারিত স্থানে বসিয়ে দেন এবং নিজের পবিত্র ঠোঁট দ্বারা চুম্বন করেন। এরই ফলশ্রুতিতে এটা হজ্জ্বের একটি প্রথায় পরিণত হয়। আজকে ঈমানদারবৃন্দ এই পাথরকে চুম্বন করার একমাত্র কারণ হচ্ছে মহানবী (দ:) এটাকে চুমো দিয়েছিলেন।

এই বাস্তবতা (খলীফা) হযরত উমর ফারূক (রা:)-এর বক্তব্য দ্বারা পরিস্ফুট হয়, যিনি একবার তাওয়াফ পালনকালে হজরে আসওয়াদের সামনে দাঁড়িয়ে বলেছিলেন, “আমি ভালো করেই জানি তুমি স্রেফ একটি পাথর। তুমি কারো উপকার বা ক্ষতি করতে অক্ষম। (খোদ) রাসূলুল্লাহ (দ:) তোমাকে চুম্বন করেছেন, এমনটি যদি আমি না দেখতাম, তাহলে কখনোই আমি এরকম করতাম না।” [আল-বুখারী প্রণীত ‘সহীহ: কিতা’ব আল-হজ্জ্ব’, ‘কালো পাথর সম্পর্কে যা উল্লেখিত হয়েছে’ শীর্ষক অধ্যায়, ২:৫৭৯ #১৫২০; আল-বুখারী কৃত ‘আল-সহীহ: কিতা’ব আল-হজ্জ্ব’, ’হজ্জ্ব ও উমরা’য় পালিত রামল’ শীর্ষক অধ্যায়, ২:৫৮২ #১৫২৮; আল-বুখারী রচিত ‘সহীহ: কিতা’ব আল-হাজ্জ্ব’, কালো পাথর চুম্বন’ শীর্ষক অধ্যায়, ২:৫৮৩ #১৫৩২; মুসলিম লিখিত ‘সহীহ: কিতা’ব আল-হজ্জ্ব’, ‘তাওয়াফ পালনকালে কালো পাথর চুম্বনের বাঞ্ছনীয়তা’ শীর্ষক অধ্যায়, ২:৯২৫ #১২৭০; ইবনে মা’জাহ প্রণীত ‘আল-সুনান: কিতা’ব আল-মানা’সিক’, ‘কালো পাথরের প্রতি সম্ভাষণ’ শীর্ষক অধ্যায়, ২:৯৮১ #২৯৪৩; আল-নাসাঈ কৃত ‘আল-সুনান আল-কুবরা’, ২:৪০০ #৩৯১৮; এবং আহমদ ইবনে হাম্বল রচিত ‘আল-মুসনাদ’, ১:৪৬ #৩২৫]

অপর এক বর্ণনায় হযরত উমর ফারূক (রা:) বলেন, “তুমি নিতান্ত-ই একটি পাথর মাত্র। রাসূলুল্লাহ (দ:) তোমাকে চুম্বন করেছেন, এমনটি না দেখলে আমি কখনো এরকম করতাম না।।” [ইমাম মালেক কৃত ‘মোওয়াত্তা: কিতা’ব আল-হজ্জ্ব’, ‘সম্ভাষণের সময় হজরে আসওয়াদের কোণা চুম্বন’ শীর্ষক অধ্যায়, ১:৩৬৭ #৮১৮; এবং আহমদ ইবনে হাম্বল রচিত ‘আল-মুসনাদ’, ১:৫৩ #৩৮০]

এই কথা বলার পর হযরত উমর ফারূক (রা:) কালো পাথরকে চুম্বন করতে অগ্রসর হন। ঘটনাটি এ বাস্তবতাকে পরিস্ফুট করে যে মহান সাহাবা-এ-কেরাম (রা:) কালো পাথরকে চুমো খেতেন মহানবী (দ:)-এর পদাঙ্ক অনুসরণেরই উদ্দেশ্যে; এটা ছিল তাঁদের জন্যে (হুযূর পাককে) স্মরণ করার খাতিরেই একটি অনুশীলিত রীতি। আর শেষ বিচার দিবস অবধি এই সুন্নাহ তথা রীতি বাক্বি বা অবশিষ্ট (মানে টিকে) থাকবে।

১: ১৪ মাক্বামে ইবরাহীম: পয়গম্বর ইবরাহীম (আ:)-এর স্মরণে

মাক্বাম (মর্যাদাপূর্ণ স্থান) বলতে (আরবী) ভাষাবিদ্যায় এমন এক স্থানকে বোঝানো হয়, যেখানে কারো পা স্থাপিত হয়েছে [আল-ফারা’হীদী কৃত ‘কিতা’ব আল-’আইন’, ৫:২৩২; ফায়রূয আবা’দী প্রণীত ‘আল-ক্বা’মূস আল-মুহীত’, ৪:১৭০; ইবনে মানযূর রচিত ‘লিসা’ন আল-’আরব’, ১২:৪৯৮; এবং আল-যাবীদী লিখিত ‘তা’জ আল-উরূস’ মিন জওয়া’হির আল-ক্বা’মূস’, ১৭:৫৯২]মাক্বাম-এ-ইবরাহীম সম্পর্কে বিভিন্ন মত বিদ্যমান। উলামাবৃন্দ ও মুফাসসিরীন-মণ্ডলী [সর্ব-হযরত জাবের ইবনে আব্দিল্লাহ (রা:), আবদুল্লাহ ইবনে আব্বাস (রা:), ক্বাতাদা (রা:) প্রমুখের মতামতের ভিত্তিতে] বিশ্বাস পোষণ করেন যে ‘মাক্বাম-এ-ইবরাহীম’ হচ্ছে এই স্থানে অবস্থিত পাথরটির নাম। এখানে দুই রাক’আত নামায আদায় করা হয়ে থাকে। এটাই সবচেয়ে নির্ভরযোগ্য মত। [আল-তাবারী প্রণীত ‘জামেউল বয়া’ন ফী তাফসীরিল ক্বুরআ’ন’, ১:৫৩৭; আল-ক্বুরতুবী রচিত ‘আল-জামে’ লি-আহকা’ম আল-ক্বুরআ’ন’, ২:১১২; আল-রা’যী কৃত ‘আল-তাফসীর আল-কবীর’, ৪:৪৫; আল-আলূসী লিখিত ‘রূহুল মা’আনী ফী তাফসীর আল-ক্বুরআ’ন ওয়া সাব’ আল-মাসা’নী’, ১:৩৭৯; এবং আল-আসক্বালা’নী প্রণীত ‘ফাতহুল বা’রী’, ১:৪৯৯]

ইমাম বুখারী (১৯৪-২৫৬ হিজরী) বর্ণিত একটি হাদীসে ওপরের বিষয়টি সম্পর্কে ব্যাখ্যা করা হয়েছে এ মর্মে যে, কা’বা শরীফ নির্মাণের সময় পয়গম্বর ইসমাঈল (আ:) পাথরগুলো জড়ো করতে থাকেন, আর পয়গম্বর ইবরাহীম (আ:) দেয়ালগুলো দাঁড় করাতে থাকেন। দেয়ালগুলো যখন বেশ উঁচু হয়, তখন পয়গম্বর ইবরাহীম (আ:) এই পাথরটির (মাক্বামে ইবরাহীম) ওপর ওঠে দাঁড়ান যাতে শীর্ষদেশে পৌঁছে ইমারতটির নির্মাণ সুসম্পন্ন করা যায়। [আল-বুখারী রচিত ‘সহীহ: কিতা’ব আল-আম্বিয়া’, দ্রুত ফেরত যাওয়া: তাড়াতাড়ি হাঁটা’ শীর্ষক অধ্যায়, ৩:১২৩৫ #৩১৮৪; আবদুর রাযযাক্ব প্রণীত ‘আল-মুসান্নাফ’, ৫:১১০ #৯১০৭; আল-তাবারী কৃত ‘জামেউল বয়া’ন ফী তাফসীরিল ক্বুরআ’ন’, ১:৫৫০; ইবনে কাসীর লিখিত ‘আল-তাফসীর আল-ক্বুরআ’ন আল-আযীম’, ১:১৭৮; এবং আল-ক্বাযউইনী রচিত ‘আল-তাদউয়ীন ফী আখবা’র ক্বাযউয়ীন’, ১:১০৫]

অপর এক রওয়ায়াতে বিবৃত হয় যে, পয়গম্বর ইসমাঈল (আ:)-এর আনা পাথরগুলো বহন করা যখনই পয়গম্বর ইবরাহীম (আ:)-এর জন্যে কষ্টসাধ্য হতো, তৎক্ষণাৎ তিনি মাক্বামে ইবরাহীমের ওপর ওঠে দাঁড়াতেন এবং সেটা তাঁকে মাটি থেকে ওপরে তুলে ইমারতটির চারপাশ ঘুরিয়ে আনতো, যতোক্ষণ না কা’বা শরীফ নির্মাণ সুসম্পন্ন হয়। [আল-আযরাক্বী লিখিত ‘আখবা’র মক্কা ওয়া মা’ জা’য়া ফীহা’ মিন আল-আসা’র’, ১:৫৮ ও ২:৩৩]

হযরত আনাস (রা:) বর্ণনা করেন যে হযরত উমর ফারূক (রা:) রাসূলুল্লাহ (দ:)-এর কাছে আরয করেন, “এয়া রাসূলাল্লাহ (দ:)! আপনি যদি মাক্বাম-এ-ইবরাহীমকে সালা’ত বা নামাযের স্থান হিসেবে গ্রহণ করতেন!” অতঃপর আয়াতে করীমা অবতীর্ণ হয়: “আর (বল্লাম,) ’ইবরাহীমের দাঁড়াবার স্থানকে নামাযের স্থানস্বরূপ গ্রহণ করো’। [আল-ক্বুরআন, ২:১২৫]

সর্বশক্তিমান আল্লাহতা’লার প্রিয়নবী (দ:) অবিলম্বে মাক্বামে ইবরাহীমে নামায আদায় করে এই ঐশী আজ্ঞা পালন করেন। [আল-বুখারী রচিত ‘সহীহ: কিতা’ব আল-তাফসীর’, “আল্লাহর বাণী – ‘ইবরাহীমের দাঁড়াবার স্থানকে নামাযের স্থানস্বরূপ গ্রহণ করো’” শীর্ষক অধ্যায়, ৪:১৬২৯ #৪২১৩; আল-তিরমিযী লিখিত ‘আল-জামে’ আল-সহীহ: আবওয়া’ব আল-তাফসীর’, ‘সূরা আল-বাক্বারা’ শীর্ষক অধ্যায়, ৫:২০৬ #২৯৬০; ইবনে মা’জাহ প্রণীত ‘আল-সুনান: কিতা’ব এক্বা’মা আল-সালা’হ ওয়াল-সুন্না ফীহা’, ‘ক্বিবলা’ শীর্ষক অধ্যায়, ১:৩২২ #১০০৮; আল-নাসা’ঈ কৃত ‘আল-সুনান আল-কুবরা’, ৬:২৮৯ #১০,৯৯৮; ইবনে হিব্বা’ন লিখিত ‘আল-সহীহ’, ১৫:৩১৯ #৬৮৯৬; এবং আহমদ ইবনে হাম্বল প্রণীত ‘আল-মুসনাদ’, ১:৩৬ #২৫০]

হযরত জাবের ইবনে আব্দিল্লাহ (রা:) বর্ণনা করেন: আমরা রাসূলুল্লাহ (দ:)-এর সাথে যখন কা’বা শরীফের সামনে উপস্থিত হই, তিনি তখন তাওয়াফ (তিনবার রামল ও চারবার স্বাভাবিক গতিতে) পালন করেন। এর অব্যবহিত পরেই তিনি মাক্বাম-এ-ইবরাহীমের দিকে অগ্রসর হন এবং “আর (বল্লাম,) ’ইবরাহীমের দাঁড়াবার স্থানকে নামাযের স্থানস্বরূপ গ্রহণ করো’ – ক্বুরআ’ন মজীদের এই আয়াতটি তেলাওয়াত করেন। অতঃপর তিনি কা’বা মাক্বামে ইবরাহীমের মধ্যবর্তী স্থানে দাঁড়িয়ে দুই রাকআত নামায আদায় করেন। [মুসলিম রচিত ‘সহীহ: কিতা’ব আল-হাজ্জ্ব’, ‘রাসূলুল্লাহ (দ:)-এর হজ্জ্ব’ শীর্ষক অধ্যায়, ২:৮৮৭ #১২১৮]

পয়গম্বর ইবরাহীম (আ:) যে পাথরটির ওপর দাঁড়িয়ে পবিত্র কা’বা ঘর নির্মাণ করেছিলেন, আল্লাহতা’লা তাকে এবাদতগাহ (উপাসনার স্থান) করার আদেশ দেন, যেহেতু এটা ছিল শীর্ষস্থানীয় সাহাবী (পুণ্যাত্মা) হযরত উমর ফারূক (রা:)-এর (প্রাণের) আকাঙ্ক্ষা। এই পাথরটি আশীর্বাদধন্য, কেননা এর পাশেই দাঁড়িয়ে মহানতম পয়গম্বর সাল্লাল্লাহু আলাইহে ওয়া সাল্লাম নামায পড়েন। শেষ বিচার দিবস পর্যন্ত পৃথিবীতে যতো হাজ্বী সাহেবান কা’বা শরীফের তাওয়াফ করবেন, তাঁদের জন্যে মাক্বামে ইবরাহীমের পাশে দুই রাকআত নামায আদায় করা ওয়া’জিব (বাধ্যতামূলক) হবে; এতে ব্যর্থ হলে তাওয়াফ পালন অসম্পূর্ণ থেকে যাবে। অবশ্য কোনো স্থান সংকুলান না হলে অন্যত্র নামায পড়ার অনুমতি আছে, যদিও ওই মাক্বামের কাছে নামায পড়াটা প্রশংসনীয় বলে সাব্যস্ত হয়েছে। [আল-সারখাসী লিখিত ‘কিতা’ব আল-মাবসূত’, ৪:১২; আল-কা’সা’নী রচিত ‘বাদা’ঈ আল-সানা’ঈ ফী তারতীব আল-শারা’ঈ’, ২:১৪৮; আল-সামারক্বান্দী কৃত ‘তোহফা আল-ফুক্বাহা’, ১:৪০২; এবং ইবনে নুজাইম প্রণীত ‘আল-বাহর আল–রা’ইক্ব শারহে কানয আল-দাক্বা’ইক্ব’, ২:৩৫৬]

যেহেতু পয়গম্বর ইবরাহীম (আ:)-এর পবিত্র পদচিহ্ন মাক্বামে ইবরাহীম পাথরটির ওপর অঙ্কিত রয়েছে, সেহেতু কা’বা ঘর নির্মাণে তাঁর কর্মপ্রয়াসের স্মরণে মুসলমান সমাজ চিরকাল এটাকে শ্রদ্ধা করবেন এবং এর পাশে নফল নামায-ও আদায় করবেন।

১:১৫ সাফা ও মারওয়া’র সাঈ: হযরত মা হাজেরের সুন্নাহর স্মরণে

আল্লাহতা’লার পছন্দকৃত বান্দাদের এমন কিছু কাজ বিদ্যমান, যেগুলো দৃশ্যতঃ এবাদত-বন্দেগীর মতো দেখায় না এবং এবাদতের নিয়্যতেও সেগুলো পালিত হয়নি, কিন্তু মহান আল্লাহ পাক সেগুলোকে মহামূল্যবান বিবেচনা করে সংরক্ষণ করেছেন এমনভাবে যে, তিনি সেগুলোকে একটি সামষ্টিক এবাদতের অংশ হিসেবেই ঘোষণা করেছেন।

এর একটি (উৎকৃষ্ট) উদাহরণ হলো মা হাজেরা (রা:)-এর ঘটনাটি, যেখানে তিনি তাঁর শিশুপুত্র পয়গম্বর ইসমাঈল (আ:)-এর জন্যে পানির তালাশে মরিয়া হয়ে আল-সাফা’আল-মারওয়ার মধ্যবর্তী স্থানে ছুটোছুটি করেছিলেন। আল্লাহতা’লা তাঁর এই কাজটিকে এতো-ই পছন্দ করেন যে তিনি এ মর্মে আদেশ জারি করেন যেন হাজ্বী সাহেবান হজ্জ্বের অঙ্গ হিসেবে ওই দুটো পাহাড়ের মাঝখানে একইভাবে দ্রুত চলাচল করেন। এর পরিভাষাগত শব্দ হচ্ছে সা’ঈ। হজ্জ্ব ও উমরা উভয় ক্ষেত্রেই সা’ঈ ওয়া’জিব তথা অবশ্যকর্তব্য।

মনে রাখতে হবে যে সাতবার সা’ঈ পালনকালে সুনির্দিষ্ট কোনো ক্বুরআ’ন মজীদের আয়াত তেলাওয়াত কিংবা কোনো যিকর পাঠ নির্ধারণ করা হয়নি। যার যেমন ইচ্ছে সে মোতাবেক ক্বুরআ’ন মজীদের যে কোনো আয়াত তেলাওয়াত করার অনুমতি আছে; আর মহানবী (দ:)-এর প্রতি সালাত-সালাম প্রেরণ-ও জায়েয। মুখস্থ কিছু জানা না থাকলেও আল্লাহতা’লার মহিমাপূর্ণ নামগুলো জপা কিংবা বিশ্বাসসংক্রান্ত কলেমা-বাক্য মুখে আওড়ানোই যথেষ্ট হবে। নতুবা স্রেফ নিশ্চুপ থেকেও সা’ঈ সুসম্পন্ন করা বৈধ।

ইমাম বুখারী (১৯৪-২৫৬ হিজরী) ও অসংখ্য হাদীসশাস্ত্র বিশারদ এবং তাফসীরবিদ আল-সাফা আল-মারওয়া’র তাৎপর্যপূর্ণ ঘটনার সাথে সম্পর্কিত বেশ কিছু আহাদীস রওয়ায়াত লিপিবদ্ধ করেছেন। এর একটি নমুনা নিম্নরূপ:

হযরত আবদুল্লাহ ইবনে আব্বাস (রা:) বলেন যে পয়গম্বর ইবরাহীম (আ:) মা হাজেরা (রা:) ও (তাঁর শিশুপুত্র) পয়গম্বর ইসমাঈল (আ:)-কে সিরিয়া হতে মক্কা মোয়াযযমায় নিয়ে যান। ওই সময় নগরীটি বসতিহীন ছিল এবং পানির উৎস-ও দৃশ্যমান ছিল না। পয়গম্বর ইবরাহীম (আ:) তাঁর স্ত্রী ও পুত্রকে আল্লাহর ঘরের পাশে রেখে তাঁদের কাছে কিছু খেজুর ও পানির মওজূদ জমা দিয়ে বিদায় নিতে গেলে মা হাজেরা (রা:) বেদনার্তস্বরে বলেন, ‘কোথায় যাচ্ছেন আপনি, ইবরাহীম?’ আপনি কি আমাদেরকে এই বিরাণ মরু-উপত্যকায় রেখে চলে যাচ্ছেন?’ তিনি এই প্রশ্নটি বারংবার করতে থাকেন। কিন্তু পয়গম্বর ইবরাহীম (আ:) তাঁর দিকে পেছন ফিরে তাকাননি। এমতাবস্থায় মা হাজেরা (রা:) জিজ্ঞেস করেন, ‘মহান আল্লাহতা’লা আপনাকে আদেশ করার কারণেই কি আপনি আমাদেরকে এখানে ছেড়ে যাচ্ছেন?’ তিনি এর প্রতি হাঁ-সূচক উত্তর দেন। অতঃপর মা হাজেরা (রা:) বলেন, ‘এ-ই যদি অবস্থা হয়, তাহলে আল্লাহতা’লা আমাদেরকে পরিত্যাগ করবেন না।’

এরপর মা হাজেরা (রা:) ওই স্থানেই বসে থাকেন যতোক্ষণ না পয়গম্বর ইবরাহীম (আ:) তাঁর যাত্রায় দৃষ্টির বাইরে চলে যান। তিনি যখন ‘সানিয়্যা’ নামের একটি জায়গায় পৌঁছেন, তখন দুই হাত তুলে মোনাজাত করেন:

“হে আমার রব্ব! আমি আমার কিছু বংশধরকে (মানে মা হাজেরা ও পুত্র পয়গম্বর ইসমাঈল এবং পুত্রের অনাগত বংশধরদের) এমন এক উপত্যকায় বসতি স্থাপন করালাম, যেখানে ক্ষেত হয় না এবং যে স্থানটি আপনারই সম্মানিত ঘরের সন্নিকটে; হে আমাদের রব্ব! (এটা) এই জন্যে যে তারা নামায ক্বায়েম রাখবে। অতঃপর আপনি কিছু মানুষের অন্তরকে তাদের দিকে অনুরাগী করে দিন এবং তাদেরকে কিছু ফলমূল খেতে দিন; হয়তো তারা কৃতজ্ঞতা প্রকাশ করবে।” [আল-ক্বুরআ’ন, ১৪:৩৭; মুফতী আহমদ এয়ার খান (রহ:) প্রণীত নূরুল এরফান]

হযরত আবদুল্লাহ ইবনে আব্বাস (রা:) বর্ণনা করেন, মা হাজেরা (রা:) তাঁর শিশু পুত্রকে বুকের দুধ খাওয়াতে আরম্ভ করেন এবং পানির মওজূদ হতে পান করতে থাকেন যতোক্ষণ না পাত্রের জল ফুরিয়ে যায়। এরপর তিনি ও তাঁর শিশু তৃষ্ণার্ত হন। মা হাজেরা (রা:) লক্ষ্য করেন যে তাঁর শিশুপুত্র বেজায় তৃষ্ণার্ত হয়ে কাতরাচ্ছেন এবং এর দরুন মাটিতে পা দ্বারা আঘাত করছেন। তিনি শিশুর এই অবস্থা আর সহ্য করতে পারেননি। আল-সাফা ছিল সবচেয়ে কাছে অবস্থিত পাহাড়। তাই তিনি তাতে আরোহণ করে উপত্যকার ওপারে মানুষজনের খোঁজ করেন। কাউকে না পেয়ে তিনি এরপর উপত্যকা অতিক্রম করে আল-মারওয়া পাহাড়ে ওঠেন। এরকম তিনি সাতবার করেন।

হযরত আবদুল্লাহ ইবনে আব্বাস (রা:) বর্ণনা করেন যে মহা্নবী (দ:) এরশাদ ফরমান: এই দুটো পাহড়ের মধ্যবর্তী স্থানে মানুষের সা’ঈ করার কারণ এটাই। [আল-বুখারী রচিত ‘আল-সহীহ: কিতা’ব আল-আম্বিয়া’, “আল্লাহর বাণী – ‘ইবরাহীমের দাঁড়াবার স্থানকে নামাযের স্থানস্বরূপ গ্রহণ করো’” শীর্ষক অধ্যায়, ৩:১২২৮-১২২৯ #৩১৮৪; অাল-নাসা’ঈ লিখিত ‘আল-সুনান আল-কুবরা’, ৫:১০০ #৮৩৭৯; আবদুর রাযযাক্ব কৃত আল-মুসান্নাফ, ৫:১০৫-১০৬ #৯১০৭; আল-বায়হাক্বী প্রণীত ‘আল-সুনান আল-কুবরা’, ৫:১০০ #৮৩৭৯; আল-নাসা’ঈ লিখিত ‘ফাযা’ইলে সাহা’বা’, ১:৮২ #২৭৩; আল-ক্বুরতুবী রচিত ‘আল-জামে’ লি-আহকা’ম আল-ক্বুরআ’ন’, ৯:৩৬৮-৩৬৯; এবং ইবনে কাসীর কৃত ‘আল-তাফসীর আল-ক্বুরআ’ন আল-আযীম’, ১:১৭৭]

মহান আল্লাহ পাক তাঁর প্রিয় বান্দীর ধার্মিকতা এতোই সযত্নে লালন করেন যে তিনি একে তাঁর নিদর্শন হিসেবে গ্রহণ করেন। তিনি এরশাদ ফরমান:

“নিশ্চয় সাফা ও মারওয়া আল্লাহর নিদর্শনগুলোর অন্তর্ভুক্ত।” [আল-ক্বুরআ’ন, ২:১৫৮]

এই ঘটনা আনুমানিক চার হাজার বছর আগে ঘটেছিল। ওই উপত্যকা ও পাহাড়গুলো তাদের মৌলিক আকৃতিতে এখন আর বিরাজ করছে ন। আর খোদাতা’লার প্রিয় বান্দীর শঙ্কাও বর্তমানে অস্তিত্বশীল নেই। তথাপিও হাজ্বী সাহেবান আল্লাহতা’লার আদিষ্ট দুই পাহাড়ের মাঝে সা’ঈ পালন করে থাকেন। এসব কিছুই মা হাজেরা (রা:) কর্তৃক তাঁর পুত্র পয়গম্বর ইসমাঈল (আ:)-এর প্রতি অনুভূত উদ্বেগ-উৎকণ্ঠা এবং তাঁরই অস্বস্তিকর ও পেরেশানি অবস্থার স্মরণার্থে করা হয়।

১:১৫.১ যমযম কূপ: নামের উৎপত্তির কারণ

পয়গম্বর ইসমাঈল (আ:) তীব্র তেষ্টাবোধের কারণে মাটিতে পা দ্বারা আঘাত করলে সেখান থেকে পানির নহর প্রবাহিত হয়। মা হাজেরা (রা:) এতো জোরে পানির স্রোত বইতে শুরু করায় আশঙ্কা করেন যে হয়তো পয়গম্বর ইসমাঈল (আ:)-এর এতে ক্ষতি হতে পারে। তাই তিনি উচ্চস্বরে বলেন, ‘যাম যাম’ (থামো, থামো)! এমতাবস্থায় জলপ্রবাহের মাত্রা স্বাভাবিক হয়ে যায়। এ কারণেই অদ্যাবধি এই পানির উৎসকে যমযম নামে অভিহিত করা হয়।

সহস্র সহস্র বছর যাবত প্রবাহিত যমযম কূপের পানি হাজ্বী সাহেবানদের জন্যে এক ঐশী দান বটে। এই পানি ওযূ অবস্থায় ক্বিবলা তথা কা’বার দিকে মুখ করে দাঁড়িয়ে পান করাটা প্রথাসিদ্ধ; পয়গম্বর ইসমাঈল (আ:)-এর সাথে এর সম্পৃক্ততার দরুন-ই এই বিশেষ বিধান জারি করা হয় [আল-বুখারী রচিত ‘আল-সহীহ: কিতা’ব আল-হজ্জ্ব’, ‘যমযম সম্পর্কে বর্ণিত বিষয়াদি’ শীর্ষক অধ্যায়, ২:৫৯০ #১৫৫৬; আল-বুখারী কৃত ‘আল-সহীহ: কিতা’ব আল-আশরিবা’, দাঁড়িয়ে পান করা’ শীর্ষক অধ্যায়, ৫:২১৩০ #৫২৯৪; মুসলিম প্রণীত ‘আল-সহীহ: কিতা’ব আল-আশরিবা’, দাঁড়িয়ে যমযমের পানি পান’ শীর্ষক অধ্যায়, ৩: ১৬০১-১৬০২ #২০২৭; এবং আল-আইনী লিখিত ‘উমদাত আল-ক্বা’রী শারহে সহীহ আল-বুখারী’, ৯:২৭৭]। বস্তুতঃ যমযম হচ্ছে ধরণীর বুকে সেরা (পানীয়) জল, আর এতে অনেক রোগের আরোগ্য-ও রয়েছে নিহিত।

ওপরোক্ত বিষয়গুলো প্রমাণ করে যে দ্বীন-ইসলাম কেবল অতীতের ঘটনাবলী স্মরণ-ই করে না, বরঞ্চ বিশেষ বিশেষ পরিস্থিতিতে সেগুলোর উদযাপনকে বাধ্যতামূলক-ও করে দেয়। মওলিদুন্নবী (দ:)-কে ওই একই আঙ্গিক বা দৃষ্টিকোণ্ থেকে দেখতে বা মূল্যায়ন করতে হবে। হযরতে মুহাম্মাদুর রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহে ওয়া সাল্লাম হলেন বিশ্বজগতের জন্যে খোদাতা’লার করুণা, দয়া ও আশীর্বাদের সেরা উৎস। মওলিদুন্নবী (দ:)-তে কৃতজ্ঞতা প্রকাশ, যা দ্বারা তাঁর প্রতি প্রত্যেকের ভালোবাসা ও আনুগত্য সুদৃঢ় হয়, তা-ই এ উদযাপনের ভিত্তিমূল।

১.১৬ আরাফাত, মুযদালিফা ও মিনা: পয়গম্বর আদম (আ:)-এর স্মরণে

প্রতি যিলহজ্জ মাসের নবম দিবসে হাজ্বী সাহেবান আরাফা’ ময়দানে অবস্থান করেন। লক্ষণীয় যে, সুনির্দিষ্ট কোনো এবাদত-বন্দেগীর আদেশ এখানে দেয়া হয়নি। আরাফাতে স্রেফ উপস্থিত থাকাটাই হজ্জ্বের অবশ্য পালনীয় শর্ত পূরণের জন্যে যথেষ্ট। আরাফাত আমাদেরকে পয়গম্বর আদম (আ:) ও মা হাওয়া (রা:)-এর পুনর্মিলিত হওয়ার কথা স্মরণ করিয়ে দেয়, যেটা ৯ই যিলহাজ্ব তারিখে ঘটেছিল; ঠিক যেমনটি এক রওয়ায়াতে প্রমাণিত হয় –

. হযরত আবদুল্লাহ ইবনে আব্বাস (রা:) বলেন: পয়গম্বর আদম (আ:) ভারতে অবতরণ করেন, আর মা হাওয়া (রা:) জেদ্দায়। বাবা আদম (আ:) তাঁর স্ত্রীর খোঁজ করতে থাকেন যতোক্ষণ না তাঁরা অবশেষে একে অপরের দেখা পান। মা হাওয়া (রা:) তাঁর কাছে আসেন, যার দরুন তাঁকে ‘মুযদালিফা’ তথা ‘(বাবা আদমের) নিকটে গমনকারিনী’ নামে অভিহিত করা হয়। স্বামী ও স্ত্রী পরস্পর পরস্পরকে ‘আরাফাতে’ চিনতে পারেন, তাই এর নাম আরাফাত (অর্থাৎ, যেখানে একে অপরকে চিনতে পারেন)। তাঁরা জাম’-এ পুনর্মিলিত হন, সে মোতাবেক-ই এর নামকরণ হয়েছে (মানে পুনর্মিলনের স্থান)। [আল-তাবারী লিখিত ‘তা’রীখ আল-উমাম ওয়াল-মুলূক’, ১:৭৯; ইবনে আল-আসীর কৃত ‘আল-কা’মিল ফী আল-তা’রীখ’, ১:৩৪; ইবনে সা’আদ প্রণীত ‘আল-তাবাক্বা’ত আল-কুবরা’, ১:৩৯; এবং ইবনে আসা’কির রচিত ‘তা’রীখ দিমাশক্ব আল-কবীর’, ৬৯:১০৯]

. পয়গম্বর আদম (আ:) ভারত উপমহাদেশের ‘নাওয়ায’ নামের এক পাহাড়ে অবতরণ করেন, আর মা হাওয়া (রা:)-কে জেদ্দায় প্রেরণ করা হয়। ইবনে সা’আদ (১৬৮-২৩০ হিজরী), আল-তাবারী (২৬৪-৩১০ হিজরী) ও ইমাম নববী (৬৩১-৬৭৭ হিজরী) এই অভিমত পোষণ করেন যে, বাবা আদম (আ:) তাঁর স্ত্রীর সাথে আবার মিলিত হন আরাফাত নামের স্থানে, যার দরুন এই নামকরণ হয়েছে। [আল-তাবারী প্রণীত ‘তা’রীখ আল-উমাম ওয়াল-মুলূক’, ১:৭৯; ইবনে সা’আদ কৃত ‘আল-তাবাক্বা’ত আল-কুবরা’, ১:৩৫-৩৬; এবং আল-নববী রচিত ‘তাহযীব আল-আসমা’ ওয়াল-লুগা’ত’, ৩:২৩৭]

. আল-ক্বুরতুবী (২৮৪-৩৮০ হিজরী) নিজ ‘আল-জামে’ লি-আহকা’ম আল-ক্বুরআ’ন’ গ্রন্থে লেখেন: পয়গম্বর আদম (আ:) ভারত উপমহাদেশে অবতরণ করেন, আর মা হাওয়া (রা:) জেদ্দায়। তাঁরা পরস্পর পরস্পরের সাক্ষাৎ পান আরাফা দিবসে আরাফা’তেরই ময়দানে। অতএব, এই দিনটি আরাফা’ নামে পরিচিত হয়, আর স্থানটি খ্যাত হয় আরাফাত নামে। এটা আল-দাহহা’কের বক্তব্য। [আল-ক্বুরতুবী প্রণীত ‘আল-জামে’ লি-আহকা’ম আল-ক্বুরআ’ন’, ২:৪১৫]

. আল-মুযদালিফা নামকরণের ব্যাপারে ইবনে হাজর আল-আসক্বালা’নী (৭৭৩-৮৫২ হিজরী), এয়া’কূত আল-হামাভী (জন্ম:৬২৬ হিজরী) এবং আল-শওকানী (১১৭৩-১২৫০ হিজরী) লেখেন: আল-মুযদালিফাকে ’জাম’ হিসেবেও অভিহিত করা হয়, কেননা বাবা আদম (আ:) সেখানেই মা হাওয়া (রা:)-এর সাথে পুনরায় মিলিত হন এবং তাঁর সান্নিধ্য পান। [আল-আসক্বালা’নী রচিত ‘ফাতহুল বা’রী’, ৩:৫২৩; এয়া’কূত আল-হামাভী কৃত ‘মু’জাম আল-বুলদা’ন’, ৫:১২১; এবং আল-শওকা’নী লিখিত ‘নায়ল আল-আওতা’র শারহ মুনতাক্বা’ আল-আখবা’র’, ১:৪২৩]

. মিনা’ নামকরণ সম্পর্কে হযরত আবদুল্লাহ ইবনে আব্বাস (রা:) বলেন: মিনা’ নামকরণ হয় যখন হযরত জিবরাঈল (আ:) পয়গম্বর আদম (আ:) হতে পৃথক হতে চান এবং তাঁকে জিজ্ঞেস করেন তিনি (বাবা আদম) কোনো কিছু কামনা করেন কি না। হযরত আদম (আ:) উত্তর দেন, ‘বেহেশত’। একারণেই এই স্থানকে মিনা’ নামে ডাকা হয় – পয়গম্বর আদম (আ:)-এর আকাঙ্ক্ষার দরুন। [আল-আযরাক্বী রচিত ‘আখবা’র মক্কা ওয়া মা’ জা’য়া ফীহা’ মিন আল-আ’সার’, ২:১৮০; আল-নববী প্রণীত ‘তাহযীব আল-আসমা’ ওয়াল-লুগা’ত’, ৩:৩৩৩; এবং আল-ক্বুরতুবী কৃত ‘আল-জামে’ লি-আহকা’ম আল-ক্বুরআ’ন’, ৩:৭]     

’রামী’ তথা পাথর নিক্ষেপের রীতির মতোই ’সা’ঈ’’তালবিয়্যা’ প্রথাগুলোও আল্লাহতা’লার নেয়ামতপ্রাপ্ত বান্দাদের সম্মানার্থে উদযাপিত আমল। অনুরূপভাবে, ‘আরাফা’ত’‘মুযদালিফা’ স্থানগুলোও সম্মানিত হয়েছে, যেহেতু বাবা আদম (আ:) ও মা হাওয়া (রা:) দীর্ঘকাল পরে সেখানে পুনরায় মিলিত হন। এখানে গুরুত্বারোপ করতে হবে যে, আক্ষরিক অর্খে ‘আরাফা’ত’ বলতে ’চেনা’কে বোঝায়, আর ‘মুযদালিফা’ মানে ’সান্নিধ্য’। মহান আল্লাহতা’লা এই অতি গুরুত্বপূর্ণ পুনর্মিলনের স্মৃতি প্রতি বছর যেলহজ্জ্ব মাসের ৯ তারিখে কীভাবে সেখানে হাজ্বী সাহেবানের উপস্থিতিকে বাধ্যতামূলক করে দিয়ে পুনর্জাগরিত করেছেন, তা গভীরভাবে ভেবে দেখুন।

১.১৭ আরাফাত ও মুযদালিফায় আদায়কৃত নামাযের একত্রীভবন: মহানবী (দ:)-এর সুন্নাহ

মুসলমানবৃন্দ আল্লাহতা’লার ইচ্ছা মোতাবেক সর্বদা নির্দিষ্ট ওয়াক্তের নামায যথাসময়ে আদায় করে থাকেন। কিন্তু (এর ব্যতিক্রমস্বরূপ) আরাফাতের ময়দানে হাজ্বী সাহেবান যোহর ও আসর ওয়াক্তের নামায একত্রে পড়েন। এটা শুধু এ কারণেই যে প্রিয়নবী (দ:) এই দুই ওয়াক্তের নামায একত্রে পড়েছিলেন; আর তাই হাজ্বী সাহেবানের প্রতি অনুরূপ রীতি পালনের (শরঈ) বিধান জারি করা হয়। একইভাবে, সূর্য ডোবার সাথে সাথে হাজ্বী সাহেবান মাগরেব ও এশা’র নামায-ও একত্রে পড়েন। তাঁরা সরাসরি নামায আদায় করেন না, বরং মুযদালিফায় না পৌঁছুনো পর্যন্ত তাঁরা অপেক্ষা করেন। এটা নিম্নের রওয়ায়াত দ্বারা সপ্রমাণিত:

. মুহাদ্দেসীনে কেরাম হযরত জাবের ইবনে আব্দিল্লাহ (রা:) হতে মহানবী (দ:)-এর বিদায়ী হজ্জ্ব সম্পর্কে একটি বিশদ বর্ণনা উদ্ধৃত করেন। তাঁরা দ্ব্যর্থহীন ভাষায় ব্যক্ত করেন যে রাসূলুল্লাহ (দ:) আরাফাত ময়দানে এক আযান ও দুই এক্বা’মত সহকারে যোহর ও আসরের নামায একত্রে আদায় করেছিলেন, আর মুযদালিফায় মাগরেব ও এ’শার নামাযের ক্ষেত্রেও একই রকম করা হয়েছিল। [মুসলিম রচিত ‘আল-সহীহ: কিতা’ব আল-হাজ্জ্ব’, ‘মহানবী (দ:)-এর হজ্জ্ব’ শীর্ষক অধ্যায়, ২:৮৮৬-৮৯২ #১২১৭; এবং আবূ দাউদ লিখিত ‘আল-সুনান: কিতা’ব আল-মানা’সিক’, রাসূলুল্লাহ (দ:)-এর হজ্জ্বের বিবরণ’ শীর্ষক অধ্যায়, ২:১৮৫ #১৯০৫]

. ইমাম জা’ফর আল-সা’দিক্ব (রহ:) তাঁর পিতা ইমাম বা’ক্বির (রহ:) হতে বর্ণনা করেন: হুযূর পূর নূর (দ:) আরাফা’তে যোহর ও আসরের নামায এক আ’যা’ন ও দুইটি এক্বা’মত সহকারে (একত্রে) আদায় করেন। তিনি উভয়ের মাঝে আল্লাহ পাকের কোনো ‘তাসবীহ’ (প্রশংসা-বাক্য) পাঠ করেননি। অতঃপর তিনি এক আ’যা’ন ও দুইটি এক্বা’মত সহকারে মাগরেব ও এ’শার নামাযও (মুযদালিফায়) আদায় করেন এবং সেখানেও তিনি উভয়ের মাঝে কোনো তাসবীহ পাঠ করেননি। [আবূ দাউদ প্রণীত ‘আল-সুনান: কিতা’ব আল-মানা’সিক’, ‘রাসূলুল্লাহ (দ:)-এর হজ্জ্বের বিবরণ’ শীর্ষক অধ্যায়, ২:১৮৬ #১৯০৬; এবং আল-বায়হাক্বী কৃত ‘আল-সুনান আল-কুবরা’, ১:৪০০ #১৭৪১]

৩. হযরত আবদুল্লাহ ইবনে মাসঊদ (রা:) বলেন: আমি কখনোই রাসূলুল্লাহ (দ:)-কে নামায তার নির্দিষ্ট ওয়াক্ত ছাড়া পড়তে দেখিনি (মানে নামায তরক করেননি); ব্যতিক্রম শুধু (হজ্জ্বের সময়) দুইটি নামায – মাগরেব ও এশা’ একত্রে আদায়। [মুসলিম রচিত ‘আল-সহীহ: কিতা’ব আল-হজ্জ্ব’, ‘মুযদালিফায় নাহর দিবসে অন্ধকার থাকতে ফজরের নামায আদায়ের বাঞ্ছনীয়তা’ শীর্ষক অধ্যায়, ২:৯৩৮ #১২৮৯; এবং আল-বুখারী লিখিত ‘আল-সহীহ: কিতা’ব আল-হাজ্জ্ব’, ‘জাম’ (মুযদালিফা)-এ ফজরের নামায পড়ার সময়’ শীর্ষক অধ্যায়, ২:৯০৪ #১৫৯৮]

ক্বুরআ’ন মজীদে যদিও নামায সুনির্দিষ্ট ওয়াক্ত অনুযায়ী আদায়ের হুকুম রয়েছে [আল-ক্বুরআ’ন ৪:১০৩], তবুও হজ্জ্বের সময় আরাফা’তমুযদালিফায় এই সাধারণ আদেশের ব্যতিক্রম করা হয়েছে। এটা প্রিয়নবী (দ:)-এর অনুশীলিত রীতির কারণেই হয়েছে।

১.১৮ পশু কুরবানি: পয়গম্বর ইসমাঈল (আ:)-এর স্মরণে

হজ্জ্বের রীতি পালন করতে হাজ্বী সাহেবান এবং পয়গম্বর ইবরাহীম (আ:)-এর সুন্নাহ’র (স্মারক) উদযাপন করতে বিশ্বব্যাপী মুসলমান সর্বসাধারণ ঈদুল আযহা’র দিন পশু কুরবানি দেন। এই কুরবানী মূলতঃ হযরত ইবরাহীম (আ:) কর্তৃক তাঁর প্রিয় পুত্র হযরত ইসমাঈল (আ:)-কে আল্লাহতা’লার রেযামন্দির খাতিরে উৎসর্গ করতে প্রস্তুত থাকারই স্মৃতিচারণমূলক আমল বা নেক কাজ। (তাঁর) এই কুরবানির এতোখানি সযত্ন মূল্যায়ন হয়েছিল যে এর ফলশ্রুতিতে প্রতি বছর হজ্জ্বে হাজ্বী সাহেবানকে একটি করে কুরবানি দিতে (খোদায়ী) নির্দেশ জারি করা হয়। শুধু হাজ্বী সাহেবান-ই নন, প্রত্যেক সামর্থ্যবান মুসলমানের প্রতিও আল্লাহতা’লার ওয়াস্তে পশু কুরবানি দেয়ার বাধ্যবাধকতা আরোপ করা হয়।

ইমাম হাসান আল-বসরী (২১-১১০ হিজরী) বলেন: পয়গম্বর ইসমাঈল (আ:)-এর পরিবর্তে ‘সাবীর’ উপত্যকায় (মক্কা পাহাড়ে) একটি বড় ও হৃষ্টপুষ্ট মদ্দা ভেড়া/দুম্বা কুরবানি দেয়া হয়। এ প্রসঙ্গে আল্লাহ এরশাদ ফরমান, “আমি তার (ইসমাঈল আলাইহিস সালামের) স্থলে উৎসর্গস্বরূপ একটি বড় (পশু) কুরবানি (গ্রহণ) করি” [আল-আয়াত]। হযরত ইসমাঈল (আ:)-এর কুরবানির পরিবর্তে ভেড়া জবাইকেই এই (ঐশী) কুরবানি নির্দেশ করেছে। এতদসত্ত্বেও শেষ বিচার দিবস অবধি প্রতি বছর পশু কুরবানি দেয়ার জন্যে এই উম্মতকে আদেশ করা হয়েছে। (ইমাম হাসান আল-বসরী এরপর শ্রোতাদের উদ্দেশ্যে বলেন) ‘ওহে মানুষ, তোমাদের জানা উচিত যে এই কুরবানি ইন্তেক্বালপ্রাপ্তদেকে ক্ষতি থেকে রক্ষা করে, আর তাই তোমাদেরও এই কুরবানি করা উচিত!’ [আল-তাবারী প্রণীত ‘তা’রীখ আল-উমাম ওয়াল মুলূক’, ১:১৬৭; আল-তাবারী কৃত ‘জামে’ আল-বয়া’ন ফী তাফসীর আল-ক্বুরআ’ন’, ২৩:৮৭-৮৮; এবং আল-ফা’কাহী রচিত ‘আখবার মক্কা ফী ক্বাদীম আল-দাহর ওয়া হাদীসিহী’, ৫:১২৪]

এই আমল (পুণ্যদায়ক কর্ম) নিঃসন্দেহে সর্ব-পয়গম্বর ইবরাহীম (আ:) ও ইসমাঈল (আ:)-এর মহা কুরবানিরই উদযাপন, যার দরুন ঈমানদারবৃন্দ প্রত্যাশা অনুযায়ী এ দ্বীনের মর্মবাণী অন্তরে ধারণ করতে পারেন এবং ফলস্বরূপ আল্লাহতা’লার রেযামন্দির খাতিরে নিজেদের জান ও মাল সমর্পণ করতে প্রস্তুত থাকেন।

১.১৮.১ কুরবানির পশু: আল্লাহর চিহ্নগুলোর একটি

সারা বিশ্বে যদিও পশু জবাই হয়ে থাকে, তবুও পয়গম্বর ইসমাঈল (আ:)-এর স্মরণে পশু কুরবানি হওয়া একটি অনন্য ঘটনা। এগুলোকে আল্লাহতা’লার ‘শ’আয়ের’ বা চিহ্ন বলা হয়েছে সুস্পষ্টভাবে। এরশাদ হয়েছে: “এবং ক্বোরবানির মোটাতাজা পশুকে আমি তোমাদের জন্যে আল্লাহর নিদর্শনসমূহের অন্যতম করেছি।” [আল-ক্বুরআ’ন, ২২:৩৬]

আজকে পয়গম্বর ইবরাহীম (আ:)-এর এই সুন্নাত পশু কুরবানি দ্বারা পুনর্যাপিত হচ্ছে। এটা একটা পুণ্যদায়ক কর্ম এবং আল্লাহতা’লার সন্তুষ্টি অর্জনের মাধ্যম।

১.১৯ কঙ্কর নিক্ষেপ প্রথা: পয়গম্বর ইবরাহীম (আ:)-এর সুন্নাহ  

হাজ্বী সাহেবান (হজ্জ্বের অংশ হিসেবে) তিন দিন মিনা’তে অবস্থান করেন এবং তাঁরা সেখানে ‘জামারা’ত’ নামে পরিচিত স্তম্ভগুলোতে কঙ্কর নিক্ষেপ করেন। এই আমলটি পয়গম্বর ইবরাহীম (আ:)-এর স্মৃতি রক্ষার্থে পালিত হয়।

হযরত আবদুল্লাহ ইবনে আব্বাস (রা:) বর্ণনা করেন রাসূলুল্লাহ (দ:)-এর হাদীস, যিনি এরশাদ ফরমান: হযরত জিবরীল আমীন (আ:) পয়গম্বর ইবরাহীম (আ:)-কে ‘জামরা আল-’আক্বাবা’য় নিয়ে গেলে সেখানে শয়তানের আবির্ভাব ঘটে। হযরত ইবরাহীম (আ:) সাতটি কঙ্কর তার দিকে ছুঁড়ে মারেন, যার দরুন শয়তান মাটিতে লুটিয়ে পড়ে। পয়গম্বর ইবরাহীম (আ:) ‘জামরা আল-উসতা’য় অগ্রসর হলে শয়তান আবারো (দ্বিতীয়বার) আবির্ভূত হয়। তিনি তার দিকে (পুনরায়) সাতটি কঙ্কর নিক্ষেপ করলে শয়তান পুনরায় মাটিতে পড়ে যায়। অতঃপর পয়গম্বর ইবরাহীম (আ:) ‘জামরা আল-ক্বুসওয়া’য় অগ্রসর হলে শয়তান আবারো (তৃতীয়বারের মতো) আবির্ভূত হয়। হযরত ইবরাহীম (আ:) পুনরায় সাতটি কঙ্কর তার দিকে নিক্ষেপ করেন, যার ফলে শয়তান মাটিতে লুটিয়ে পড়ে। [আহমদ ইবনে হাম্বল রচিত ‘আল-মুসনাদ’, ১:৩০৬; আল-হা’কিম কৃত ‘আল-মোসতাদরাক’, ১:৬৩৮ #১৭১৩; আল-বায়হাক্বী প্রণীত ‘আল-সুনান আল-কুবরা’, ৫:১৫৩ #৯৪৭৫; আল-মাক্বদাসী লিখিত ‘আল-আহা’দীস আল-মুখতা’রা’, ১০:২৮৩ #২৯৬; আল-মুনযিরী রচিত ‘আল-তারগীব ওয়াল-তারহীব মিনাল-হাদীস আল-শরীফ’, ২:১৩৪ #১৮০৭; এবং আল-হায়সামী কৃত ‘মজমা’ আল-যাওয়া’ঈদ ওয়া মানবা’ আল-ফাওয়া’ঈদ’, ৩:২৫৯]

হযরত আবদুল্লাহ ইবনে আব্বাস (রা:) স্বয়ং বলেন: পয়গম্বর ইবরাহীম (আ:)-কে হজ্জ্বের রীতিনীতি পালনের আদেশ দেয়া হলে পরে হযরত জিবরীল (আ:) তাঁকে ‘জামরা আল-আক্বাবা’য় নিয়ে যান। সেখানে শয়তানের আবির্ভাব ঘটে। হযরত ইবরাহীম (আ:) তার দিকে (একে একে) সাতটি কঙ্কর নিক্ষেপ করেন যতোক্ষণ না সে পালিয়ে যায়। ‘জামরা আল-’উসতা’য়ও সে আবার দেখা দেয়, আর ইবরাহীম (আ:) তার দিকে আবার সাতটি কঙ্কর নিক্ষেপ করেন। [অতঃপর হযরত ইবনে আব্বাস রাদ্বিয়াল্লাহু আনহূ একটি ক্বুরআ’নের আয়াত তেলাওয়াত করেন যা ঘোষণা করে, “এবং পিতা ইবরাহীম পুত্র ইসমাঈলকে মাথার ওপর ভর করে শায়িত করলো” (আল-ক্বুরআ’ন, ৩৭:১০৩)]। পয়গম্বর ইসমাঈল (আ:) একটি সাদা রংয়ের জামা পরেছিলেন। তিনি বলেন, ‘বাবা, কাফনের কাপড় হিসেবে ব্যবহারের জন্যে আমার তো কোনো কাপড় নেই। অতএব, অনুগ্রহ করে এই জামাটি আমার শরীর থেকে অপসারণ করুন, যাতে আপনি এটা দিয়ে আমাকে দাফন-কাফন করতে পারেন।’ হযরত ইবরাহীম (আ:) যেই তা সরাতে যাবেন, অমনি তিনি এক গায়েবী কণ্ঠস্বর শুনতে পান যা ঘোষণা করে, “হে ইবরাহীম! নিশ্চয় তুমি স্বপ্নকে সত্যে পরিণত করে দেখালে” [প্রাগুক্ত আল-ক্বুরআ’ন, ৩৭:১০৪-১০৫]। হযরত ইবরাহীম (আ:) ঘুরে তাকিয়ে দেখেন একটি সুন্দর, বড় চোখবিশিষ্ট সাদা মদ্দা ভেড়া দাঁড়িয়ে আছে। হযরত আবদুল্লাহ ইবনে আব্বাস (রা:) (প্রসঙ্গতঃ) বলেন, “আমরা এ ধরনের ভেড়া/দুম্বা একই জায়গায় বিক্রি করতাম।” অতঃপর তিনি আরো বলেন, “হযরত জিবরীল ফেরেশতা (আ:) পয়গম্বর ইবরাহীম (আ:)-কে ‘জামরা আল-ক্বুসওয়া’য় পথ দেখিয়ে নিয়ে গেলে সেখানে শয়তান আবির্ভূত হয়। হযরত ইবরাহীম (আ:) তার দিকে সাতটি কঙ্কর নিক্ষেপ করলে সে পালিয়ে যায়। [আহমদ ইবনে হাম্বল রচিত ‘আল-মুসনাদ’, ১:২৯৭; আল-তাবারা’নী কৃত ‘আল-মু’জাম আল-কবীর’, ১০:২৬৮ #১০,৬২৮; আল-বায়হাক্বী প্রণীত ‘আল-সুনান আল-কুবরা’, ৫:১৫৩-১৫৪; আল-হায়সামী লিখিত ‘মজমা’ আল-যাওয়া’ঈদ ওয়া মানবা’ আল-ফাওয়া’ঈদ’, ৩:২৫৯; আল-তাবারী রচিত ‘জামে’ আল-বয়া’ন ফী তাফসীর আল-ক্বুরআ’ন’, ২৩:৮০; এবং ইবনে কাসীর কৃত ‘আল-তাফসীর আল-ক্বুরআ’ন আল-’আযীম’, ৪:১৬]

হযরত ইবরাহীম (আ:) শয়তানের দিকে সাতটি কঙ্কর নিক্ষেপের সময় যুগপৎভাবে আল্লাহর ‘তাকবীর’ (শ্রেষ্ঠত্ব) পাঠ করেছিলেন। এর প্রমাণস্বরূপ হযরত মুজাহিদ ইবনে যুবায়র (বেসাল: ১০৪ হিজরী) বলেন: পয়গম্বর ইবরাহীম (আ:) হযরত জিবরীল ফেরেশতা (আ:)-এর সাথে অগ্রসর হন। ‘জামরা আল-’আক্বাবা’ অতিক্রমকালে শয়তানের আবির্ভাব ঘটে। হযরত জিবরীল (আ:) বলেন, ‘আপনি তাকবীর পাঠ করে পাথর নিক্ষেপ করুন।’ শয়তান আবারো ‘জামরা আল-ক্বুসওয়া’য় দেখা দিলে জিবরীল ফেরেশতা (আ:) আবারো পয়গম্বর ইবরাহীম (আ:)-কে বলেন, ‘তাকবীর পাঠ করে তাকে পাথর নিক্ষেপ করুন।’ [আল-আযরাক্বী প্রণীত ‘আখবা’র মক্কা ওয়া মা’ জা’য়া ফীহা’ মিন আল-আ’সার’, ১:৬৮]    

শয়তানের দিকে কঙ্কর নিক্ষেপ করা শুধু পয়গম্বর ইবরাহীম (আ:)-এরই সুন্নাত নয়, বরঞ্চ এটা পয়গম্বর আদম (আ:)-এরও সুন্নাত। ইমাম আল-কালবী লেখেন: জিমা’র (কঙ্কর যে স্থানটিতে নিক্ষেপ করা হয়) নামকরণ হয়েছে, কেননা পয়গম্বর আদম (আ:) ইবলীস শয়তানকে পাথর নিক্ষেপ করতেন যখনই সে তাঁর সামনে থেকে পালাতে থাকতো। [আল-আযরাক্বী রচিত প্রাগুক্ত ‘আখবার মক্কা ওয়া মা’ জা’য়া ফীহা’ মিন আল-আসা’র’, ২: ১৮১]

সর্বশক্তিমান আল্লাহতা’লার প্রিয় বান্দার হাতে হাজার হাজার বছর আগে সংঘটিত এই কাজটি মহাপ্রভুর কাছে এতোই সন্তুষ্টির ছিল যে তিনি এই উম্মতের প্রতি (হজ্জ্বের রীতি হিসেবে) তা আবারো পালনের আদেশ জারি করেন। এটা হজ্জ্বের প্রয়োজনীয় অংশ হয়ে যায়; যা ব্যতিরেকে হজ্জ্ব অসম্পূর্ণ রবে।

এই আমল উদ্দেশ্য ও অর্থহীন নয়। কেননা, এটা আমাদেরকে তিনটি বিষয় শিক্ষা দেয়:

(১) আম্বিয়া আলাইহিমুস্ সালামের সুন্নাতের ধারাবাহিকতা;

(২) এ কাজের অনুকরণের ফলে আম্বিয়া (আ:)-এর প্রতি মহব্বত ও আনুগত্য প্রকাশ হয়;

(৩) শয়তানের প্রতিনিধিত্বকারী স্তম্ভের দিকে কঙ্কর নিক্ষেপ করে মুসলমানবৃন্দ শয়তানের প্রতি ঘৃণা প্রকাশ করেন।

এই পুরো আলোচনার সারমর্ম হচ্ছে কোনো নির্দিষ্ট ঐতিহাসিক ঘটনার কথা স্মরণ করে আবেগের বহিঃপ্রকাশ কেবল শরীয়তে জায়েয-ই নয়, বরং এটা মহান আল্লাহতা’লার আরোপিত একটি রীতি-ও। এরই আলোকে মুসলমান সর্বসাধারণ যদি রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহে ওয়া সাল্লামের ধরাধামে শুভাগমন উপলক্ষে খুশি প্রকাশার্থে ধর্মীয় সভা-সমাবেশ/মাহফিলের আয়োজন করেন, তাহলে তা সম্পূর্ণ জায়েয বা বৈধ হবে।

এসব ধর্মীয় অনুষ্ঠানের আয়োজন মহানবী (দ:)-এর সাথে আমাদের আত্মিক বন্ধন সৃদৃঢ় করে থাকে এবং তাঁর প্রতি আমাদের এশক্ব-মহব্বত ও বিশ্বাস-ও বৃদ্ধি করে বটে। প্রেমাস্পদকে স্মরণ করা এবং তাঁর মহব্বতে বিলীন হওয়া এমনই সব আহওয়াল (আধ্যাত্মিক অবস্থা) যা আল্লাহর দৃষ্টিতে অত্যন্ত মূল্যায়িত একটি বিষয়। খালেস নিয়্যতে তথা সৎ উদ্দেশ্যে পবিত্র কা’বায় হজ্জ্বে গমন পয়গম্বর ইবরাহীম (আ:)-এর প্রতি আমাদের স্মৃতি জাগরূক রাখে, আর এরই ফলে মহান আল্লাহতা’লা আমাদের ছোট-বড় সকল গুনাহ ক্ষমা করে দেন [হযরত আবূ হুরায়রা রাদ্বিয়াল্লাহু আনহূ মহানবী সাল্লাল্লাহু আলাইহে ওয়া সাল্লামের বাণী উদ্ধৃত করেন, যিনি বলেন, ‘যে কেউ হজ্জ্ব পালন করলে, এবং কোনো অশোভনীয় আচরণ বা অপরাধ না করলে, সে তার মায়ে তাকে জন্ম দেয়ার দিনের মতোই নিষ্পাপ হয়ে যায়।’ এই হাদীসটি রওয়ায়াত করেছেন আল-বুখারী নিজ ‘আল-সহীহ: কিতা’ব আল-হজ্জ্ব’, ‘ক্ববূল হজ্জ্বের গুণাবলী’ শীর্ষক অধ্যায়, ২: ৫৫৩ #১৪৪৯ গ্রন্থে; ইবনে আল-জা’আদ তাঁর ‘আল-মুসনাদ’, পৃষ্ঠা ১৪১ #৮৯৬ পুস্তকে; ইবনে মুনদাহ আপন ‘আল-ঈমান’, পৃষ্ঠা ৩৯২ #২৩০ বইয়ে; আল-মাক্বদিসী তাঁর ‘ফাদা’য়েল আল-আ’মাল’, পৃষ্ঠা ৮১ #৩৪৭ কিতাবে; এবং আল-তাবারী নিজ ‘জামে’ আল-বয়া’ন ফী তাফসীর আল-ক্বুরআ’ন’, ২:২৭৭ পুস্তকে]। সে তুলনায় মওলিদুন্নবী (দ:) উদযাপনের মাধ্যমে সর্বশ্রেষ্ঠ রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহে ওয়া সাল্লামের প্রতি যে মুসলমান-ব্যক্তি সালাত-সালাম পেশ করেন এবং হুযূরে পূর নূর (দ:)-এর সাথে নিজ আত্মিক বন্ধন সুদৃঢ় করেন, তাঁর জন্যে কী (ঐশী) পুরস্কার মঞ্জুর হতে পারে? বস্তুতঃ রাসূল-প্রেম ঈমানের সার তথা নির্যাস নয় কি?

১.১৯.১ একটি আপত্তি

অনেক মানুষ আছেন যারা মওলিদুন্নবী (দ:) উদযাপন করেন না। তাদের আপত্তি হলো, মহানবী (দ:)-এর বেলাদত তথা ধরাধামে শুভাগমনের উদযাপন কোনো গুরুত্বপূর্ণ বিষয় নয়। কেননা, তাঁকে প্রেরণের (ঐশী) উদ্দেশ্য আমাদেরকে সঠিক পথপ্রদর্শন ও শরীয়তের জ্ঞান শিক্ষা দান ছাড়া কিছু নয়। তাই আমাদের একমাত্র লক্ষ্য হওয়া উচিত তাঁরই শিক্ষার অনুসরণে কুরআন ও সুন্নাহর সাথে সঙ্গতিপূর্ণভাবে আমাদের জীবন যাপন করা এবং অন্যদেরকেও একই রকম করতে বলা। এই আপত্তি উত্থাপনকারীদের মতে, মওলিদ উদযাপন স্রেফ পণ্ডশ্রম এবং সময়েরও অপচয়।

১.১৯.২ আপত্তির প্রতি আমাদের জবাব

এব্যাপারে আমাদের দৃষ্টিভঙ্গি হলো, মহানতম নবী (সাল্লাল্লাহু আলাইহে ওয়া সাল্লাম) যে তাঁর সুন্নাহ-রূপী হেদায়াতের আলো দ্বারা আমাদেরকে আশীর্বাদধন্য করতে (আল্লাহতা’লা কর্তৃক) প্রেরিত হয়েছিলেন এবং দ্বীন-ইসলাম যে একটি পূর্ণাঙ্গ জীবনব্যবস্থা, সে কথা অস্বীকার করার জো নেই। এ বিষয়ে কোনো মতপার্থক্য-ই নেই। হুযূর পাক (দ;)-এর পদাঙ্ক অনুসরণ এবং ইসলামের শিক্ষা অনুযায়ী জীবন যাপন করার বাধ্যবাধকতা রয়েছে আমাদের প্রতি। আর আমরাও খোদাতা’লার অনুগ্রহ ও দয়ায় ইসলাম ধর্মকে প্রতিষ্ঠার জন্যে বুদ্ধিবৃত্তিক ও ব্যবহারিকভাবে সংগ্রাম বা সাধনা  করেছি। আমরা যে ক্ষেত্রে ভিন্নমত পোষণ করছি, তা হচ্ছে মওলিদুন্নবী (দ:)-এর গুরুত্ব ও তাৎপর্যের ব্যাপারে, আর এটা সম্পূর্ণ আলাদা একটা বিষয়।

রাসূলুল্লাহ (দ:)-এর সুন্নাহকে আঁকড়ে ধরার এবং তা অনুসরণ করার কোনো আলোচনাই এখানে নিহিত নেই, কেননা সেটা ধর্মের একটা গুরুত্বপূর্ণ দিক। তবে (ধর্মের) আরো অনেক দিক রয়েছে। ধর্মের মধ্যে শুধু আমল (নেক কাজ) অন্তর্ভুক্ত নয়, বরঞ্চ এতে এশক্ব-মহব্বত ও ভক্তির মতো আবেগ-ও বিদ্যমান। আর এই দিকটির সাথেই মওলিদুন্নবী (দ:) উদযাপনের বিষয়টি (গভীরভাবে) সম্পর্কিত।

মহান প্রভু আল্লাহতা’লা তাঁরই রাসূল (দ:)-কে আমাদের মাঝ হতে আবির্ভূত করে আপন সর্ববৃহৎ নেয়ামত (মানে আশীর্বাদ) মানব সভ্যতার প্রতি মঞ্জুর করেছেন। যেদিনটিতে তাঁর বেলাদত (ধরাধামে শুভাগমন) হয়, সেদিনটি মহা আনন্দের এবং কৃতজ্ঞতা প্রকাশেরও বটে। (খোদায়ী) আশীর্বাদরূপী বিশ্বনবী (দ:)-এর মাধ্যমে আল্লাহ পাক আমাদের প্রতি তাঁরই করুণা ও অনুগ্রহ বর্ষণ করেছেন। এই কারণেই হুযূরে পূর নূর (দ:)-এর বেলাদত দিবস উদযাপন করে কৃতজ্ঞতা প্রকাশ করা মহামূল্যবান একটি কাজ। এটা এমন-ই এক গুরুত্বপূর্ণ বিষয় যা অবহেলা বা অবজ্ঞা করার মতো নয়।

আমাদের যুগ হতে হাজার হাজার বছর আগে ঘটে যাওয়া অনেক ঘটনা রয়েছে, যেগুলোতে (ঐশী) শিক্ষা বিদ্যমান। হজ্জ্বের রীতিগুলোই ধরুন, প্রথম নজরে এর বিভিন্ন রীতির মধ্যে কোনো পারস্পরিক সম্পর্ক-ই (খুঁজে) পাওয়া যাবে না। দৃশ্যতঃ এগুলো বিচ্ছিন্ন বা পৃথক পৃথক ঘটনা, যেগুলো এখন অতীত। ব্যবহারিক অর্থে এসব ঘটনা আমাদের জন্যে কী শিক্ষা বহন করে? অতএব, এ থেকে আমরা সিদ্ধান্ত নিতে পারি যে ইসলাম ধর্ম উভয় বাস্তবতাকেই দৃঢ়ভাবে ব্যক্ত করে: দ্বীন প্রতিষ্ঠার পূর্বশর্ত হিসেবে ঐশী বিধানের সাথে সম্পর্কিত ধর্মীয় শিক্ষার দিকগুলো যেমন দ্বীন-ইসলাম তাৎপর্যপূর্ণ বলে বিবেচনা করে, ঠিক তেমনি আবেগের দিকটিও গুরুত্বপূর্ণ বলে বিবেচনা করে, যেটা আমাদের মন ও মগজে ঐতিহাসিক ঘটনার স্মৃৃতি জাগরূক রেখে আমাদেরই জীবনে ভূমিকা পালন করে থাকে। সার কথা হলো, ইসলাম ধর্ম অতীত ঘটনাবলীকে দেখে থাকে দুইটি দৃষ্টিকোণ থেকে: ব্যবহারিক/বাস্তব দৃষ্টিভঙ্গি এবং আবেগের দৃষ্টিভঙ্গি।

প্রিয়নবী (দ:)-এর বেলাদত উপলক্ষে অন্তহীন খুশি প্রকাশ হচ্ছে এর ঐতিহাসিক, সাংস্কৃতিক ও আধ্যাত্মিক তাৎপর্যের সাথে সংশ্লিষ্ট বিষয়। অর্থাৎ, এই ঘটনা আমাদের স্মৃতিপটে ধরে রাখার উদ্দেশ্যে কখনোই বিস্মৃত হওয়া উচিত নয়। তাই মওলিদুন্নবী (দ:)-এর শুভলগ্নে খুশি ও আনন্দের পরিবেশ বিরাজ করে। ওর প্রাপ্য সম্মান দেয়ার জন্যেই তা করা হয়।

এই বইয়ের পূর্ববর্তী পৃষ্ঠাগুলো হতে এ বিষয়টি সুস্পষ্ট হয়েছে যে হজ্জ্বের রীতিগুলো প্রকৃতপক্ষে আল্লাহতা’লার প্রিয় ও আশীর্বাদধন্য বান্দাদের জীবনের সাথে জড়িত ঘটনাসংশ্লিষ্ট বিষয়। এসব ঘটনার স্মৃতি খোদাতা’লার নিদর্শনস্বরূপ সংরক্ষিত হয়েছে। এব্যাপারে যদি কোনো ভিন্নমত বা মতপার্থক্য না থাকে, তাহলে মওলিদুন্নবী (দ:) উদযাপনের ব্যাপারেও কোনো আপত্তি আর থাকা উচিত নয়।

দ্বিতীয় অধ্যায়

আনন্দ ও বিষাদময় ঘটনার স্মরণে

বিশ্বনবী (দ:)-এর বেলাদত (অর্থাৎ, ধরাধামে শুভাগমন) ইতিহাসের সবচেয়ে চমকপ্রদ ঘটনা। এই দিনেই বিশ্বজগতের প্রতি খোদার (অসীম) করুণা (মহানবী সাল্লাল্লাহু আলাইহে ওয়া সাল্লাম) এ ধরণীতলকে নিজ তাশরিফ তথা শুভাগমন দ্বারা আশীর্বাদধন্য করেন। খুশি প্রকাশের জন্যে এর চেয়ে শ্রেয়তর দিন অার কোনোটাই হতে পারে না। সুখ ও হতাশা, শান্তি ও শঙ্কা, আশা ও নিরাশা হচ্ছে মানব জীবনের সেসব দিক, যেগুলো ব্যক্তিগত ও সামষ্টিক পর্যায়ে প্রত্যেকের মন-মানসিকতাকে রূপায়ন করে থাকে। মহান আল্লাহতা’লা তাঁর নেয়ামত বর্ষণের মাধ্যমে অতীতকালের জাতিগুলোকে সুখ-শান্তির ঐশ্বর্য দ্বারা সমৃদ্ধ করেছিলেন, আবার তাঁর প্রতি অকৃতজ্ঞ ও অবাধ্য হওয়ার দৃষ্টান্তমূলক শাস্তির ব্যাপারেও তিনি তাদেরকে সতর্ক করেছিলেন।

হেদায়াত তথা সত্য ও সঠিক পথের দিকে পরিচালিত হওয়ার বিষয়টি মানুষের মনস্তাত্ত্বিক বাস্তবতার সাথে সম্পৃক্ত। কোনো ব্যক্তির অন্তরে সততারূপী বীজ যতোক্ষণ না বেড়ে ওঠে, ততোক্ষণ তার যাবতীয় কর্ম ফলদায়ক হবে না। কিন্তু যখন কেউ আধ্যাত্মিক হাল তথা অবস্থাগুলো অর্জন করেন এবং তাঁর মন ও মগজ আলোকিত হয়, তখন হেদায়াতের জ্যোতি তাঁর প্রতি বিচ্ছুরিত হয়; আর এই নূর তথা জ্যোতি দ্বারা তিনি জীবনের যাত্রাপথ লম্বা লম্বা কদমে পার হয়ে যান।

এসব অবস্থা হতে উপকার পেতে হলে প্রত্যেককে স্বীকার করতে হবে যে এগুলোর উৎস তারই চেনাজানাদের সাথে সম্পর্কিত। পয়গম্বর এয়া’ক্বূব (আ:) পুত্রবিচ্ছেদের শোকে দৃষ্টিশক্তি হারান। আল্লাহতা’লার এই পয়গম্বর (ওই সময়) শোকে মূহ্যমান অবস্থায় ছিলেন। কিন্তু যখন (তাঁর পুত্র) পয়গম্বর ইউসূফ (আ:) নিজের জামাটি আপন পিতার চোখের ওপর রাখার জন্যে প্রেরণ করেন, তখন হযরত এয়াক্বূব (আ:)-এর শোক পরিণত হয় সুখে এবং তাঁর দৃষ্টিশক্তিও ফিরে আসে। এমতাবস্থায় তাঁর অবস্থা ধৈর্য হতে কৃতজ্ঞতায় রূপ নেয়। অতএব, এটা পরিস্ফুট যে, এ ঘটনা চেনাজানার সম্পর্কের মধ্যেই আবর্তিত হয়েছে। কেননা, জামাটি ছিল পয়গম্বর ইউসূফ (আ:)-এর সাথে সম্পর্কিত।

অনুরূপভাবে, আমাদের জীবনেও এমন অনেক ঘটনা ঘটে থাকে, যা ওই ধরনের সম্পর্ককে ঘিরে আবর্তিত। আমাদের ঘরে বিভিন্ন জিনিস বিরাজমান, যেগুলো পূর্ববর্তী প্রজন্ম পরম্পরায় আমাদের কাছে এসে পৌঁছেছে; এ ধরনের জিনিসকে শিল্পকর্ম হিসেবে সংরক্ষণ করা হয়ে থাকে, যেগুলোকে এমন কি স্পর্শ করলেও স্মৃতির রোমন্থন হয়। একইভাবে, আমাদের আনন্দ-বেদনার অনুভূতিগুলো-ও ওই ধরনের চেনাজানার সাথে সম্পর্কিত, আর এসব চেনাজানা হতেই আমাদের অন্তস্থিত (আত্মিক) অবস্থাগুলোর উৎপত্তি ও বিকাশ ঘটে থাকে।

রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহে ওয়া সাল্লামের আহাদীস তথা পবিত্র বাণীতে বহু বাস্তব ঘটনার বর্ণনা বিদ্যমান, যেগুলোতে মহানতম পয়গম্বর (দ:) নিজের অনুশীলিত কর্ম দ্বারাই এই উম্মতকে আনন্দ ও বেদনাময় অবস্থাগুলোর স্মরণার্থে ঐতিহাসিক ঘটনাগুলোর স্মৃতিচারণ শিক্ষা দিয়েছেন। আমরা যদি গভীরভাবে এসব ঘটনা সম্পর্কে চিন্তা করি, তাহলে দেখতে পাবো যে খুশিপূর্ণ ও বিষাদময় অবস্থাগুলো কোনো নির্দিষ্ট চেনাজানা কারোর সাথে সংশ্লিষ্টতারই ফসল, যা তাঁর সাথে ওতপ্রোতভাবে জড়িত। মহানবী (দ:)-এর হাদীসে উল্লেখিত এরকম কিছু ঘটনা নিচে দেয়া হলো:

২.১ পয়গম্বর মূসা (আ:)-এর দিবসের স্মরণে

মহানবী (দ:) মদীনা মোনাওয়ারায় হিজরত করার পর সেখানে বসবাসরত ইহুদীদের তিনি ১০ই মহররম তারিখে তাদের রোযা রাখার কারণ জিজ্ঞেস করেন। তারা উত্তরে বলে, এই দিনে আল্লাহতা’লা ফেরাউনকে পানিতে ডুবিয়ে পয়গম্বর মূসা (আ:)-কে বিজয় দান করেন। ফেরাউনের দুঃশাসন ও অত্যাচার-নিপীড়ন হতে এ দিনেই ইসরাঈল জাতি মুক্তি লাভ করে। এই কারণে পয়গম্বর মূসা (আ:) আল্লাহতা’লার প্রতি কৃতজ্ঞতা প্রকাশ করেন এবং দিনটিতে রোযা রাখেন। তাই আমরাও এ দিনে রোযা রাখি। রাসূলুল্লাহ (দ:) ইহুদীদের এই জবাব শুনে বলেন, আমি তোমাদের চেয়ে মূসা (আ:)-এর বেশি ঘনিষ্ঠ (দুই জনই আল্লাহর পয়গম্বর হওয়ার সূত্রে)। অতঃপর প্রিয়নবী (দ:)-ও ১০ই মহররম তারিখে নিজে রোযা রাখা আরম্ভ করেন এবং তাঁর সাহাবা (রা:)-বৃন্দকেও অনুরূপ রোযা পালন করতে আদেশ দেন। [আল-বুখারী রচিত ‘আল-সহীহ: কিতা’ব আল-সওম’, ‘এয়াওমে আশুরার রোযা’ শীর্ষক অধ্যায়, ২:৭০৪ #১৯০০; আল-বুখারী কৃত ‘আল-সহীহ: কিতা’ব আল-আম্বিয়া’, ‘আল্লাহর কালাম: মূসা (আ:)-এর সংবাদ তোমাদের কাছে পৌঁছেছে কি?’ শীর্ষক অধ্যায়, ৩:১২৪৪ #৩২১৬; আল-বুখারী লিখিত ‘আল-সহীহ: কিতা’ব ফাযা’য়েল আল-সাহা’বা’, ‘মহানবী (দ:) মদীনায় এলে ইহুদীদের তাঁর কাছে আগমন’ শীর্ষক অধ্যায়, ৩:১৪৩৪ #৩৭২৭; মুসলিম প্রণীত ‘আল-সহীহ: কিতা’ব আল-সিয়া’ম’, ‘এয়াওমে আশুরার রোযা’ শীর্ষক অধ্যায়, ২:৭৯৫-৭৯৬ #১১৩০; আবূ দাউদ রচিত ‘আল-সুনান: কিতা’ব আল-সওম’, ‘এয়াওমে আশুরার রোযা’ শীর্ষক অধ্যায়, ২:৩২৬ #২৪৪৪; ইবনে মা’জাহ কৃত ‘আল-সুনান: কিতা’ব আল-সিয়া’ম’, এয়াওমে আশুরার রোযা’ শীর্ষক অধ্যায়, ১:৫৫২ #১৭৩৪; আহমদ ইবনে হাম্বল লিখিত ‘আল-মুসনাদ’, ১:২৯১ ও ৩৩৬ #২৬৪৪ ও ৩১১২; এবং আবূ এয়া’লা’ রচিত ‘আল-মুসনাদ’, ৪:৪৪১ #২৫৬৭]

এ থেকে পরিস্ফুট হয় যে ইসরাঈল বংশ (তাদের) এই জাতীয় জীবনের ঘটনায় খুশি প্রকাশ করতে দিনটির স্মরণে রোখা রেখেছিল; আর মহানবী (দ:)-ও সেই ঘটনার ব্যাপারে তাঁর খুশি প্রকাশার্থে একইভাবে রোযা রেখে দিনটিকে স্মরণ করেন।

২.২ পয়গম্বর নূহ (আ:)-এর দিবসের স্মরণে

ইমাম আহমদ ইবনে হাম্বল (১৬৪-২৪১ হিজরী) ও হাফেয ইবনে হাজর আল-আসক্বালা’নী (৭৭৩-৮৫২ হিজরী) ‘এয়াওমে আশূরা’ (আশূরা দিবস) সম্পর্কে হযরত আবূ হোরায়রা (রা:) হতে এ মর্মে আরেকটি তাৎপর্যপূর্ণ বিষয় বর্ণনা করেন যে, ওই দিনটিতে আল্লাহতা’লা পয়গম্বর নূহ (আ:) ও তাঁর সাথীদের প্রতিও নিজ অনুগ্রহ বর্ষণ করেন; কেননা ওই দিনেই তাঁরা কিস্তি থেকে ‘জূদী’ পর্বতশৃঙ্গে অবতরণ করেন। এরপর থেকে পয়গম্বর নূহ (আ:) ও তাঁর সাথীবৃন্দ আল্লাহর প্রতি কৃতজ্ঞতা প্রকাশ করেন এবং দিনটি পরবর্তী প্রজন্মগুলোর দ্বারা বিশেষ মর্যাদাপূর্ণ দিবস হিসেবে পালিত হতে থাকে। এই দিনে মহানবী (দ:)-ও রোযা রাখেন এবং তাঁর সাহাবা-এ-কেরাম (রা:)-কেও রোযা রাখার নির্দেশ দেন। [আহমদ ইবনে হাম্বল কৃত ‘আল-মুসনাদ’, ২:৩৫৯-৩৬০ #৮৭০২; এবং আল-আসক্বালা’নী রচিত ‘ফাতহুল বারী’, ৪:২৪৭]

২.৩ ইসলাম-ধর্মের পূর্ণতাপ্রাপ্তির দিবস: খুশি উদযাপনের দিন (ঈদ)

হযরত কা’আব আল-আহবার (রা:) বর্ণনা করেন যে তিনি খলীফা হযরত উমর বিন আল-খাত্তা’ব (রা:)-কে বলেন, “আমি এমন এক জাতি সম্পর্কে জানি যাদের প্রতি এই আয়াতটি অবতীর্ণ হলে তারা ওই দিনটিকে (মানে আয়াত নাযেলের দিনটিকে) ঈদ হিসেবে উদযাপন করতো।” হযরত উমর ফারূক (রা:) জিজ্ঞেস করেন, “সেটা কোন্ আয়াত?” হযরত কা’আব (রা:) উত্তর দেন, “আজ আমি তোমাদের জন্যে তোমাদের দ্বীনকে পরিপূর্ণ করে দিলাম এবং তোমাদের প্রতি আমার অনুগ্রহ সম্পূর্ণ করলাম, আর তোমাদের জন্যে ইসলামকে দ্বীন (পূর্ণাঙ্গ জীবন-ব্যবস্থা) মনোনীত করলাম।” [আল-ক্বুরআন, ৫:৩]

অতঃপর হযরত উমর (রা:) বলেন, “এই আয়াতটি  (‘আজ আমি তোমাদের জন্যে তোমাদের দ্বীনকে পরিপূর্ণ করে দিলাম’) যেদিন নাযেল হয় সেদিনটি সম্পর্কে আমি জানি: সেদিনটি ছিল ‘আরাফা এবং শুক্রবার; আর উভয়-ই (ইতোমধ্যে) আমাদের জন্যে ঈদের দিনে পরিণত হয়েছে।” [আল-তাবারানী রচিত ‘আল-মু’জাম অাল-আওসাত’, ১:২৫৩ #৮৩০; আল-আসক্বালা’নী কৃত ‘ফাতহুল বারী’, ১:১০৫ #৪৫; এবং ইবনে কাসীর প্রণীত ‘আল-তাফসীর আল-ক্বুরআন আল-আযীম’, ২:১৪]

এখানে হযরত কা’আব (রা:)-ই তাঁর ভাবনাকে ভাষায় প্রকাশ করেন এ মর্মে যে, এই সুসংবাদ প্রাপ্তির দিনটিকে ঈদের দিন হিসেবে গ্রহণ করা উচিত। আর হযরত উমর ফারূক (রা:)-ও তা অনুমোদন এবং এর সত্যতা প্রতিপাদন করেন। এ দৃষ্টান্ত থেকে এটা শেখা যায় যে আমাদের (অর্থাৎ, মুসলমানদের) জাতীয় ও সম্প্রদায়গত জীবনে এমন কিছু ঘটনা আছে, যেগুলোর তাৎপর্যপূর্ণ প্রভাব থাকায় সেগুলোকে ঈদের মতো করে উদযাপন করা উচিত। এ কাজটি ক্বুরআন ও সুন্নাহর নীতির পরিপন্থী নয়। বরঞ্চ তা একটি (শরীয়ত)-সমর্থিত পুণ্যদায়ক আমল, যেটা জাতীয় ও সম্প্রদায়গত দৃষ্টিকোণ হতে গুরুত্বপূর্ণ। [খুশি উদযাপনের ব্যাপারে আরো বিস্তারিত জানতে এই বইয়ের পঞ্চম অধ্যায় দেখুন]

২.৪ আল-হিজর অতিক্রমকালে মহানবী (দ:)-এর নির্দেশ

নবম হিজরী সালে তাবূকের যুদ্ধ সংঘটিত হওয়ার সময় মুসলমান বাহিনী দুটো কুয়ো অতিক্রম করেন, যেগুলো ইতিপূর্বে সামূদ গোত্রের মালিকানাধীন ছিল। এই স্থানটি সম্পর্কে প্রিয়নবী (দ:) বলেছিলেন যে পয়গম্বর সালেহ (আ:)-এর জাতি এখানেই একটি মাদী উটকে হত্যা করেছিল, যার ফলে আল্লাহতা’লা তাদেরকে শাস্তি দেন। রাসূলুল্লাহ (দ:) তাঁর সাহাবা (রা:)-বৃন্দকে দুটো কুয়োর মধ্যে শুধু একটি হতে পানি সংগ্রহের অনুমতি দেন, যাতে তাঁদের চাহিদা মেটে; অপর কুয়োটি হতে পানি সংগ্রহ করতে তিনি তাঁদের বারণ করেন।

যে কুয়োটি হতে মহানবী (দ:) তাঁর পুণ্যাত্মা সাহাবা (রা:)-বৃন্দকে পানি সংগ্রহের নির্দেশ দেন, সেটা থেকেই ওই উটনী ইতিপূর্বে জলপান করতো। তার জন্যে পানি পানের দিন (আলাদাভাবে) বরাদ্দ থাকলেও সামূদ গোত্রের লোকেরা এটা বরদাশত্ করতে অক্ষম হয়ে উটনীকে পেশীতন্তু কেটে হত্যা করে।

(পয়গম্বর সালেহ আলাইহিস্ সালামের) ওই উটনীকে হত্যার এ ঘটনাটি ঘটেছিল বহু শতাব্দী আগে, আর নিঃসন্দেহে মহানবী সাল্লাল্লাহু আলাইহে ওয়া সাল্লাম ও সাহাবাবৃন্দ রাদ্বিয়াল্লাহু তা’লা আনহুমের সময়কাল নাগাদ সেই কুয়োটিরও পরিবর্তন সাধিত হয়েছিল; কিন্তু এতদসত্ত্বেও রাসূলুল্লাহ (দ:) সেটাকে বিশেষ গুরুত্ব দেন। এই কুয়োটি পয়গম্বর সালেহ (আ:)-এর উটনীর সাথে সম্পর্কিত ছিল, আর এর আশীর্বাদসূত্রে প্রিয়নবী (দ:) তাঁর সাহাবাবৃন্দ (রা:)-কে এটা থেকে পানি সংগ্রহ করতে বলেন। পক্ষান্তরে, সামূদ গোত্রের লোকেরা অপর যে কুয়োটির পানি ব্যবহার করতো, মহানবী (দ:) নিজ সাহাবামণ্ডলী (রা:)-কে সেটার পানি ব্যবহার করতে বারণ করেন। কেননা, সামূদ গোত্র এরই সূত্রে আল্লাহর শাস্তির সতর্ক-বার্তা শুনতে পেয়েছিল। তাদের ওই বিশ্বাসঘাতকতার (উটনীকে হত্যা) দরুন আল্লাহ পাক তাদেরকে শাস্তি দেন এবং ফলশ্রুতিতে তারা নিশ্চিহ্ন হয়ে যায়। এ বিষয়টি স্মরণে রেখেই হুযূর পূর নূর (দ:) সাহাবা-এ-কেরাম (রা:)-কে ওই কুয়োর পানি ব্যবহার করতে মানা করেন।

এই নিষেধাজ্ঞা জারির আগে পুণ্যবান সাহাবা (রা:)-বৃন্দের একটি দল নিজেদের অজ্ঞাতসারে ‘সামূদ’ গোত্রের ওই কুয়ো থেকে পানি ব্যবহার করেছিলেন। এই নিষেধাজ্ঞা সম্পর্কে শোনার পর তাঁরা রাসূলুল্লাহ (দ:)-এর কাছে আরয করেন এই মর্মে যে তাঁরা নিষেধাজ্ঞা সম্পর্কে না জেনেই ইতোমধ্যে ওই পানি ব্যবহার করেছেন। প্রিয়নবী (দ:) তাঁদেরকে ওই পানি এবং তা দ্বারা রান্নাকৃত সমস্ত খাবার ফেলে দিয়ে উটনীর সাথে সম্পর্কিত কুয়ো হতে সংগৃহীত পানি ব্যবহার করতে নির্দেশ দেন।

এই ঘটনা সম্পর্কে আরো বিশদ বিবরণ পাওয়া যায় নিম্নের আহাদীসগুলোতে:

২.৪.১ আল-হিজরে অবস্থিত সামুদের কুয়ো হতে পানি পানে নিষেধাজ্ঞা

হযরত আবদুল্লাহ বিন উমর (রা:) বর্ণনা করেন, তাবূক জ্বিহাদের সময় রাসূলুল্লাহ (দ:) আল-হিজর এলাকায় যাত্রাবিরতি করেন এবং তাঁর সাহাবা (রা:)-বৃন্দকে সেখানকার কুয়ো হতে পানি পান বা সংগ্রহ করতে মানা করেন। (কতিপয় সাহাবী) আরয করেন, ‘আমরা তা দিয়ে আটার কাই বানিয়েছি এবং (জন্তুর চামড়ানির্মিত) আমাদের পানির থলেগুলো-ও পূর্ণ করেছি।’ মহানবী (দ:) তাঁদেরকে আটার কাই ছুঁড়ে ফেলতে বলেন এবং কুয়োর পানিও ঢেলে ফেলে দিতে আদেশ করেন। [আল-বুখারী প্রণীত ‘আল-সহীহ: কিতা’ব আল-আম্বিয়া’, ‘আল্লাহর বাণী: আর সামূদের প্রতি তাদের ভাই সালেহ’ শীর্ষক অধ্যায়, ৩:১২৩৬-১২৩৭ #৩১৯৮; আল-ক্বুরতুবী কৃত ‘আল-জামে’ লি-আহকা’মিল ক্বুরআন’, ১০:৪৬; আল-বাগ্বভী রচিত ‘মু’আলিমুত্ তানযীল’, ২:১৭৮; ইবনে হাযম লিখিত ‘আল-মুহাল্লা’, ১:২২০; এবং আল-আসক্বালানী প্রণীত ‘তাগলীক্ব আল-তা’লীক্ব’, ৪:১৯]

২.৪.২ পয়গম্বর সালেহ (আ:)-এর মাদী উটের সাথে সংশ্লিষ্ট কুয়ো হতে জলপানসম্পর্কিত আদেশ

হযরত আবদুল্লাহ ইবনে উমর (রা:) বর্ণনা করেন যে (সামূদ গোত্রের অধ্যুষিত) আল-হিজর এলাকায়  হুযূর পাক (দ:)-এর সাথে গমনকারী কিছু মানুষ সেখানকার কুয়ো থেকে পানি সংগ্রহ করে তা দ্বারা আটার কাই বানান এবং নিজেদের পানির থলেগুলো পূর্ণ করেন। মহানবী (দ:) তাঁর সাহাবাবৃন্দ (রা:)-কে ওই কুয়োর পানি ঢেলে ফেলে দিতে বলেন এবং আটার কাই তাঁদের উটগুলোকে খেতে দিতে আদেশ করেন। আর তিনি (পয়গম্বর সালেহ আলাইহিস্ সালামের) উটনী যে কুয়ো থেকে পানি পান করতো, তা হতে পানি সংগ্রহ করতে বলেন। [আল-বুখারী কৃত ‘আল-সহীহ: কিতা’ব অাল-আম্বিয়া’, ‘আল্লাহর বাণী: আর সামূদের প্রতি তাদের ভাই সালেহ’ শীর্ষক অধ্যায়, ৩:১২৩৭ #৩১৯৯; মুসলিম রচিত ‘আল-সহীহ: কিতা’ব আল-যুহদ’, ‘নিজেদের (আত্মার) প্রতি যুলূমকারীদের বসতিতে প্রবেশ করো না’ শীর্ষক অধ্যায়, ৪:২২৮৬ #২৯৮১; ইবনে হিব্বা’ন লিখিত ‘আল-সহীহ, ১৪:৮২ #৬২০২; আল-বায়হাক্কী প্রণীত ‘আল-সুনান আল-কুবরা’, ১:২৩৫ #১০৫০; এবং আল-ক্বুরতুবী কৃত ‘আল-জামে’ লি-আহকা’ম আল-ক্বুরআন’, ১০:৪৬]

হযরত আবদুল্লাহ ইবনে উমর (রা:) বর্ণনা করেন যে তাবূকের যুদ্ধের বছর মুসলিম সেনাবাহিনী ‘সামূদ’ গোত্রের বসতির ধ্বংসাবশেষের পাশে তাঁবু ফেলেন। তাঁরা নিজেদের পাত্র সেখানকার কুয়োর পানি দ্বারা পূর্ণ করেন এবং আটার কাই বানান, আর গোশত-ও রান্না করেন। রাসূলুল্লাহ (দ:) (এ সম্পর্কে জানতে পেরে) তাঁদেরকে ওই পানি ফেলে দিতে বলেন; আর তাঁরাও পানি ফেলে দেন এবং আটা নিজেদের উটগুলোকে খাওয়ান। অতঃপর হুযূর পাক (দ:) তাঁদেরকে (পয়গম্বর সালেহ আলাইহিস সালামের) ওই উটনী যে কুয়ো হতে জলপান করতো, সেখানে নিয়ে যান। তিনি তাঁদেরকে (সামূদ গোত্রের) শাস্তিপ্রাপ্ত সেসব লোকের বসতভিটায় প্রবেশ করতে মানা করে বলেন, ‘আমি আশঙ্কা করি যে তাদেরকে যে শাস্তি আক্রান্ত করেছে, তা তোমাদেরকেও আক্রান্ত করতে পারে। অতএব, ওদের ঘরে প্রবেশ করো না।’ [আহমদ ইবনে হাম্বল রচিত ‘আল-মুসনাদ’, ২:১১৭ #৫৯৮৪; এবং ইবনে হিব্বা’ন প্রণীত ‘আল-সহীহ’, ১৪:৮৩ #৬২০৩; ইমাম আহমদ (রা:)-এর বর্ণনা সর্ব-ইমাম বুখারী (রহ:) ও মুসলিম (রহ:)-এর আরোপিত শর্ত পূরণ করেছে]

এখানে লক্ষণীয় বিষয় হলো, শরীয়তের দৃৃষ্টিতে কুয়োর ওই পানি স্বতন্ত্রভাবে ব্যবহারের অনুপযোগী ছিল না, বরং সুপেয় জল ছিল। কিন্তু (পয়গম্বর সালেহ আলাইহিস্ সালামের) উটনী হত্যার দায়ে (ঐশী) শান্তিপ্রাপ্ত গোষ্ঠীর সাথে সম্পর্কিত হওয়ার একমাত্র কারণেই প্রিয়নবী (দ:) তাঁর সাহাবা (রা:)-বৃন্দকে তা ব্যবহার করতে বারণ করেন। এরই বিপরীতে অপর কুয়োটি পয়গম্বর সালেহ (আ:)-এর উটনীর সাথে সম্পর্কিত ছিল। আর এই সম্পর্কের সূত্রেই কুয়োটিকে সম্মান দেয়া হয় এবং সেটাকে (ঐশী) করুণা ও আশীর্বাদের উৎস হিসেবে ঘোষণা করা হয়। [বঙ্গানুবাদকের জরুরি জ্ঞাতব্য: লা’নতপ্রাপ্ত তথা অভিশপ্ত গোষ্ঠীর সাথে ওঠা-বসা, নামায-সমাজ ইত্যাদি বজায় রাখাও মুসলমানদের জন্যে এই দলিলে নিষিদ্ধ প্রমাণিত হয়। এব্যাপারে উদাসীনতা পতনের কারণ হবে।]

২.৪.৩ পয়গম্বর সালেহ (আ:)-এর মাদী উটের স্মরণে

ওপরে উল্লেখিত বিষয়গুলো স্পষ্টভাবে প্রতীয়মান করে যে কোনো নবী (আ:) বা রাসূল (আ:)-এর সাথে সম্পর্কিত আশীর্বাদ স্থায়ী প্রভাব ফেলে। সেগুলোকে শ্রদ্ধা প্রদর্শন করা এবং সেগুলো হতে বরকত তথা আশীর্বাদ গ্রহণ করা এমনই এক শিক্ষা যা স্বয়ং মহানবী (দ:) প্রদান করেছেন। এখানে বিশেষভাবে লক্ষণীয় বিষয় হলো আলোচ্য কুয়োটি সে-ই কুয়ো, যেটা থেকে পয়গম্বর সালেহ (আ:)-এর মাদী উটটি পানি পান করতো; কিন্তু পয়গম্বর সালেহ (আ:) তা থেকে পানি পান করেছিলেন বলে উল্লেখিত হয়নি।

অতঃপর সহস্র সহস্র বছর অতিক্রান্ত হয়েছে, আর আল্লাহ-ই ভালো জানেন ওই সময় হতে পানির কতোটুকু পরিবর্তন সাধিত হয়েছে, অথবা উটনীর পানকৃত জল এখনো আগের মতোই আছে কি না। তবে একমাত্র নিশ্চিত বিষয় হচ্ছে আল্লাহতা’লার আম্বিয়া (আ:)-বৃন্দের মধ্যে একজনের মালিকানাধীন উটনীর সাথে কুয়োটির সংশ্লিষ্টতা। এই সংশ্লিষ্টতাকে এতোই উচ্চমর্যাদার দৃষ্টিতে দেখা হয়েছে যে দীর্ঘ সময় পার হয়ে গেলেও কুয়োর পানিকে শ্রদ্ধা করা হয়েছে এবং এর আশীর্বাদ-ও বহাল আছে।

২.৪.৪ সামূদের প্রতি বিধানকৃত শাস্তি স্মরণকালে দুঃখ প্রকাশ

সামূদ গোত্র কর্তৃক পৃথিবীর বুকে সর্বশেষ হাঁটার সময় হতে এ যাবত দীর্ঘকাল অতিবাহিত হয়েছে। এখন তাদের অার লেশচিহ্ন মাত্রও অবশিষ্ট নেই। যে বদনসিব তাদের আক্রান্ত করেছিল, তা-ও বর্তমানে দূর-অতীত। তথাপি রাসূলুল্লাহ (দ:) তাঁর পুণ্যবান সাহাবাবৃন্দ (রা:)-কে তাদের বসতভিটায় প্রবেশ করতে বারণ করেছিলেন এবং আরো আদেশ করেছিলেন যেন তাঁরা ওই ধ্বংসাবশেষ অতিক্রমের সময় দুঃখভারাক্রান্ত চিত্তে ও অশ্রুসজল নয়নে তা পার হন, যাতে মনে হয় শাস্তি এখনো তাঁদের ওপর পড়ছে।

হযরত আবদুল্লাহ বিন উমর (রা:) উদ্ধৃত করেন মহানবী (দ:)-কে, যিনি এরশাদ ফরমান: যারা নিজেদের (আত্মার) প্রতি যুলূম করেছিল, তাদের বসতিতে অশ্রুসিক্ত (ও বেদনার্ত) অবস্থা ছাড়া প্রবেশ করো না, পাছে তোমাদের প্রতিও অনুরূপ শাস্তি এসে পড়ে। [আল-বুখারী রচিত ‘আল-সহীহ: কিতা’ব আল-আম্বিয়া’, ‘আল্লাহর বাণী: আর সামূদের প্রতি তাদের ভাই সালেহ’ শীর্ষক অধ্যায়, ৩:১২৩৭ #৩২০০-৩২০১; মুসলিম কৃত ‘আল-সহীহ: কিতা’ব আল-যুহদ’, ‘যারা নিজেদের প্রতি যুলূম করেছে তাদের বসতিতে প্রবেশ করো না’ শীর্ষক অধ্যায়, ৪:২২৮৫-২২৮৬ #২৯৮০; আহমদ ইবানে হাম্বল প্রণীত ‘আল-মুসনাদ’, ২:৯৬; ইবনে হিব্বান কৃত ‘আল-সহীহ’, ১৪:৮০ #৬১৯৯; এবং আল-রূইয়্যা’নী রচিত ‘আল-মুসনাদ’, ২:৪০৭ #১৪০৯]

এই হতভাগ্য সম্প্রদায়ের ব্যাপারে বিশ্বনবী (দ:)-এর নির্দেশ ছিল এ মর্মে যে, দুঃখভারাক্রান্ত চিত্তে ও অশ্রুসিক্ত নয়নে  তাদের ধ্বংসাবশেষ অতিক্রম করতে হবে। সর্বাধিক করুণাময় রাসূল (দ:) তাঁর পুণ্যবান সাহাবাবৃন্দের (রা:) মাধ্যমে এই উম্মতকে এটা  শিক্ষা দিয়েছেন যেন আমরা যখন বিলীন জাতিগোষ্ঠীগুলোর ঐতিহাসিক ঘটনাবলীর কথা স্মরণ করবো, তখন আল্লাহর প্রতি এমন বিনয় প্রকাশ করবো যাতে ওই জাতিগোষ্ঠী যেভাবে খোদায়ী শাস্তি দ্বারা আক্রান্ত হয়েছিল সেভাবে আমরাও আক্রান্ত না হই। যদিও দৃশতঃ (সাহাবা-মণ্ডলীর মাঝে) মহানবী (দ:)-এর সম্মানিত উপস্থিতি এধরনের (আযাবের) ঘটনা রহিত করার অসীলাস্বরূপ, তবু তাঁদেরকেও দুঃখ-বেদনাময় ভাবাপ্লুত হতে বলা হয়েছে। এই হাদীস হতে আমরা এ শিক্ষা-ই পেয়েছি।

এই বিষয়টি অন্তর ও আত্মার অনুভূতি ও আবেগের সাথে সম্পৃক্ত। ইমাম মুসলিম (রহ:) ওপরে বর্ণিত এ হাদীসটি তাঁর ‘আল-সহীহ’ গ্রন্থের ‘কিতাব আল-রাক্বা’য়েক্ব’ (আত্ম-অস্বীকৃতি ও অন্তর কোমলকরণ) শীর্ষক বইয়ে উদ্ধৃত করেন। ইমাম সাহেব (রহ:) চেয়েছেন এই বার্তা পৌঁছে দিতে যে বিষয়টি ওইসব আমল (পুণ্যদায়ক কাজ) ও অনুশীলনের সাথে সম্পর্কিত, যেগুলো কারো অন্তর ও আত্মার ওপর আধ্যাত্মিক প্রভাব ফেলে। এধরনের ঐতিহাসিক ঘটনা উল্লেখ করার মাধ্যমে কারো অন্তস্তলে বিশেষ এক অনুভূতি বা আবেগ সৃষ্টি হয়, যার ফলে সে আধ্যাত্মিক পর্যায়ে তার জীবনে পরিবর্তন নিয়ে আসে। কারো আত্মার মনস্তাত্ত্বিক বা আধ্যাত্মিক উপকার যদি এতে নিহিত না থাকতো, তাহলে সর্বাধিক দয়াশীল রাসূলুল্লাহ (দ:) কেন তাঁর সাহাবায়ে কেরাম (রা:)-কে পুনরায় ওই অভিজ্ঞতা পেতে নির্দেশনা দানের প্রয়োজনীয়তা অনুভব করতেন? তাঁদের আত্মিক হাল তথা অবস্থার পরিশুদ্ধি বা উন্নতিতে প্রভাব ফেলে না এমন কোনো কাজ করতে তো তিনি তাঁদেরকে আদেশ দিতে পারতেন না। তিনি তাঁদেরকে এটা করতে নির্দেশ দেয়ার বাস্তবতা-ই প্রমাণ করে যে এসব অবস্থা ব্যতিক্রমহীনভাবে প্রভাব ফেলে থাকে।

হযরত আবদুল্লাহ বিন উমর (রা:) বর্ণনা করেন মহানবী (দ:)-এর হাদীস, যিনি এরশাদ ফরমান: এসব (খোদায়ী) শাস্তিপ্রাপ্ত লোকদের বসতিতে অশ্রুসিক্ত অবস্থা ছাড়া প্রবেশ করো না। অশ্রুসজল না হতে পারলে তাতে প্রবেশ করো না, যাতে অনুরূপ অভিসম্পাত তোমাদের ওপর এসে না পড়ে। [আল-বুখারী লিখিত ‘আল-সহীহ: কিতা’ব আল-মাসা’জিদ’, ‘শাস্তির এলাকায় নামায’ শীর্ষক অধ্যায়, ১:১৬৭ #৪২৩; আল-বুখারী কৃত ‘আল-সহীহ: কিতা’ব আল-মাগা’যী’, ‘আল-হিজর এলাকায় মহানবী (দ:)-এর শিবির স্থাপন’ শীর্ষক অধ্যায়, ৪:১৬০৯ #৪১৫৮; মুসলিম রচিত ‘আল-সহীহ: কিতা’ব আল-যুহদ’, ‘যারা নিজেদের প্রতি যুলূম করেছে তাদের বসতিতে প্রবেশ করো না’ শীর্ষক অধ্যায়, ৪:২২৮৫ #২৯৮০; আল-বায়হাক্বী প্রণীত ‘আল-সুনান আল-কুবরা’, ২:৪৫১; এবং আবদ বিন হুমায়দ লিখিত ‘আল-মুসনাদ’, ১:২৫৫ #৭৯৮]

প্রিয়নবী (দ:) তাঁর সাহাবা-এ-কেরাম (রা:)-কে সামূদ গোত্রের লোকদের বসতভিটায় প্রবেশ করতে এমনভাবে মানা করেন যেন তারা এখনো সেখানে জীবিতাবস্থায় আছে। এটা এ কারণে যে, (পয়গম্বর সালেহ আলাইহিস্ সালামের) মাদী উটকে হত্যা করার অপরাধে আল্লাহতা’লা তাদেরকে দৃষ্টান্তমূলক শাস্তির বিধান করেন। যদিও এ ঘটনা দীর্ঘকাল আগে ঘটেছিল, তবুও সর্বাধিক দয়াবান রাসূল (দ:)-ই এখানে খোদায়ী প্রতিবিধানের কথা স্মরণ করানোর জন্যে এবং প্রত্যেকের অন্তরে আল্লাহর প্রতি ভয় সৃষ্টির লক্ষ্যে নির্দেশ প্রদান করেছেন।

মহাসম্মানিত নবী করীম (সাল্লাল্লাহু আলাইহে ওয়া সাল্লাম) তাঁর পুণ্যবান সাহাবা (রা:)-মণ্ডলীকে আদেশ করেন যেন তাঁদের চোখের সামনে আল্লাহর শাস্তি ভেসে ওঠে, যাতে ওই ধ্বংসাবশেষ অতিক্রমকালে তাঁদের অন্তরে আল্লাহর শাস্তি পতিত হওয়ার ভীতির দরুন তাঁদের কান্না আসে। আর এটা তাঁরা না করতে পারলে তাঁদেরকে ওই উপত্যকায় প্রবেশ করতেই বারণ করা হয়। কতিপয় সাহাবা (রা:) হুযূর পূর নূর (দ:)-এর কাছে আরয করেন এই মর্মে যে তাঁরা যদি বেদনায় অশ্রুসজল না হতে পারেন, তাহলে তাঁরা কী করবেন। হযরত আবদুল্লাহ বিন উমর (রা:) সাহাবামণ্ডলী (রা:)-এর এই আর্জির পরিপ্রেক্ষিতে মহানবী (দ:)-এর উত্তর বর্ণনা করেন এভাবে: তোমরা কাঁদতে না পারলে কান্নাকাটি করার চেষ্টা করো এ আশঙ্কায় যে তাদের প্রতি পতিত শাস্তি তোমাদের প্রতিও পতিত হতে পারে। [ইবনে কাসীর রচিত ‘আল-বেদা’য়া ওয়াল-নেহা’য়া’, ১:১৩৮; ইবনে কাসীর কৃত ’আল-তাফসীর আল-ক্বুরআ’ন আল-আযীম’, ২:৫৫৭; এবং আল-আসক্বালা’নী প্রণীত ‘ফাতহুল বা’রী’, ৬:৩৮০]

কান্নাকাটি করা শ্রেয়তর; কিন্তু কেউ তা না পারলে তার উচিত যে ব্যক্তি এটা পেরেছে, তাকে অনুকরণ করা। এর মূল উদ্দেশ্য হলো, আল্লাহতা’লার শাস্তির কথা চিন্তা করে মানুষ যেন খোদাভীরুতা অর্জন করে, এবং এরই ফলে মহান প্রভুর প্রতি বিনয়ী হয় এবং তাঁরই আশ্রয় প্রার্থনা করে। এই ঘটনা বহুকাল আগে ঘটেছিল এবং এর মুহূর্তগুলোও অতিবাহিত হয়েছে। এতদসত্ত্বেও প্রিয়নবী (দ:) তাঁর পুতঃপবিত্র সাহাবাবৃন্দ (রা:)-কে সাথে নিয়ে এই ঘটনার স্মৃতি রোমন্থনের মাধ্যমে একে জীবন্ত করে রেখেছেন।

২.৪.৫ আল-হিজর অতিক্রমকালে মহানবী (দ:)-এর নিজস্ব আমল

সামূদ গোত্রের বসতি অতিক্রমকালে সৃষ্টিকুল শিরোমণি মহানবী (দ:) আপন চলার গতি বাড়িয়ে দেন, আর আপন চাদর দ্বারা নিজেকে আচ্ছাদিত করেন এমনভাবে যেন (খোদায়ী) শাস্তি বুঝি ওই সময়েও পতিত হচ্ছিল।

হযরত আবদুল্লাহ ইবনে উমর (রা:) বর্ণনা করেন: রাসূলুল্লাহ (দ:) তাঁর সওয়ারের জন্তুর ওপর বসা অবস্থাতেই আপন চাদর দ্বারা নিজেকে আবৃত করেন। [আল-বুখারী প্রণীত ‘আল-সহীহ: কিতা’ব আল-আম্বিয়া’, ‘আল্লাহর বাণী: আর সামূদের প্রতি তাদের ভাই সালেহ’ শীর্ষক অধ্যায়, ৩:১২৩৭ #৩২০০; আহমদ ইবনে হাম্বল কৃত ‘আল-মুসনাদ’, ২:৬৬; আল-নাসাঈ রচিত ‘আল-সুনান আল-কুবরা’, ৬:৩৭৩ #১১,২৭০; এবং ইবনে মুবারক লিখিত ‘আল-যুহদ’, পৃষ্ঠা নং ৫৪৩ #১৫৫৬]

হযরত আবদুল্লাহ ইবনে উমর (রা:) আরো বর্ণনা করেন: মহানবী (দ:) আল-হিজর অতিক্রম করার সময় বলেন, “যারা নিজেদের প্রতি যুলূম করেছে, তাদের বসতিতে তোমরা প্রবেশ করো না, পাছে তোমাদের ওপরও ওই শাস্তি পতিত হয়। বরঞ্চ তোমরা তাদেরকে অতিক্রম করো কান্নারত অবস্থায়।” অতঃপর রাসূলুল্লাহ (দ:) তাঁর শির মোবারক ঢেকে দ্রুতবেগে সেই স্থান পার হয়ে যান। [আল-বুখারী রচিত ‘আল-সহীহ: কিতা’ব আল-মাগা’যী’, ‘আল-হিজরে মহানবী (দ:)-এর সেনাশিবির’ শীর্ষক অধ্যায়, ৪:১৬০৯ #৪১৫৭; মুসলিম কৃত ‘আল-সহীহ’: কিতা’ব আল-যুহদ’, ‘যারা নিজেদের প্রতি যুলূম করেছে তাদের বসতিতে প্রবেশ করো না’ শীর্ষক অধ্যায়, ৪:২২৮৬ #২৯৮০; আবদুর রাযযাক্ব প্রণীত ‘আল-মুসান্নাফ’, ১:৪১৫ #১৬২৪; এবং আল-বায়হাক্বী লিখিত ‘আল-সুনান আল-কুবরা’, ২:৪৫১]

প্রিয়নবী (দ:) কর্তৃক উক্ত উপত্যকা দ্রুত অতিক্রম করার সময় নিজ শির মোবারককে ঢেকে রাখা এবং এর পাশাপাশি তাঁর পুণ্যবান সাহাবাবৃন্দ (রা:)-কে কান্নারত অবস্থায় এলাকাটি পার হতে বলাটা এমন এক আমল, যা’তে নিহিত  রয়েছে আমাদের জন্যে গভীর জ্ঞান ও প্রজ্ঞা।

২.৪.৫.১ বিবেচনাযোগ্য বিষয়াবলী  

এসব হাদীসের আলোকে নিম্নের সিদ্ধান্তগুলো নেয়া যায়:

প্রথমতঃ আমাদের মনে রাখতে হবে যে সর্বসেরা আধ্যাত্মিক ক্ষমতাবান নবী করীম (দ:)-এর উপস্থিতি-ই আল্লাহতা’লার করুণার এক উৎস এবং তাঁর গযব (রোষ/অসন্তুষ্টি) ও আযাব (শাস্তি) নিরোধক। অতএব, প্রিয়নবী (দ:) সাহাবা-এ-কেরাম (রা:)-এর মাঝে স্বশরীরে উপস্থিত থাকা অবস্থায় শাস্তি পতিত হওয়ার বিন্দুমাত্র সম্ভাবনা ছিল না। উপরন্তু, ওই সেনা অভিযানে শরীক হয়েছিলেন হুযূর পাক (দ:)-এর পুণ্যবান সাহাবীবৃন্দ (রা:), যাঁদের মধ্যে একজনও বে-ঈমান ছিলেন না, আল্লাহ মাফ করুন। ইতিহাসজুড়ে এর চেয়ে শ্রেয়তর সঙ্গি-সাথী পৃথিবীর বুকে আর কেউই ছিলেন না। এরকম মহান ব্যক্তিত্বদের প্রতি আল্লাহতা’লা শাস্তির বিধান করবেন, এ কথা কি চিন্তাও করা যায়?

ওই সময় সামূদ গোত্রের লোকেরা, যারা মাদী উটের পেশীতন্তু কেটে হত্যার মতো জঘন্য অপরাধ করেছিল, তারা আর জীবিত ছিল না। এতদসত্ত্বেও সবচেয়ে দয়াবান মহানবী (দ:) তাঁর পুতঃপবিত্র সাহাবা (রা:)-বৃন্দকে এ মর্মে উপদেশ দেন যেন তাঁরা শাস্তি পতিত হওয়ার ঘটনাটি কল্পনা করেন এবং তাঁদের অন্তর ও মস্তিষ্কে এর ভয় ও আশঙ্কার অভিজ্ঞতা সঞ্চয় করেন। এর ফলে প্রত্যেক সাহাবী (রা:)-ই প্রচুর কান্নাকাটি করেন এবং এই বিবেকের দংশন অনুভব করেন যে শাস্তি প্রকৃতপক্ষে তৎক্ষণাৎ পতিত হতে যাচ্ছে।

দ্বিতীয়তঃ আরেকটি গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হলো, এই সেনা অভিযানে মহান সাহাবী (রা:)-বৃন্দ একা ছিলেন না, তাঁদের সাথে উপস্থিত ছিলেন সৃষ্টিকুল শিরোমণি, মহাসম্মানিত পয়গম্বর (সাল্লাল্লাহু আলাইহে ওয়া সাল্লাম) স্বয়ং। এ প্রসঙ্গে আল্লাহতা’লা এরশাদ ফরমান: “এবং আল্লাহর কাজ এ নয় যে তাদেরকে শাস্তি দেবেন যতোক্ষণ পর্যন্ত হে মাহবূব, আপনি তাদের মধ্যে উপস্থিত থাকবেন।” [আল-ক্বুরআ’ন, ৮:৩৩; মুফতী আহমদ এয়ার খাঁন সাহেব কৃত ‘তাফসীরে নূরুল এরফান’]

খোশ-খবরীর (মানে ঐশী সুসংবাদের) ব্যাপারে ওয়াকেফহাল থাকা সত্ত্বেও পুণ্যবান সাহাবা-এ-কেরাম (রা:) ‘সামূদ’ গোত্রের (করুণ) পরিণতি সম্পর্কে স্মৃতিচারণ করেন এবং আল্লাহ-ভীতির (তাক্বওয়ার) কারণে তাঁর প্রতি সমর্পিত হন। এটা অনুশীলন করে তাঁরা বাস্তবায়ন করেন প্রিয়নবী (দ:)-এর শিক্ষাসমূহ এবং পূরণ করেন দ্বীন-ইসলামের একটি প্রয়োজনীয় শর্ত, যথা – (ঐশীদানের) আনন্দঘন মুহূর্তে খুশি ও দুঃখ-বেদনার সময় শোক প্রকাশ। অন্তর ও মস্তিষ্কে মনস্তাত্ত্বিক পরিবেশ সৃষ্টির লক্ষ্যে প্রত্যেকের উচিত ঘটনা হতে প্রত্যাশিত আবেগগুলোর রোমন্থন করা। কারো অন্তরে এ ধরনের আবেগ ও অনুভূতি গড়ে তোলার জন্যে একটি জায়গা বানিয়ে রাখা হয়েছে।

এখানে উল্লেখ্য যে, কোনো কিছু স্বাভাবিকভাবে অনুভব করা আর কোনো কিছুর জন্যে অনুভূতি সৃষ্টি করার মধ্যে বিস্তর পার্থক্য বিরাজমান। কোনো ব্যক্তির যখন বিশ্বাস অটল-অবিচল এবং তার চেনাজানার সম্পর্ক-ও সুদৃঢ়, তখন তার আবেগ বৃদ্ধি পায় প্রেরণার ভিত্তিতে। কেউ এটা অর্জন করতে পারেন শুধুমাত্র রাসূলুল্লাহ (দ:)-এর প্রতি নিজের গোলামির প্রকৃত মর্ম উপলব্ধির মাধ্যমেই। কোনো দুঃখ-বেদনার ঘটনায় শোকের কারণে কারো অশ্রু প্রয়াসহীনভাবে গড়িয়ে পড়ে; আর খুশির ঘটনার মুহূর্তে উৎফুল্লচিত্তের কারণে কেউ স্বাভাবিকভাবেই স্মিতহাস্য করেন। এ উপায়ে অতীত ঘটনাবলীর স্মৃতিচারণ করাটা মহানবী (দ:)-এর উদ্দেশ্যের সাথে একদম সঙ্গতিপূর্ণ, আর এ বিষয়টি হাদীসগুলো হতে সপ্রমাণিত।

সবশেষে যে বিষয়টি উল্লেখযোগ্য তা হলো, পরম দয়াবান মহানবী (দ:) শুধু তাঁর মহান সাহাবা (রা:)-বৃন্দকে কান্নারত অবস্থায় উপত্যকাটি অতিক্রম করতে বলেই ক্ষান্ত হননি, বরঞ্চ তিনি নিজেও তা অতিক্রমের সময় কাপড় দ্বারা আপন শির মোবারককে আবৃত করেছিলেন এবং তাঁর সওয়ারকৃত উট দ্রুতবেগে ছুটিয়েছিলেন। এটা (দেখে) কারো কাছে এমন মনে হতে পারতো যে রাসূলুল্লাহ (দ:) ধ্বংসের মুখোমুখি (সামূদের) এসব লোকজন হতে বহু দূরে সরে যেতে চাইছিলেন।

প্রিয়নবী (দ:) এ রকম (আচরণ) করার কী প্রয়োজনীয়তা অনুভব করেছিলেন, যদিও বাস্তবতা ছিল এ ঘটনা বহু হাজার বছর আগে ঘটেছিল? আল্লাহর দৃষ্টিতে সর্বোচ্চ মর্যাদাবান পয়গম্বর সাল্লাল্লাহু আলাইহে ওয়া সাল্লামের মাক্বাম এমন-ই যে তিনি যেখানে যেতেন, সেখানেই রহমত (আশীর্বাদ) নাযেল হতো, আর শাস্তি নিবারণ হতো। মহানবী (দ:) স্বয়ং হচ্ছেন (খোদায়ী) করুণার পরমোৎকর্ষের মূর্ত রূপ এবং মানবজাতির সুপারিশকারী ত্রাতা। যাঁর খাতিরে আল্লাহতা’লা নিজের আরোপিত শাস্তি ফিরিয়ে নেন, তিনি কীভাবে ওই শাস্তির ভয়ে মুহ্যমান থাকবেন? এ ধরনের চিন্তা করাটাও অসম্ভব, এমন কি সবচেয়ে দুর্বল ঈমানদার ব্যক্তিও এভাবে চিন্তা করবেন না। অতএব, হুযূর পূর নূর (দ:) যদি ওই হালত তথা (মানসিক) অবস্থায় উপত্যকাটি ছেড়ে যান, তাহলে স্রেফ উম্মতকে শিক্ষাদানের উদ্দেশ্যেই তিনি তা করেছিলেন।

২.৫ হস্তীবাহিনীর লোকদের প্রতি অবতীর্ণ শাস্তির স্মরণ এবং মুহাসসির উপত্যকা দ্রুত অতিক্রম

মুহাসসির উপত্যকা কোথায় অবস্থিত, এ ব্যাপারে মতপার্থক্য রয়েছে। একটি মত হলো, স্থানটি মুযদালিফা’র কাছে [এয়া’ক্বূত আল-হামাভী কৃত ‘মু’জাম আল-বুলদা’ন’, ১:৪৪৯]। ফযল ইবনে আব্বা’স (রহ:)-এর ভাষ্য মোতাবেক আরেকটি মত হলো তা মিনা’য় অবস্থিত [মুসলিম রচিত ‘আল-সহীহ: কিতা’ব আল-হাজ্জ্ব’, ‘হাজ্বীর পাঠকৃত তালবিয়্যার সময়কাল’ শীর্ষক অধ্যায়, ২:৯৩১ #১২৮২; আল-নাসা’ঈ প্রণীত ‘আল-সুনান: কিতা’ব আল-মানা’সিক আল-হাজ্জ্ব’, ‘আরাফা হতে সফরের সময় শান্ত থাকার নির্দেশ’ শীর্ষক অধ্যায়, ৫:২৮৫ #৩০২০; আল-নাসা’ঈ লিখিত ‘আল-সুনান আল-কুবরা’, ২:৪৩৪ #৪০৫৬; আহমদ ইবনে হাম্বল কৃত ‘আল-মুসনাদ’, ১:২১০ #১৭৯৬; এবং আল-বায়হাক্বী রচিত ‘আল-সুনান আল-কুবরা’, ৫:১২৭ #৯৩১৬]। শায়খ আবদুল হক্ব মোহাদ্দিসে দেহেলভী (রহ:) এই দুটো মতের মধ্যে সমন্বয় করে বলেন যে মুহাসসির উপত্যকা প্রকৃতপক্ষে মিনা’মুযদালিফা’র মধ্যবর্তী স্থানে অবস্থিত [শায়খ আবদুল হক্ব দেহেলভী প্রণীত ‘আশয়াত আল-লুম’আ’ত শরহে মিশকা’ত আল-মাসা’বিহ’, ২:৩৪৫] মুযদালিফা’র আশপাশ এলাকাটিতে হাজ্বী সাহেবান অবস্থান করলেও মুহাসসির উপত্যকাটি ওই এলাকার বাইরে হওয়ায় সেখানে অবস্থান করতে তাঁদেরকে নিষেধ করা হয়েছে [আহমদ ইবনে হাম্বল কৃত ‘আল-মুসনাদ’, ৪:৮২ #১৬,৭৯৭; ইবনে হিব্বা’ন রচিত ‘আল-সহীহ’, ৯:১৬৬ #৩৮৫৪; আল-শায়বা’নী প্রণীত ‘’কিতা’ব আল-মাবসূত’, ২:৪২২; ইবনে আবী শায়বা লিখিত ‘আল-মুসান্নাফ’, ৩:২৪৬ #১৩৮৮৪-১৩৮৮৫; আল-দায়লামী রচিত ‘আল-ফেরদৌস বি-মা’সূর আল-খিতা’ব’, ৩:৪৪ #৪১১৩; আল-বায়হাক্বী কৃত ’আল-সুনান আল-কুবরা’, ৯:২৯৫ #১৯,০২১; আল-তাবারা’নী প্রণীত ‘আল-মু’জাম আল-কবীর’, ২:১৩৮ #১৫৮৩; আল-হায়সামী লিখিত ‘মজমা’ আল-যাওয়া’ঈদ ওয়া মানবা’ আল-ফাওয়া’ঈদ’, ৩:২৫১; এবং আল-হায়সামী কৃত ‘মজমা’ আল-যাওয়া’ঈদ ওয়া মানবা’ আল-ফাওয়া’ঈদ’, ৪:২৫]

যিলহজ্জ্ব মাসের ১০ তারিখ সূর্যোদয়ের প্রাক মুহূর্তে (ফজরের দুই রাক’আত নামায পড়ার সময়ে) হাজ্বী সাহেবান তালবিয়্যা পাঠ করতে করতে মিনা’র উদ্দেশ্যে মুযদালিফা ত্যাগ করেন; আর যখন তাঁরা মুহাসসির উপত্যকায় পৌঁছেন, তখন তাঁদেরকে আল্লাহর শাস্তি হতে বাঁচতে তাঁরই কাছে আশ্রয় প্রার্থনা করতে করতে দ্রুতবেগে সে স্থান অতিক্রম করতে হয়। [ওয়াহবা আল-যুহায়লী রচিত ‘আল-ফিকহু আল-ইসলা’মী ওয়া আদিল্লাতুহু’, ৩:২১৬৮]

কেন এটা এরকম? এ কারণে যে, প্রিয়নবী (দ:)-এর বেলাদত তথা ধরাধামে শুভাগমনের আগে বাদশাহ আবরাহা এক হস্তীবাহিনীসহ কা’বা শরীফ ধ্বংস করার ইচ্ছা করেছিল। তার অসৎ উদ্দেশ্য চরিতার্থ করতে সে মুহাসসির উপত্যকায় পৌঁছুলে সর্বশক্তিমান আল্লাহতা’লার গযব (রোষ) তার ওপর অবতীর্ণ হয়। এক ঝাঁক (আবাবীল) পাখি ওপর থেকে কঙ্কর নিক্ষেপ করে তাকে এবং তার হস্তীবাহিনীকে নিশ্চিহ্ন করে দেয় [ইবনে হিশা’ম প্রণীত ‘অাল-সীরা আল-নাবাউইয়্যা’, পৃষ্ঠা ৬৫-৬৭; ইবনে আসীর কৃত ‘আল-কা’মিল ফী আল-তা’রীখ’, ১:৪৪২-৪৪৭; আল-সুহায়লী রচিত ‘আল-রওদ আল-উনুফ ফী তাফসীর আল-সীরা আল-নাবাউইয়্যা লি-ইবনে হিশা’ম’, ১:১১৭-১২৬; ইবনে আল-ওয়ার্দী লিখিত ‘তাতিম্মা আল-মুখতাসার ফী আখবা’র আল-বাশর’, ১:৯২; ইবনে কাসীর প্রণীত ‘আল-বেদা’য়া ওয়া আল-নেহা’য়া’, ২:১০১-১১০; আল-কসতলা’নী কৃত ‘আল-মাওয়া’হিব আল-লাদুন্নিয়্যা’, ১:৯৯-১০৪; আল-সা’লেহী রচিত ‘সুবুল আল-হুদা’ ওয়া আল-রাশা’দ ফী সীরা খায়র আল-এবা’দ’, ১:২১৭-২২২; এবং আল-যুরক্বা’নী লিখিত ‘শরহু আল-মাওয়া’হিব আল-লাদুন্নিয়্যা’, ১:১৫৬-১৬৬]। এই ঘটনাটি কুরআনে করীমের সূরা ফীল, অর্থাৎ, হস্তী অধ্যায়ে লিপিবদ্ধ আছে এভাবে:

হে মাহবূব! আপনি কি দেখেননি আপনার রব্ব ওই হস্তী আরোহী বাহিনীর কী অবস্থা করেছেন? তাদের চক্রান্তগুলোকে কি তিনি ধ্বংসের মুখে ছুঁড়ে ফেলেননি? এবং তাদের ওপর পাখির ঝাঁকগুলোকে প্রেরণ করেছেন; যেগুলো তাদেরকে কঙ্কর-পাথর দিয়ে হনন করছিল। অতঃপর (তিনি) তাদেরকে চর্বিত ক্ষেতের পল্লবের মতো করেছেন। [আল-ক্বুরআ’ন, ১০৫:১-৫]

এ কারণেই হজ্জ্ব পালনকালে মহানবী (দ:) তাঁর পুণ্যবান সাহাবা-এ-কেরাম (রা:)-কে মুহাসসির উপত্যকাটি তাড়াতাড়ি পার হয়ে যেতে আদেশ করেন। তাঁদের আচরণ ছিল শঙ্কার, যেন এই বুঝি শাস্তি এসে পড়বে; যে শাস্তি প্রকৃতপক্ষে বহু বছর আগেই আবরাহা ও তার হস্তীবাহিনীর ওপর অবতীর্ণ হয়েছিল। এতদসত্ত্বেও প্রিয়নবী (দ:) তাঁর পুতঃপবিত্র সাহাবাবৃন্দ (রা:)-কে তাঁদের নিজেদের মধ্যে আল্লাহভীতির এক অনুভূতি/হাল জাগিয়ে তুলতে বলেন। তিনি নিজেও একই কাজ করেন, আর উপত্যকাটি ত্বরিত অতিক্রম করেন।

মুহাসসির উপত্যকা পার হওয়ার সময় হুযূর পাক (দ:)-এর হাল/অবস্থা হযরত আলী (কাররামাল্লাহু ওয়াজহাহূ) বর্ণনা করেন এভাবে: তিনি মুহাসসির উপত্যকা পর্যন্ত গমন করলে তাঁর উটের লাগাম আপন পবিত্র হাতে নেন, আর উটটি দ্রুত উপত্যকা পার হয়ে যায়। অতঃপর তিনি থামেন। [আল-তিরমিযী প্রণীত ‘আল-জামে’ আল-সহীহ: কিতা’ব আল-হাজ্জ্ব’, ‘গোটা আরাফা দাঁড়াবার জায়গা মর্মে যাবতীয় বর্ণনা’ শীর্ষক অধ্যায়, ৩:২৩২ #৮৮৫; আহমদ ইবনে হাম্বল কৃত ‘আল-মুসনাদ’, ১:৭৫ #৫৬২; ইবনে খুযাইমা রচিত ‘আল-সহীহ’, ৪:২৭২ #২৮৬১; আল-বাযযার লিখিত ‘আল-বাহর আল-যুখা’র’, ২:১৬৫ #৫৩২; এবং আবূ এয়া’লা’ প্রণীত ‘আল-মুসনাদ’, ১:২৬৪ #৩১২]

শায়খ আবদুল হক্ক মোহাদ্দেসে দেহেলভী (৯৫৮-১০৫২ হিজরী) লেখেন: পদব্রজে হোক, বা সওয়ারে চড়ে হোক, এই উপত্যকাটি দ্রুত পার হওয়া মুস্তাহাব (প্রশংসনীয় আমল)। [আবদুল হক্ক দেহেলভী রচিত ‘আশ’আত আল-লোম’আত শরহে মিশকা’ত আল-মাসা’বীহ’, ২:৩২৪]    

মহানবী (দ:) কেন তাঁর সাহাবাবৃন্দকে (রা:) উপত্যকাটি দ্রুতবেগে অতিক্রম করতে নির্দেশ দিয়েছিলেন? এখন তো আর (আবাবীল) পাখির ঝাঁক বা কঙ্করবৃষ্টির অস্তিত্ব-ই নেই। এর উত্তর হচ্ছে এটা এমনই এক আমল (অনুশীলন), যা থেকে আমরা উপদেশ ও সতর্কবাণী এবং নিজেদের আধ্যাত্মিক অবস্থার উন্নতিসাধন সংক্রান্ত শিক্ষা গ্রহণ করতে পারি। উপত্যকাটিতে তাড়াতাড়ি পার হওয়ার এই ব্যাপারটি শেষ বিচার দিবস পর্যন্ত অনুশীলনীয় একটি সুন্নাহ’তে পরিণত হয়েছে, আর হাজ্বীদেরকে এই স্থানটি ত্বরিত অতিক্রমের হুকুম দেয়া হয়েছে।

এর পেছনে একটি উদ্দেশ্যই নিহিত আর তা হলো, অতীত ঘটনাবলী প্রত্যেকের অন্তরে স্মরণীয় হয়ে থাকা এবং মস্তিষ্কে সেগুলোকে দৃঢ়ভাবে গেঁথে রাখা। ওপরোক্ত হাদীসগুলো এর সত্যতা প্রতিপাদন করে; এধরনের ঐতিহাসিক ঘটনা দ্বীন-ইসলামের শিক্ষায় একটি গুরুত্বপূর্ণ স্থান দখল করে আছে।   

২.৬ হযরত উমর ফারূক (রা:) কর্তৃক ব্যক্ত অনুতাপ

কারো দ্বারা স্মৃতিরোমন্থনে আনন্দ-বেদনার আবেগ-অনুভূতি লাভ করা একেবারেই স্বাভাবিক; তাদের চেহারাতেই ওই অভিব্যক্তি দৃশ্যমান হয়। কোনো আনন্দঘন মুহূর্ত দেখা দিলে মানুষের চেহারা উজ্জ্বল হয়ে ওঠে; কিন্তু দুঃখবেদনায় চোখ বেয়ে অশ্রু ঝরে। এই সূত্রে হযরত উমর ইবনে খাত্তাব (রা:)-এর একটি ঘটনা বর্ণিত হয়েছে: হযরত আবদুর রাহমান বিন আবী লায়লা (রা:) বর্ণনা করেন, হযরত উমর (রা:) ফজরের নামাযে আমাদের ইমাম হন। তিনি সূরা ইউসুফ তেলাওয়াত করছিলেন যখন নিম্নের আয়াতে পৌঁছেন – “আর তাঁর নয়নযুগল শোক-সন্তাপে শ্বেতবর্ণ ধারণ করেছিল, কিন্তু তিনি তাঁর দুঃখ চেপে রেখেছিলেন।” এ সময় হযরত উমর (রা:) কাঁদতে থাকেন অঝোর ধারায়। এরপর তিনি রুকু (দাঁড়িয়ে নত) অবস্থায় গমন করেন। [আল-শায়বানী লিখিত ‘কিতা’ব আল-হুজ্জা ‘আলা’ আহল আল-মাদীনা’, ১:১১৩ ও ১১৫-১১৬; এবং আল-তাহা’বী প্রণীত ‘শারহ মা’আনী আল-আসা’র’: কিতা’ব আল-সালা’ত’, ‘ফজর ওয়াক্তের সময়’ শীর্ষক অধ্যায়, ১:২৩৩ #১০৫১]

ইবনে আবযী বলেন, আমি হযরত উমর (রা:)-এর ইমামতিতে নামায পড়ছিলাম। তিনি সূরা ইউসুফ তেলাওয়াত করছিলেন যখন নিম্নের আয়াতে উপনীত হন – “আর তাঁর নয়নযুগল শোক-সন্তাপে শ্বেতবর্ণ ধারণ করেছিল, কিন্তু তিনি তাঁর দুঃখ চেপে রেখেছিলেন।” এমতাবস্থায় হযরত উমর (রা:) কান্নায় আপ্লুত হয়ে পড়েন; অতঃপর তিনি রুকূতে যান। [ইবনে ক্বুদা’মা রচিত ‘আল-মুগ্বনী’, ১:৩৩৫]

এই হাদীসগুলোতে আমরা দেখতে পাই যে হযরত উমর (রা:) পয়গম্বর এয়াক্বূব (আ:)-এর কষ্টে দুঃখ প্রকাশ করেছিলেন। রাসূলুল্লাহ (দ:)-এর আহাদীসে এবং ক্বুরআন মজীদের তাফসীরগুলোতে এমন অসংখ্য নজির আছে, যা প্রমাণ করে যে ঈমানদারীর নির্যাস মানুষের অন্তরের অন্তস্তলে নিহিত – এই হালত বা আত্মিক/আধ্যাত্মিক অবস্থার ধারণ প্রত্যেক ঈমানদারকে এর মিষ্টস্বাদের আশীর্বাদ এনে দেয়। এমন কি মহানবী (দ:)-এর প্রতি ঈমান আনাও মূলতঃ কোনো ঈমানদারের অন্তরসংশ্লিষ্ট বৈশিষ্ট্য; হুযূর পাক (দ:)-এর আনুগত্য ও অনুসরণ-ও তাঁরই প্রতি ঈমানদারের অন্তরের মহব্বত হতে সৃষ্ট। তাঁর আশীর্বাদধন্য বেলাদত (ধরাধামে শুভাগমন)-কে আল-ক্বুরআনে মানবজাতির জন্যে আল্লাহতা’লার সর্বশ্রেষ্ঠ রহমত (করুণা) হিসেবে বর্ণনা করা হয়েছে [আল-ক্বুরআন, ৩:১৬৪]। এই রহমতের প্রতি কীভাবে কৃতজ্ঞতা প্রকাশ করা যায়? রাসূলুল্লাহ (দ:)-এর এই শুভাগমনকে তার প্রাপ্য সম্মান ও মর্যাদা কীভাবে দেয়া যায়? প্রিয়নবী (দ:)-এর জন্যে ঈমানদারের পরম এশক্ব-মহব্বত কীভাবে প্রকাশ করা যেতে পারে? এসব প্রশ্নের উত্তর আমাদেরকে একটি (সিদ্ধান্তের) দিকেই নিয়ে যায়, আর তা হচ্ছে মওলিদুন্নবী (দ:) উপলক্ষে খুশি প্রকাশ করা। এই শুভক্ষণে আমরা সভা-সমাবেশের আয়োজন করি এবং হুযূর পূর নূর (দ:)-এর ভালোবাসায় আবেগাপ্লুত হই; আমাদের প্রতিটি পদক্ষেপ-ই তাঁর আনুগত্যে আমরা নিয়ে থাকি।

এই আলোচনার সারমর্ম হলো, অতীত ঘটনাবলীর প্রতি আনন্দ বা দুঃখ প্রকাশ এবং নিজের মধ্যে ওই অবস্থা সৃষ্টি করা রাসূলুল্লাহ (দ:)-এর সুন্নাহ’রই আওতায় পড়ে। যদিও মহানবী (দ:)-এর বেলাদত শরীফের পরে চৌদ্দশ বছর অতিক্রান্ত হয়েছে, তবুও ধরাধামে তাঁর আশীর্বাদধন্য শুভাগমনকে স্মরণ করে আমরা আমাদের খুশি প্রকাশ করে থাকি। মওলিদুন্নবী (দ) পালনের ক্ষেত্রে যে কারণে আমরা সর্বাত্মক চেষ্টা করি তা হলো, নবী করীম (দ:) স্বয়ং অতীতে সংঘটিত ঘটনাবলীর ব্যাপারে তাঁর সাহাবা-এ-কেরাম (রা:)-কে সেগুলো স্মরণ করতে আদেশ দিয়েছিলেন এবং ওইসব ঘটনার অভিজ্ঞতা নিজেদের (অন্তরের) মধ্যে পুনরায় জীবন্ত করে তুলতে বলেছিলেন। তাই এটা মহানবী (দ:) ও তাঁর সাহাবা-এ-কেরাম (দ:)-এর সুন্নাহ বটে।

এই ধূলির ধরায় মহানবী (দ:)-এর শুভাগমন আল্লাহতা’লার সর্বসেরা রহমত তথা করুণা; এ এক মহা অনুগ্রহ ও ঐশীদান। এই উম্মতের জন্যে এটা সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ লগ্ন। মা আমেনা (রা:) যে আনন্দ ও আবেগের কম্পনভাব অনুভব করেছিলেন, প্রত্যেক মুসলমান-ব্যক্তিকেও অনুরূপ খুশি ও উৎফুল্লচিত্ত হওয়া চাই। মহাসম্মানিত পয়গম্বর সাল্লাল্লাহু আলাইহে ওয়া সাল্লামের উম্মত হিসেবে মওলিদুন্নবী (দ:)-এর উদযাপনের মাধ্যমে এই চৌদ্দশ বছরের (ঐতিহ্যবাহী) ঘটনার স্মৃতি অন্তরে জাগুরূক রাখা আমাদের জন্যে তাই অবশ্যকর্তব্য হয়েছে।

তৃতীয় অধ্যায়

আম্বিয়া (আ:)-এর মওলিদের স্মরণ: একটি কুরআনী বিশ্লেষণ

ইসলাম ধর্মের বিভিন্ন নিদর্শন বা চিহ্ন, যেগুলো মুসলিম উম্মাহ’র (মানে সমাজের) প্রতি এবাদত-বন্দেগীর আকারে বাধ্যতামূলক হয়েছে, সেগুলো সম্পর্কে পূর্ববর্তী অধ্যায়গুলোতে আমরা একখানা বিশ্লেষণ পেশ করেছি। যদি আম্বিয়া (আ:)-বৃন্দের জীবন এবাদতের মাধ্যমে স্মরণ করা যায়, তাহলে মহানবী (দ:)-এর আশীর্বাদধন্য শুভাগমনকে কেন উদযাপনের মাধ্যমে স্মরণ করা যাবে না? কুরআন মজীদের গভীর অধ্যয়ন দ্বারা প্রতীয়মান হবে যে আল্লাহতা’লার নৈকট্যপ্রাপ্ত বান্দাদের বেলাদত (ধরাধামে শুভাগমন)-কে ঘিরে ঘটে যাওয়া ঘটনাগুলোর বর্ণনা দেয়া একটি ঐশী প্রথা। এই অধ্যায়ে আমরা আলোকপাত করবো আল-কুরআন কীভাবে পয়গম্বর (আলাইহিমুস সালাম)-বৃন্দের বেলাদতের কথা উল্লেখ করেছে।

৩.১ মওলূদের পটভূমি

আরবদের মাঝে ইমামবৃন্দ ও হাদীসশাস্ত্রবিদমণ্ডলী রাসূলুল্লাহ (দ:)-এর বেলাদত-বিষয়ে অনেক বইপত্র লিখেছেন। তাঁদের প্রচলিত ভাষায় এধরনের সাহিত্য ‘মওলিদ’, ‘মাওয়া’লীদ’ বা ‘মওলূদ’ হিসেবে বহুল পরিচিত। আরব বিশ্বে রবিউল আঊয়াল মাসে সর্বত্র প্রসারলাভকৃত সংখ্যাগরিষ্ঠ মুসলমানবৃন্দের একটি ঐতিহ্য বিদ্যমান, যা’তে মওলিদ পাঠের জন্যে তাঁরা সভা-সমাবেশের আয়োজন করেন এবং মহানবী (দ:)-এর আশীর্বাদপূর্ণ বেলাদতকে ঘিরে ঐতিহাসিক ঘটনাবলীর উল্লেখ-ও করেন। ইমামমণ্ডলী ও হাদীসবেত্তাবৃন্দের লেখা মওলূদ শরীফ মদীনা মোনাওয়ারা, মক্কা মোয়াযযমা, সিরিয়া, মিসর, ইরাক, ওমান, জর্দান , আরব আমিরাত, কুয়েত, লিবিয়া ও মরক্কো ছাড়াও পৃথিবীর সবদেশে পাঠ করা হয়। উর্দূভাষীদের মাঝে এটা ’মীলা’দ-না’মা’ হিসেবে পরিচিত।

৩.২ আম্বিয়া (আ:)-বৃন্দের স্মরণ: এক ঐশী-প্রথার চর্চা  

কতিপয় ’আধুনিকতাবাদী’ এ মর্মে ধারণা লালন করেন যে মহানবী (দ:)-এর আশীর্বাদপূর্ণ বেলাদত এখন অতীত একটি ঘটনা, তাই এর উদযাপনের কী প্রয়োজনীয়তা রয়েছে? তাদের দৃষ্টিতে হুযূর পাক (দ:)-এর জীবন ও সুন্দর আচার-আচরণকেই স্মরণ করা উচিত। বস্তুতঃ এধরনের মানসিকতা আল-কুরআনের দৃষ্টিভঙ্গি বা দর্শনের সম্পূর্ণ খেলাফ। তাই এই বিভ্রান্তি যাতে দূর হয়ে যায়, সেজন্যে এ বিষয়টির সমাধান জরুরি।

আল-কুরআন ও হাদীস শরীফের (সূক্ষ্ম) বিশ্লেষণ আমাদেরকে জ্ঞাত করে যে আল্লাহতা’লার প্রিয় ও মনোনীত বান্দাদেরকে স্মরণ করা কেবল এবাদত-ই নয়, বরং এটা স্বয়ং আল্লাহতা’লারই সুন্নাহ তথা অনুশীলিত রীতি। কুরআন মজীদে মহান প্রভু তাঁর বিশেষ ও পছন্দকৃত বান্দাদের কথা উল্লেখ করেন এবং বহুবার মহানবী (দ:) তা তেলাওয়াত করেন। অতএব, এই দলিলের ভিত্তিতে মহানবী (দ:)-এর আশীর্বাদপূর্ণ বেলাদত-সংশ্লিষ্ট বিভিন্ন ঘটনার বিস্তারিত স্মৃতিচারণ আল্লাহ পাক ও তাঁর রাসূল (দ:)-এর অনুশীলিত রীতির আওতায় পড়ে।

আল্লাহর প্রিয় বান্দাদের বিবরণ উল্লেখ করা এতোই বড় নেয়ামতের উৎস যে, এর বাস্তবতা আমাদের সবার চোখের সামনে প্রকাশ্যে উপস্থিত। কুরআন মজীদের বিভিন্ন স্থানে পয়গম্বরবৃন্দ (আ:) ও তাঁদের উম্মতের কাহিনী বিস্তারিতভাবে বর্ণিত হয়েছে, কিন্তু কিছু কিছু জায়গায় পয়গম্বরবৃন্দ (আ:) ও সৎকর্মশীলদের (মানে আউলিয়া কেরামের) স্মরণকে আলোচনার মূল প্রতিপাদ্য করার দৃষ্টান্ত-ও পবিত্রগ্রন্থে বিরল নয়।

. আল্লাহতা’লা সূরা আল-আনআমে পয়গম্বরমণ্ডলী (আ:)-এর কথা উল্লেখ করতে গিয়ে এরশাদ ফরমান: “আর ইসমাঈল, ইয়াসা’, ইয়ূনুস এবং লূতকেও; আর আমি প্রত্যেককে তাঁরই যুগের সবার ওপর শ্রেষ্ঠত্ব দিয়েছি। এবং তাদের পিতৃপুরুষ, বংশধর এবং ভ্রাতৃবৃন্দের মধ্য থেকে কতেককেও; এবং আমি তাদেরকে মনোনীত করেছি ও সোজা পথ দেখিয়েছি।” [আল-ক্বুরআন, ৬:৮৬-৮৭, তাফসীরে নূরুল এরফান]

. কুরআন মজীদের ১৪তম অধ্যায়টির (সূরার) শিরোনাম আল্লাহতা’লার ঘনিষ্ঠ বন্ধু পয়গম্বর ইবরাহীম (আ:)-নামে করা হয়েছে। এই সূরায় তাঁর দুই ছেলে সর্ব-পয়গম্বর ইসমাঈল (আ:) ও ইসহাক্ব (আ:)-কে উল্লেখ করা হয়েছে এভাবে: “সমস্ত প্রশংসা আল্লাহরই, যিনি আমাকে আমার বার্ধক্যে ইসমাঈল ও ইসহাক্বকে দান করেছেন। নিশ্চয় আমার রব্ব প্রার্থনা শ্রবণকারী।” [আল-ক্বুরআন, ১৪:৩৯, প্রাগুক্ত নূরুল এরফান]

. সূরা মরিয়ম আল্লাহর আশীর্বাদধন্য বান্দাদের বিবরণ দ্বারা পরিপূর্ণ; এতে পয়গম্বর (আ:)-বৃন্দের স্মরণে কোনো ছেদ-ই পড়েনি। এই সূরা আল্লাহতা’লা আরম্ভ করেন পয়গম্বর যাকারিয়্যা (আ:)-এর দোয়া দ্বারা: “এটা হচ্ছে বিবরণ তোমার রব্বের ওই অনুগ্রহের, যা তিনি আপন বান্দা যাকারিয়্যার প্রতি করেছেন, যখন সে আপন রব্বকে নীরবে আহ্বান করেছিল।” [আল-ক্বুরআন, ১৯:২-৩]

. আল্লাহতা’লা এরশাদ ফরমান: “এবং আমার কাছ থেকে দয়া ও পবিত্রতা; এবং (সে) পরিপূর্ণ খোদা-ভীতিসম্পন্ন ছিল।” [আল-ক্বুরআন, ১৯:১৩]

. আল্লাহতা’লা ঘোষণা করেন: “এবং কিতাবে মরিয়মকে স্মরণ করুন! যখন আপন পরিবারবর্গ থেকে পূর্বদিকে পৃথক একস্থানে চলে গিয়েছিল।” [আল-ক্বুরআন, ১৯:১৬]

. আল্লাহতা’লা এরশাদ ফরমান: “এবং কিতাবে ইব্রাহীমকে স্মরণ করুন! নিশ্চয় সে ছিল অতীব সত্যবাদী, অদৃশ্যের সংবাদদাতা (নবী)।” [আল-কুরআন, ১৯:৪১]

. আল্লাহতা’লা বলেন: “এবং কিতাবের মধ্যে মূসা’কে স্মরণ করুন! নিশ্চয় সে মনোনীত ছিল এবং রাসূল ছিল, অদৃশ্যের সংবাদসমূহ বর্ণনাকারী।” [আল-কুরআন, ১৯:৫১]

. আল্লাহতা’লা এরশাদ ফরমান: “এবং কিতাবের মধ্যে ইসমাঈলকে স্মরণ করুন! নিশ্চয় সে প্রতিশ্রুতি পালনে সত্যাশ্রয়ী ছিল এবং রাসূল ছিল, অদৃশ্যের সংবাদসমূহ বহনকারী; এবং আপন পরিবারবর্গকে নামায ও যাকাতের নির্দেশ দিতো; আর আপন রব্বের কাছে পছন্দনীয় ছিল।” [আল-কুরআন, ১৯:৫৪-৫৫]

. আল্লাহতা’লা ঘোষণা করেন: “এবং কিতাবের মধ্যে ইদরীসকে স্মরণ করুন! নিঃসন্দেহে সে অত্যন্ত সত্যনিষ্ঠ ছিল, অদেৃশ্যের সংবাদসমূহ বর্ণনাকারী। এবং আমি তাকে উচ্চ স্থানের ওপর উঠিয়ে নিয়েছি।” [আল-কুরআন, ১৯:৫৬-৫৭]

১০. অনুরূপভাবে, সূরা আম্বিয়া-ও পয়গম্বর (আ:)-মণ্ডলীর বিবরণ দ্বারা পরিপূর্ণ। পঞ্চাশ ও তৎপরবর্তী আয়াতগুলোতে হ্রাস না পাওয়া বিবরণ রয়েছে, যার শুরু হয়েছে নিম্নের কথা দ্বারা: “এবং এটা (ক্বুরআন) হচ্ছে কল্যাণময় উপদেশ, যা আমি অবতীর্ণ করেছি। তবুও কি তোমরা সেটার অস্বীকারকারী হও?” [আল-ক্বুরঅান, ২১:৫০]

১১. ‘সবচেয়ে বরকতময় যিকর (স্মরণ)’ শিরোনামে নিম্নের আয়াতটি পয়গম্বর (আ:)-বৃন্দের পিতা হয়রত ইবরাহীম (আ:)-এর কথা উল্লেখ করেছে এভাবে: “আর নিশ্চয় আমি ইব্রাহীমকে পূর্ব থেকেই তার সৎপথ দান করেছি এবং আমি তার সম্বন্ধে পরিজ্ঞাত ছিলাম।” [আল-ক্বুরআন, ২১:৫১, প্রাগুক্ত নূরুল এরফান]

১২. বিস্তারিত একটি বিবরণের পরে সর্ব-পয়গম্বর লূত (আ:), ইসহাক্ব (আ:) ও এয়া’ক্বূব (আ:)-এর কথাও স্মরণ করা হয়েছে এতে। এর শেষ হয়েছে এই বলে: “এবং আমি তাদের সবাইকে আমার বিশেষ নৈকট্যের উপযোগী করেছি।” [আল-ক্বুরআন, ২১:৭২]

১৩. অতঃপর ওই সূরার ৭৩ নং আয়াতে উক্ত পয়গম্বর (আ:)-বৃন্দের মক্বাম তথা মর্যাদার আরো বিবরণ দেয়া হয়েছে: “এবং আমি তাদেরকে ‘ইমাম’ করেছি, যারা আমার নির্দেশে আহ্বান করে আর আমি তাদের প্রতি ওহী প্রেরণ করেছি – সৎকর্ম পালন করতে, নামায প্রতিষ্ঠিত রাখতে এবং যাকাত প্রদান করতে; আর তারা আমার ইবাদত করতো।” [আল-ক্বুরআন, ২১:৭৩]

১৪. উক্ত সূরার ৭৬-৮৪ আয়াতগুলো সর্ব-পয়গম্বর নূহ (আ:), দা’উদ (আ:), সুলাইমান (আ:) ও আইয়ূব (আ:)-এর কথাও উল্লেখ করেছে। এই স্মরণের পরিসমাপ্তি হয় পয়গম্বর আইয়ূব (আ:)-এর উল্লেখ দ্বারা: “অতঃপর আমি তার (অর্থাৎ, আইয়ূব আলাইহিস্ সালামের) প্রার্থনা শুনেছি। তখন তার যে দুঃখ-কষ্ট ছিল, আমি তা দূরীভূত করেছি, এবং আমি তাকে তার পরিজনবর্গ ও তাদের সাথে তদসংখ্যক আরো দান করলাম; এটা আমার নিকট থেকে এক (বিশেষ) দয়া এবং ইবাদতকারীদের জন্যে (এতে নিহিত রয়েছে) উপদেশ (এই মর্মে যে আল্লাহ ধৈর্য ও কৃতজ্ঞতাকে পুরস্কৃত করে থাকেন)।” [আল-কুরআন, ২১:৮৪]

১৫. এর পরবর্তী আয়াতে করীমাতেই সর্ব-পয়গম্বর ইসমাঈল (আ:), ইদরীস্ (আ:) ও যূল-কিফল (আ:)-এর কথা উল্লেখিত হয়েছে: “এবং ইসমাঈল, ইদরীস্ ও যূল-কিফলকে (স্মরণ করুন)। তারা সবাই ধৈর্যশীল ছিল। এবং তাদেরকে আমি আপন অনুগ্রহের অন্তর্ভুক্ত করেছি। নিশ্চয় তারা আমার বিশেষ নৈকট্যের উপযোগীদের অন্তর্ভুক্ত।” [আল-কুরআন, ২১:৮৫-৮৬]

১৬. অতঃপর উক্ত সূরার ৮৭-৯০ আয়াতগুলোতে সর্ব-পয়গম্বর ইউনুস (যূননুন খেতাবে পরিচিত), যাকারিয়্যা ও ইয়াহইয়ার (সবার প্রতি শান্তি বর্ষিত হোক) উল্লেখ করা হয়েছে; এই যিকরের পরিসমাপ্তি ঘটেছে তাঁদের আধ্যাত্মিক অবস্থার বর্ণনা দিয়ে: “নিশ্চয় তারা সৎকর্মসমূহে ত্বরা করতো এবং আমাকে ডাকতো আশা ও ভীতির সাথে, আর আমার দরবারে বিনীতভাবে প্রার্থনা করতো।” [আল-ক্বুরআন, ২১:৯০]

১৭. আল্লাহতা’লা এরপর তাঁরই আশীর্বাদধন্য ও প্রিয় এসব বান্দার কথা স্মরণ করার উদ্দেশ্যটুকু ব্যাখ্যা করে এরশাদ ফরমান: “নিশ্চয় এ কুরআন যথেষ্ট এবাদতকারীদের জন্যে।” [আল-কুরআন, ২১:১০৬]

১৮. এই পুরো সূরাটি-ই আল্লাহর সম্মানিত বান্দাদের নিরবচ্ছিন্ন এক যিকর তথা স্মরণ, কিন্তু এর চূড়ান্ত পরিণতি ঘটেছে যখন শাহেনশাহ-এ-মাহবুবীন (প্রিয়বান্দাদের মহারাজ) ও বিশ্বজগতের জন্যে আল্লাহতা’লার পরম করুণা (রহমত) মহানবী (দ:)-এর কথা উল্লেখিত হয়েছে। আল্লাহতা’লার নেয়ামতপ্রাপ্ত বান্দাদের এই স্মরণের সমাপ্তি হয়েছে নিম্নের এই ভাষ্য দ্বারা: “আর আমি আপনাকে (হে রাসূল) সমগ্র জগতের জন্যে রহমতরূপেই প্রেরণ করেছি।” [আল-ক্বুরআন, ২১:১০৭]

১৯. এরপর আর কোনো পয়গম্বর (আ:)-এর ব্যাপারে উল্লেখ করা নেই, কেননা মহব্বতের এই স্মৃতিচারণ তার চূড়ান্ত পরিণতি পেয়েছে। মহানবী (দ:)-এর যিকর-তাযকেরা’র পরে অধ্যায়টির পরিসমাপ্তি ঘটেছে মহান আল্লাহতা’লার যিকর (স্মরণ) দিয়ে; এরশাদ হয়েছে: “নবী আরয করলেন, ‘হে আমার রব্ব! ন্যায় মীমাংসা করে দিন এবং আমাদের রব্ব রহমানেরই সাহায্য আবশ্যক ওইসব কথার ওপর, যা তোমরা বলছো।” [আল-ক্বুরআন, ২১:১১২, তাফসীরে নূরুল এরফান]

২০. সূরা সা’আদ-এ আল্লাহতা’লা এরশাদ ফরমান: “এবং স্মরণ করুন ইসমাঈল, ইয়াসা ও যূল-কিফল’কে এবং (তারা) সবাই সজ্জন।” [আল-ক্বুরআন, ৩৮:৪৮]

এই পাঁচটি অধ্যায় হতে মাত্র কয়েকটি আয়াত-ই (এখানে) নির্বাচন করা হয়েছে; নতুবা আল্লাহতা’লা তাঁরই প্রিয় বান্দাদের কথা উল্লেখ করেছেন এমন উদ্ধৃতি কুরআন মজীদে ভরপুর। এসব উদ্ধৃত অংশে প্রিয় বান্দাদের আধ্যাত্মিক সাধনা ও প্রচেষ্টাকে স্মরণ করা হয়েছে; এই নেয়ামত-প্রাপ্ত (মানে আশীর্বাদধন্য) বান্দাদের উচ্চারিত দোয়া/প্রার্থনা-বাক্য ও সেগুলোর বর্ণনাপ্রসঙ্গ এবং ধরন সবই বর্ণিত হয়েছে। উপরন্তু, তাঁরা যে ঐশী অনুগ্রহ ও দান পেয়েছেন তার পাশাপাশি তাঁদের দৃঢ়তা ও শ্রেষ্ঠত্বের কথাও উল্লেখিত হয়েছে। সংক্ষেপে, তাঁদের জীবনের কোনো দিক-ই বাদ দেয়া হয়নি, আর প্রত্যেককে বারংবার স্মরণ করিয়ে দেয়া হয়েছে যে এসব যিকর-তাযকিরা শুধু তাঁদের জন্যেই সুনির্দিষ্ট, যাঁরা আল্লাহর এবাদত-বন্দেগী ও আনুগত্যে অটল, অবিচল।

কেউ আল্লাহতা’লার রেযামন্দি (সন্তুষ্টি) ও নৈকট্যলাভের মাধ্যম হিসেবে এবাদত-বন্দেগী ও আনুগত্যকে গ্রহণ করতে চাইলে এই যিকর-তাযকিরা’কে তার উচ্চাকাঙ্ক্ষার উৎস হিসেবে গ্রহণ করতে হবে। এই কারণেই মহান সাহাবাবৃন্দের (রা:) সময়কাল হতে অদ্যাবধি, প্রতিটি যুগেই, সৃষ্টিকুল শিরোমণি প্রিয়নবী (দ:)-এর পবিত্র জীবনবৃত্তান্তের যিকর-তাযকিরা ঈমানদারদের বৈশিষ্ট্য হয়েছে। ইমামমণ্ডলী, মুহাদ্দেসীন ও আল্লাহতা’লার সকল পুণ্যবান বন্ধু (আউলিয়া) নিজ নিজ প্রকৃতি অনুসারে মহানবী (দ:)-এর যিকর-তাযকেরায় সমাবেশের আয়োজন করেছেন; আর প্রতিটি যুগেই এই ঐশী প্রথা সম্পর্কে শত শত গ্রন্থ লেখা কিংবা সংকলন করা হয়েছে।

ক্বুরআন মজীদের একটি বৈশিষ্ট্য হলো, পয়গম্বর (আ:)-বৃন্দের বেলাদত তথা ধরাধামে শুভাগমনের বর্ণনাগুলো স্বয়ং আল্লাহতা’লাই করেছেন। এক্ষেত্রে মওলিদের স্মরণ বা স্মৃতিচারণ প্রকৃতপক্ষে আল্লাহতা’লারই সুন্নাহ (রীতি)।

৩.৩ আম্বিয়া (আ:)-এর মওলিদের তাৎপর্য

মহব্বতের কেউ জন্মগ্রহণ করলে তা যে কোনো ব্যক্তির জন্যেই খুশির উপলক্ষ হয়। এ থেকে আমরা দেখতে পাই যে জন্মদিনের বিশেষ তাৎপর্য রয়েছে। অধিকন্তু, এর গুরুত্ব আরো বৃদ্ধি পায় তখন-ই, যখন উপলক্ষটি কোনো পয়গম্বর (আ:)-এর বেলাদতের সাথে সম্পর্কিত হয়। আম্বিয়া (আ:)-বৃন্দের বেলাদত (ধরাধামে শুভাগমন) নিজে থেকেই আল্লাহতা’লার সেরা আশীর্বাদগুলোর অন্যতম। কোনো জাতির পয়গম্বরের (আ:) বেলাদতের মাধ্যমে সে জাতিকে অন্যান্য সব নেয়ামত দান করা হয়। বিশেষ করে সর্বশেষ নবী (সাল্লাল্লাহু আলাইহে ওয়া সাল্লাম) হচ্ছেন হেদায়াত ও ঐশীবাণী প্রাপ্তির দ্বার। তাঁর মাধ্যমেই আমরা কুরআন মজীদ ও রমজান মাস পেয়েছি। বস্তুতঃ আমরা যতো রহমত-বরকত-নেয়ামত লাভ করেছি, তা রবিউল আউয়াল মাসের সেই আলোকিত ও আশীর্বাদপূর্ণ ভোরের বদৌলতেই পেয়েছি, যে শুভলগ্নে আমাদের মাহবূব (সাল্লাল্লাহু আলাইহে ওয়া সাল্লাম) এই ধূলির ধরায় শুভাগমন করেন। তাই তাঁর বেলাদতে খুশি হওয়া এবং তা উদযাপন করা তাঁরই প্রতি ঈমানের লক্ষণ, আর এটা মহানবী (দ:)-এর প্রতি কারো ব্যক্তিগত আন্তরিক অনুভূতিরই প্রতিফলন বা বহিঃপ্রকাশ।

আল-ক্বুরআন কয়েকজন পয়গম্বর (আ:)-এর বেলাদতের কথা উল্লেখকালে ওই দিনগুলোর তাৎপর্য ও উত্তম বৈশিষ্ট্যগুলোকে চিহ্নিত করে।

. পয়গম্বর এয়াহইয়া (আ:)-এর বেলাদত প্রসঙ্গে আল্লাহ পাক এরশাদ ফরমান: “এবং শান্তি তার (এয়াহইয়ার)-ই প্রতি, যেদিন জন্মগ্রহণ করেছে, যেদিন মৃত্যুবরণ করবে এবং যেদিন জীবিতাবস্থায় পুনরুত্থিত হবে।” [আল-কুরআন, ১৯:১৫]

. কুরআন মজীদে পয়গম্বর ঈসা (আ:)-এর কথাও উদ্ধৃত হয়েছে: “এবং ওই শান্তি আমার প্রতি যেদিন আমি জন্মলাভ করেছি এবং যেদিন আমার মৃত্যু হবে আর যেদিন জীবিতাবস্থায় পুনরুত্থিত হবো।” [আল-ক্বুরআন, ১৯:৩৩]

৩. মহানবী (দ:)-এর পবিত্র বেলাদত সম্পর্কে আল্লাহতা’লা শপথ করছেন এই বলে: “আমায় এ শহরের (মক্কার) শপথ, যেহেতু হে মাহবূব! আপনি এ শহরে তাশরীফ এনেছেন, এবং আপনার পিতা (পিতৃপুরুষ) ইব্রাহীমের শপথ এবং তার বংশধরের, অর্থাৎ, আপনি-ই।” [আল-ক্বুরআ’ন, ৯০:১-৩]

কোনো পয়গম্বর (আ:)-এর বেলাদতের বিশেষ তাৎপর্য যদি কুরআন ও সুন্নাহ’তে না-ই থাকতো, তাহলে এই দিনকে কেন দোয়া প্রার্থনা ও শপথের জন্যে আলাদাভাবে বেছে নেয়া হয়েছে? এটা স্পষ্ট যে এই দিনটি তাৎপর্যময়, যেমনটি আল্লাহ পাক উল্লেখ করেছেন। নিচে আল-কুরআনে প্রদত্ত কিছু সংখ্যক আম্বিয়া (আ:)-এর মওলিদের বিবরণ পেশ করা হলো:

৩.৩.১ পয়গম্বর আদম (আ:)-এর মওলিদ

আল্লাহতা’লার আশীর্বাদধন্য বান্দাদের মধ্যে মানবজাতির পিতা পয়গম্বর আদম (আ:)-এর সৃষ্টিসম্পর্কিত বর্ণনা কুরআনে সর্বপ্রথম দেয়া হয়েছে এভাবে: “এবং স্মরণ করুন! যখন আপনার রব্ব ফেরেশতাদেরকে বল্লেন, ’আমি পৃথিবীতে আপন প্রতিনিধি সৃষ্টিকারী।’” [আল-কুরআন, ২:৩০]

সর্বশক্তিমান আল্লাহতা’লা পয়গম্বর আদম (আ:)-এর সৃষ্টিরও আগে তাঁর মওলিদ সম্পর্কে উল্লেখ করেছিলেন, নিম্নের আয়াতগুলোতে তা বর্ণিত হয়েছে। হযরত আদম (আ:)-কে যখন তাঁর মানবাকৃতিতে সৃষ্টি করা হয়, ফেরেশতাকুলকে আদেশ করা হয় তাঁর প্রতি সেজদা করতে; কিন্তু ইবলীস (শয়তান) বেয়াদবি করলে তাকে আল্লাহর দরবার থেকে বের করে দেয়া হয়। পয়গম্বর আদম (আ:)-এর সৃষ্টির পূর্ণ বিবরণ রয়েছে নিচে:

এবং স্মরণ করুন, যখন আপনার রব্ব ফেরেশতাদেরকে বললেন, আমি মানুষ সৃষ্টিকারী ঠনঠনে মাটি থেকে, যা দুর্গন্ধময় কালো কাদা থেকেই। অতঃপর যখন আমি সেটাকে ঠিক করে নেই এবং সেটার মধ্যে আমার কাছ থেকে বিশেষ সম্মানিত রূহ ফুৎকার করে দেই, ‘তখন সেটার উদ্দেশ্যে সেজদাবনত হয়ে পড়ো!’ তখন যতো ফেরেশতা ছিল সবাই একত্রে সেজদাবনত হয়ে পড়লো, ইবলীস ব্যতিরেকে। সে সেজদাকারীদের সঙ্গি হতে অস্বীকার করলো। [আল-কুরআন, ১৫:২৮-৩১]

কুরআন মজীদের অসংখ্য স্থানে পয়গম্বর আদম (আ:) সম্পর্কে বিশদভাবে আলোকপাত করা হয়েছে – শুধুমাত্র তাঁর সৃষ্টির বিষয়ে নয়, বরঞ্চ তাঁর জীবনের বিভিন্ন দিক, যেমন বেহেশতে তাঁর আবাস, তাঁর সৃষ্টি সম্পর্কে ফেরেশতাদের ভাবনা, অভিশপ্ত শয়তানের আপত্তি ও পয়গম্বর আদম (আ:)-কে সেজদা করার ক্ষেত্রে শয়তানের ব্যর্থতা, এসব-ই বিস্তারিতভাবে উল্লেখ করা হয়েছে। মানুষ সৃষ্টিসংক্রান্ত যতোগুলো আয়াত রয়েছে, সবগুলোই পয়গম্বর আদম (আ:)-এর সাথে সংশ্লিষ্ট; এটাই তাঁর মওলিদ বা মওলূদ হিসেবে জ্ঞাত।

৩.৩.২ পয়গম্বর মূসা (আ:)-এর মওলিদ

পয়গম্বর মূসা (আ:) হচ্ছেন সেই মহান পয়গম্বর, যাঁকে খোদা দাবিদার নিষ্ঠুর ও স্বৈরাচারী শাসক ফেরাউনের মোকাবেলা করার জন্যে প্রেরণ করা হয়েছিল। সর্বশক্তিমান আল্লাহতা’লা তাঁকে পাঠিয়ে বনূ ইসরাঈল জাতিকে ফেরাউনের অত্যাচার-নিপীড়ন ও বিশ্বাসঘাতকতা হতে রক্ষা করেছিলেন; এরই ফলশ্রুতিতে ফেরাউন পানিতে ডুবে মরে এবং (খোদার) উপদেশের এক (স্মারক) চিহ্নে সে পরিণত হয়; আর মানবতার জন্যেও এক শিক্ষা হয়ে থাকে। ফেরাউনের গণকবর্গ তাকে জানায় যে সহসা এক শিশুর জন্ম হতে যাচ্ছে যিনি তার সিংহাসন উল্টে ফেলবেন। ফলে ফেরাউন এর প্রতিক্রিয়াস্বরূপ তার অত্যাচারের মাত্রা বাড়িয়ে দেয়। সে পুত্র-শিশুদের হত্যা করতে বলে, আর মেয়ে-শিশুদের জীবিত ছেড়ে দেয়। এমনি এক পরিস্থিতিতে পয়গম্বর মূসা (আ:)-এর বেলাদত হয়, যেমনটি আল্লাহতা’লা কর্তৃক উল্লেখিত হয়েছে কুরআন মজীদের বিভিন্ন আয়াতে করীমায়।

সূরা আল-ক্বাসাস আরম্ভ হয় এই ঘটনার বর্ণনা দ্বারা, যেটা ৫০টি আয়াতের সমষ্টি। প্রথম পাঁচটি আয়াত পয়গম্বর মূসা (আ:)-সম্পর্কিত বর্ণনাসম্বলিত। নিচে প্রথম ১৪টি আয়াত উদ্ধৃত হলো, যেগুলো তাঁর বেলাদত হতে যৌবনকাল পর্যন্ত বিবরণ দেয়, যা দ্বারা এই বাস্তবতা ফুটে ওঠেছে যে আম্বিয়া (আ:)-বৃন্দের মওলিদকে স্মরণ করা আল্লাহতা’লারই সুন্নাহ। এরশাদ হয়েছে:

ত্বোয়া- সী—-ম্ মী—-ম। এ আয়াতগুলো সুস্পষ্ট কিতাবের। আমি আপনার প্রতি পাঠ করি মূসা ও ফেরাউনের সত্য সংবাদ ওই সমস্ত লোকের জন্যে, যারা ঈমান রাখে। নিশ্চয় ফেরাউন পৃথিবীতে কর্তৃত্ব লাভ করেছিল এবং তার লোকজনকে তার অনুসারী করেছে; তাদের মধ্যে একটা দলকে দুর্বল দেখতো, তাদের পুত্র-সন্তানদেরকে হত্যা করতো এবং তাদের নারীদেরকে জীবিত রাখতো। নিশ্চয় সে বিপর্যয় সৃষ্টিকারী ছিল। আর আমি চাচ্ছিলাম ওই দুর্বলদের প্রতি অনুগ্রহ করতে এবং তাদেরকে নেতৃত্ব দান করতে, আর তাদেরকে তাদের দেশ ও ধনসম্পদের অধিকারী করতে; আর তাদেরকে ভূ-পৃষ্ঠে ক্ষমতায় প্রতিষ্ঠিত করতে এবং ফেরাউন, হামান ও তাদের সৈন্যবাহিনীকে তাই দেখিয়ে দিতে, যার আশঙ্কা তাদের মনে এদের দিক থেকে রয়েছে। এবং আমি মূসার মাকে গোপন-প্রেরণা দিয়েছি যে, ‘তাকে দুধ পান করাও। অতঃপর যখন তার সম্পর্কে তোমার আশঙ্কা হয়, তবে তাকে দরিয়ায় নিক্ষেপ করো আর না ভয় করো এবং না দুঃখ। নিশ্চয় আমি তাকে তোমার কাছে ফিরিয়ে আনবো এবং তাকে রাসূল করবো।’ অতঃপর তাকে উঠিয়ে নিলো ফেরাউনের পরিবারের লোকজন, যেন সে তাদের শত্রু ও তাদের দুঃখের কারণ হয়। নিশ্চয় ফেরাউন ও হামান এবং তাদের সৈন্যদল অপরাধী ছিল। এবং ফেরাউনের স্ত্রী বললো, ‘এ শিশু আমার ও তোমার নয়নের শান্তি, তাকে হত্যা করো না; হয়তো এটা আমাদের উপকারে আসবে, অথবা আমরা তাকে পুত্র হিসেবে গ্রহণ করে নেবো।’ এবং তারা বুঝতে পারেনি। এবং সকালে মূসার মায়ের হৃদয় ধৈর্যহীন হয়ে পড়লো। অবশ্য সে তার অবস্থা প্রকাশ করে দেয়ার উপক্রম হয়েছিল যদি আমি তার অন্তরকে দৃঢ় করে না দিতাম, যাতে সে আমার প্রতিশ্রুতির প্রতি আস্থাশীল থাকে। এবং তার মা তার বোনকে বললো, ‘তার পেছনে পেছনে চলে যা।’ অতঃপর সে তাকে দূর থেকে দেখছিল এবং ওদের জানা ছিল না। এবং আমি আগে থেকেই সমস্ত ধাত্রীকে তার জন্যে হারাম করে দিয়েছিলাম। সুতরাং সে বললো, ‘আমি তোমাদেরকে কি এমন পরিবারের সন্ধান দেবো, যারা তোমাদের এ শিশুকে লালন-পালন করবে এবং তারা তার মঙ্গলকামী?’ অতঃপর আমি তাকে তার মায়ের কাছে ফিরিয়ে দিলাম, যাতে মায়ের চোখ জুড়ায় এবং দুঃখ না করে আর জেনে নেয় যে, আল্লাহর প্রতিশ্রুতি সত্য; কিন্তু অধিকাংশ লোক জানে না। আর সে যখন আপন যৌবনে উপনীত হলো এবং পূর্ণ শক্তিপ্রাপ্ত হলো, তখন আমি তাকে হুকুম ও জ্ঞানদান করলাম, আর আমি অনুরূপ পুরস্কার প্রদান করি সৎকর্মপরায়ণদেরকে। [আল-কুরআন, ২৮:১-১৪]

এই ১৪টি আয়াতে আল্লাহতা’লা নিম্নবর্ণিত বিষয়গুলোর উল্লেখ করেছেন: পয়গম্বর মূসা (আ:)-এর বেলাদতের পূর্ববর্তী ঘটনাবলী, তাঁর বেলাদতের মুহূর্ত, আল্লাহরই আদেশে তাঁকে একটি ঝুড়িতে/পাত্রে রাখা, ফেরাউনের পরিবারে তাঁকে নিয়ে যাওয়া এবং অবশেষে তাঁকে তাঁর মায়ের জিম্মায় রেখে দুধপান করে পূর্ণ যৌবনে উপনীত করা। এটাই হচ্ছে পয়গম্বর মূসা (আ:)-এর মওলিদ।

৩.৩.৩ মরিয়ম (আ:)-এর মওলিদ

সর্বশক্তিমান আল্লাহতা’লা তাঁর পাক কালামে হযরত মরিয়ম (আ:)-এর মওলিদের কথা উল্লেখ করেছেন, যিনি কোনো নবী ছিলেন না, বরং একজন পুণ্যবতী মহিলা, ওলী/দরবেশ ছিলেন, আর ছিলেন মনোনীত পয়গম্বর হযরত ঈসা (আ:)-এর মহান মাতা। তাঁর মওলিদের বর্ণনা প্রদানের আগে আল্লাহতা’লা প্রথমে তাঁর কতিপয় পয়গম্বর (আ:) ও তাঁদের কুলীন বংশধরদের কথা উল্লেখ করেন; তিনি এরশাদ ফরমান:

নিঃসন্দেহে আল্লাহ মনোনীত করেছেন আদম, নূহ, ইব্রাহীমের বংশধর এবং ইমরানের বংশধরদেরকে সমগ্র বিশ্বজগত থেকে। এটা একটা বংশানুক্রম, একে অপর হতে এবং আল্লাহ শোনেন, জানেন। [আল-কুরআন, ৩:৩৩-৩৪]

এই ভূমিকার পরে মরিয়ম (আ:)-এর মওলিদের সূচনা হয়েছে। কেউ কেউ হয়তো আপত্তি উত্থাপন করতে পারেন যে কুরআন মজীদ যেহেতু স্রেফ অতীত ঘটনাবলীর বর্ণনা দিয়েছে, সেহেতু এটাকে কীভাবে মওলিদ বলে দাবি করা যায়? যারা এই আপত্তি তোলেন, তাদের বোঝা উচিত যে শিক্ষা ও হেদায়াত তথা সঠিক পথের দিক-নির্দেশনার উদ্দেশ্যে যেসব বিষয়, সেগুলোর সীমিত পরিসর; অর্থাৎ, কেবল বিষয়বস্তুর সাথে যেসব বিষয় প্রাসঙ্গিক, সেগুলোরই উল্লেখ প্রয়োজনীয়; পক্ষান্তরে, অপ্রাসঙ্গিক বিষয়গুলো কুরআনী শিক্ষার অংশ হিসেবে গঠিত হওয়ার কোনো প্রয়োজন-ই নেই। নিম্নের আয়াতগুলো মরিয়ম (আ:)-এর মওলিদের কথা স্মরণ করে; এগুলো কোনো বিশেষ শিক্ষা বা হেদায়াত দানের জন্যে উপস্থাপিত হয়নি, বরঞ্চ এগুলো স্রেফ তাঁরই বেলাদতের ঘটনা স্মরণ করার উদ্দেশ্যে বর্ণিত। আল্লাহতা’লা এরশাদ ফরমান:

(স্মরণ করুন) যখন ইমরানের স্ত্রী আরয করলো, ‘হে আমার রব্ব, আমি আপনার জন্যে মানত করছি যা আমার গর্ভে রয়েছে যে, একান্ত আপনারই সেবায় থাকবে। সুতরাং আপনি আমার কাছ থেকে কবূল করে নিন। নিঃসন্দেহে আপনি-ই হন শ্রোতা, জ্ঞাতা।’ অতঃপর যখন তাকে প্রসব করলো, তখন বললো, ’হে আমার রব্ব! এ তো আমি কন্যা প্রসব করলাম।’ এবং আল্লাহর সম্যক জানা আছে যা সে প্রসব করেছে। আর ওই পুত্র সন্তান, যা সে চেয়েছে, এ কন্যা সন্তানের মতো নয়। (সে বললো) ‘এবং আমি তার নাম মরিয়ম রাখলাম। আর তাকে এবং তার বংশধরকে আপনার আশ্রয়ে দিচ্ছি বিতাড়িত শয়তান থেকে।’ [আল-কুরআন, ৩:৩৫-৩৬]

এটাই আল্লাহতা’লার প্রদত্ত মরিয়ম (আ:)-এর বেলাদতের চমৎকার বিবরণ। পয়গম্বর যাকারিয়্যা (আ:)-এর সেবাযেত্নে বেড়ে ওঠা তাঁর শৈশবের বর্ণনা দেয়া হয়েছে নিম্নের আয়াতগুলোতে। ওই সময়কালে আল্লাহতা’লার বর্ষিত নেয়ামত ও তাঁরই প্রদত্ত বে-মওসূমি ফল-ফলাদির বিবরণ-ও এসব আয়াতে হয়েছে বিধৃত। পয়গম্বর যাকারিয়্যা (আ:) মরিয়ম (আ:)-এর বসতভিটার অসীলা (দোহাই) দিয়ে আল্লাহর কাছে সন্তানপ্রাপ্তির জন্যে দোয়া করেন, যার দরুন আল্লাহতা’লা তাঁকে (পুত্র) পয়গম্বর এয়াহইয়া (আ:)-এর খোশ-খবরী (সুসংবাদ) দেন। এরশাদ হয়েছে:

অতঃপর তাকে (মরিয়মকে) তার রব্ব উত্তমরূপে গ্রহণ করলেন এবং তাকে উত্তমরূপে প্রতিপালন করলেন, আর তাকে যাকারিয়্যার তত্ত্বাবধানে দিলেন। যখন যাকারিয়্যা তার কাছে তার নামায পড়ার স্থানে যেতেন, তখন তার কাছে নতুন রিযক্ব পেতেন। বললো, ‘হে মরিয়ম! এটা তোমার কাছে কোত্থেকে এলো?’ বললেন, ‘সেটা আল্লাহর কাছ থেকে।’ নিশ্চয় আল্লাহ যাকে ইচ্ছা অগণিত দান করেন। [আল-কুরআন, ৩:৩৭]

ওপরোক্ত আয়াতগুলো মরিয়ম (আ:)-এর শৈশবকাল ও বেড়ে ওঠার সাথে সম্পৃক্ত। তবে এখানেই  এর শেষ নয়; সর্বশক্তিমান আল্লাহতা’লা আরো ব্যাখ্যা করেন এমন ছোটখাটো বিষয়ও, যেখানে বিবৃত হয় মরিয়ম (আ:)-এর সেবাযত্নের দায়দায়িত্ব নেয়ার প্রশ্নে ধর্মীয় নেতৃবর্গ কীভাবে তর্কবিতর্ক করেছিল। আল্লাহ পাক এরশাদ করেন:

(স্মরণ করুন) এবং যখন ফেরেশতাবৃন্দ বললো, ‘হে মরিয়ম! নিশ্চয় আল্লাহ তোমাকে মনোনীত করে নিয়েছেন, খুব পবিত্র করেছেন এবং আজকার সমগ্র বিশ্বের নারীদের থেকে তোমাকে মনোনীত করেছেন।’ ‘হে মরিয়ম! নিজ রব্বের সম্মুখে আদব সহকারে দণ্ডায়মান হও এবং তাঁর জন্যে সাজদা করো ও রুকূ’কারীদের সাথে রুকূ’ করো।’ এগুলো অদৃশ্যের সংবাদ, যেগুলো আমি গোপনভাবে আপনাকে বলে থাকি এবং আপনি তাদের কাছে ছিলেন না যখন তারা তাদের কলমগুলো দ্বারা লটারী টানছিল (এ বিষয়ে) যে, মরিয়ম কার লালন-পালনের দায়িত্বে থাকবে! আর আপনি তাদের কাছে ছিলেন না যখন তারা বাদানুবাদ করছিল। [আল-কুরআন, ৩:৪২-৪৪]

এই হলো মরিয়ম (আ:)-এর মওলিদ, যা’তে দৃশ্যতঃ ছোটখাটো বিবরণ-ও প্রদান করা হয়েছে, যেমন – ধর্মীয় নেতৃবর্গ কর্তৃক নিজেদের কলম ছুঁড়ে মারা, লটারী করা এবং পারস্পরিক তর্কবিতর্ক করা। এসব বিবরণের কোনোটির সাথেই শিক্ষা বা হেদায়াতের কোনো সম্পর্ক নেই। পক্ষান্তরে, প্রিয়নবী (দ:)-এর আশীর্বাদপূর্ণ বেলাদতের বিবরণ ও উন্নত বৈশিষ্ট্যাবলী সম্পর্কে উল্লেখ এমনই এক মাধ্যম যা দ্বারা ঈমানকে নিখুঁত করা হয় এবং পূর্ণতা দেয়া হয়। আর এর মাধ্যমেই আমরা আল্লাহতা’লার সুন্নাহ’কে আঁকড়ে ধরতে সক্ষম হই। মানুষেরা যদি এ কথা বুঝতে পারতো একজন পুণ্যবতী, দরবেশ মহিলার মওলিদের কথা কুরআন মজীদে উল্লেখ করা হয়েছে, তাহলে প্রিয়নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহে ওয়া সাল্লামের পবিত্র মওলিদের কথা উল্লেখ কেন নয়? মহানবী (দ:)-এর মওলিদের উল্লেখ করা কোনোক্রমেই বেদআত (নব্য প্রথা) নয়; বরঞ্চ এটা প্রকৃত ঈমানদারির বহিঃপ্রকাশ এবং তওহীদ তথা একত্ববাদের মূল বৈশিষ্ট্য।

৩.৩.৪ পয়গম্বর ইয়াহইয়া (আ:)-এর মওলিদ

সর্বশক্তিমান আল্লাহ পাক পয়গম্বর ইয়াহইয়া (আ:)-এর মওলিদ সম্পর্কে বিস্তারিত বর্ণনা দিয়েছেন। পয়গম্বর যাকারিয়্যা (আ:) যখন মরিয়ম (আ:)-এর যত্ন নিচ্ছিলেন, তখন তিনি মরিয়ম (আ:)-এর বসতভিটায় ওই (বরকতময়) স্থানকে অসীলা করে আল্লাহর কাছে দোয়া করেছিলেন। এ সম্পর্কে মহান প্রভু এরশাদ ফরমান:

“এখানে প্রার্থনা করলেন যাকারিয়্যা আপন রব্বের কাছে। আরয করলেন, ‘হে আমার প্রভু! আমাকে আপনার কাছ থেকে প্রদান করুন পবিত্র সন্তান। নিশ্চয় আপনি-ই প্রার্থনা শ্রবণকারী।’ তখন ফেরেশতাবৃন্দ তাকে সাড়া দিলো এবং তিনি আপন নামাযের স্থানে দণ্ডায়মান অবস্থায় নামায পড়ছিলেন, ‘নিশ্চয় আল্লাহ আপনাকে সুসংবাদ দিচ্ছেন ইয়াহইয়ার, যে আল্লাহর পক্ষের একটা কলেমার সত্যায়ন করবেন এবং সরদার ও সব সময়ের জন্যে নারীদের থেকে বিরত থাকবেন এবং নবী, আমার খাস বান্দাদের মধ্য থেকে (হবেন)।’ বললেন, হে আমার রব্ব! আমার সন্তান কোত্থেকে হবে? আমি তো বার্ধক্যে উপনীত এবং আমার স্ত্রী-ও বন্ধ্যা।’ এরশাদ করলেন, ‘আল্লাহ এভাবেই করেন, যা চান।’ আরয করলেন, ‘হে আমার রব্ব! আমার জন্যে কোনো নিদর্শন করে দিন!’ এরশাদ করলেন, ‘তোমার নিদর্শন এ-ই যে তিন দিন পর্যন্ত তুমি লোকজনের সাথে কথাবার্তা বলবে না, কিন্তু ইঙ্গিতে-ইশারায় এবং অাপন রব্বকে খুব স্মরণ করো; আর বিকেলে ও প্রভাতে তাঁর পবিত্রতা ঘোষণা করো।’ [আল-ক্বুরআন, ৩:৩৮-৪১]

এটা স্পষ্ট হওয়া দরকার যে পয়গম্বর ইয়াহইয়া (আ:)-এর তখনো বেলাদত তথা ধরণীতলে আবির্ভাব ঘটেনি। শুধু পয়গম্বর যাকারিয়্যা (আ:)-এর দোয়া কবূল হয়েছিলমাত্র। এমন কি তাঁর বেলাদতের আগেই আল্লাহতা’লা তাঁর কিছু বৈশিষ্ট্যের কথা  এখানে উল্লেখ করেছেন। অধিকন্তু, সূরা মরিয়মে পয়গম্বর ইয়াহইয়া (আ:)-এর বেলাদতের কথা পুরোপুরি উল্লেখ করা হয়েছে, যেখানে প্রথম আয়াতটি তাঁর মওলিদের বর্ণনা দ্বারা সুনির্দিষ্ট করা হয়েছে। এরশাদ হয়েছে:

“কা—-ফ হা-ইয়া-  ‘আঈ—-ন সোয়া—-দ (কেবল আল্লাহ পাক ও তাঁর রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহে ওয়া সাল্লাম-ই এর প্রকৃত অর্থ জানেন)। এটা হচ্ছে বিবরণ আপনার রব্বের ওই অনুগ্রহের, যা তিনি আপন বান্দা যাকারিয়্যার প্রতি করেছেন।” [আল-ক্বুরআন, ১৯:১-২]

এসব আয়াতে  জানা যায় যে কোনো পয়গম্বরের (আ:) বেলাদত/মওলিদকে স্মরণ করাটা কুরআন মজীদে আল্লাহতা’লার করুণা হিসেবে ব্যক্ত হয়েছে। পয়গম্বর ইয়াহইয়া (আ:)-এর মওলিদের স্মরণ যদি আল্লাহর রহমত তথা করুণারই স্মরণ হয়, তাহলে প্রিয়নবী (দ:)-এর মওলিদের স্মরণ-ও কেন আল্লাহর রহমতের স্মরণ হতে পারবে না? সমগ্র বিশ্বজগতের জন্যে খোদার রহমত হিসেবে যিনি প্রেরিত হয়েছেন, তাঁর থেকে সেরা আর কী রহমত হতে পারে? অতএব, যৌক্তিকভাবে বলতে গেলে মহানবী (দ:)-এর মওলিদের স্মরণ প্রকৃতপ্রস্তাবে আল্লাহতা’লারই রহমতের স্মরণ বটে।

আল-কুরআন পয়গম্বর ইয়াহইয়া (আ:)-এর মওলিদকে খোদার রহমত বলে উল্লেখ করেছে নিম্নবর্ণিত কারণে; এরশাদ হয়েছে:

“যখন তিনি (যাকারিয়্যা) আপন রব্বকে নীরবে আহ্বান করেছেন। আরয করলেন, ‘হে আমার প্রভু! আমার অস্থি দুর্বল হয়ে গেছে আর মাথা থেকে বার্ধক্যের শিখা প্রকাশ পেয়েছে (মানে সাদা হয়েছে),  এবং হে আমার রব্ব! আপনাকে আহ্বান করে আমি কখনো ব্যর্থ হইনি। এবং আমার মনে আমার পরে আপন স্বজনদের সম্পর্কে আশঙ্কা রয়েছে; আর আমার স্ত্রী বন্ধ্যা; সুতরাং আমাকে আপনার কাছ থেকে এমন কাউকে দান করুন, যে আমার কাজ সম্পাদন করবে। সে আমার উত্তরাধিকারী হবে এবং ইয়া’কুবের বংশধরদের উত্তরাধিকারী হবে; এবং হে আমার রব্ব! তাকে পছন্দ করুন।’ হে যাকারিয়্যা! আমি তোমাকে সুসংবাদ শুনাচ্ছি এক পুত্রের, যার নাম ইয়াহইয়া; এর পূর্বে আমি এ নামে কাউকেও নামকরণ করিনি। আরয করলেন, ‘হে আমার রব্ব! আমার পুত্র কোত্থেকে হবে? আমার স্ত্রী তো বন্ধ্যা এবং আমি বার্ধক্যের কারণে শুকিয়ে যাবার উপক্রম।’ (আল্লাহ) বললেন, ‘এরকম-ই হবে।’ তোমার রব্ব বলেছেন, ‘তা আমার জন্যে সহজসাধ্য এবং আমি এর আগে তোমাকে ওই সময়ে সৃষ্টি করেছি যখন তুমি কিছুই ছিলে না।’ আরয করলেন, ‘হে আমার রব্ব! আমাকে কোনো নিদর্শন দিন।’ (আল্লাহ) বললেন, ‘তোমার নিদর্শন এই যে, তুমি তিন রাত-দিন মানুষের সাথে বাক্যালাপ করবে না একেবারে সুস্থ থাকা সত্ত্বেও।’ অতঃপর মসজিদ থেকে আপন সম্প্রদায়ের কাছে বের হয়ে এলেন, তারপর তাদেরকে ইঙ্গিতে বললেন, ‘সকাল-সন্ধ্যায় (আল্লাহর) পবিত্রতা ঘোষণা করতে থাকো।’ ‘হে ইয়াহইয়া! কিতাবটা দৃঢ়তার সাথে ধারণ করো।’ এবং আমি তাকে শৈশবেই নবূয়ত প্রদান করেছি। এবং আমার কাছ থেকে দয়া ও পবিত্রতা; আর (তিনি) পরিপূর্ণ খোদভীরু (বান্দা) ছিলেন। এবং আপন মাতা-পিতার সাথে সদ্ব্যবহারকারী ছিলেন, উদ্ধত ও অবাধ্য ছিলেন না। এবং শান্তি তারই প্রতি যেদিন জন্মগ্রহণ করেছেন, যেদিন বেসালপ্রাপ্ত হবেন এবং যেদিন হায়াতে পুনরুত্থিত হবেন।” [আল-ক্বুরআন, ১৯:৩-১৫; মুফতী আহমদ এয়ার খাঁন (রহ:) প্রণীত ‘তাফসীরে নূরুল এরফান’]

সূরার এই প্রাথমিক আয়াতগুলো সম্পূর্ণভাবে পয়গম্বর ইয়াহইয়া (আ:)-এর মওলিদের স্মরণেই নির্দিষ্ট হয়েছে, যেখানে তাঁর বেলাদতের কথা উল্লেখিত হয়েছে এবং তাঁরই জন্যে পয়গম্বর যাকারিয়্যা (আ:)-এর কৃত দোয়ার ব্যাপারেও উল্লেখ করা হয়েছে। সর্বশক্তিমান আল্লাহতা’লা পয়গম্বর ইয়াহইয়া (আ:)-এর বেলাদতের সুসংবাদ প্রদান করেছেন; আর যখন পয়গম্বর যাকারিয়্যা (আ:) তাঁর বিস্ময়ের কথা ব্যক্ত করেন, তখন আল্লাহ পাক নিজ কুদরত তথা সর্বশক্তিমান হওয়ার ক্ষমতা সম্পর্কে উল্লেখ করেছেন। সংক্ষেপে, আল্লাহতা’লা ও পয়গম্বর যাকারিয়্যা (আ:)-এর মাঝে যে বাক্যালাপ হয়েছিল, তার সম্পূর্ণ বিবরণ কুরআন মজীদে বিবৃত হয়েছে। অতঃপর পয়গম্বর ইয়াহইয়া (আ:)-এর আধ্যাত্মিক মাকাম (স্তর)-এর কিছু দিক এবং তাঁরই জীবনের কিছু অনন্য বৈশিষ্ট্য সম্পর্কে উল্লেখ করা হয়েছে। তাঁর আশীর্বাদপূর্ণ বেলাদত ও জীবনের ঘটনাবলী উল্লেখের পরে এই বর্ণনার পরিসমাপ্তি ঘটেছে তাঁর বেলাদত, বেসালপ্রাপ্তি ও শেষ বিচার দিবসে পুনরুত্থানের প্রতি শান্তি বর্ষণের মাধ্যমে। আল-কুরআনে এসব ঘটনা স্মরণ করার উদ্দেশ্য হলো, আমাদের মস্তিষ্কে পয়গম্বর ইয়াহইয়া (আ:)-এর মওলিদের তাৎপর্য সম্পর্কে সচেতনতা সৃষ্টি করা। এটাই হচ্ছে কুরআনে বর্ণিত পয়গম্বর ইয়াহইয়া (আ:)-এর মওলিদ

৩.৩.৫ পয়গম্বর ঈসা (আ:)-এর মওলিদ

কুরআন মজীদে মরিয়ম (আ:)-এর মওলিদের উল্লেখের পরপরই তাঁর পুত্র পয়গম্বর ঈসা (আ:)-এর মওলিদের কথা উল্লেখিত হয়েছে। একটি গোটা উদ্ধৃতি তাঁর মওলিদের প্রতি উৎসর্গিত হয়েছে, যেখানে তাঁর মহান মাতাকে তাঁরই বেলাদতের আগে তাঁর ধরাধামে আবির্ভাবের সুখবর দেয়া হয়েছে। এরশাদ হয়েছে:

“এবং স্মরণ করুন! যখন ফেরেশতারা মরিয়মকে বললো, ‘হে মরিয়ম! আল্লাহ তোমাকে সুসংবাদ দিচ্ছেন তাঁর কাছ থেকে একটা কলেমার, যার নাম হচ্ছে মসীহ ঈসা, মরিয়ম-পুত্র, মর্যাদাবান হবে দুনিয়া ও আখেরাতে এবং নৈকট্যপ্রাপ্ত; এবং মানুষের সাথে কথা বলবে দোলনায় ও পরিণত বয়সে আর খাস বান্দাদের অন্যতম হবে।’ বললো, ‘হে আমার রব্ব! আমার সন্তান কোত্থেকে হবে? আমাকে তো কোনো পুরুষ স্পর্শ করেনি।’ এরশাদ করলেন, ‘আল্লাহ এভাবেই সৃষ্টি করেন যা ইচ্ছা করেন। যখন কোনো কাজের হুকুম করেন, তখন তাকে এটাই বলে থাকেন, ‘হয়ে যাও!’ সেটা তৎক্ষণাৎ হয়ে যায়।” [আল-কুরআন, ৩:৪৫-৪৭]

পয়গম্বর ঈসা (আ:)-এর মওলিদ সম্পর্কে বিশদ আলোচনার পরে আরো ঘটনা বর্ণনা করা হয়েছে। যেমন, ফেরেশতা জিবরীল আমীন (আ:) কীভাবে মরিয়ম (আ:)-এর মধ্যে রূহ ফুঁকে দেন,  আর তিনি কীভাবে এরপর সন্তান-সম্ভবা হন। সন্তান প্রসবকালে মরিয়ম (আ:) যে ব্যথা অনুভব করেন, এমন কি তা-ও বর্ণিত হয়েছে। আর অাল্লাহতা’লা তাঁর প্রসববেদনা উপশমে কীভাবে পানির নহর সৃষ্টি করেন এবং (তাজা) খেজুর সরবরাহ করেন, তারও উল্লেখ রয়েছে। পয়গম্বর ঈসা (আ:)-এর বেলাদতের মুহূর্তগুলো, পরবর্তীকালে সংঘটিত ঘটনাবলী (যা’তে মরিয়মকে দোষারোপ ও সমালোচনা করা হয়) এবং দোলনায় অবস্থানকারী পয়গম্বর ঈসা (আ:)-এর প্রদত্ত জবাব, এসব-ই আল্লাহতা’লা তাঁর কুরআন মজীদে উল্লেখ করেছেন এভাবে:

“এবং কিতাবে মরিয়মকে স্মরণ করুন! যখন আপন পরিবারবর্গ থেকে পূর্বদিকে পৃথক একস্থানে চলে গিয়েছিলো; অতঃপর তাদের দিক থেকে একটা পর্দা করে নিলো। তারপর তার প্রতি আমি আপন ‘রূহানী’ (মানে ফেরেশতা জিবরীল) প্রেরণ করেছি, সে তার সামনে একজন সুস্থ মানুষের রূপে আত্মপ্রকাশ করলো। (মরিয়ম) বললো, ‘আমি তোমার থেকে পরম করুণাময়ের আশ্রয় চাচ্ছি যদি তোমার মধ্যে খোদার ভয় থাকে।’ (ফেরেশতা) বললো, ‘আমি তো তোমার রব্বের প্রেরিত, আমি তোমাকে এক পবিত্র পুত্র (সন্তান) প্রদান করবো।’ বললো, ‘আমার পুত্র কোত্থেকে হবে, আমাকে তো কোনো মানুষ স্পর্শ করেনি, না আমি ব্যভিচারিনী?’ (ফেরেশতা) বললো, ‘এরকম-ই হবে’; তোমার রব্ব বলেছেন, ‘এটা আমার জন্যে সহজসাধ্য এবং এ জন্যে যে, আমি তাকে মানুষের জন্যে নিদর্শন করবো এবং আমার কাছ থেকে একটা অনুগ্রহ; আর এ বিষয় চূড়ান্ত হয়ে গেছে।’ তখন মরিয়ম তাকে গর্ভে ধারণ করলো, অতঃপর তাকে নিয়ে এক দূরবর্তী স্থানে চলে গেলো। অতঃপর তাকে প্রসব-বেদনা একটা খেজুর-বৃক্ষমূলে নিয়ে এলো। বললো, ‘হায়! এর পূর্বে কোনো মতে আমি যদি মরে যেতাম এবং লোকের স্মৃতি থেকে সম্পূর্ণ বিলুপ্ত হয়ে যেতাম!’ অতঃপর তাকে তার নিম্নদেশ থেকে আহ্বান করলো, ‘তুমি দুঃখ করো না, নিশ্চয় তোমার রব্ব তোমার নিম্নদেশে একটা নহর প্রবাহিত করে দিয়েছেন। এবং খেজুর বৃক্ষের গোড়া ধরে নিজের দিকে নাড়া দাও, তখন তোমার ওপর তাজা-পাকা খেজুরসমূহ ঝরে পড়বে। সুতরাং তুমি আহার করো এবং পান করো আর চোখ জুড়াও। অতঃপর যদি তুমি কোনো মানুষ দেখো তবে বলে দিও, ‘আমি আজ ‘রাহমান’ (পরম  দয়ালু আল্লাহ)-এর উদ্দেশ্যে রোযার মানত করেছি, সুতরাং আজ কিছুতেই কোনো মানুষের সাথে কথা বলবো না।’ অতঃপর তাকে কোলে নিয়ে আপন সম্প্রদায়ের কাছে উপস্থিত হলো। তারা বললো, ‘হে মরিয়ম! নিশ্চয় তুমি অত্যন্ত অপছন্দনীয় কাজ করে বসেছো। হে হারূনের বোন! তোমার পিতা মন্দ লোক ছিলো না এবং না তোমার মাতা ব্যভিচারিনী।’ এর জবাবে মরিয়ম (আপন) সন্তানের প্রতি ইঙ্গিত করলো। তারা বললো, ‘আমরা কীভাবে কথা বলবো তারই সাথে, যে দোলনার শিশু?’ শিশুটি বললো, ‘আমি আল্লাহর বান্দা। তিনি আমাকে কিতাব দিয়েছেন এবং আমাকে অদৃশ্যের সংবাদদাতা (নবী) করেছেন, আর তিনি আমাকে যেখানেই থাকি না কেন এবং আমাকে নামায ও যাকাতের তাকীদ দিয়েছেন যতোদিন আমি জীবিত থাকি, আর আমার মায়ের সাথে সদ্ব্যবহারকারী এবং আমাকে উদ্ধত ও হতভাগ্য করেননি; এবং ওই শান্তি আমার প্রতি যেদিন আমি জন্মলাভ করেছি এবং যেদিন আমি বেসালপ্রাপ্ত হবো আর যেদিন জীবিত অবস্থায় পুনরুত্থিত হবো।’ এ-ই হচ্ছে ঈসা, মরিয়ম-তনয়। সত্য কথা, যা’তে তারা সন্দেহ করছে। আল্লাহর জন্যে শোভা পায় না যে তিনি কাউকে আপন সন্তান স্থির করবেন। পকিত্রতা তাঁরই। যখন কোনো কাজের নির্দেশ দেন তখন এভাবেই সেটার উদ্দেশ্যে বলেন, ‘হয়ে যাও!’ সেটা তৎক্ষণাৎ হয়ে যায়।” [আল-কুরআন, ১৯: ১৬-৩৫]

৩.৩.৬ মনোনীত জন – মহানবী (দ:)-এর মওলিদ

পূর্ববর্তী পৃষ্ঠাগুলোতে আম্বিয়া (আ:)-বৃন্দের মওলিদের কথা উল্লেখিত হয়েছে; এসব ঘটনার বিবরণ প্রদানকারী হলেন স্বয়ং আল্লাহতা’লা। কুরআন মজীদ কর্তৃক পয়গম্বর (আ:)-মণ্ডলীর বেলাদত তথা ধরণীতলে শুভাগমনকে ঘিরে বিভিন্ন ঘটনার বিবরণ প্রদান, আম্বিয়া (আ:)-বৃন্দের মো’জেযা তথা অলৌকিকত্ব ও আশীর্বাদের বর্ণনা দান এবং তাঁদের প্রতি বর্ষিত আল্লাহর নেয়ামতের উল্লেখকরণের উদ্দেশ্য হচ্ছে এটা দেখানো যে, এটা আল্লাহতা’লারই সুন্নাহ; আর এসব আয়াত বারংবার তেলাওয়াত করার পক্ষেই আল-কুরআনের (দৃঢ়) অবস্থান। হয়তো এ প্রশ্ন উঠতে পারে যে আল-কুরআনে অন্যান্য আম্বিয়া (আ:)-মণ্ডলীর মওলিদের উল্লেখ করা হয়েছে সত্য, কিন্তু আমাদের মহানবী (দ:)-এর মওলিদ সম্পর্কে কি কোনো উল্লেখ এতে রয়েছে? এর উত্তর অবশ্যই হ্যাঁ-সূচক: সর্বোচ্চ মর্যাদাসম্পন্ন নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহে ওয়া সাল্লামের আশীর্বাদপূর্ণ মওলিদের উল্লেখ কুরআন মজীদে বিধৃত হয়েছে।

কুরআন পাকের গভীর অধ্যয়নে সুস্পষ্টভাবে ফুটে ওঠবে যে পয়গম্বর (আ:)-বৃন্দের বেলাদতের উল্লেখ দ্বারা আল্লাহতা’লা তাঁদের মান-মর্যাদাকে সুখ্যাতি দিয়েছেন। কেউ যদি কুরআনকে নিয়ে গবেষণা ও বিশ্লেষণ করেন, তাহলে তিনি দেখতে পাবেন যে অন্যান্য আম্বিয়া (আ:)-বৃন্দের মওলিদ স্রেফ তাঁদের বেলাদতকে ঘিরে ঘটে যাওয়া ঘটনারই বর্ণনামাত্র। অথচ অপরদিকে, মহানবী (দ:)-এর মর্যাদা বিশেষভাবে পৃথক করা হয়েছে – আল্লাহতা’লা শুধু তাঁর বেলাদতের শহরের (মানে মক্কার) শপথ-ই নেননি, বরঞ্চ তিনি তাঁর পূর্বপুরুষদের নামেও কসম করেছেন। এরশাদ হয়েছে:

“আমায় এ শহরের শপথ, যেহেতু হে মাহবূব! আপনি এ শহরে তাশরীফ রাখছেন, এবং আপনার পিতা (পিতৃপুরুষ) ইব্রাহীমের শপথ এবং তার বংশধরের, অর্থাৎ আপনি-ই।” [আল-কুরআন, ৯০:১-৩]

মক্কায় অবস্থিত রয়েছে আল্লাহর ঘর, হাজরে আসওয়াদ (কালো পাথর), তাওয়াফ করার স্থান, মুলতাযাম, মাক্বা’ম-এ-ইবরাহীম, যমযম কূপ, আল-সা’ফা ও আল-মারওয়া; কিন্তু আল্লাহতা’লা এগুলোর কোনোটারই কসম কাটেননি। বরঞ্চ তিনি মক্কা শহরের শপথ করেছেন, কেননা এতে তাঁর মাহবূব (দ:)-এর বসতিস্থান রয়েছে। অতঃপর আল্লাহতা’লা প্রিয়নবী (দ:)-এর পিতৃপুরুষদের শপথ করেছেন। এখানে যে গুরুত্বপূর্ণ বিষয়টি লক্ষণীয় তা হলো, আল্লাহতা’লা কারোরই বেলাদতের ক্ষেত্রে শপথ নেননি, ব্যতিক্রম শুধু মহানবী (দ:)-এর বেলাদতের বেলায়।

মহানবী (দ:)-এর প্রেরণ সম্পর্কে আল্লাহ পাক এরশাদ ফরমান:

“যেমন আমি তোমাদের মধ্যে প্রেরণ করেছি একজন রাসূল তোমাদের মধ্য থেকে, যিনি তোমাদের প্রতি আমার আয়াতগুলো তেলাওয়াত করেন, তোমাদেরকে (অর্থাৎ, তোমাদের অন্তর ও একগুঁয়ে নফসকে) পবিত্র করেন এবং কিতাব ও পরিপক্ক জ্ঞান শিক্ষা দেন। আর তোমাদের ওই (আধ্যাত্মিক ও ঐশী) জ্ঞান শিক্ষা দান করেন, যার জ্ঞান তোমাদের ছিল না।” [আল-কুরআন, ২:১৫১]

“নিশ্চয় আল্লাহর মহান অনুগ্রহ হয়েছে মুসলমানদের প্রতি যে, তাদের মধ্যে  তাদেরই মধ্য থেকে একজন রাসূল প্রেরণ করেছেন, যিনি তাদের প্রতি তাঁর আয়াতসমূহ পাঠ করেন এবং তাদেরকে পবিত্র করেন, আর তাদেরকে কিতাব ও হিকমত শিক্ষা দান করেন এবং তারা নিশ্চয় এর পূর্বে স্পষ্ট গোমরাহীতে ছিলো।” [আল-কুরআন, ৩:১৬৪]

“হে মানবজাতি! তোমাদের কাছে এ রাসূল সত্য সহকারে তোমাদেরই রব্বের কাছ থেকে শুভাগমন করেছেন; সুতরাং ঈমান আনো তোমাদের কল্যাণার্থে।” [আল-কুরআন, ৪:১৭০]

“হে কিতাবীরা! নিশ্চয় তোমাদের কাছে আমার এ রাসূল তাশরীফ এনেছেন, যিনি তোমাদের কাছে প্রকাশ করেন ওইসব বস্তু থেকে এমন অনেক কিছু, যেগুলো তোমরা কিতাবের মধ্যে গোপন করে ফেলেছিলে এবং অনেক কিছু (তিনি) ক্ষমা করে থাকেন। নিশ্চয় তোমাদের কাছে আল্লাহর পক্ষ থেকে একটা ‘নূর’ এসেছে এবং স্পষ্ট কিতাব।” [আল-কুরআন, ৫:১৫]

“হে কিতাবীরা! নিঃসন্দেহে তোমাদের কাছে আমার এ রাসূল তাশরীফ এনেছেন, যিনি তোমাদের কাছে আমার বিধি-বিধান সুস্পষ্টভাবে বর্ণনা করেন, এরপর যে, রাসূলবৃন্দের আগমন বহুদিন বন্ধ ছিলো, যাতে কখনো একথা না বলতে পারো যে ‘আমাদের কাছে কোনো সুসংবাদদাতা ও সাবধানকারী আসেননি।’ সুতরাং এ সুসংবাদদাতা ও সাবধানকারী তোমাদের কাছে তাশরীফ এনেছেন এবং আল্লাহর কাছেই রয়েছে চূড়ান্ত ক্ষমতা।” [আল-কুরঅান, ৫:১৯]

“নিশ্চয় তোমাদের কাছে তাশরীফ এনেছেন তোমাদের মধ্য হতে ওই রাসূল, যাঁর কাছে তোমাদের দুঃখ-দুর্দশা (দর্শন) কষ্টদায়ক, তোমাদের কল্যাণ অতিমাত্রায় (যিনি) কামনাকারী, মুসলমানদের প্রতি পূর্ণ দয়ার্দ্র, দয়ালু।” [আল-কুরআন, ৯:১২৮]

“এবং আমি আপনাকে সমগ্র জগতের জন্যে রহমতরূপেই প্রেরণ করেছি।” [আল-কুরআন, ২১:১০৭]

“তিনি-ই (আল্লাহ), যিনি উম্মী মানুষদের মধ্যে তাদেরই মধ্য থেকে একজন রাসূল প্রেরণ করেন যেন তাদের কাছে তাঁর আয়াতসমূহ পাঠ করেন, তাদেরকে পবিত্র করেন (বাইরে ও অভ্যন্তরে) এবং তাদেরকে কিতাব ও হিকমতের জ্ঞান দান করেন, আর অবশ্যঅবশ্য তারা ইতিপূর্বে সুস্পষ্ট পথভ্রষ্টতার মধ্যে ছিলো।” [আল-কুরআন, ৬২:২]

“নিশ্চয় আমি তোমাদের প্রতি একজন রাসূল প্রেরণ করেছি।” [আল-কুরআন, ৭৩:১৫]

ওপরের আয়াতগুলোতে মহানবী (দ:)-এর শুভাগমন সম্পর্কে উল্লেখ আছে, আর এটা মূলতঃ তাঁর আশীর্বাদপূর্ণ বেলাদতেরই যিকর-তাযকেরা (স্মরণ)। কেউ যদি গভীরভাবে এসব আয়াত সম্পর্কে চিন্তা করেন, তাহলে বোঝা যাবে যে আল্লাহতা’লা তাঁর মাহবূব (দ:)-এর বেলাদতের কথা উল্লেখ করেছেন গোটা মানবতাকে উদ্দেশ্যে করেই; ঈমানদারদের পাশাপাশি আহলে কেতাব (ইহুদী/খৃষ্টান), অবিশ্বাসী ও মুশরিকদেরও এতে অন্তর্ভুক্ত করা হয়েছে। প্রত্যেককেই সচেতন করা হয়েছে যে আল্লাহর মাহবূব (দ:) শুভাগমন করতে যাচ্ছেন; তাঁর এই শুভাগমনকে সমগ্র বিশ্বজগতের জন্যে (আল্লাহর) করুণা ও আশীর্বাদ হিসেবে ঘোষণা করা হয়েছে। সর্বশক্তিমান আল্লাহ পাক তাঁর মাহবূব (দ:)-এর আবির্ভাবের যিকর তথা স্মরণকে এতো উচ্চমর্যাদা দিয়েছেন যে কেউই আর এটাকে হাল্কা ব্যাপার হিসেবে নিতে পারবে না।

আল্লাহতা’লা এসব আয়াতে করীমার মাধ্যমে উম্মতে মুহাম্মদীকে শিক্ষা দিয়েছেন যে মহানবী (দ:)-এর আশীর্বাদপূর্ণ বেলাদতের স্মরণ অনাগত প্রজন্মগুলোর জন্যে বাধ্যতামূলক করা হয়েছে। এরই আলোকে রাসূলুল্লাহ (দ:)-এর বেলাদতের যিকর-তাযকেরার প্রয়োজনীয়তাকে যে মানসিকতা হেয় প্রতিপন্ন করে, তাকে আম্বিয়া (আ:)-এর মওলিদের উল্লেখকারী ডজনকে ডজন আয়াতের প্রত্যাখ্যানকারী হিসেবে সাব্যস্ত করা যায়। আমরা যখন মহানবী (দ:)-কে তাঁর মওলিদের পরিপ্রেক্ষিতে স্মরণ করি, তখন আমরা আল্লাহরই সুন্নাহকে অনুকরণ-অনুসরণ করে থাকি এবং ফলশ্রুতিতে তাঁরই আদেশ মেনে চলি। এসব আয়াত, যেগুলোতে আল্লাহর আশীর্বাদধন্য বান্দাদের বেলাদতের কথা উল্লেখ করা হয়েছে, সেগুলো কেউ সযত্নে অধ্যয়ন করলে জানা যাবে যে সেসব ঘটনায় কোনো বিশেষ শিক্ষা বা পথপ্রদর্শনমূলক বার্তা নিহিত নেই (যা আমাদের জীবনে সরাসরি বাস্তবায়ন করা যায়); বরঞ্চ সেগুলো বিবরণ মাত্র, যার উদ্দেশ্য হলো (স্রেফ) আম্বিয়া (আ:)-এর মওলিদকে স্মরণ করা।

৩.৪ আম্বিয়া (আ:)-এর মওলিদ হতে মহানবী (দ:)-এর মওলিদের ধারাবাহিকতা

সর্বশক্তিমান আল্লাহতা’লা তাঁর আশীর্বাদধন্য প্রিয় বান্দাদের মওলিদের স্মরণকে এতো উচ্চমর্যাদা দিয়েছেন যে এমন কি এসব প্রিয় বান্দার মনে যে সকল চিন্তার উদ্রেক হয়েছিল, সেগুলোরও তিনি উল্লেখ করেছেন। উদাহরণস্বরূপ, কেউ পয়গম্বর ইয়াহইয়া (আ:)-এর মওলিদ সম্পর্কে অধ্যয়ন করলে দেখতে পাবেন যে পয়গম্বর যাকারিয়্যা (আ:) মরিয়ম (আ:)-এর মঠরূপী আবাসস্থলে প্রবেশ করার পর সেখানে বে-মওসূমি ফল-ফলাদির খোঁজ পেয়ে তিনি সন্তানপ্রাপ্তির আশায় দোয়া করেছিলেন।আর যখন তাঁকে একজন সৎ ও ন্যায়পরায়ণ পুত্রসন্তান-প্রাপ্তির খোশখবরি দেয়া হয়েছিল, তখন নিজের বার্ধক্য ও তাঁরই স্ত্রীর বন্ধ্যাত্বের কারণে কীভাবে সন্তান লাভ হবে সে সম্পর্কে তাঁর মনে এক চিন্তার উদ্রেক হয়। এরই ফলে তিনি আল্লাহতা’লাকে এব্যাপারে প্রশ্ন-ও করেন। কুরআন মজীদে এই ঘটনা ও এর প্রতি (খোদার) জবাব-ও উল্লেখিত হয়েছে।

অনুরূপভাবে, পয়গম্বর ঈসা (আ:)-এর মওলিদের অধ্যয়ন-ও ঈমানকে দারুণভাবে সতেজ করে তোলে এবং চিন্তার খোরাক যোগায়। প্রদত্ত কিছু খুঁটিনাটি বিষয়ের বিবরণ পাঠের পর কেউ স্রেফ থমকে একথা চিন্তা করবেন যে এসব বিবরণ প্রদানের প্রয়োজনীয়তা কী হতে পারে। উদাহরণস্বরূপ, মরিয়ম (আ:)-এর অনুভূত প্রসববেদনা ও এই শঙ্কাবোধের বহিঃপ্রকাশ যে এর আগে যদি তাঁর মৃত্যু হতো এবং তিনি বিস্মৃত হতেন। পয়গম্বর ঈসা (আ:)-এর বেলাদতের সময় ফেরেশতা জিবরীল (আ:)-এর উপস্থিতি হতে আরম্ভ করে প্রতিটি খুঁটিনাটি বর্ণনা প্রদান করা হয়েছে। এসব বর্ণনা প্রদান করে আল্লাহতা’লা এই উম্মতকে সচেতন করে তুলেছেন এ মর্মে যে, আল-কুরআনে যেভাবে পয়গম্বর (আ:)-বৃন্দের মওলিদের পূর্ণ বৃত্তান্ত দেয়া হয়েছে, ঠিক তেমনি তাঁর সর্বাধিক প্রিয় নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহে ওয়া সাল্লামের মওলিদের সময় যখন আগমন করবে তখন একই উপায়ে সেটারও স্মরণ করতে হবে। পয়গম্বর আদম (আ:)-এর ঔরস হতে পিতা আবদুল্লাহ’র ঔরস হয়ে মা আমেনা’র কোলে মহানবী (দ:)-এর নূরানী বেলাদত তথা জ্যোতির্ময় শুভাগমন ও তৎপরবর্তী পর্যায়ে (দুধ-মা) হালিমা আল-সা’দিয়া কর্তৃক লালন-পালন পর্যন্ত সমস্ত বিবরণ-ই প্রত্যেকের স্মরণ করা উচিত। এসব বর্ণনা এমনভাবে প্রদান করতে হবে যাতে প্রত্যক্ষকৃত সমস্ত খুঁটিনাটি বিষয়, নেয়ামত তথা আশীর্বাদ ও মো’জেযা (অলৌকিকত্ব)-এর কথা উল্লেখিত হয়, কিছুই যাতে বাদ না পড়ে। এটা মহান আল্লাহতা’লার সুন্নাত (রীতিনীতি) এবং এর পক্ষেই আল-কুরআনের অবস্থান। অন্যান্য পয়গম্বর (আ:)-বৃন্দের মওলিদের কথা ঐশী কালাম (বাণী)-এর সূত্রে আমাদের মহানবী (দ:)-ই প্রকাশ করেছেন; আর স্পষ্টতঃ আমাদের প্রিয়নবী (দ:)-এর মওলিদের স্মরণ অনাগত প্রজন্মগুলোই করবেন, যেহেতু তাঁর পরে অন্য কোনো নবী আর আসবেন না। এই কারণেই তাঁর যিকর-তাযকেরা (স্মরণ) এ উম্মতকেই করতে হবে।

প্রিয়নবী (দ:)-এর মওলিদ হচ্ছে ওইসব ঘটনার যিকর-তাযকেরা (স্মরণ) যা তাঁর ধরাধামে শুভাগমনের আগে এবং ওই শুভক্ষণে ঘটেছিল। মহানবী (দ:)-এর নূর (জ্যোতি) কীভাবে পয়গম্বর আদম (আ:)-এর ঔরস হতে পুণ্যবান পুরুষদের ঔরস ও ন্যায়নিষ্ঠ নারীদের গর্ভে স্থানান্তরিত হয়ে (তাঁর বাবা) আব্দুল্লাহর ঔরসে পৌঁছে, এটা তারই উল্লেখ; আর তাঁরই বেলাদতের মাধ্যমে মহান আল্লাহতা’লা কীভাবে মানবজাতির প্রতি নিজের অসংখ্য রহমত-বরকত-নেয়ামত (আশীর্বাদ) বর্ষণ করেছেন, সেটারও স্মরণ বটে। সারা বছর ধরেই হুযূর পাক (দ:)-এর শানে না’ত-পদ্য-কসীদা পাঠ করা হয়, কিন্তু পবিত্র রবিউল আউয়াল মাস এলেই এই মহব্বত ও ভক্তিশ্রদ্ধা নতুন প্রাণস্পন্দন পায় এবং রাসূলুল্লাহ (দ:)-এর সম্মানে বিশেষ মাহফিল ও মজলিশের আয়োজন করা হয়। এই উপলক্ষে কিছু মানুষ হুযূর পাক (দ:)-এর মনোরম অলকগুচ্ছ ও গণ্ডদেশ সম্পর্কে স্মৃতিচারণ করেন, আবার অনেকে রোমন্থন করেন হৃদয়ে উষ্ণতা ছড়ানো তাঁর স্মিত হাসি এবং মক্কার রাস্তায় রাস্তায় তাঁরই পদচারণাকে; কেউ কেউ সবুজ গুম্বজের শান-শওকত নিয়ে আলোচনা করেন, আর কেউ কেউ তাঁর পবিত্র রওযা শরীফের স্বর্ণের ঘের এবং মদীনা নগরীর রাস্তা ও সেগুলোর সৌন্দর্য সম্পর্কে বর্ণনা দেন। রাসূল (দ:)-এর মহান মাতা আমিনা (রা:) ও দুধ-মা হালিমা (রা:)-এর স্মৃতি চৌদ্দ’শ বছর আগেকার মক্কার দৃশ্যগুলোকে আবার স্মৃতিপটে ভাস্বর করে। এই মাসে নবী করীম (দ:)-এর প্রতি ভক্তিমূলক না’ত-শে’র-কসীদা গাওয়া হয়, আর তাঁকে স্মরণ-ও করা হয়। মহানবী (দ:)-এর বেলাদতের কথা যখন উল্লেখ করা হয়, তখন ঈমানদারবৃন্দ এসব আবেগময় কাব্য শুনে তাঁদের অন্তরে সুপ্ত নবীপ্রেমের জাগরণ অনুভব করেন।

পূর্ববর্তী পৃষ্ঠাগুলোতে আমরা দেখিয়েছি কীভাবে আল-কুরআন অন্যান্য পয়গম্বর (আ:)-বৃন্দের মওলিদের উল্লেখ করেছে। এই পৃষ্ঠাগুলো সেসব লোককে খণ্ডন করে, যারা মহানবী (দ:)-এর বেলাদতকে ঘিরে ঘটে যাওয়া ঘটনাগুলোর স্মৃতিচারণের গুরুত্বকে প্রশ্নবিদ্ধ করে থাকে। এসব কুরআনের আয়াত পাঠ করেও যদি কেউ এখনো মনে করে যে এগুলোর কোনো গুরুত্ব নেই, তাহলে এধরনের লোক আল-কুরআনের প্রকাশ্য আয়াতেরই প্রতি আপত্তি উত্থাপন করছে, আর এটা শুধু তার নিজস্ব জ্ঞানের অভাব ও ভুল উপলব্ধিরই পরিচায়ক হবে। এই কুরআনী বিশ্লেষণ দ্বারা এ বিষয়টি উপলব্ধি করা জরুরি যে মহানবী (দ:)-এর মওলিদের উদযাপন প্রকৃতপ্রস্তাবে আল্লাহতা’লারই একটি সুন্নাহ বা রীতি; আর শেষ বিচার দিবস পর্যন্ত প্রিয়নবী (দ:)-এর প্রতি গভীর প্রেম-ভালোবাসা যাঁরা অন্তরে রাখবেন, তাঁরা এটাকে (মানে মওলিদকে) গ্রহণ বা ধারণ করবেন।

প্রশ্ন জাগে, তাহলে এই স্মরণ কীভাবে করা উচিত? উত্তরটাও স্বয়ং খোদাতা’লা-ই ব্যাখ্যা করেছেন। হুযূর পাক (দ:)-এর ধরাধামে শুভাগমনের সাথে সম্পৃক্ত ঘটনাগুলোর স্মরণ দ্বারা আমরা সর্বশক্তিমান আল্লাহতা’লার সুন্নাহকেই মেনে চলি, কেননা তিনি-ই অন্যান্য আম্বিয়া (আ:)-বৃন্দের মওলিদের কথা উল্লেখ করেছেন (তাঁর পাক কেতাবে)। আমরা এ-ও ব্যাখ্যা করেছি যে আল্লাহতা’লা যখন কুরআন মজীদে পয়গম্বর (আ:)-বৃন্দের মওলিদের কথা উল্লেখ করেছেন, তখন তিনি খুঁটিনাটি বিষয়ের বর্ণনাও উপেক্ষা করেননি। এভাবে আল্লাহর এই রীতির কথা স্মরণে রেখে রাসূল (দ:)-এর যিকর-তাযকেরা করার সময় আমাদের উচিত হবে তাঁর সৃষ্টি, তাঁর নূর হওয়ার বিষয় এবং তাঁর বেলাদত সম্পর্কে আলোচনা করা; তাঁর উচ্চবংশীয় খান্দান, তাঁর অনুপম বৈশিষ্ট্যাবলী এবং ধূলির ধরায় মাহবূব (দ:)-এর শুভাগমনকে ঘিরে ঘটে যাওয়া অলৌকিক ঘটনাগুলোর উল্লেখও আমাদের করা উচিত হবে।

মওলিদের উপলক্ষ পেলেই আমরা পয়গম্বর আদম (আ:) হতে আরম্ভ করে সর্ব-পয়গম্বর ইব্রাহীম (আ:) ও ইসমাঈল (আ:) হয়ে (রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহে ওয়া সাল্লামের বাবা) আবদুল্লাহ (রা:)-কে স্মরণ করি। অতঃপর আমরা বর্ণনা করি কীভাবে নবী করীম (দ:) মা আমিনা (রা:)-এর কোলে এলেন এবং দুধ-মা হালিমা (রা:) কর্তৃক লালিত-পালিত হলেন, যাতে এই যিকর-তাযকেরার আনন্দ আমাদের অন্তরে শান্তি বয়ে আনে এবং আমাদের মস্তিষ্কে চিরস্থায়ীভাবে এর গুণগত প্রভাব পড়ে। প্রিয়নবী (দ:)-এর মওলিদের অনুষ্ঠানগুলোতে তাঁরই নবুয়্যতের স্মরণ করা হয়। অতএব, এসব মাহফিল অনুষ্ঠান করাকে না-জায়েয বলা চরম ভ্রান্তি, আল্লাহ মাফ করুন। মওলিদুন্নবী (দ:)-এর উদযাপন জায়েয তথা অনুমতিপ্রাপ্ত হওয়ার পক্ষে কুরআন-হাদীসের প্রামাণিক দলিলাদি এবং এর গঠনের উপাদানসমূহ পরবর্তী অধ্যায়গুলোতে বিধৃত হয়েছে।

চতুর্থ অধ্যায়

মওলিদুন্নবী (দ:)-এর সমর্থনে আল-কুরআনের দলিল

তাকদীর তথা ভাগ্য (নিয়তি) কিছু বস্তুকে অন্যান্য বস্তুর চেয়ে শ্রেষ্ঠত্ব দিয়েছে। নির্দিষ্ট কিছু দিন ও স্থান অন্যান্য দিন ও স্থানের চেয়ে বিভিন্ন দিক দিয়ে উচ্চতর মর্যাদাসম্পন্ন। অনুরূপভাবে, আল্লাহতা’লা কিছু পুণ্যাত্মাকে অন্যান্য মানুষের চেয়ে শ্রেষ্ঠত্ব দিয়েছেন, ঠিক যেমনটি আল্লাহতা’লা কর্তৃক কতিপয় পয়গম্বর (আ:)-কে অন্যদের চেয়ে উচ্চতর মর্যাদা দান। তিনি এরশাদ ফরমান:

“এঁরা রাসূল, আমি তাঁদের এককে অপরের ওপর শ্রেষ্ঠ করেছি।” [আল-কুরআন, ২:২৫৩]

একইভাবে, মহান আল্লাহতা’লা কিছু মুহূর্ত, দিন ও মাসকে অন্যান্য মুহূর্ত, দিন ও মাসের চেয়ে বেশি পছন্দ করেছেন। রমযান মাসের উৎকর্ষের কারণ বর্ণনা করতে গিয়ে তিনি কুরআন মজীদে এরশাদ ফরমান:

“রমযানের মাস, যা’তে কুরআন অবতীর্ণ হয়েছে, মানুষের জন্যে হেদায়াত এবং পথ-নির্দেশ ও মীমাংসার সুস্পষ্ট বাণীসমূহ।” [আল-কুরআন, ২:১৮৫]

এই আশীর্বাদপূর্ণ মাসে একটি রাত আছে (লাইলাতুল ক্বদর), যেটা ক্বুরআন অবতীর্ণ হওয়ার সুবাদে অন্যান্য রাতের চেয়ে শ্রেষ্ঠত্ব পেয়েছে। এরশাদ হয়েছে:

“নিশ্চয় আমি সেটা ক্বদরের রাতে অবতীর্ণ করেছি।” [আল-কুরআন, ৯৭:১]

একই পন্থায় অন্যান্য পবিত্র স্থান থাকা সত্ত্বেও আল্লাহতা’লা মক্কা নগরীর শপথ করেছেন, যার দরুন এটা অন্যান্য নগরীর চেয়ে শ্রেষ্ঠত্ব পেয়েছে। এর কারণ হলো, মহানবী (দ:) তাঁর (প্রকাশ্য) জীবনের বেশির ভাগ সময়-ই এখানে কাটিয়েছিলেন। এরশাদ হয়েছে:

“আমায় এ শহরের শপথ, যেহেতু হে মাহবূব! আপনি এ শহরে তাশরীফ রাখছেন।” [আল-ক্বুরআন, ৯০:১-২]

অনুরূপভাবে, ইসলাম ও ঈমানের পরে মানবজাতির মাঝে সম্মান ও গুণগত শ্রেষ্ঠত্বের ভিত্তি হচ্ছে তাক্বওয়া তথা খোদাভীরুতা ও পুণ্য। আল্লাহ পাক এরশাদ ফরমান:

“(ওহে মানবকুল), নিশ্চয় আল্লাহর কাছে তোমাদের মধ্যে অধিক সম্মানিত সে-ই, যে তোমাদের মধ্যে অধিক খোদাভীরু।” [আল-কুরআন, ৪৯:১৩]

সংক্ষেপে, কুরআন মজীদে এমন অনেক আয়াত বিদ্যমান, যেখানে আল্লাহতা’লা বিভিন্ন বিষয়ের/জিনিসের পবিত্রতা সম্পর্কে স্পষ্ট বিবরণ দিয়েছেন এবং সেগুলোর শ্রেষ্ঠত্বের কারণ-ও ব্যাখ্যা করেছেন। লাইলাতুল ক্বদর  যেমন হাজার মাসের চেয়ে উত্তম, ঠিক তেমনি রবিউল আউয়াল মাস-ও একইভাবে আলাদা বৈশিষ্ট্যমণ্ডিত; কেননা যিনি কুরআন মজীদ আমাদের মাঝে নিয়ে এসেছিলেন, তিনি এই মাসেই ধরাধামে শুভাগমন করেছিলেন। এটাই সেই বরকতময় মাস, যা’তে আল্লাহতা’লা তাঁর সর্বাধিক প্রিয় রাসূল (দ:)-কে ঈমানদারবৃন্দের মাঝে প্রেরণ করে তাদের প্রতি আপন রহমত বর্ষণ করেছেন। অতএব, মহানবী (দ:)-এর আশীর্বাদধন্য বেলাদতের সূত্রে রবিউল আউয়াল মাস অন্যান্য মাসের চেয়ে সেরা হয়েছে। এটাকে তাঁর মওলিদের মাস বলাটাই বেশি যথাযোগ্য হবে।

৪.১ কুরআন নাযেলের উদযাপন হতে দলিল

আল-কুরআন হচ্ছে আল্লাহতা’লার বাণী, আর এটা তাঁরই একটি বৈশিষ্ট্য হিসেবে একত্ববাচক গুণের ধারক। এর নাযেল তথা প্রকাশ হওয়াটা মানবজাতির জন্যে এক বড় আশীর্বাদ; এরই হেদায়াতের আলো দ্বারা মনুষ্যকুলকে অজ্ঞতার অন্ধকার হতে পরিত্রাণ দেয়া হয়েছে এবং মান-মর্যাদাও মঞ্জুর করা হয়েছে। এই কুরআন আমাদের মাঝে নাযেল হয়েছে এক বিশেষ (তথা অনুপম) সিদ্ধপুরুষের (পুণ্যাত্মার) মাধ্যমে। এর নূর (জ্যোতি)-কে আমাদের কাছে নিয়ে এসেছেন এক (মহান) নূর (জ্যোতির্ময় সত্তা)। সর্বশক্তিমান আল্লাহতা’লা এরশাদ ফরমান:

“নিশ্চয় তোমাদের কাছে আল্লাহর পক্ষ থেকে একটা ‘নূর’ (অর্থাৎ, মহানবী সাল্লাল্লাহু আলাইহে ওয়া সাল্লাম) এসেছেন এবং স্পষ্ট কেতাব (মানে পবিত্র কুরআন)।” [আল-ক্বুরআন, ৫:১৫]

ক্বুরআন মজীদের জ্ঞান দ্বারা মানবকুলকে অশেষ, অফুরন্ত (খোদায়ী) রহমত-বরকত-নেয়ামতের গ্রহীতা করা হয়েছে। তাহলে সেই মহান সিদ্ধপুরুষের মাহাত্ম্য কী হতে পারে, যাঁর প্রতি ক্বুরআন নাযেল হয়েছিল? ওই পুণ্যাত্মার মক্বাম কী হতে পারে, যাঁর শিক্ষার মাধ্যমে জ্ঞান-প্রজ্ঞার বিশাল রত্নভাণ্ডার ও হেদায়াতের উৎসকে মানবজাতির প্রতি মঞ্জুর করা হয়েছিল; যাঁর অন্তরে আল্লাহতা’লার কালাম (ঐশীবাণী) অবতীর্ণ হয়েছিল, এবং যাঁর সুন্দরতম আচরণের মাধ্যমে তাঁকে এর (আল-ক্বুরআনের) শিক্ষক ঘোষণা করা হয়েছিল? তাঁর উচ্চমর্যাদা সম্পর্কে কে-ই বা উপলব্ধি করতে সক্ষম? সত্য বটে, ক্বুরআন মজীদ সামগ্রিকভাবে রাসূলুল্লাহ (দ:)-এরই মনোরম যিকর-তাযকেরা তথা স্মরণের একটি সংকলন। তাঁরই নিখুঁত চরিত্র, সর্বোত্তম গুণাবলী ও সৃষ্টিকুলের মাঝে অনন্য বৈশিষ্ট্যমণ্ডিত হওয়ার যিকর এটা। কবি ইক্ববাল কী সুন্দর লিখেছেন:

“ওহে ঈমানদার, উত্তম চরিত্র গঠনে তুমি পাঠ করো আল-ক্বুরআন,

এরই দর্পণে যাঁর চেহারা দেখো তাঁকে করো অন্বেষণ, দিয়ে মন-প্রাণ।” [ভাবানুবাদ]

অতএব, আমাদেরকে এই মহা আশীর্বাদের জন্যে কৃতজ্ঞ হতে হবে; এতে বিশ্বাসী হওয়ার এবং এর প্রতি মহব্বত রাখার সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ অত্যাবশ্যক বিষয়গুলোর একটা হচ্ছে এটা। তবু এই কৃতজ্ঞতা প্রকাশ অসম্পূর্ণ থেকে যাবে, যদি আমরা যাঁর মধ্যস্থতায় এই আশীর্বাদের গ্রহীতা হতে পেরেছি তাঁরই মাহাত্ম্য ও শ্রেষ্ঠত্ব মূল্যায়ন করতে সক্ষম না হই। এই কারণেই যে রাতে আল-ক্বুরআন অবতীর্ণ হয়েছিল, আল্লাহতা’লার চূড়ান্ত বিধি-বিধানের নীতি-নৈতিকতা ও শিক্ষাসমূহকে উদযাপন ও স্মরণ করার জন্যে আমরা সে রাতে মাহফিলের আয়োজন করে থাকি। এমতাবস্থায় ক্বুরআন মজীদ যে মহান ও পবিত্র সত্তার আশীর্বাদে আমরা লাভ করেছি, তাঁর বেলাদত তথা ধরাধামে শুভাগমনের রাতটি কেন একইভাবে উদযাপন করবো না? তাঁর আশীর্বাদধন্য বেলাদতের রাতটি উদযাপন করা উচিত, কেননা এর পক্ষে যুক্তি আরো জোরালো এবং এর গুরত্ব-ও বেশি।

৪.১.১ লাইলাতুল কদরের রাত ও বেলাদত শরীফের রাতের মধ্যকার তুলনা

কুরআন মজীদ – যে ঐশীগ্রন্থটিতে মহানবী (দ:)-এর অনুকরণীয় দৃষ্টান্তপূর্ণ নৈতিক চরিত্র উল্লেখিত হয়েছে এবং তাঁর বৈশিষ্ট্যগুলো সুন্দরভাবে বর্ণনা করা হয়েছে – তাতে ঐশীভাবে উন্মেচিত হয়েছে যে পবিত্র রমযান মাসের কোনো একটি রাত এক হাজার মাসের চেয়েও উচ্চমর্যাদাসম্পন্ন। এটাই পবিত্র লায়লাতুল কদরের রাত (ভাগ্য রজনী), যে রাতে ‘লওহ আল-মাহফূয’ নিম্নের আসমানে অবতরণ করেছিল। সর্বশক্তিমান আল্লাহতা’লা এ রাতকে শেষ বিচার দিবস অবধি সব মানুষের জন্যে মর্যাদাপূর্ণ মক্বাম তথা স্তর/পর্যায় অর্জনের অসীলা বা মাধ্যম বানিয়েছেন; আর এ রাতকে সকল রাতের মধ্যমণি হিসেবে ঘোষণা করা হয়েছে। কুরআন নাযেলের বেলায় এটা যদি সত্য হয়, তাহলে তাঁর বেলায় কী বলা যায়, যাঁর খাতিরে সমস্ত সৃষ্টিকুল অস্তিত্বশীল হয়েছে, যিনি গোটা বিশ্বজগতকে চিরস্থায়ী ভালোবাসা ও করুণা দ্বারা আলোকিত করেছেন এবং যাঁর অধিকারে (খোদ) আল-কুরআন? আল্লাহর দৃষ্টিতে তাঁর বেলাদত তথা ধরাধামে শুভাগমনের রাতটির মর্যাদা কী হতে পারে? তা কী হতে পারে, এব্যাপারে মানব মস্তিষ্ক ধারণা করতেও অপারগ।

লায়লাতুল ক্বদরের মর্যাদা এই কারণে যে এ রাতে কুরআন নাযেল হয়েছে এবং ফেরেশতাবৃন্দ-ও অবতীর্ণ হয়েছেন। কিন্তু মহানবী (দ:) না হলে ওহী-ও (নাযেল) হতো না, আর লায়লাতুল ক্বদর-ও হতো না – এমন কি সমগ্র সৃষ্টিকুল-ও অস্তিত্ব পেতো না। বাস্তবিকপক্ষে, এসব নেয়ামত (আশীর্বাদ) অামাদের রাসূলুল্লাহ (দ:)-এর বেলাদতের কারণেই এসেছে। অতএব, তাঁর বেলাদতের রাতকে যদি আমরা লায়লাতুল কদরের রাতের চেয়ে শ্রেষ্ঠ বলি, তাহলে অতিরঞ্জন হবে না। কদরের রাতকে এক সহস্র মাসের চেয়ে শ্রেয়তর ঘোষণা করে আল্লাহ পাক এটার গুণের একটি সীমা নির্ধারণ করে দিয়েছেন। পক্ষান্তরে, মহানবী (দ:)-এর বেলাদতের রাতের বৈশিষ্ট্য ধারণারও অতীত। তবে একথা মনে রাখা উচিত যে যদিও তাঁর বেলাদতের রাতের বৈশিষ্ট্য শ্রেষ্ঠতর, তবুও প্রত্যেকের লায়লাতুল কদরের রাতে এবাদত-বন্দেগী বেশি করা উচিত; কেননা এ রাতে এবাদত-বন্দেগীর জন্যে বরাদ্দ সওয়াবের পরিমাণ বেশি, আর এটা কুরআন ও হাদীস দ্বারা সুপ্রতিষ্ঠিত।

বিশেষ কয়েকটি রাতের বৈশিষ্ট্যগুলো সম্পর্কে ইমামবৃন্দ ও মুহাদ্দীস-মণ্ডলী আলোচনা করেছেন, যেমন – শা’বান মাসের ১৫ তারিখের রাত, লায়লাতুল কদর, ঈদুল ফিতর ও এয়াওমে আরাফা’র রাতগুলো এবং মহানবী (দ:)-এর বেলাদতের রাত। এঁদের মধ্যে অনেকেই লায়লাতুল কদরের রাতের চেয়ে মীলাদুন্নবী (দ:)-এর রাতকে শ্রেষ্ঠ বলে ঘোষণা করেছেন। ইমাম কসতলানী (৯২৩-৮৫১ হিজরী), শায়খ আবদুল হক্ব মুহাদ্দীসে দেহেলভী (৯৫৮-১০৫২ হিজরী), ইমাম যুরক্বানী মালেকী (১০৫৫-১১২২ হিজরী), ইমাম ইউসূফ নাবহানী (বেসাল: ১৩৫০ হিজরী) প্রমুখ একথা স্পষ্টভাবে ব্যক্ত করেছেন।

১. ইমাম কসতলানী এ সম্পর্কে লেখেন:

মহানবী (দ:)-এর বেলাদত প্রশ্নে এমর্মে বলা হয় যে দুটি রাতের কোন্ রাতটি শ্রেষ্ঠতর – কদরের রজনী, না মীলাদুন্নবী (দ:)-এর রাত, (এ প্রসঙ্গে) আমার উত্তর হলো, কদরের রাতের চেয়ে তাঁর বেলাদতের রাত শ্রেষ্ঠ তিনটি ক্ষেত্রে:

প্রথমতঃ হুযূর পূর নূর (দ:)-এর বেলাদতের রাত হচ্ছে তাঁরই মহিমান্বিত আবির্ভাবের রাত, অথচ কদরের রাত তাঁকে প্রদানকৃত। ওই রাত, যা নিজ উচ্চমর্যাদার কারণ তথা মহানবী সাল্লাল্লাহু আলাইহে ওয়া সাল্লামের প্রকাশ (বেলাদত)দ্বারা সম্মানিত হয়েছে, তা সেই রাত অপেক্ষা শ্রেয়তর হবে, যেটা রাসূল (দ:)-এর কারণে প্রদত্ত সূত্রে সম্মানিত হয়েছে। আর এবিষয়ে কোনো ধরনের মতপার্থক্য-ই নেই। অতএব, এক্ষেত্রে তাঁর বেলাদতের রাত শ্রেষ্ঠতর।

দ্বিতীয়তঃ কদরের রাত সম্মানিত, কেননা ফেরেশতাবৃন্দ ওই রাতে অবতীর্ণ হয়েছিলেন; অপরদিকে, মীলাদুন্নবী (দ:)-এর রাত সম্মানিত, কেননা এটা ধরাধামে তাঁরই শুভাগমনের রাত। যেহেতু তিনি ফেরেশতাদের চেয়ে শ্রেষ্ঠতর, সেহেতু মওলিদুন্নবী (দ:)-এর রাত কদরের রাতের চেয়ে শ্রেষ্ঠ। আর সবচেয়ে নির্ভরযোগ্য ও (অধিকাংশ সুন্নী উলামার) সমর্থিত সিদ্ধান্ত অনুযায়ী, তাঁর মীলাদের রাত-ই শ্রেষ্ঠতর।

তৃতীয়তঃ কদরের রাতের যে ফযীলত, তা (খাসভাবে) উম্মতে মুহাম্মদীয়ার জন্যেই। পক্ষান্তরে, তাঁর বেলাদতের রাতে যে ফযীলতপ্রাপ্তি হয়েছে, তা সকল অস্তিত্বশীল প্রাণি/বস্তুর জন্যে। তাঁকেই সর্বশক্তিমান আল্লাহ পাক সারা বিশ্বজগতের জন্যে আপন করুণাস্বরূপ প্রেরণ করেন; ফলে এ আশীর্বাদে অন্তর্ভুক্ত সমগ্র সৃষ্টিকুল, আর তাঁর মীলাদের রাতটিও এ বৃহত্তর কল্যাণ ধারণ করে আছে। অতএব, এক্ষেত্রেও এই রাত কদরের রাতের চেয়ে শ্রেষ্ঠতর। [আল-কসতলানী প্রণীত ‘আল-মাওয়া’হিবুল লাদুন্নিয়া বিল-মিনাহিল মুহাম্মদিয়া’, ১:১৪৫; শায়খ আবদুল হক্ক দেহেলভী কৃত ‘মা’ সাবাতা মিনাল-সুন্নাহ ফী আইয়া’মিল সানা’, ৫৯-৬০ পৃষ্ঠা; আল-যুরক্বানী রচিত ‘শরহে মাওয়া’হিবুল লাদুন্নিয়া’, ১:২৫৫-২৫৬; এবং ইমাম আল-নাবহানী লিখিত ‘জওয়া’হিরুল বিহার ফী ফাযা’ইলিল নাবী-ইল-মুখতার’, ৩:৪২৪]

২. ইমাম আল-তাহাবী (২৩৯-৩২১ হিজরী) কতিপয় শাফেঈ জ্ঞান বিশারদের মতামত উদ্ধৃত করেন:

সর্বশ্রেষ্ঠ রজনী হলো মহানবী (দ:)-এর বেলাদতের রাত, এরপর কদরের রাত; অতঃপর তাঁর মে’রাজে গমনের রাত, এরপর ‘আরাফাতের (ময়দানের) রাত; অতঃপর (প্রতি) শুক্রবারের রাত, এরপর ১৫ই শা’বানের (মানে শবে বরাতের) রাত; আর এরপর হলো ঈদের রাত। [ইমাম ইবনে আবেদীন কৃত ‘রাদ্দুল মোহতার ‘আলা দুর্র আল-মোখতার ‘আলা তানউইর আল-আবসার’, ২:৫১১; আল-শিরওয়ানী প্রণীত ‘হাশীয়া ‘আলা তোহফাত আল-মোহতাজ বি-শারহে আল-মিনহাজ’, ২:৪০৫; এবং আল-নাবহানী রচিত ‘জওয়াহির আল-বিহার ফী ফাদাঈল আল-নাবী আল-মোখতার, ৩:৪২৬]

৩. ইমাম ইউসূফ নাবহানী (বেসাল: ১৩৫০ হিজরী) তাঁর সুবিখ্যাত সেরা গ্রন্থ ‘আল-আনওয়ারুল মুহাম্মদিয়্যা ফীল মাওয়াহিবিল লাদুন্নিয়্যা’র ২৮ পৃষ্ঠায় লেখেন:

ওয়া লায়লাতু মওলিদিহি (সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লামা) আফযালু মিন লায়লাতিল ক্বাদরি – অর্থাৎ, রাসূলুল্লাহ (দ:)-এর বেলাদতের রাত কদরের রাতের চেয়ে শ্রেষ্ঠ।

৪.  মুহাম্মদ আবদুল হাই ফারাঙ্গী মহল্লী লাখনাভী (১২৬৪-১৩০৪ হিজরী) মহানবী (দ:)-এর বেলাদতের রাত সেরা, না কদরের রাত সেরা, এই প্রশ্নের জবাবে লেখেন:

অন্যান্য রাতের চেয়ে লায়লাতুল ক্বদরের শ্রেষ্ঠত্ব ধর্মশাস্ত্রলিপিতে সুপ্রতিষ্ঠিত এবং অনেক উপায়েও প্রমাণিত। যেমন (ক) এই রাতে রূহ ও ফেরেশ্তামণ্ডলী জমিনে নেমে আসেন; (খ) সন্ধ্যা থেকে ভোর পর্যন্ত আল্লাহর তাজাল্লী (বিশেষ প্রকাশ) নিম্ন আসমানে অবতীর্ণ হয়; (৩) এই রাতে আল-লওহ আল-মাহফূয (সংরক্ষিত লিপি) হতে নিম্ন আসমানে আল-ক্বুরআন অবতীর্ণ হয়েছিল। এসব বৈশিষ্ট্যের সূত্রে উম্মতে মুহাম্মদীয়্যা’কে এ সান্ত্বনা দেয়া হয়েছে যে এই রাতটি এক হাজার মাসের এবাদত-বন্দেগী হতেও উত্তম। আল্লাহতা’লা এরশাদ ফরমান: “ক্বদরের রাত হাজার মাস থেকে উত্তম” [আল-ক্বুরআন, ৯৭:৩]। এ রাতে জাগ্রত থাকা (ও এবাদত করা)’র প্রতি হাদীস শরীফে তাকিদ দেয়া হয়েছে। কতিপয় মুহাদ্দেসীন (হাদীসশাস্ত্রবিদ) লায়লাতুল ক্বদরের চেয়ে মওলিদুন্নবী (দ:)-এর রাতকে শ্রেষ্ঠ জ্ঞান করেছেন; তাঁদের মত এটা নয় যে এবাদতের ক্ষেত্রে মীলাদুন্নবী (দ:)-এর রাত ক্বদরের রাতের সমকক্ষ, কেননা সওয়াব (পুরস্কার) ও শাস্তির বিষয়গুলো শুধু আল-নস আল-ক্বাতেঈ তথা সুস্পষ্ট প্রামাণ্য দলিল দ্বারাই নির্ধারণ করা সম্ভব। বরঞ্চ তাঁর সম্মানিত বেলাদতের রাত ক্বদরের রাতের চেয়ে শ্রেষ্ঠ হওয়ার ভিত্তি আল্লাহর দৃষ্টিতে এর আপন (অনুপম) বৈশিষ্ট্যেরই সুবাদে। [আব্দুল হাই লাখনাভী কৃত ‘মাজমূ’আ আল-ফাতাওয়া’, ১:৮৬-৮৭]

লায়লাতুল ক্বদরের উৎকর্ষ হচ্ছে এই রাতে ক্বুরআন মজীদ অবতীর্ণ হওয়ার পাশাপাশি ফেরেশতামণ্ডলীও অবতীর্ণ হয়েছিলেন। অপরদিকে, মহানবী (দ:)-এর সত্তা মোবারক এতোই অনুপম বৈশিষ্ট্যমণ্ডিত যে তাঁরই প্রতি কুরআন নাযেল হয়; আর প্রতি সকালে ৭০,০০০ ফেরেশতা তাঁর পবিত্র রওযা পাক নিরন্তর যেয়ারত, এর তওয়াফ এবং তাঁর প্রতি দরুদ-সালাম পাঠ করে থাকেন; অপর ৭০,০০০ ফেরেশতা একই কাজ করেন সন্ধ্যায়। এই রীতির অনুশীলন শেষ বিচার দিবস পর্যন্ত চলতে থাকবে এবং যে ফেরেশতা একবার এরকম যেয়ারত করতে সক্ষম হবেন, তিনি আর দ্বিতীয়বার তা করার সুযোগ পাবেন না [ইবনে মুবারক প্রণীত ‘আল-যুহদ’, ৫৫৮ পৃষ্ঠা #১৬০০; আল-দারিমী রচিত ‘আল-সুনান’, ১:৫৭ #৯৪; আল-ক্বুরতুবী লিখিত ‘আল-তাযকিরা ফী উমূর আহওয়াল আল-মাওতা ওয়া উমূর আল-আখিরা’, ‘মহানবী (দ:)-এর রওযা হতে পুনরুত্থান’ শীর্ষক অধ্যায়, ২১৩-২১৪ পৃষ্ঠা; আল-নাজ্জার কৃত ‘আল-রাদ্দ ‘আলা মান এয়াক্বূল আল-ক্বুরআন মাখলূক্ব’, ৬৩ পৃষ্ঠা #৮৯; ইবনে হিব্বান রচিত ‘আল-’আযামা’, ৩:১০১৮-১০১৯ #৫৩৭; আল-আযদী প্রণীত ‘ফযল আল-সালাত ‘আলা আল-নাবী’, ৯২ পৃষ্ঠা #১০১; আল-বায়হাক্বী লিখিত ‘শুআব আল-ঈমান’, ৩:৪৯২-৪৯৩ #৪১৭০; আবূ নু’আইম কৃত ‘হিলইয়া আল-আউলিয়া ওয়া তাবাক্বাত অাল-আসফিয়্যা’, ৫:৩৯০; ইবনে জাওযী রচিত ‘আল-ওয়াফা’ বি-আহওয়াল আল-মুস্তফা’, ৮৩৩ পৃষ্ঠা #১৫৭৮; ইবনে আল-কাইয়্যেম আল-জাওযিয়্যা প্রণীত ‘জালা’ আল-আফহাম ফী আল-সালাত ওয়া আল-সালাম ‘আলা খায়র আল-আনাম’, ৬৮ পৃষ্ঠা #১২৯; আল-সামহূদী লিখিত ‘ওয়াফা’ আল-ওয়াফা’ বি-আখবার দার আল-মুস্তাফা’, ২:৫৫৯; ইমাম কসতলানী কৃত ‘আল-মাওয়াহিব আল-লাদুন্নিয়্যা বি-মিনাহ আল-মুহাম্মাদিয়া’, ৪:৬২৫; ইমাম আল-সুয়ূতী রচিত ‘কেফায়া আল-তালেব আল-লাবীব ফী খাসা’য়েস আল-হাবীব’, ২:৩৭৬; আল-সালেহী প্রণীত ‘সুবুল আল-হুদা ওয়া আল-রাশাদ ফী সীরা খায়র আল-’এবাদ’, ১২:৪৫২-৪৫৩; এবং আল-যুরক্বানী লিখিত ‘শরহে মাওয়াহিব আল-লাদুন্নিয়া বি আল-মিনাহ আল-মুহাম্মদিয়া’, ১২:২৮৩-২৮৪]। ফেরেশতামণ্ডলী অবতীর্ণ হয়ে মহানবী (দ:)-এর দরবারে বিনয়ী খাদেমের মতো প্রবেশ করে থাকেন। তাঁদের অবতীর্ণ হওয়াতে লায়লাতুল ক্বদর হাজার মাসের চেয়ে শ্রেষ্ঠত্ব পেয়েছে; পক্ষান্তরে, মহানবী (দ:)-এর ধরাধামে শুভাগমনের রাতের শ্রেষ্ঠত্ব উপলব্ধি করা অসম্ভব ব্যাপার এবং তা কল্পনারও অতীত! মওলিদুন্নবী (দ:)-এর ওই রাতের খাতিরে অসংখ্য, অগণিত রাত উৎসর্গিত হোক!

এখানে মনে রাখার মতো আরেকটি গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হলো, লায়লাতুল ক্বদরের ফযীলত কেবলমাত্র ঈমানদার মুসলমানদের জন্যেই খাস (সুনির্দিষ্ট); কিন্তু মওলিদুন্নবী (দ:) স্রেফ ঈমানদারদের জন্যে নির্দিষ্ট নয়, বরঞ্চ তা সমগ্র মানবজাতির জন্যেই বরাদ্দ।

৪.২ কোনো নেয়ামত লাভের উদযাপন হতে দলিল

সর্বশক্তিমান আল্লাহতা’লা পূর্ববর্তী জাতিগুলোর প্রতিও তাঁর রহমত-বরকত (আশীর্বাদ) বর্ষণ করেছেন, আর তাঁর প্রতি কৃতজ্ঞতার নিদর্শনস্বরূপ তারাও ওই নেয়ামত-প্রাপ্তির দিনগুলোকে ঈদ হিসেবে উদযাপন করেছে। এই দৃষ্টান্তের অন্তর্নিহিত উদ্দেশ্য হচ্ছে এবিষয়টি স্পষ্ট করা যে, পূর্ববর্তী জাতিগুলো তাদের ঐতিহ্য ও প্রথা অনুযায়ী নির্দিষ্ট দিবসসমূহ উদযাপন করতো; এটা এমন এক অনুশীলিত রীতি যা ক্বুরআন মজীদ সমর্থন করেছে [মরিয়ম-তনয় ঈসা আরয করলেন, ‘হে আল্লাহ, হে আমাদের রব্ব! আমাদের প্রতি আকাশ থেকে একটা খাদ্যভর্তি খাঞ্চা অবতীর্ণ করুন, যা আমাদের জন্যে ঈদ হবে – আমাদের পূর্ববর্তী ও পরবর্তীদের জন্যে এবং আপনার কাছ থেকে হবে এক নিদর্শন’ – কুরআন মজীদ, ৫:১১৪; তাফসীরে নূরুল এরফান বাংলা সংস্করণ]। যদি পূর্ববর্তী জাতিগুলো ছোটখাটো আশীর্বাদপ্রাপ্তিতে কৃতজ্ঞতা প্রকাশ করে থাকে, তাহলে সবচেয়ে তাৎপর্যপূর্ণ রহমত-বরকত-নেয়ামতপ্রাপ্তিতে আল্লাহতা’লার প্রতি কৃতজ্ঞতা জ্ঞাপন করা আমাদের জন্যে আরো বেশি জরুরি নয় কি? আল্লাহ পাক স্বয়ং এটা করতে আমাদের প্রতি নির্দেশ দেন নিম্নবর্ণিত আয়াতে করীমায়:

“এবং নিজেদের প্রতি আল্লাহর অনুগ্রহকে স্মরণ করো যখন তোমাদের মধ্যে শত্রুতা ছিল, তিনি তোমাদের অন্তরগুলোতে সম্প্রীতি সৃষ্টি করে দিয়েছেন। সুতরাং তাঁর অনুগ্রহক্রমে তোমরা পরস্পর ভ্রাতৃত্ববন্ধনে আবদ্ধ হয়ে গিয়েছো।” [আল-ক্বুরআন, ৩:১০৩]

এটা দয়া ও অনুগ্রহের কী চমৎকার এক নিদর্শন যে আল্লাহ পাক তাঁরই রাসূল (দ:)-এর মাধ্যমে ঝগড়া-ফাসাদে লিপ্ত মানুষদের অন্তরগুলোকে একতাবদ্ধ করেছেন। যাঁরা ইতিপূর্বে নিজেদের ভাইদের রক্তপিপাসু ছিলেন, তাঁরাই এখন হয়েছেন ভ্রাতৃত্ববন্ধনে আবদ্ধ। বস্তুতঃ মানবজাতির মাঝে মহানবী (দ:)-এর আগমনের সুবাদে এই আশীর্বাদপ্রাপ্তি হয়েছে; তাঁর খোদ সত্তা মোবারক-ই এই নেয়ামতের উৎস। রাসূলুল্লাহ (দ:)-এর এই জগতে শুভাগমন এবং তাঁর প্রতি স্রেফ ঈমান এনে যাঁরা নিজেদের যুদ্ধংদেহী মনোভাব ও আচরণ হতে পরিশুদ্ধ হওয়ার দরুন কৃতজ্ঞতা প্রকাশ করেছিলেন, তা আমাদের প্রতিও বাধ্যবাধকতা আরোপ করে যে আমরা প্রিয়নবী (দ:)-এর বেলাদত (ধরাধামে শুভাগমন) উপলক্ষে আল্লাহতা’লার প্রতি কৃতজ্ঞতার মূর্ত প্রকাশ হই।

৪.৩ মুক্তি লাভের উদযাপন হতে দলিল

কৃতজ্ঞতা প্রকাশের আমল বা পুণ্যদায়ক কর্মের মাধ্যমে আল্লাহতা’লার আশীর্বাদকে স্মরণ করা শুধু হযরত মুহাম্মাদুর রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহে ওয়া সাল্লামের উম্মতের প্রতি আরোপিত বাধ্যবাধকতা-ই নয়, বরঞ্চ এর বাধ্যবাধকতা পূর্ববর্তী উম্মতদের প্রতিও আরোপ করা হয়েছিল। সর্বশক্তিমান আল্লাহতা’লা বনী ইসরাঈল বংশের প্রতি আদেশ করেন:

“হে এয়া’ক্বুবের বংশধরবর্গ! স্মরণ করো, আমার ওই অনুগ্রহকে যা আমি তোমাদের প্রতি করেছি। আর এটাও যে, আমি তোমাদেরকে তোমাদের যুগে সমগ্র বিশ্বের ওপর শ্রেষ্ঠত্ব দিয়েছি।” [আল-ক্বুরআন, ২:৪৭]

অনুরূপভাবে, অন্য আয়াতেও আল্লাহতা’লা বনী ইসরাঈল বংশের প্রতি বর্ষিত তাঁর আশীর্বাদের কথা স্মরণ করেন:

“এবং স্মরণ করো! যখন আমি তোমাদেরকে ফির’আউনী সম্প্রদায় থেকে নিষ্কৃতি দান করেছি, যারা তোমাদেরকে মর্মান্তিক যন্ত্রণা দিতো, তোমাদের পুত্রদেরকে যবেহ করতো আর তোমাদের কন্যাদেরকে জীবিত রাখতো; এবং এর মধ্যে তোমাদের রব্বের পক্ষ থেকে এক মহা ‘বালা’ ছিলো (অথবা ছিলো মহা পুরস্কার)।” [আল-ক্বুরআন, ২:৪৯]

ওপরোক্ত কুরআনের আয়াতগুলো থেকে এই সিদ্ধান্ত নেয়া যায় যে কোনো জাতির স্বাধীনতা বা মুক্তিলাভ হচ্ছে এক মহা নেয়ামত/আশীর্বাদ। বন্দীদশা থেকে মুক্তিলাভের জন্যে বনী ইসরাঈল বংশকে আল্লাহতা’লার প্রতি কৃতজ্ঞতা প্রকাশের নির্দেশ দেয়া হয়। বৃটিশ সাম্রাজ্যবাদের কবল থেকে আমাদের মুক্তি ও পাকিস্তান নামের একটি নতুন ইসলামী রাষ্ট্রের গোড়াপত্তন-ও আল্লাহতা’লার পক্ষ এক মহা অনুগ্রহ ছিল [শায়খ তাহিরুল কাদেরীর আদি বাসস্থান পাকিস্তান হলেও তিনি বর্তমানে কানাডায় বসবাস করছেন – অনুবাদক]। প্রতি বছর ১৪ই আগস্ট তারিখে আমাদের স্বাধীনতা দিবস যখন আমরা উদযাপন করি, তখন আল-ক্বুরআনে বর্ণিত আল্লাহর প্রতি কৃতজ্ঞতা প্রকাশের আদেশটির আলোকে এই আশীর্বাদকে স্মরণ করা আমাদের প্রতি বাধ্যতামূলক হয়।

একইভাবে, আল-ক্বুরআনের এ আয়াত থেকে স্পষ্ট প্রতীয়মান হয় যে প্রতি বছর জাতীয় স্বাধীনতা দিবস উদযাপন ও বিভিন্ন উপায়ে কৃতজ্ঞতা প্রকাশ করা স্রেফ কোনো পার্থিব বা রাজনৈতিক বিষয় নয়, বরং এটা একটা ধর্মীয় বিষয়-ও; এটা গ্রহণ করার বা মেনে নেয়ার ক্ষেত্রে ব্যর্থতা প্রকৃতপক্ষে আল্লাহতা’লারই আদেশ হতে বিচ্যুত হওয়া ছাড়া আর কিছু নয়। প্রতিটি যুগে, শতাব্দীতে এবং শাসনামলে এক-একটি বৈশ্বিক সংস্কৃতি বিদ্যমান ছিল বা আছে; আর প্রত্যেক দেশ, জাতি ও গোত্রেরই রয়েছে নিজ নিজ ইতিহাস-ঐতিহ্য যা তারা কৃতজ্ঞতা প্রকাশের বা খুশির দিন হিসেবে উদযাপন করে থাকে। পৃথিবীতে এমন কোনো দেশ বা স্থান নেই যার ধর্মীয় বা জাতীয় তাৎপর্যপূর্ণ কোনো উৎসব নেই। ইহুদী, খৃষ্টান, বৌদ্ধ, হিন্দু, এমন কি সাংস্কৃতিক ঐতিহ্য ও প্রথার অনুশীলনকারী ধর্মনিরপেক্ষ জাতিগুলোর পর্যন্ত নানা উৎসবের দিন রয়েছে। সর্বশক্তিমান আল্লাহতা’লা মুসলমান জাতির প্রতি আদেশ করেছেন যেন আমরা তাঁর দিবসগুলো (আইয়্যাম আল্লাহ) পালন করি। মহানবী (দ:)-এর যাত মোবারক তথা পবিত্র সত্তা আমাদের হেদায়াত তথা সঠিক পথপ্রদর্শনের মূল আলোকবর্তিকা; আর তিনি আমাদের সভ্যতা ও সংস্কৃতিরও উৎসমূল। আজকের একশিলাবিশিষ্ট (মানে একটিমাত্র ধারার) বৈশ্বিক সংস্কৃতির প্রেক্ষাপটে  মওলিদুন্নবী (দ:) উদযাপন করা আমাদের ইসলামী পরিচয় বিকাশের ক্ষেত্রে গুরুত্বপূর্ণ মুখ্য ভূমিকা পালন করবে।

৪.৩.১ সভ্যতা জারি থাকার জন্যে গুরুত্বপূর্ণ প্রয়োজনীয় বিষয়

ওপরে উদ্ধৃত খোদায়ী আশীর্বাদের স্মরণ সংক্রান্ত ক্বুরআনের আয়াতগুলোতে স্পষ্ট প্রতীয়মান হয় যে কিতাবুল্লাহ শরীফ কোনো সুনির্দিষ্ট ঘটনাকে উদ্দেশ্য করে। তবে কৃতজ্ঞতা প্রকাশের প্রয়োজনীয় শর্ত হচ্ছে আল্লাহতা’লার এই রহমত-বরকত-নেয়ামতকে সবসময়-ই স্মরণ করতে হবে; আর এ কাজে যেন কেউ আশীর্বাদটি সম্পর্কে বিস্মৃত না হন এবং নিরন্তর আল্লাহতা’লার প্রতি কৃতজ্ঞতা প্রকাশ করেন। অধিকন্তু, সারা বছর ওই রহমত স্মরণে রেখে বার্ষিকী পালনের সময় হয়ে এলে পরে কারো খুশির মাত্রা স্বতঃস্ফূর্তভাবে বহুগুণ বৃদ্ধি পাওয়ার ব্যাপারটি  সর্বজন স্বীকৃত এক বাস্তবতা। ঘটনার প্রকৃত দিন-ক্ষণ সুনির্দিষ্টভাবে স্মরণ ও যথাযথভাবে উদযাপন মানব প্রকৃতির অপরিহার্য অংশ হওয়ার পাশাপাশি সাংস্কৃতিক প্রয়োজনীয়তা-ও বটে। কোনো (খোদায়ী) আশীর্বাদ উপলক্ষে কৃতজ্ঞতার নিদর্শনস্বরূপ নিয়মতান্ত্রিক পন্থায় খুশি প্রকাশ করাটা জরুরি, যাতে পরবর্তী প্রজন্মগুলো ওই আশীর্বাদ সম্পর্কে ওয়াকেফহাল থাকে এবং ওই দিনটির তাৎপর্য সম্পর্কেও থাকে অবগত। কোনো সভ্যতা কর্তৃক আপন সত্তাকে এবং সংস্কৃতিকে ইতিহাসের পাতায় বিস্মৃতি হতে সংরক্ষণ করার এটাই একমাত্র উপায়।

মহান প্রভু আল্লাহতা’লার রহমত-বরকত-নেয়ামতপ্রাপ্তিতে তাঁর প্রতি আমরা কৃতজ্ঞ হতে অক্ষম হলে এবং অনাগত প্রজন্মগুলোর কাছে আমাদের সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ ঐতিহ ও প্রথা পৌঁছে দিতে অপারগ হলে তারা এ আশীর্বাদের ব্যাপারে অমনোযোগী বা অযত্নবান হতে বেশি দেরি হবে না; আর তাদের দৃষ্টিতে আশীর্বাদপ্রাপ্তির ওই দিনটির তাৎপর্য-ও তখন অবহেলিত হবে। অতএব, এই ঐশী আজ্ঞা এ শর্তারোপ করে যে সারা বছর-ই আল্লাহতা’লার প্রতি কৃতজ্ঞতা প্রকাশ করা চাই; কিন্তু যখন ওই সুনির্দিষ্ট দিন (মুক্তির দিবস) আগমন করে তখন আনুষ্ঠানিক উদযাপন দ্বারা খুশি প্রকাশের লক্ষ্যে বিশেষ প্রস্তুতি-ও গ্রহণ করা চাই, যাতে পরবর্তী প্রজন্মগুলো সে দিনটির গুরুত্ব সম্পর্কে জানতে পারে।

এই আলোচনার আলোকে প্রশ্ন ওঠে যে, কারো মুক্তি উপলক্ষে (আল্লাহর প্রতি) কৃতজ্ঞতা প্রকাশ যদি আল-ক্বুরআনে সাবেত তথা প্রমাণিত হয়, তাহলে বিশ্বজগত সৃষ্টির একমাত্র কারণ ও উপলক্ষ মহানবী (দ:)-এর বেলাদত (ধরাধামে শুভাগমন) দিবসে খুশি প্রকাশ কেন অনুমতিপ্রাপ্ত হবে না? কেননা, প্রকৃতপক্ষে তাঁর মধ্যস্থতাতেই তো বাকি সব রহমত-বরকত-নেয়ামত অর্জিত হয়েছিল।

৪.৪ কোনো খোদায়ী আশীর্বাদ লাভে খুশি প্রকাশ করা আম্বিয়া (আ:)-বৃন্দের সুন্নাত

সর্বশক্তিমান আল্লাহতা’লার কাছে পয়গম্বর ঈসা (আ:) তাঁর নিজের জাতির জন্যে আসমান হতে খাদ্যভর্তি খাঞ্চা মঞ্জুর করার আবেদন জানানোর সময় আরয করেন:

“হে আল্লাহ, হে আমাদের রব্ব! আমাদের প্রতি আকাশ থেকে একটা খাদ্যভর্তি খাঞ্চা অবতীর্ণ করুন, যা আমাদের জন্যে ঈদ হবে – আমাদের পূর্ববর্তী ও পরবর্তীদের জন্যে, এবং তা আপনার কাছ থেকে হবে (এক) নিদর্শন।” [আল-ক্বুরআন, ৫:১১৪]

ওপরের আয়াতটিতে কুরআন মজীদ এই পয়গম্বরের কথার উদ্ধৃতি দিয়ে এ বিষয়টি স্পষ্ট করেছে যে, আল্লাহতা’লার আশীর্বাদ যেসব দিনে বর্ষিত হয় সেগুলো ঈদ হিসেবে উদযাপন করা উচিত; এটাই খোদায়ী আশীর্বাদের প্রতি কৃতজ্ঞতা প্রকাশের প্রশংসনীয় উপায়। ‘আমাদের পূর্ববর্তী’ ও ‘আমাদের পরবর্তীদের জন্যে’ বাক্যগুলো ইঙ্গিত করে যে ওই আশীর্বাদপ্রাপ্তির পর ওই কওম বা জাতির অন্তর্গত প্রাথমিক যুগে মানুষেরা আসবেন এবং পরবর্তী যুগগুলোতেও মানুষেরা আসবেন; এমতাবস্থায় যাঁরা পূর্ববর্তী যুগে আগমন করবেন তাঁদের ঈদ হিসেবে তা উদযাপন করা উচিত, আর পরবর্তী যুগে যাঁরা আসবেন, তাঁদেরও অনুরূপ করা উচিত।

৪.৪.১ বিবেচনাযোগ্য একটি গুরুত্বপূর্ণ বিষয়

উক্ত আয়াতটিতে ‘আমাদের পূর্ববর্তীদের’ ও ‘আমাদের পরবর্তীদের’ বাক্যগুলোতে ব্যক্তিবাচক সর্বনাম ‘আমাদের’  বিদ্যমান, যা ইঙ্গিত করে যে এই আশীর্বাদটি কেবল তাঁরাই মূল্যায়ন করবেন যাঁরা ‘আমাদের’ মধ্য হতে (আবির্ভূত হবেন)। কিন্তু যারা ‘আমাদের’ মধ্য হতে নয়, তাদের এই উদযাপনে অংশীদার হওয়ার কোনো (সঙ্গত) কারণ-ই নেই। এখানে আল-ক্বুরআন মানুষের মাঝে একটি মানদণ্ড/মাপকাঠি স্থাপন করেছে। সেই ঘটনা ছিল পয়গম্বর ঈসা আলাইহিস্ সালামের কওম বা জাতির, আর এখন হচ্ছে মহানবী হযরতে মুহাম্মদুর রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহে ওয়া সাল্লামের উম্মত। এই একই মানদণ্ড বা মাপকাঠি আমাদের প্রতিও আরোপ করা হয়েছে এ মর্মে যে যখন মহানবী (দ:)-এর বেলাদতের দিনকে ধারণকারী রবিউল আউয়াল মাস আগমন করে, ওই সময় কারা এই মহা আশীর্বাদের সাথে সংশ্লিষ্ট হয়ে সাক্ষ্য বহন করে, আর কারা তা করে না, এটা আমাদের প্রত্যক্ষ করা উচিত। মওলিদুন্নবী (দ:)-এর আগমনে কেউ ক্ষুব্ধ বোধ করলে বা তাতে সন্দেহ পোষণ করলে সেটা ঈমানী ঘাটতির স্পষ্ট আলামত/লক্ষণ; যার জন্যে আল্লাহতা’লার কাছে তওবা করা উচিত। তা এ কারণে যে এটা এমনই এক বিপজ্জনক ব্যাধি যা পরিহার করা অতীব গুরুত্বপূর্ণ দায়িত্ব ও কর্তব্য, যদি কেউ নিজের ধর্মকে হেফাযত করতে চান। কেউ প্রিয়নবী (দ:)-কে ভালোবাসার এবং তাঁর উম্মত হওয়ার দাবিদার কীভাবে হতে পারে যদি তাঁরই মীলাদ-দিবসে খুশি প্রকাশ না করে?

মওলিদুন্নবী (দ:)-এর পক্ষে (শরঈ) প্রামাণ্য দলিল দাবি করা এবং এবিষয়টির অবৈধতা প্রমাণ করার জন্যে তর্ক-বিতর্ক করা ঈমানের পূর্বশর্ত সৃষ্টিকুলশ্রেষ্ঠ প্রিয়নবী (দ:)-এর প্রতি ভালোবাসা ও ভক্তিশ্রদ্ধা প্রদর্শনকে রহিত করে দেয়। বস্তুতঃ ভালোবাসার কোনো দলিলের প্রয়োজন-ই নেই। তাঁর বেলাদতের মাস রবিউল আউয়াল শরীফ যখন আগমন করে, তখন ঈমানদারের হওয়া চাই উৎফুল্ল চিত্ত এবং এর প্রতি আগ্রহান্বিত। এমতাবস্থায় তাঁর খুশির মোকাবেলায় অন্যান্য সব আনন্দ-ফুর্তি অর্থহীন হয়ে যায়, কেননা প্রিয়নবী (দ:)-এর বেলাদতে খুশি হওয়াতেই প্রকৃত সুখ নিহিত। ঈমানদার ব্যক্তির অনুভব করা উচিত যে এই দিনটির চেয়ে বেশি আনন্দঘন আর কোনো দিন-ই হতে পারে না, আর তিনি এই বিশ্বজগতে এর চেয়ে বেশি খুশি কল্পনা করতেও অক্ষম।

৪.৫ মওলিদুন্নবী (দ:) উদযাপনের পক্ষে খোদায়ী আদেশ

সর্বশক্তিমান আল্লাহতা’লার করুণা ও আশীর্বাদ লাভের জন্যে কেউ কৃতজ্ঞ হওয়ার গৃহীত একটি পন্থা হচ্ছে নিজের (অনুভূত) সুখ ও আনন্দ প্রকাশ্যে ঘোষণা করা। আর মওলিদুন্নবী (সাল্লাল্লাহু আলাইহে ওয়া সাল্লাম)-এর চেয়ে বড় নেয়ামত কী হতে পারে? এটা এতোই বড় আশীর্বাদ যে স্বয়ং খোদাতা’লা-ই এ উপলক্ষে আমাদেরকে উৎফুল্লচিত্ত হতে আদেশ করেছেন। তিনি এরশাদ ফরমান:

“আপনি বলুন, ‘আল্লাহরই অনুগ্রহ ও তাঁরই দয়া (মুসলমানদের প্রতি, যা মহানবী সাল্লাল্লাহু আলাইহে ওয়া সাল্লামকে রাসূল করে প্রেরণের কারণে বর্ষিত হয়েছে), সেটারই ওপর তাদের আনন্দ প্রকাশ করা উচিত। তা তাদের সমস্ত ধন-দৌলত অপেক্ষা শ্রেয়।” [আল-ক্বুরআন, ১০:৫৮]

এই আয়াতে করীমায় আল্লাহতা’লা তাঁর নবী পাক (দ:)-কে সম্বোধন করে জানাচ্ছেন যে তাঁর সাহাবা-এ-কেরাম (রাদ্বিয়াল্লাহু আনহুম)-এর এবং তাঁদের পরবর্তী সময়ে সমগ্র উম্মতের এবিষয়টি অবগত হওয়া উচিত যে রাসূলুল্লাহ (দ:)-এর মাধ্যমে আল্লাহতা’লার যে রহমত-বরকত-নেয়ামত অাবির্ভূত হয়েছে, তা যথাসাধ্য খুশি ও আনন্দের সাথে উদযাপন করা উচিত। অাশীর্বাদটি লাভ করা হয়েছে সম্প্রদায়গতভাবে, আর তাই এটা (মুসলিম) সম্প্রদায়ের দ্বারা সম্মিলিতভাবে উদযাপিত হওয়াই বিধিবদ্ধ। যেহেতু ঐশী আজ্ঞাটি খুশি প্রকাশের, সেহেতু আশীর্বাদপ্রাপ্তির দিনটিকে কেবল পালন করা যায় ঈদ হিসেবে উদযাপনের মাধ্যমেই, অথবা কোনো অনুষ্ঠানের আয়োজন দ্বারাই। অতএব, এই আয়াতটি স্পষ্ট সিদ্ধান্ত ব্যক্ত করে যে মহানবী (দ:)-এর মীলাদ-দিবসকে মুসলমানদের আনন্দ-খুশি উদযাপনের দিন তথা ঈদ হিসেবে পালন করা উচিত। এতদসংক্রান্ত গুরুত্বপূর্ণ কিছু বিষয় নিম্নে তালিকাবদ্ধ করা হলো:

৪.৫.১ ‘ক্বুল’ (বলুন) শব্দটির মধ্যে লুক্কায়িত কুরআনী দর্শন

ক্বুরআন মজীদে আল্লাহ পাক নির্দিষ্ট কিছু মানুষের দলকে সম্বোধন করেছেন; যেমন মনুষ্যজাতিকে সম্বোধনের সময় তিনি বলেন, “ওহে মানবকুল”;  ঈমানদারবৃন্দকে সম্বোধনের সময় তিনি বলেন, “হে ঈমানদার সকল, যারা বিশ্বাস করো”; আর অন্যান্য জায়গায় আদেশ জারির সময় তিনি আরোপ করেন ‘বলুন’ (ক্বুল) শব্দটি। ‘বলুন’ আদেশটি দ্বারা আল্লাহতা’লা তাঁরই প্রিয় ও সম্মানিত রাসূল (দ:)-এর মধ্যস্থতায় আপন বিধান ঘোষণা করেছেন। ‘বলুন’ শব্দটি অনুজ্ঞাসূচক সংশ্লেষ। ক্বুরআনী বচনগুলোর মধ্যে একটি এই যে, ‘বলুন’ শব্দটি যেখানেই ব্যবহৃত হয়েছে, তা ধর্মের একটি গুরুত্বপূর্ণ ও মৌলিক বাস্তবতার ইঙ্গিত বহন করেছে। উদাহরণস্বরূপ, আল্লাহতা’লা আপন পবিত্র সত্তার ঐশী একত্ব ব্যাখ্যা করতে তাঁর প্রভুত্বের ঘোষণা দিয়েছেন:

“(হে মহা সম্মানিত রাসূল) বলুন, তিনি আল্লাহ, তিনি এক।” [আল-ক্বুরআন, ১১২:১]

অনুরূপভাবে, আনুগত্য ও সেবার উদ্দেশ্য (যা হচ্ছে আল্লাহর ভালোবাসা অর্জন), এবং তা অর্জনের মাধ্যম ব্যাখ্যা করতে মহানবী (দ:)-এর তাবেদারির পক্ষে একটি আজ্ঞা জারি করা হয়েছে:

“হে মাহবূব! আপনি বলে দিন, ‘হে মানবকুল, যদি তোমরা আল্লাহকে ভালোবেসে থাকো তবে আমার অনুসারী হয়ে যাও, অাল্লাহ তোমাদেরকে ভালোবাসবেন এবং তোমাদের গুনাহ ক্ষমা করবেন; আর আল্লাহ ক্ষমাশীল, দয়ালু।” [আল-ক্বুরআন, ৩:৩১]

একইভাবে, প্রকৃত আনুগত্য/সেবা ব্যক্ত করার জন্যে এবং আল্লাহর ওয়াস্তে প্রত্যেকের জীবন, মরণ, এবাদত-বন্দেগী ও ক্বোরবানীর দর্শনের রূপরেখা প্রদানের খাতিরে ক্বুরআন মজীদ ঘোষণা করে:

“আপনি বলুন, ‘নিঃসন্দেহে আমার নামায, আমার ক্বোরবানীগুলো, আমার জীবন এবং আমার মরণ – সবই আল্লাহর জন্যে, যিনি রব্ব সমগ্র জাহানের।” [আল-ক্বুরআন, ৬:১৬২]

আল-ক্বুরআনের এই রীতির দর্শন অনুযায়ী নিম্নের বিষয়গুলো বিশেষ মনোযোগ আকর্ষণ করে:

৪.৫.১.১ আল্লাহতে বিশ্বাসের আগে রাসূল (দ:)-এর প্রতি বিশ্বাস স্থাপনের অপরিহার্যতা

মহানবী (দ:)-এর পবিত্র মুখ হতে হুবহু উচ্চারিত ক্বুরআন মজীদ যে আল্লাহতা’লারই বাণী, তাতে কোনো সন্দেহ নেই। এতদসত্ত্বেও আল্লাহতা’লার ভালোবাসা ও সান্নিধ্য লাভ, আর ইসলামের মৌলিক মতাদর্শ (আক্বীদা-বিশ্বাস) ও অনুশীলনীয় কর্মের (আমলের) রূপরেখা প্রদান করতে আল-ক্বুরআন মাধ্যম হিসেবে ব্যবহার করেছে ‘ক্বুল’ (‘বলুন’) শব্দটিকে, যা সারমর্মে বোঝায় – ‘হে মাহবূব! আপনি তাদেরকে জানিয়ে দিন।’ এথেকে আমরা দেখতে পাই যে আল্লাহর ঐশী একত্বে  ও তাঁর আনুগত্যে কোনো ব্যক্তির বিশ্বাস প্রিয়নবী (দ:)-এর মধ্যস্থতায় প্রতিষ্ঠিত হয়। অতএব, মহানবী (দ:)-এর মাধ্যমে এই ঘোষণাটি হওয়াই যথাযথ। এ প্রসঙ্গে লক্ষণীয় বিষয় হলো এই যে, কারো দ্বারা মহানবী (দ:)-এর প্রতি ঈমান স্থাপন তার দ্বারা আল্লাহর প্রতি ঈমান স্থাপনের আগে আসবে।

কেউ রাসূলুল্লাহ (দ:)-এর প্রতি বিশ্বাস স্থাপন না করে সর্বশক্তিমান আল্লাহতা’লায় বিশ্বাস করলে সে কখনোই ঈমানদার হবে না। ইসলামে দাখিল হতে হলে মহানবী (দ:)-এর মাধ্যমে আল্লাহতা’লায় বিশ্বাস স্থাপন করাটা অবশ্যকর্তব্য। সর্বশক্তিমান আল্লাহর একত্ব দৃঢ়ভাবে ঘোষণার যে কোনো দাবির পাশাপাশি রেসালাতে অস্বীকার করাটা নিজে নিজেই অবিশ্বাস/কুফর হবে। তাই ‘বলুন’ শব্দটি এই দর্শন ব্যক্ত করে যে আল্লাহতা’লার ঐশী একত্বে বিশ্বাস অর্জন করার একমাত্র মাধ্যম হলেন মহানবী (দ:); এ মধ্যস্থতা ছাড়া আল্লাহতা’লার নৈকট্য লাভ করার কোনো সম্ভাবনা-ই নেই।

“ধর্মের সারমর্ম আর কিছু নয় কেবল মহানবী (দ:)-এর আজ্ঞার প্রতি আত্মসমর্পণ

তাঁর দোরগোড়ায় উপনীত না হতে পারলে অবশ্যম্ভাবী হবে আমাদের অধঃপতন।” [কবি ইক্ববালের লিখিত ‘কুল্লিয়্যাত: আরমিগানে হেজায’, ৬৯১ পৃষ্ঠা]

৪.৫.১.২ ‘ক্বুল’ (বলুন) শব্দটির ব্যবহার দ্বারা খোদায়ী আজ্ঞার গুরুত্ব ও তাৎপর্য বৃদ্ধি  

মহান আল্লাহতা’লার বাণী মানবজাতির কাছে পৌঁছে দেয়া হয়েছে রাসূলুল্লাহ (দ;)-এর মাধ্যমে। কোনো বিশেষ আজ্ঞার গুরুত্ব ও তাৎপর্যের প্রতি মনোযোগ আকর্ষণের প্রয়োজন হওয়ার ক্ষেত্রে নির্দিষ্ট কিছু দিক আছে। এই উদ্দেশ্যেই ‘বলুন’ শব্দটি প্রয়োগ করা হয়েছে। আল্লাহতা’লার মধ্যস্থতাকারী হিসেবে এটা মহানবী (দ:)-এর কর্তৃত্বের ইঙ্গিত বহন করে। নিঃসন্দেহে আল-ক্বুরআনে ’বলুন’ শব্দটির ব্যবহারে অনেক হেকমত তথা জ্ঞান রয়েছে; যেমন আমরা যদি “আপনি বলুন, ‘আল্লাহরই অনুগ্রহ ও তাঁরই দয়া (মুসলমানদের প্রতি, যা মহানবী সাল্লাল্লাহু আলাইহে ওয়া সাল্লামকে রাসূল করে প্রেরণের কারণে বর্ষিত হয়েছে), সেটারই ওপর তাদের আনন্দ প্রকাশ করা উচিত।” – শীর্ষক আয়াতটি নিয়ে ভাবি, তাহলে তা থেকে অনেক জ্ঞান লাভ করতে সক্ষম হবো। আল্লাহতা’লা ‘বলুন’ শব্দটি ছাড়াই এ আয়াতটি নাযেল করতে পারতেন, যথা – “হে মানবকুল! আল্লাহর অনুগ্রহ ও তাঁরই দয়ায় তোমরা আনন্দ প্রকাশ করো।” কিন্তু তিনি তা করেননি, বরঞ্চ তিনি এরশাদ ফরমান, “হে মাহবূব! আপনারই পবিত্র জবান মোবারক দ্বারা তাদের জানিয়ে দিন যে আল্লাহতা’লার অনুগ্রহ ও দয়াপ্রাপ্তিতে তাদের আনন্দ প্রকাশ করা উচিত।”

এমতাবস্থায় মনে একটি প্রশ্নের উদয় হয়: এই নেয়ামত/বরকত/আশীর্বাদ যিনি মঞ্জুর করেছেন তিনি স্বয়ং খোদাতা’লা, আর যারা এতে খুশি প্রকাশ করার কথা তারা তাঁরই বান্দা। তাহলে আল্লাহ পাক কেন মহানবী (দ:)-এর পবিত্র জবান মোবারক দ্বারা নিজের ঈমানদার বান্দাদের আপন রহমত/আশীর্বাদ উদযাপন করার আদেশ করেছেন? তিনি তো নিজেই তাদেরকে নির্দেশ দিতে পারতেন, যেমনটি তিনি আপন নেয়ামতের স্মরণ করিয়ে নির্দেশ দিয়েছিলেন পূর্ববর্তী জাতিগুলোকে। এই প্রশ্নের উত্তর খোদ আয়াতটিতেই বিধৃত হয়েছে; অর্থাৎ, এর দ্বারা ঈমানদার মুসলমানদের দেখানো হয়েছে যে তারা এসব রহমত/আশীর্বাদ লাভ করেছে মহানবী (দ:)-এর মহাসম্মানিত সত্তা মোবারকের মাধ্যমে এবং তাঁরই আল্লাহর রাসূল হিসেবে প্রেরিত হওয়ার দরুন।

৪.৫.২ মহানবী (দ:) হলেন আল্লাহর অনুগ্রহ ও দয়া

সূরা ইউনূসের ৫৮ আয়াতে দুটি ব্যাপারে খুশি উদযাপন করার কথা বলা হয়েছে। এগুলো হলো: আল্লাহতা’লার ফযল/অনুগ্রহ ও তাঁরই রহমত/দয়া। এখানে ‘অনুগ্রহ’ ও ‘দয়া’ শব্দগুলো কেন আলাদাভাবে উল্লেখিত হয়েছে, আর এগুলোর মানেই বা কী?

আল-ক্বুরআনের বাচনশৈলীগুলোর মধ্যে একটি এই যে, ‘ফযল’ (অনুগ্রহ) ও ‘রহমত’ (দয়া/করুণা) শব্দগুলো যখন উল্লেখিত হয়, তখন সেগুলো মহানবী (দ:)-এর মোবারক সত্তাকে উদ্দেশ্য করে, যার আরো প্রামাণিক দলিল পরবর্তী পর্যায়ে পেশ করা হবে। কিন্তু প্রথমে ‘ফযল’‘রাহমা’ শব্দগুলো দ্বারা কী বোঝানো হয়েছে, তা-ই আমরা দেখি।

৪.৫.২.১ একটি কৌতূহলোদ্দীপক বুদ্ধিবৃত্তিক বিষয়

এই আয়াতটিতে দুটি বিষয়ের উল্লেখ রয়েছে:

১/ – আল্লাহর অনুগ্রহ (ফযল)

২/ – আল্লাহর দয়া/করুণা (রাহমা)

এই দুটি শব্দের মাঝে ‘ওয়াও’ (এবং) অপ্রধান পদটি বিদ্যমান, যা সংযোজক অব্যয় পদ হিসেবে ব্যবহৃত। আরবী ব্যাকরণের সাধারণ নিয়ম অনুযায়ী, ‘ফযল’‘রাহমা’ শব্দগুলো পৃথক পৃথকভাবে উল্লেখ করা হয়েছে, যেটা ইঙ্গিত করে যে সেগুলো দুটি আলাদা বিষয়। তাই উভয় শব্দকে উদ্দেশ্য করার পদ্ধতি হিসেবে ‘যা-লিকা’ (’ওই’) শীর্ষক নির্দেশাত্মক সর্বনামটি দ্বি-বচনে ব্যবহার করা উচিত ছিল; কিন্তু এখানে তা না করে এক-বচনই ব্যবহার করা হয়েছে। (ব্যাকরণের) এই নিয়ম গৃহীত হলে আয়াতটি হতো নিম্নরূপ: “সেগুলোর (মানে ফযল/অনুগ্রহ ও রাহমা/দয়ার) ওপর মুসলমানদের আনন্দ প্রকাশ করা উচিত।” অথচ এভাবে প্রকাশিত না হওয়ার দরুন আয়াতটি বরঞ্চ ঘোষণা করে: “সেটার (অর্থাৎ, এক-বচনে) ওপর মুসলমানদের আনন্দ প্রকাশ করা উচিত।” 

আরবী ভাষায় ‘যা-লিকা’ (’ওই’) শব্দটি এক-বচনে কোনো ব্যক্তি বা বস্তুকে বোঝায়; কিন্তু আমরা দ্বি-বচন বা বহু-বচন ব্যবহার করতে চাইলে যথাক্রমে ‘যা-নিকা’’ঊলা’ইকা’ শীর্ষক নির্দেশাত্মক সর্বনামদ্বয় প্রয়োগ করে থাকি। এই নিয়ম স্মরণে রেখে আমরা যদি আয়াতখানির দিকে ফিরে তাকাই, তাহলে দেখতে পাবো যে ‘যা-লিকা’ শীর্ষক এক-বচনের নির্দেশাত্মক সর্বনামটি-ই ‘ফযল’‘রাহমা’ শব্দ দুটোর পরে প্রয়োগ করা হয়েছে।

এই বাচনশৈলীর পেছনে কী হেকমত তথা ঐশী জ্ঞান লুক্কায়িত আছে? আল-ক্বুরআন কি এর নীতিমালা পরিবর্তন করেছে? না, আসলে তা নয়। আমাদেরকে এখানে স্বীকার করতে হবে যে আয়াতটিতে এক-বচনের নির্দেশাত্মক সর্বনামটি ব্যবহৃত হয়েছে এ কারণে যে ‘ফযল’‘রাহমা’ শব্দ দুটো শুধু একজনকেই উদ্দেশ্য করেছে। ক্বুরআন মজীদের এই বাচনশৈলী হতে নিম্নের বিষয়টি যথাযথভাবে উপলুব্ধ হওয়া উচিত যে, সর্বশক্তিমান আল্লাহতা’লা তাঁরই ‘ফযল’‘রাহমা’-কে মূলতঃ একজন মহান সত্তার মাঝে সন্নিবেশিত করেছেন; আর এই মহা সম্মানিত সত্তার খাতিরেই আমাদেরকে আনন্দ প্রকাশের জন্যে আদেশ দেয়া হয়েছে।

৪.৫.২.২ কুরআন দ্বারা কুরআনের তাফসীর/ব্যাখ্যা

ওপরে উল্লেখিত আয়াতে করীমার আলোকে যদি আমরা অন্যান্য ক্বুরআনের আয়াত ব্যাখ্যা-বিশ্লেষণ করি (এটা তাফসীর আল-ক্বুরআন বিল-ক্বুরআন নামে পরিচিত), তাহলে দিবালোকের মতো পরিষ্কার হয়ে যাবে যে সর্বশক্তিমান আল্লাহতা’লার ‘ফযল’ (অনুগ্রহ) ও ‘রাহমা’ (দয়া/করুণা) হলেন মহানবী (দ:)। ‘রাহমা’ শব্দটির ব্যাখ্যা সূরা আম্বিয়া’তে পাওয়ায় যায়, যেখানে আল্লাহতা’লা তাঁর শেষ নবী (দ:)-এর প্রতি ‘রাহমাতুল্লিল্ আলামীন’ (বিশ্বজগতের জন্যে ঐশী করুণা) লক্বব/উপাধিটি দান করেন।

. ক্বুরআন মজীদে বিশ্বনবী (দ:)-কে স্পষ্টভাবে ঐশী দয়া/করুণা বলা হয়েছে: “এবং আমি আপনাকে সমগ্র জগতের জন্যে রহমতরূপেই প্রেরণ করেছি।” [আল-ক্বুরআন, ২১:১০৭, তাফসীরে নূরুল এরফান]

প্রিয়নবী (দ:)-কে সমস্ত সৃষ্টিকুলের জন্যে (খোদায়ী) পরম করুণার মূর্তরূপ হিসেবে সৃষ্টি করা হয়েছে, যা’তে শুধু এই বিশ্বজগত-ই নয়, বরং অন্যান্য আলম/জগত-ও অন্তর্ভুক্ত। তাঁর পবিত্র যাত (সত্তা) মোবারক-ই খোদায়ী করুণার মূর্ত প্রকাশ, যাঁকে বিশ্বমানবতার হেদায়াত তথা সঠিক পথপ্রাপ্তি ও কল্যাণে প্রেরণ করা হয়েছে। মহানবী (দ:)-এর মাধ্যমে এ জগতে আল্লাহতা’লার অনুগ্রহ ও দয়ার বহিঃপ্রকাশ ঘটেছে।

. বিশ্বনবী (দ:)-কে আল্লাহতা’লার অনুগ্রহ ও করুণা ঘোষণা করে আল-ক্বুরআনের অন্যত্র এরশাদ হয়েছে: “তারপর যদি আল্লাহর ‘ফযল’ (কৃপা/অনুগ্রহ) এবং তাঁর ‘রাহমা’ (করুণা) তোমাদের প্রতি না হতো, তাহলে তোমরা ক্ষতিগ্রস্তদের অন্তর্ভুক্ত হয়ে যেতে।” [আল-ক্বুরআন, ২:৬৪]

. রাসূলুল্লাহ (দ:)-ই যে আল্লাহর ‘ফযল’ (অনুগ্রহ) ও ‘রহমত’ (করুণা) তা নিম্নের আয়াতে করীমায় স্পষ্টভাবে প্রমাণিত হয়: “এবং যদি তোমাদের প্রতি আল্লাহর আল্লাহর ‘ফযল’ (অনুগ্রহ) ও ’রাহমা’ (করুণা) না হতো, তবে অবশ্যই তোমরা শয়তানের অনুসরণ আরম্ভ করতে, অল্প সংখ্যক মানুষ ব্যতিরেকে।” [আল-ক্বুরআন, ৪:৮৩]

এই আয়াতে করীমায় আল্লাহতা’লা ঈমানদার মুসলমানদেরকে সার্বিকভাবে এবং সাহাবা-এ-কেরাম (রা:)-কে সুনির্দিষ্টভাবে সম্বোধন করেছেন। প্রিয়নবী (দ:)-এর (ধরাধামে) শুভাগমন ও রাসূল হিসেবে প্রেরণকে আপন আশীর্বাদ হিসেবে ঘোষণা করার পাশাপাশি আল্লাহ পাক বিবৃত করেন যে রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহে ওয়া সাল্লাম (সৃষ্ট) না হলে অধিকাংশ মানুষ শয়তানের অনুসারী হতো, যার ফলশ্রুতিতে তারা কুফরী (অবিশ্বাস) ও শেরক (অংশীবাদ)-এর শিকারে পরিণত হতো। এটা স্রেফ খোদাতা’লার এক মহা অনুগ্রহ যে তিনি তাঁর প্রিয়নবী (দ:)-কে সঠিক পথপ্রাপ্তির উৎসমূল হিসেবে প্রেরণ করেছেন, যার দরুন শয়তানের ধূর্তচাল ও ধোকা হতে তিনি তাদেরকে রক্ষা করেছেন।

. অপর এক আয়াতে করীমায় আল্লাহতা’লা স্পষ্টভাবে ঘোষণা করেন: “নিশ্চয় আল্লাহর মহান অনুগ্রহ হয়েছে মুসলমানদের প্রতি যে তাদের মধ্যে তাদেরই মধ্য থেকে একজন রাসূল প্রেরণ করেছেন, যিনি তাদের প্রতি তাঁর আয়াতসমূহ পাঠ করেন এবং তাদেরকে পবিত্র করেন, আর তাদেরকে কিতাব (আল-ক্বুরআন) ও হিকমত (ঐশী জ্ঞান-প্রজ্ঞা) শিক্ষা দান করেন; এবং তারা নিশ্চয় এর আগে স্পষ্ট গোমরাহীতে (মানে পথভ্রষ্টতায়) ছিলো।” [আল-ক্বুরআন, ৩:১৬৪]

মনোনীত এই পয়গম্বর (দ:)-এর প্রেরণের আগে গোটা মানবজাতি গোমরাহী ও অজ্ঞতার অন্ধকারে ডুবে ছিল। ঠিক এমন-ই এক পরিস্থিতিতে প্রিয়নবী (দ:)-কে মানবের মাঝে প্রেরণ করা হয়। ক্বুরআন তেলাওয়াত (পাঠ) এবং এর শিক্ষাকে ছড়িয়ে দিয়ে মনুষ্য সভ্যতাকে মানসিক দাসত্ব, অজ্ঞতা ও পথভ্রষ্টতার বন্দি-দশা হতে মুক্তি দেয়া হয়; আর ঈমানের জ্যোতি তাদের অন্তরে স্থাপন করা হয়, যার দরুন তাদের আত্মাগুলো নুবুওয়্যতের শিক্ষা দ্বারা জ্যোতির্ময় হয়ে ওঠে এবং এতে তারা মানসিক শান্তিও অর্জন করে। এটা এমন-ই এক বিশাল অনুগ্রহ ছিল যে আল্লাহতা’লা এটাকে তাঁর সবচেয়ে বড় আশীর্বাদ বলে অভিহিত করেন। প্রিয়নবী (দ:)-কে প্রেরণ এতো বড় নেয়ামত যে “মুসলমানদের সেটার জন্যে আনন্দ প্রকাশ করা উচিত” শীর্ষক আয়াতটি এবিষয়টিকে পূর্ণ সমর্থন দেয়; ফলে ঈমানদার মুসলমানবৃন্দ যতোই খুশি প্রকাশ করুন না কেন, তা যথেষ্ট হবে না। এই খুশি স্রেফ অনুভব করা উচিত নয়, বরঞ্চ এটা প্রকাশ্যে ব্যক্ত করাও একান্ত প্রয়োজন।

. সর্বশক্তিমান আল্লাহতা’লা ওপরোক্ত গুণাবলী সম্পর্কে ঘোষণা করেন:

“তিনি-ই, যিনি উম্মী মানুষদের মধ্যে তাদেরই মধ্য থেকে একজন রাসূল প্রেরণ করেন যেন তাদের কাছে তাঁর আয়াতসমূহ পাঠ করেন, তাদেরকে পবিত্র করেন এবং তাদেরকে কিতাব ও হিকমতের জ্ঞান দান করেন, আর অবশ্যঅবশ্য তারা ইতিপূর্বে সুস্পষ্ট পথভ্রষ্টতার মধ্যে ছিলো।” [আল-ক্বুরআন, ৬২:২]

এই আয়াতটি আমাদের জানায় যে আমাদেরই সবচেয়ে সম্মানিত মালিক-মোখতার মহানবী (দ:) হলেন সেই পয়গম্বর, যিনি মানবজাতির কাছে আল্লাহতা’লার ওহী পাঠ করে তাদেরকে পথভ্রষ্টতা ও অবিশ্বাসের আবর্জনা হতে পবিত্র করেছেন। আর তিনি-ই তাদের অন্তঃস্থিত সত্তাগুলোকে অভ্যন্তরীণ অশুচিতা হতে পুতঃপবিত্র করেছেন এবং তাদেরকে জ্ঞান-প্রজ্ঞার আলো দ্বারাও উদ্ভাসিত করেছেন, যার দরুন তারা আল্লাহতা’লার আধ্যাত্মিক জ্ঞান ও তাঁরই হেদায়াত তথা সত্য পথপ্রাপ্তির মহা পুরস্কার লাভ করেছেন। নচেৎ ইতিপূর্বে তারা স্পষ্ট গোমরাহীতে নিমজ্জিত ছিলেন। প্রিয়নবী (দ:)-এর ধরাধামে শুভাগমন নিঃসন্দেহে খোদায়ী হেদায়াতের জ্যোতির বহিঃপ্রকাশ এবং এটা আল্লাহর আশীর্বাদ ও করুণা-ও। এ জন্যেই ঈমানদারদের কৃতজ্ঞতা প্রকাশ করা বাধ্যতামূলক।

. এর পরবর্তী আয়াতে করীমায় আল্লাহ পাক শেষ বিচার দিবস অবধি সকল অনাগত প্রজন্মকে এই আশীর্বাদের আওতায় নিয়ে এসেছেন:

“এবং তাদের মধ্য থেকে অন্যান্যদেরকে (মহানবীর মাধ্যমে) পবিত্র করেন এবং জ্ঞান দান করেন তাদেরকে, যারা ওই পূর্ববর্তীদের সাথে মিলিত হয়নি; এবং তিনি-ই সম্মান ও প্রজ্ঞাময়। এটা (মানে মহানবীর আগমন ও এর পাশাপাশি তাঁর আধ্যাত্মিক দয়া) আল্লাহরই অনুগ্রহ; যাকে চান দান করেন, এবং আল্লাহ বড় অনুগ্রহশীল।” [আল-ক্বুরআন, ৬২:৩-৪]

সূরা জুমু’আ’র ওপরে উল্লেখিত আয়াতে আল্লাহতা’লা তাঁর নবী (দ:)-কে প্রথমে একজন পয়গম্বর হিসেবে বর্ণনা করেন এবং তারপর তাঁকে আপন আশীর্বাদ হিসেবে বিভূষিত করেন। এসব আয়াতে করীমা থেকে এ বিষয়টি প্রতিষ্ঠিত হয় যে আল্লাহতা’লা তাঁর প্রিয়নবী (দ:)-কে সৃষ্টিকুলের জন্যে পয়গম্বর হিসেবে প্রেরণ করেছেন: কোনো স্থান-কাল-পাত্রকেই এর ব্যতিক্রম করা হয়নি।

মহানবী (দ:)-এর সঙ্গ দ্বারা যাঁরা আশীর্বাদধন্য হন, তাঁদেরকে এই উম্মতের প্রথম প্রজন্ম সাব্যস্ত করা হয়। আর তাঁদের মধ্যেই রাসূলুল্লাহ (দ:) শুভাগমন করেন (মানে তাঁর বেলাদত হয়)। সূরা জুমু’আর ৩য় আয়াতে ‘তাদের মধ্য থেকে অন্যান্যদেরকে’ উল্লেখ করা হয়েছে এবং এ সকল মানুষ হলেন তারাই, যারা মহানবী (দ:)-এর যাহেরী জিন্দেগীর পরে আগমন করবেন। এতে অন্তর্ভুক্ত আছেন অন্য জাতিয়তা ও সভ্যতার সকল মানুষ যারা ইসলামে দাখিল হবেন এবং উম্মতে মুহাম্মদী (সাল্লাল্লাহু আলাইহে ওয়া সাল্লাম)-এর সদস্য হবেন, ঠিক যেমনটি ওই আয়াতে করীমায় ঘোষিত হয়েছে, “যারা (অর্থাৎ, বর্তমান যে পরবর্তী প্রজন্ম) ওই পূর্ববর্তীদের সাথে মিলিত হয়নি।” যেহেতু তারা হুযূর পূর নূর (দ:) হতে ভিন্ন এক যুগে আবির্ভূত হয়েছেন, সেহেতু তাদেরকে পরবর্তী প্রজন্মের মধ্যে গণনা করা হয়েছে যারা মহানবী (দ:)-এর সরাসরি দেখা-সাক্ষাৎ পাননি।

সূরা ইঊনুসের ৫৮ নং আয়াতের আরো বিস্তারিত ব্যাখ্যা দেয়ার আগে সূরা আল-জুমু’আর ৪ নং আয়াতে বিধৃত মর্মবাণী সর্বপ্রথমে যথাযথভাবে উপলুব্ধ হওয়া প্রয়োজন। এই আয়াতটির তাফসীর নিম্নরূপ:

৪.৫.২.২.১ “এবং আল্লাহ-ই সবচেয়ে বেশি ফযল তথা অনুগ্রহশীল” মর্মে আয়াতটির অর্থ

সর্বশক্তিমান আল্লাহতা’লা যিনি সৃষ্টিকুলের স্রষ্টা, তিনি সব ধরনের মাহাত্ম্য ও শ্রেষ্ঠত্বের অধিকারী। তাঁর অনুগ্রহে তিনি-ই সবচেয়ে শ্রেষ্ঠ, আর তাঁর কর্তৃত্ব রয়েছে সমস্ত কিছুর ওপর। এখানে সর্বাধিক প্রাসঙ্গিক যে বিষয়টির প্রতি লক্ষ্য করা গুরুত্বপূর্ণ তা হলো, আল্লাহ পাক এই ‘ফযল’ তথা অনুগ্রহের মালিক; কিন্ত তিনি নিজে সেই ফযল/অনুগ্রহ নন। উদাহরণস্বরূপ, কোনো নির্দিষ্ট বাড়ি ও তা কার মালিকানাধীন জানার জন্যে প্রশ্ন করা হলে উত্তরে বলা হবে অমুক এ বাড়ির মালিক। আরবী ব্যাকরণে এটা ’আল-এযাফত’ (ষষ্ঠী বিভক্তি) হিসেবে পরিচিত, যা সম্বন্ধ নির্দেশ করতে ব্যবহৃত হয় এবং যার সমষ্টি হচ্ছে একটি সম্বন্ধকৃত বিশেষ্য পদ ‘মোযাফ’ ও একটি সম্বন্ধকারক বিশেষ্য পদ ‘মোযাফ ইলাইহে’। যদিও এগুলো একত্রে আসে, তবুও মূলতঃ একে অপর হতে এরা আলাদা। যথা – বইয়ের মালিক; মালিক ও মালিকানাধীন বস্তু এখানে পরস্পর হতে পৃথক; কখনোই এরা এক হতে পারে না। আরেকটি উদাহরণ হলো ‘আল্লাহর রাসূল’: এখানে ‘রাসূল’ বিশেষ্য পদটি সম্বন্ধকৃত, আর ‘আল্লাহ’ বিশেষ্য পদটি সম্বন্ধকারক। অতএব, এই নিয়ম অনুসারে রাসূল যেমন আল্লাহ হতে পারেন না, তেমনি আল্লাহ-ও রাসূল হতে পারেন না।

এই বিষয়টি উপলব্ধি করার পর চলুন আমরা আলোচ্য আয়াতটির দিকে আবার ফিরে তাকাই এবং ওপরোক্ত (ব্যাকরণগত) নিয়মটি তাতে প্রয়োগ করি। অাল্লাহতা’লা এরশাদ ফরমান: “এটা আল্লাহরই অনুগ্রহ”– এখানে ‘অনুগ্রহের অধিকারী’ শব্দগুলো ষষ্ঠী বিভক্তি। (আরবী) ব্যাকরণগতভাবে সম্বন্ধকৃত বিশেষ্য ও সম্বন্ধকারক বিশেষ্য সর্বদা একে অপর হতে ভিন্ন। অতএব, ‘ফযল’ (অনুগ্রহ) ও তার ‘মালিক’ দুটি আলাদা আলাদা বিষয়। সর্বশক্তিমান আল্লাহ হলেন ওই অনুগ্রহের মালিক; কিন্তু তিনি স্বয়ং ওই অনুগ্রহ নন। কেননা অনুগ্রহ সেই জিনিস যা আল্লাহতা’লা কর্তৃক দানকৃত। [অনুবাদকের নোট: আরবী ব্যাকরণের এসব টার্ম বাংলায় ঠিক মতো অনুবাদ হয়েছে কি না তা জানতে বিশেষজ্ঞের মতামত কাম্য]

প্রশ্ন উঠতে পারে যে আল্লাহতা’লা স্বয়ং সেই অনুগ্রহ না হলে সেই অনুগ্রহটি কে? এর উত্তর হলো, সেই অনুগ্রহ মহানবী (দ:)-এর সম্মানিত যাত তথা সত্তা মোবারক, যাঁকে আল্লাহতা’লা সমগ্র মানবজাতির জন্যে আপন রাহমা/করুণা ও হেদায়াত/পথপ্রদর্শনস্বরূপ প্রেরণ করেছেন। এই বিষয়টি আরো খোলাসা করতে নিচে কয়েকজন বরেণ্য ও কর্তৃত্বসম্পন্ন তাফসীরকার উলামার ব্যাখ্যা-বিশ্লেষণের সংকলন পেশ করা হলো। 

৪.৫.২.২.২ বিখ্যাত তাফসীরগ্রন্থগুলোতে ‘ফযল’ শব্দটির অর্থ

সূরা জুমু’আর ৪র্থ আয়াত অবতীর্ণ হয় করুণার নবী হযরত মুহাম্মদ সাল্লাল্লাহু আলাইহে ওয়া সাল্লামের আশীর্বাদপূর্ণ শুভাগমন উপলক্ষে। তাঁর বরকতময় আবির্ভাব সমগ্র মানবজাতির খাতিরে হয়েছিল, আর আল্লাহতা’লা এটাকে আশীর্বাদ হিসেবে ঘোষণা করেন। কেউ এই আশীর্বাদের মূর্ত প্রকাশ দেখতে চাইলে তাঁর মহানবী (দ:)-কে দেখতে হবে। এই বিষয়টি ক্বুরআন মজীদে বিস্তারিত বলা হয়েছে। আলোচ্য এ আয়াতের সাথে সংশ্লিষ্ট কিছু প্রধান প্রধান তাফসীরের একটি সংকলন নিচে পেশ করা হলো:

১. হযরত আবদুল্লাহ ইবনে আব্বাস (বেসাল: ৬৮ হিজরী) বিবৃত করেন যে মহা অনুগ্রহের অর্থ: “(এবং অাল্লাহ মহা অনুগ্রহশীল)-আয়াতটি এমন এক আশীর্বাদকে উদ্দেশ্য করে, যেটা দ্বীন-ইসলাম ও হযরত মুহাম্মদুর রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহে ওয়া সাল্লামের প্রতি দানকৃত নুবুওয়্যাত। এ কথাও বলা হয়েছে যে তা ঈমানদারবৃন্দের প্রতি দানকৃত দ্বীন-ইসলাম। আর এ-ও বলা হয়েছে যে এটা মহানবী (দ:) ও সৃষ্টিকুলকে প্রদত্ত আল-ক্বুরআন।” [ফায়রূয-আবাদী প্রণীত ‘তানঊয়ীর আল-মিক্ববা’স মিন তাফসীরে ইবনে আব্বাস’, ৪৭১ পৃষ্ঠা]

. আল-যামাখশারী (৪৬৭-৫৩৮ হিজরী) লিখেন: “(সেই) আশীর্বাদ যেটা আল্লাহতা’লা হযরত মুহাম্মদ সাল্লাল্লাহু আলাইহে ওয়া সাল্লামকে দান করেছেন, যিনি তাঁর জমানার (মানে শেষ বিচার দিবস অবধি সময়ের) মানুষের নবী এবং পূর্ববর্তী জমানার মানুষেরও; সেটাই হচ্ছে ‘আল্লাহর আশীর্বাদ তিনি যাঁকে পছন্দ করেন তাঁকে দান করেন’।” [মো’তাযেলী মতবাদী আল-যামাখশারী কৃত ‘আল-কাশশাফ ‘আন হাক্বায়েক্ব গাওয়া’মিদ আল-তানযীল ওয়া ‘উয়ূন আল-আক্বা’উয়ীল ফী উজূব আল-তা’উয়ীল’, ৪:৫৩০]

. আল-তাবরাসী (জন্ম: ৫৪৮ হিজরী) বলেন: “(এবং আল্লাহ মহা অনুগ্রহশীল) মহানবী (দ:)-কে প্রেরণের মাধ্যমে তাঁর সৃষ্টিকুলের প্রতি মহা আশীর্বাদের (যিনি) মালিক ।” [আল-তাবরাসী রচিত ‘মজমা’আ আল-বয়া’ন ফী তাফসীর আল-ক্বুরআন, ১০:৪২৯]

অর্থাৎ, মানবজাতির মাঝে সবচেয়ে সম্মানিত রাসূল (দ:)-কে প্রেরণ আল্লাহতা’লার পক্ষ হতে সর্ববৃহৎ আশীর্বাদ এবং এটা তাঁর এক অনুগ্রহ-ও।

. ইবনে আল-জাওযী (৫১০-৫৭৯ হিজরী) বলেন: “(এবং আল্লাহ মহা অনুগ্রহশীল) মহানবী (দ:)-কে প্রেরণ করে।” [ইবনে জাওযী লিখিত ‘যা’দ আল-মাসীর ফী ‘ইলম আল-তাফসীর’, ৮:২৬০]

অর্থাৎ, মানবজাতির মাঝে আল্লাহতা’লা কর্তৃক তাঁর সর্বাধিক সম্মানিত রাসূল (দ:)-কে প্রেরণ এক মহা আশীর্বাদ এবং পুরস্কার-ও।

. ইমাম নাসাফী (জন্ম: ৭১০ হিজরী) বিবৃত করেন: “(সেই) আশীর্বাদ যেটা আল্লাহতা’লা মহানবী (দ:)-কে দান করেছেন….তিনি তাঁর সময়কার (শেষ বিচার দিবস পর্যন্ত সময়ের) মানুষের নবী এবং পূর্ববর্তী সময়কালের (মানুষেরও) নবী।” [আল-নাসাফী কৃত ‘মাদা’রিক আল-তানযীল ওয়া হাক্বায়েক্ব আল-তাউয়ীল, ৫:১৯৮]

সবচেয়ে করুণাশীল রাসূল (দ:)-এর আশীর্বাদপূর্ণ প্রেরণ গোটা মানবজাতিকে আপন করুণার ছায়ায় ঢেকে রেখেছে; যারা তাঁর আগে অতিক্রান্ত হয়েছেন এবং যারা শেষ বিচার দিবস পর্যন্ত আগমন করতে থাকবেন সবাই এর আওতাধীন। এটাই হলো নিম্নের আয়াতের ব্যাখ্যা (সেটাই আল্লাহর অনুগ্রহ তিনি যাকে পছন্দ করেন তাকে দান করেন), যার মধ্যে ইমাম নাসাফী দুটো অর্থ-ই তুলে ধরেছেন। “(যারা ওই পূর্ববর্তীদের সাথে মিলিত হয়নি) – আল্লাহর এই বাণীতে অন্তর্ভুক্ত রয়েছেন পরবর্তী যুগে আগমনকারী মানুষ, যারা রাসূলুল্লাহ (দ:)-কে দেখেননি; মহানবী (দ:) তাদের প্রতিও একজন প্রেরিত পয়গম্বর, আর তাঁর ধরাধামে শুভাগমন উপলক্ষে তাদেরকেও ‘আনন্দ প্রকাশ’ করতে আদেশ দেয়া হয়েছে।

. ইমাম আল-খাযেন (৬৭৮-৭৪১ হিজরী) ‘মহা অনুগ্রহ’ বলতে কী বোঝানো হয়েছে, তা ব্যাখ্যা করতে গিয়ে বলেন: “অর্থাৎ, যা সৃষ্টিকুলের প্রতি আল্লাহতা’লা কর্তৃক মহানবী (দ:)-কে তাদের মাঝে রাসূল হিসেবে প্রেরণের দ্বারা হয়েছে।” [আল-খাযেন রচিত ‘লুবা’ব আল-তা’উয়ীল ফী মা’আনী আল-তানযীল’, ৪:২৬৫]

. আবূ হাইয়্যান আন্দালুসী (৬৮২-৭৪৯ হিজরী) ব্যক্ত করেন: “(সেটা) মহানবী (দ:)-কে (নবী হিসেবে) প্রেরণের প্রতি ইঙ্গিত করে।” [আবূ হাইয়্যান প্রণীত ‘তাফসীর আল-বাহর আল-মুহীত’, ৮:২৬৫]

. ইবনে কাসীর (৭০১-৭৭৪ হিজরী) ব্যাখ্যা করে: “অর্থাৎ, (এটা তাই) যা আল্লাহতা’লা হুযূর পাক (দ:)-কে প্রকাশ্য নুবুওয়্যত হিসেবে দান করেছেন এবং তাঁকে প্রেরণের মাধ্যমে তাঁরই উম্মতের প্রতি যে গুণাবলী মঞ্জুর করেছেন।”  [‘সালাফী’ মতবাদী ইবনে কাসীর লিখিত ‘তাফসীর আল-ক্বুরআন আল-আযীম’, ৪:৩৬৪]

অতএব, মহানবী (দ:)-এর আশীর্বাদপূর্ণ শুভাগমন ও তাঁর রেসালাত উভয়ই আল্লাহতা’লার মহা অনুগ্রহ।

. ইমাম সৈয়ূতী (৮৪৯-৯১১ হিজরী) বলেন: “(আল্লাহরই অনুগ্রহ; যাকে চান দান করেন) এ আয়াতটি মহানবী (দ:)-কে উদ্দেশ্য করে এবং তাঁদেরকেও তা করে, তাঁর সাথে যাঁদের কথা উল্লেখ করা হয়েছে।” [আল-সৈয়ূতী কৃত ‘তাফসীর আল-জালা’লাইন’, ৫৫৩ পৃষ্ঠা]

১০. আল-আলূসী (১২১৭-১২৭০ হিজরী) বিবৃত করেন: “(সেটা) ইশারা করে যা অতিক্রান্ত হয়েছে তার দিকে, যেমন – তাঁর মহাসম্মানিত রাসূল হওয়াটা উম্মী মানুষদের মাঝে এবং তাদের পরবর্তীদের মাঝেও; জ্ঞানদাতা ও পবিত্রকারী হিসেবে। এতে নিহিত দূরত্বের অর্থ সম্মানের উদ্দেশ্যেই কৃত, যথা – ‘সেই মহা অনুগ্রহ’।” [মাহমূদ আল-আলূসী রচিত ‘রূহ আল-মা’আনী ফী তাফসীর আল-ক্বুরআন আল-আযীম ওয়াল-সাব’ আল-মাসা’নী’, ২৮:৯৪-৯৫]

১১. আহমদ মোস্তফা আল-মারা’গী (১৩০০-১৩৭২ হিজরী) মন্তব্য করে: “অর্থাৎ, মানবজাতির প্রতি তাদেরকে পবিত্রকারী ও জ্ঞানদাতা এবং পথপ্রদর্শক হিসেবে এই প্রিয়নবী (দ:)-কে প্রেরণ করাটা আল্লাহতা’লার এক আশীর্বাদ, আর তাঁরই বান্দাদের প্রতি অনুগ্রহের এক নিদর্শন-ও।” [ফ্রী-মেইসন আহমদ আল-মারাগী লিখিত ‘তাফসীর আল-ক্বুরআন আল-করীম’, ১০/২৮:৯৬]

১২. আল-তানতাউয়ী আল-জওহারী (মৃত্যু: ১৩৫৯ হিজরী), সমসাময়িককালের (ফ্রী-মেইসন হিসেবে) পরিচিত মিসরীয় তাফসীরবিদ, ব্যাখ্যা করে: “(এবং আল্লাহতা’লা মহা অনুগ্রহশীল) মানে ‘ওহে উম্মী মানুষ, তোমাদের প্রতি এবং তোমাদের পরবর্তীদের প্রতি যখন আমি (খোদা) প্রিয়নবী (দ:)-কে প্রেরণ করেছি, তখন তা তোমাদের প্রতি আশীর্বাদ হয়ে গিয়েছে’।” [আল-তানতাউয়ী আল-জওহারী প্রণীত ‘আল-জাওয়া’হির ফী তাফসীর আল-ক্বুরআন আল-কা’রীম’, ২৪:১৭৫]

ওপরের তাফসীরগুলো হতে এটা স্পষ্ট যে মহাসম্মানিত রাসূল (দ:)-কে ব্যতিক্রম ছাড়াই সবার জন্যে আশীর্বাদ বলা হয়েছে। যেহেতু আল-নস্ আল-ক্বাতেঈ তথা সুস্পষ্ট শরঈ দলিল দ্বারা প্রমাণিত হয়েছে যে আল্লাহতা’লা তাঁর প্রিয়নবী (দ:)-কে আপন অনুগ্রহ ও করুণা বলে সম্বোধন করেছেন, সেহেতু ‘মুসলমানদের সেটার ওপর আনন্দ প্রকাশ করা উচিত’ মর্মে খোদায়ী আদেশ পালনার্থে খুশি উদযাপন করাটা ঐশী আজ্ঞা ও ক্বুরআনী শিক্ষার সাথে পুরোপুরি সঙ্গতিপূর্ণ।

৪.৫.২.২.৩ বিখ্যাত তাফসীরগুলোতে ‘ফযল’ ও ‘রহমত’ (করুণা) শব্দগুলোর অর্থ

পূর্ববর্তী পৃষ্ঠাগুলোতে সূরা আল-জুমু’আ’র আয়াতগুলো ব্যাখ্যা করা হয়েছে। এক্ষণে আমরা সূরা আল-ইঊনুসের ৫৮ নং আয়াতটি বিশ্লেষণ করবো, যাতে আল-ক্বুরআনের কিছু মনোনীত তাফসীরের আলোকে ‘ফযল’‘রাহমা’ শব্দগুলোর অর্থ আরো ভালোভাবে বোঝা যায়:

.  ইবনে আল-জাওযী (৫১০-৫৭৯ হিজরী) হযরত আবদুল্লাহ ইবনে আব্বাস (রা:)-এর কথা উদ্ধৃত করেন, যিনি বলেন: “আল্লাহর ফযল (অনুগ্রহ) হচ্ছে জ্ঞান (অর্থাৎ, আল-ক্বুরআন) এবং রাহমা (করুণা) হচ্ছেন প্রিয়নবী (দ:)।” আল-দাহহাক হযরত আবদুল্লাহ ইবনে আব্বাস (রা:) হতে এটা বর্ণনা করেন। [ইবনে জাওযী লিখিত ‘যা’দ আল-মাসীর ফী ‘ইলম অাল-তাফসীর’, ৪:৪০]

. আবূ হাইয়্যা’ন আল-আন্দালুসী (৬৮২-৭৪৯ হিজরী) বর্ণনা করেন: “আল-দাহহাক উদ্ধৃত করেন হযরত আবদুল্লাহ ইবনে আব্বাস (রা:)-কে, যিনি বলেন: ‘ফযল বলতে উদ্দেশ্য করা হয়েছে জ্ঞান (মানে আল-ক্বুরআন)-কে, আর রাহমা  (করুণা) হলেন মহানবী (দ:)।” [আবূ হাইয়্যান প্রণীত ‘তাফসীর আল-বাহর আল-মুহীত’, ৫:১৭১]

. ইমাম সৈয়ূতী (৮৪৯-৯১১ হিজরী)-ও হযরত আবদুল্লাহ ইবনে আব্বাস (রা:)-কে উদ্ধৃত করে বলেন: “আবূ আল-শায়খ হযরত আবদুল্লাহ ইবনে আব্বাস (রা:) হতে বর্ণনা করেন যে এই আয়াতটিতে ‘আল্লাহর ফযল’ বলতে জ্ঞানকে বোঝানো হয়েছে, আর তাঁরই ‘রাহমা’ বলতে উদ্দেশ্য করা হয়েছে মহানবী (দ:)-কে (যেমনটি এরশাদ হয়েছে – ‘এবং আমি আপনাকে সমগ্র জগতের জন্যে রহমতরূপেই প্রেরণ করেছি।’ আলক্বুরআন, ২১:১০৭)। [ইমাম সৈয়ূতী রচিত ‘আল-দুর্র আল-মানসূর ফী আল-তাফসীর বি আল-মা’সূর’, ৪:৩৩০]

. মাহমূদ আলূসী (১২১৭-১২৭০ হিজরী) বলেন: “আবূ আল-শায়খ হযরত আবদুল্লাহ ইবনে আব্বাস (রা:) হতে বর্ণনা করেন, তিনি বলেন: “আল্লাহর ‘ফযল’ (অনুগ্রহ) হচ্ছে জ্ঞান (মানে আল-ক্বুরআন) এবং তাঁরই ‘রাহমা’ (করুণা) হচ্ছেন মহানবী (দ:)। পক্ষান্তরে, আল-খতীব ও ইবনে আসা’কির উভয়-ই হযরত ইবনে আব্বাস (রা:) হতে বর্ণনা করেন যে ‘ফযল’ শব্দটি দ্বারাও মহানবী (দ:)-কে উদ্দেশ্য করা হয়েছে।“ [মাহমূদ আলূসী কৃত ‘রূহ আল-মা’আনী ফী তাফসীর আল-ক্বুরআন আল-’আযীম ওয়া আল-সাব’ আল-মাসা’নী, ১১:১৪১]

ওপরে উদ্ধৃত তাফসীরগুলো হতে স্পষ্ট প্রতীয়মান হয় যে সাহাবী হযরত ইবনে আব্বাস (রা:) ‘ফযল’ তথা ‘অনুগ্রহ’ শব্দটিকে জ্ঞান হিসেবে ব্যাখ্যা করেছেন, আর এখানে ‘জ্ঞান‘ বলতে বোঝায় ক্বুরআন মজীদ। নিচের আয়াতটি এই দৃষ্টিভঙ্গিকে প্রতিষ্ঠিত করে: “(হে মাহবূব), এবং আল্লাহ আপনার প্রতি কিতাব ও হিকমত অবতীর্ণ করেছেন, আর আপনাকে শিক্ষা দিয়েছেন যা কিছু আপনি জানতেন না এবং আপনার প্রতি আল্লাহর মহা অনুগ্রহ রয়েছে।” [আল-ক্বুরআন, ৪:১১৩]

এই আয়াতে করীমায় উদ্ধৃত ‘ফযল’ (অনুগ্রহ)-এর অর্থ যদি জ্ঞান অথবা ক্বুরআন মজীদ হয়েও থাকে, তথাপিও এর গভীর অন্তর্নিহিত অর্থের উপলব্ধি দ্বারা আমরা দেখতে পাই যে এটা মহানবী (দ:)-কেই উদ্দেশ্য করেছে। কেননা (একমাত্র) তাঁরই মধ্যস্থতায় আমরা ক্বুরআন মজীদ লাভ করেছি। এই উম্মতের তাফসীর বিশারদমণ্ডলীর ইমাম ও মহান সাহাবী হযরত আবদুল্লাহ ইবনে আব্বাস (রা:) আমাদের অন্তরগুলোকে আলোকিত করেছেন এ জ্ঞান দ্বারা যে, মহানবী (দ:)-ই আল্লাহতা’লার ’ফযল’ (অনুগ্রহ) ও ‘রাহমা’ (করুণা)। একই আয়াতে “মুসলমানদের সেটার জন্যে আনন্দ প্রকাশ করা উচিত” – বাক্যটি মওলিদুন্নবী (দ:) উপলক্ষে খুশি প্রকাশের উপলব্ধি আমাদের মধ্যে জাগ্রত করে; আল্লাহতা’লার অনুগ্রহ ও করুণাপ্রাপ্তিতে খুশি প্রকাশের এটা মাধ্যমবিশেষ। এই দৃষ্টিকোণ থেকে বিষয়টিকে  দেখলে কোনো বুদ্ধিমান মুসলমান-ই এর সাথে ভিন্নমত পোষণ করতে পারেন না। ওপরের আয়াতে করীমার গূঢ় রহস্যগুলো এই তাফসীরটি উন্মোচন করেছে এবং মওলিদুন্নবী (দ:)-এর উদযাপনের আকারে আল্লাহতা’লার কাছ থেকে প্রাপ্ত অনুগ্রহ ও করুণার প্রতি খুশি প্রকাশ করাটা যে আল্লাহরই আদেশ, সে বিষয়টিও দৃঢ়ভাবে প্রতিষ্ঠা করেছে।

আল-তাবরাসী (জন্ম: ৫৪৮ হিজরী) বলেন:  “এই আয়াতটির মানে হলো, ‘(হে রাসূল), ওইসব মানুষ যারা দুনিয়া নিয়ে আনন্দে মেতে আছে এবং একে অপরের সাথে সেটা নিয়ে প্রতিযোগিতা করছে আর সেটা (-র ফসল) সঞ্চয় করছে, তাদেরকে বলুন যে তোমাদের যদি আনন্দ করতেই হয়, তাহলে তোমাদের মাঝে মহানবী (দ:)-কে প্রেরণ ও ক্বুরআন মজীদ নাযেলের মাধ্যমে আল্লাহতা’লা যে তোমাদের প্রতি অনুগ্রহ ও করুণা করেছেন, সেটার খাতিরে তোমরা খুশি প্রকাশ করো। (আর এটা তোমরা করলে) উভয়েরই মাধ্যমে তোমরা চিরস্থায়ী ও অনন্ত (খোদায়ী) আশীর্বাদ লাভ করবে, যা তোমাদের জন্যে এই ক্ষণস্থায়ী দুনিয়া হতে শ্রেষ্ঠতর হবে……ক্বাতাদা ও মুজাহিদ দুজন-ই বর্ণনা করেন হযরত আবূ জা’ফর আল-বাক্বের (রা:)-এর বক্তব্য: আল্লাহর ফযল (অনুগ্রহ) হলেন হযরতে রাসূলুল্লাহ (দ:)’।” [আল-তাবরাসী লিখিত ‘মজমা’ আল-বয়ান ফী তাফসীর আল-ক্বুরআন’, ৫:১৭৭-১৭৮]

ওপরের তাফসীরে প্রদত্ত ব্যাখ্যা হতে অনুধাবন করা যায় যে আল্লাহতা’লার আশীর্বাদগুলোর মধ্যে সেরা মহানবী (দ:) ও আল-ক্বুরআন। এর মানে এই দুইয়ের ক্ষেত্রেই কেবল খুশি প্রকাশ করা যথাবিহিত। কেউ যদি কোনো কিছু উদযাপন করতে চান, তাহলে তাঁকে আমাদের প্রিয়নবী (দ:)-এর বেলাদত/মীলাদ দিবস পালন করতে দেয়া হোক; কেননা এর চেয়ে শ্রেষ্ঠ দিবস আর নেই।

৪.৫.২.২.৪ মৌ: আশরাফ আলী থানবীর অভিমত

এখানে পার্শ্বটীকা হিসেবে দেওবন্দী (কওমী) মতবাদের অতি পরিচিত আলেম মৌ: আশরাফ আলী থানভীর (১২৮০-১৩৬২ হিজরী) এতদসংক্রান্ত অভিমতটি প্রণিধানযোগ্য হবে। ইতিপূর্বে যেমনটি বলা হয়েছিল যে ‘ফযল’‘রাহমা’ শব্দগুলো মহানবী (দ:)-কে উদ্দেশ্য করেছে, ঠিক একইভাবে থানভী-ও নিজ ‘মীলা’দ আল-নাবী’ পুস্তকে ব্যক্ত করেন যে রাসূলুল্লাহ (দ:) হলেন আল্লাহতা’লার সবচেয়ে বড় আশীর্বাদ ও পরম নিখুঁত অনুগ্রহ। [জরুরি নোট: আশরাফ আলী থানভী আলোচ্য আয়াতের মূল অর্থ ক্বুরআনের আলোকে গৃহীত বলে ঘোষণা দিয়ে এর ব্যাখ্যায় বলেন: এক্ষণে আমরা ‘ফযল’ (অনুগ্রহ) ও ‘রাহমা’ (করুণা) শব্দ দুটির দ্বারা কী বোঝানো হয়েছে, তা আল-ক্বুরআনের অন্যান্য আয়াতে খুঁজে দেখবো। এটা জ্ঞাত হওয়া জরুরি যে এ দুটি শব্দ ক্বুরআন মজীদে প্রচুর পরিমাণে পাওয়া যায়। কখনো কখনো উভয় শব্দ একই অর্থবোধক হয়; আবার কখনো কখনো দুটি আলাদা অর্থ জ্ঞাপন করে। তাই আল্লাহতা’লা একটি আয়াতে করীমায় এরশাদ ফরমান, “অতঃপর যদি আল্লাহর অনুগ্রহ (ফযল) ও করুণা (রাহমা) তোমাদের প্রতি না হতো, তবে তোমরা ক্ষতিগ্রস্তদের অন্তর্ভুক্ত হয়ে যেতে” (আল-ক্বুরআন, ২:৬৪; মুফতী আহমদ এয়ার খাঁন সাহেবের ‘তাফসীরে নূরুল এরফান’)। অধিকাংশ তাফসীরবিদ উলামার মতে, এখানে ‘ফযল’ ও ‘রাহমা’ শব্দগুলো মহানবী (দ:)-এর আশীর্বাদধন্য পবিত্র সত্তাকে উদ্দেশ্য করেছে। আরেকটি আয়াতে এরশাদ হয়েছে, “এবং যদি তোমাদের প্রতি আল্লাহর অনুগ্রহ (ফযল) ও করুণা (রাহমা) না হতো, তবে অবশ্যই তোমরা শয়তানের অনুসরণ আরম্ভ করতে, অল্প সংখ্যক মানুষ ব্যতিরেকে” (আল-ক্বুরআন, ৪:৮৩)। এক্ষেত্রেও সংখ্যাগরিষ্ঠ তাফসীরবিদ উলামা মত প্রকাশ করেন যে এতে মহানবী (দ:)-কেই উদ্দেশ্য করা হয়েছে। কতিপয় আয়াতে ‘ফযল’ বলতে দুনিয়াবী আশীর্বাদকে বোঝানো হয়েছে, আর ‘রাহমা’ বলতে বোঝানো হয়েছে ধর্মীয় আশীর্বাদকে। সুতরাং সমস্ত তাফসীর-শাস্ত্র বিশারদের মতানুযায়ী, মহানবী (দ:) দুনিয়াবী তথা পার্থিব আশীর্বাদ এবং এর পাশাপাশি দ্বীনী তথা ধর্মীয় আশীর্বাদ-ও। আশরাফ আলী থানভী আরো বলেন: এই আয়াতে করীমার প্রসঙ্গের দিকে লক্ষ্য করলে আমরা দেখতে পাই যে এটা আল-ক্বুরআনকে উদ্দেশ্য করে। তবে আমরা যদি এটাকে সাধারণ অর্থে নেই, তাহলে ক্বুরআন মজীদকে অধিকতর যথাযথ উদ্দেশ্যগুলোর কোনো একটি হিসেবে গ্রহণ করতে হবে। অর্থাৎ, ‘ফযল’ ও ‘রাহমা’ বলতে প্রিয়নবী (দ:)-এর আশীর্বাদপূর্ণ শুভাগমনকে বোঝাবে। এই উপলব্ধি অনুযায়ী, সকল (খোদায়ী) আশীর্বাদ, চাই তা হোক দুনিয়াবী বা হোক ধর্মীয়, যার মধ্যে অন্তর্ভুক্ত আল-ক্বুরআন-ও, সবই এ বিষয়ের আওতায় পড়ে। এটা এ কারণে যে মহানবী (দ:)-এর আশীর্বাদধন্য সত্তা মোবারক হলেন অন্যান্য সকল আশীর্বাদের উৎসমূল এবং সকল (ঐশী) অনুগ্রহ ও করুণার নির্যাস। অতএব, এটাই সবচেয়ে সামগ্রিক ব্যাখ্যা; আর এই তাফসীরের ভিত্তিতে এ আয়াতখানির সারমর্ম হলো, রাসূলুল্লাহ (দ:)-এর নূর তথা জ্যোতির অস্তিত্ব-ই হোক কিংবা তাঁর জিসমানী (শারীরিক) বেলাদত-ই হোক, প্রত্যেক ব্যক্তিরই আপন আপন খুশি এব্যাপারে প্রকাশ করা উচিত। কেননা তিনি সকল আশীর্বাদের মাধ্যম বা কারণ। (অন্যান্য সাধারণ আশীর্বাদ ব্যতিরেকে) সবচেয়ে উত্তম আশীর্বাদ হচ্ছে ঈমান তথা ধর্মীয় বিশ্বাস, যেটাও নিশ্চিতভাবে মহানবী (দ:)-ই আমাদের কাছে নিয়ে এসেছিলেন। পরিশেষে, সমস্ত তথ্য বিবেচনায় নিলে দেখা যায় যে ‘ফযল’ ও ‘রাহমা’ মহানবী (দ:)-এরই সত্তা মোবারক। তাই তাঁর আশীর্বাদধন্য সত্তার অস্তিত্বের ব্যাপারে পর্যাপ্ত আনন্দ প্রকাশ করা কারো পক্ষেই সম্ভবপর নয়।]

এটার কারণ এ থেকে বোঝা যায় যে, ‘দালা’লা আল-নস’ তথা প্রামাণিক দলিল – ‘ফযল’ ‘রাহমা’ শব্দগুলো দ্বারা প্রিয়নবী (দ:)-কে উদ্দেশ্য করা হয়েছে। সর্বশক্তিমান আল্লাহতা’লা করুণার নবী (দ:)-কে খুশি প্রকাশের উপলক্ষ করার জন্যে ঈমানদারদের প্রতি আদেশ জারি করেছেন, যে পয়গম্বর (দ:) আমাদের সকল পার্থিব ও ধর্মীয় আশীর্বাদের উৎস বটেন। কেউ আল্লাহতা’লার অনুগ্রহ ও করুণার বাহ্যিক প্রকাশ দেখতে চাইলে তাঁকে অবশ্যই মহানবী (দ:)-এর প্রতি লক্ষ্য করতে হবে, যাঁকে মহাপ্রভুর আশীর্বাদ ও দয়ার পরমোৎকর্ষের মূর্তরূপ করা হয়েছে। অতএব, আল্লাহতা’লার আশীর্বাদ ও করুণাকে একটি সত্তা মাঝেই সন্নিবেশিত করা হয়েছে, যিনি মহানবী (দ:) এবং যিনি ব্যতিক্রম ছাড়াই সকল স্থান ও কালের জন্যে প্রেরিত হয়েছেন।

এই (খোদায়ী) আজ্ঞা হতে এটা বোঝা যায় যে, এ আয়াতখানি ঈমানদারবৃন্দের কাছে আনন্দ উদযাপন দাবি করেছে; আর তাই এটা সকল মুসলমানেরই প্রতি প্রযোজ্য। সুতরাং মহানবী (দ:)-এর মহিমাপূর্ণ বেলাদত (ধরাধামে শুভাগমন) উপলক্ষে মুসলমানদের খুশি প্রকাশ করা উচিত; আর শরীয়ত-নির্ধারিত সীমারেখা মেনে যতোখানি আশীর্বাদ/নেয়ামত উৎযাপন করা যায়, সবই অনুমতিপ্রাপ্ত হবে।

৪.৫.৩ আমরা কেন ‘ফযল’‘রহমত’-প্রাপ্তি উদযাপন করবো তার বর্ণনা

সর্বশক্তিমান আল্লাহতা’লা কেন সূরা ইউনুসের ৫৮ নং আয়াতে তাঁর ’ফযল’‘রাহমা’-প্রাপ্তিতে আমাদেরকে খুশি/আনন্দ উদযাপন করতে আদেশ করেছেন? এর কারণ-ই বা কী, যার ওপর ভিত্তি করে তিনি এই আশীর্বাদপ্রাপ্তিতে আমাদেরকে খুশি প্রকাশ করতে দেখতে চান? এটা জানার আগে এ কথা উপলব্ধি করা জরুরি যে ‘ফযল’‘রাহমা’ শব্দ দুটি একটি নির্দিষ্ট প্রেক্ষিতে ব্যক্ত হয়েছে। বিভিন্ন আয়াতে করীমায় ক্বুরআন মজীদ এ বিষয়টির পটভূমি সম্পর্কে ব্যাখ্যা দিয়েছে, যা ইতিপূর্বে আমাদের আলোচনায় আমরা উল্লেখ করেছি।

সর্বশক্তিমান আল্লাহতা’লা মুসলমান সম্প্রদায়কে সম্বোধন করে বলেন যে তাঁর প্রিয়নবী (দ:)-এর ধরাধামে শুভাগমনের কল্যাণরূপী তাঁরই ‘ফযল’‘রাহমা’ না হলে আমাদের মধ্যে অধিকাংশ-ই শয়তানকে মেনে বিচ্যুত বা ধ্বংসপ্রাপ্ত হতাম। মহানবী (দ:)-কে মানবজাতির মাঝে প্রেরণ করা না হলে কে মুসলমানদেরকে বিভ্রান্তির অন্ধকার এবং কুফর (অবিশ্বাস) ও শেরক (অংশীবাদ)-এর শৃঙ্খল হতে বাঁচাতেন, আর খোদায়ী সত্য ও হেদায়াতের আলোয় পথ দেখিয়ে নিয়ে যেতেন? আমাদের এই মহান পথপ্রদর্শক না হলে মনুষ্যজাতি নৈরাজ্য, নিষ্ঠুরতা ও অত্যাচার-নিপীড়নের গভীর গর্তে পতিত হতো, আর মানুষের মৌলিক অধিকার রক্ষা করা সম্ভবও হতো না।

আল্লাহতা’লার হেদায়াতের জ্যোতি মানবজাতির মাঝে যিনি নিয়ে এসেছেন, সেই মহাসম্মানিত (পবিত্র) সত্তার ধরণীতলে শুভাগমন উপলক্ষে আমাদের খুশি প্রকাশ করার জন্যে ঐশী আদেশ জারি করা হয়েছে। আমাদের প্রতি আল্লাহতা’লার অনুগ্রহ ও করুণা বর্ষণের ফলাফল-ই হচ্ছে তাঁর আশীর্বাদপূর্ণ আবির্ভাব। এ উপলক্ষে আনন্দ ও খুশি প্রকাশ করা তাই ঈমানদারির পূর্বশর্ত এবং মহানবী (দ:)-এর প্রতি অন্তরের ভালোবাসারই বহিঃপ্রকাশ।

৪.৫.৪ আয়াতটিতে (ঐশী আজ্ঞা) সীমিতকরণসূচক শব্দার্থ ব্যবহারের উদ্দেশ্য

’ফাবিযা-লিকা ফালএয়াফরাহূ’ (“মুসলমানদের সেটার জন্যে আনন্দ প্রকাশ করা উচিত” ), এই ক্বুরআনের আয়াতটিতে সীমিতকরণসূচক শব্দার্থের প্রয়োগটি বিশেষ গুরুত্বসহ বিবেচনার দাবি রাখে। ইমাম ফখরুদ্দীন রাযী (৫৪৩-৬০৬ হিজরী) এর ব্যাখ্যায় বলেন:

“(মুসলমানদের সেটার জন্যে আনন্দ প্রকাশ করা উচিত), আল্লাহতা’লার এই কথায় সীমিতকরণের (তথা নির্দিষ্টকরণের) প্রয়োগ বিদ্যমান; অর্থাৎ, এটা জরুরি যে মানুষেরা খুশি প্রকাশ না করেন, এ বিশেষ ক্ষেত্র ব্যতিরেকে।” [আল-রাযী রচিত ‘মাফা’তীহ আল-গায়ব’ (তাফসীরে কবীর), ১৭:১১৭] 

এই আয়াতে করীমার ব্যাখ্যায় ইমাম ফখরুদ্দীন রাযী বলেন যে শরীয়তে জায়েয এমন খুশি-ই শুধু নয়, বরঞ্চ শরীয়তে শর্তারোপকৃত খুশি-ও এতে (এ ঐশী আজ্ঞায়) অন্তর্ভুক্ত রয়েছে। বিবৃত হয়েছে যে আল্লাহতা’লার অনুগ্রহ ও করুণা সর্বোচ্চ পর্যায়ে উদযাপিত হওয়া উচিত।

প্রিয় পাঠক! আল্লাহতা’লা নিষেধ করেছেন সেসব আনন্দ-উৎসবের উদযাপন যা’তে প্রদর্শনী বিদ্যমান। পার্থিব আশীর্বাদের ক্ষেত্রে আনন্দের কোনো রকম প্রদর্শনী, যার উদযাপন গ্রহণযোগ্য মাত্রা ছাড়িয়ে যায়, তা সর্বশক্তিমান আল্লাহতা’লা পছন্দ করেন না। তিনি পাক কালামে ঘোষণা করেন:

“নিশ্চয় আল্লাহতা’লা দাম্ভিকদের পছন্দ করেন না।” [আল-ক্বুরআন, ২৮:৭৬]

তবে মহান প্রভুর অনুগ্রহ ও করুণার প্রশ্ন উঠলে তিনি এর ব্যতিক্রম করেন। এ ক্ষেত্রে প্রত্যেকের সর্বান্তঃকরণে খুশি প্রকাশ ও আনন্দ উদযাপন করা উচিত। ‘তা তাদের সমস্ত ধন-দৌলত অপেক্ষা শ্রেয়’ – আল্লাহতা’লার এই পাক কালামে আমরা দেখতে পাই যাঁরা মওলিদুন্নবী (দ:) উদযাপন উপলক্ষে মোমবাতি জ্বালিয়ে, জশনে জুলূস ও সভা-সমাবেশের আয়োজন করে, এবং খাবার বিতরণ করে (মহানবী সাল্লাল্লাহহু আলাইহে ওয়া সাল্লামের প্রতি ভালোবাসা ব্যক্ত করতে) আনন্দ ও সুখ  প্রকাশের জন্যে এসব রীতিকে একটি মাধ্যম হিসেবে গ্রহণ করেন, তাঁরা প্রকৃতপক্ষে আল্লাহতা’লারই পছন্দনীয় আমল পালন করেন; আর এ উপলক্ষে কৃত ব্যয় তাঁদের সমস্ত সঞ্চিত ধনসম্পদ ও মালামাল হতেও উত্তম। অতঃপর মহানবী (দ:)-এর বেলাদতের মাস সমাগত হলে প্রিয়নবী (দ:)-এর খেদমতের প্রতি সকল দিক হতে উৎসাহ দেখা দেয়, আর এরই ফলে (ধর্মীয়) উদ্দীপনা বিরাজ করে। এই আশীর্বাদধন্য দিনটির জন্যে যদি দুনিয়ার সমস্ত আনন্দ-ফুর্তি কুরবানিও দিতে হয়, তবুও তা যথেষ্ট হবে না। এর অনুমতি ক্বুরআন মজীদ হতে প্রমাণিত। আল্লাহতা’লা শুধু এর উদযাপনকেই বিধিবদ্ধ করেননি, বরঞ্চ নিচের আলোচনায় আমরা (আরো) দেখতে পাবো যে এই মহা আশীর্বাদের উদযাপন আমাদের প্রতি আদিষ্টও হয়েছে।

৪.৫.৫ আয়াতোল্লিখিত ‘ফাবিযালিকা’ (সেটারই মধ্যে) কথাটি ব্যবহারের গূঢ়রহস্য

এই প্রসঙ্গে ইতিপূর্বে আমরা ‘সেটা’ – নির্দেশাত্মক সর্বনামটি প্রয়োগের ব্যাপারে তাত্ত্বিক আলোচনা করেছিলাম। এখানে আরো কিছু বিষয় নিয়ে আলাচনা করা হবে। অল্লাহতা’লা এরশাদ ফরমান:

“আপনি বলুন, ‘আল্লাহরই অনুগ্রহ ও তাঁরই দয়া (মুসলমানদের প্রতি, যা মহানবী সাল্লাল্লাহু আলাইহে ওয়া সাল্লামকে রাসূল করে প্রেরণের কারণে বর্ষিত হয়েছে), সেটারই ওপর তাদের আনন্দ প্রকাশ করা উচিত।” [আল-ক্বুরআন, ১০:৫৮]

ওপরের আয়াতটিতে যদি নির্দেশাত্মক সর্বনামটি বাদও দেয়া হতো, তাতেও এর অর্থ বোঝা যেতো। কিন্তু এর প্রয়োগের দ্বারা তাকিদ যুক্ত করা হয়েছে, যাতে আমাদের মনোযোগ অন্য দিকে সরে না যায়। অধিকন্তু, এতে আরো ইঙ্গিত রয়েছে যে কারো দ্বারা কৃতজ্ঞতা প্রকাশ করাটা কেবল নামায, রোযা ও দান-সদকাহ’র মধ্যেই সীমাবদ্ধ নয়। এগুলো আমাদের শুকরিয়া আদায়ের গ্রহণযোগ্য পন্থা বটে। কিন্তু এ মহা আশীর্বাদের আবির্ভাব, যাঁর মাধ্যমে আমরা (বাকি) সব আশীর্বাদ লাভ করেছি,  এটা এতোই বড় উপলক্ষ যে এতে সভা-সমাবেশ, আলোকসজ্জা, জশনে জুলূস ও গরিবদের মাঝে খাদ্য বিতরণের আয়োজনের মাধ্যমে এর উদযাপনকে প্রশংসনীয় করা হয়েছে। এ যেন আল্লাহতা’লা চান আমরা নিজেদের খুশি ও সুখানুভূতি প্রকাশ এমনভাবে করি, যাতে আমাদের উদযাপন প্রমাণ করে তাঁরই প্রিয়নবী (দ:)-কে আমাদের মাঝে প্রেরণের কারণে আমরা তাঁর (আল্লাহর) প্রতি কৃতজ্ঞ।

৪.৫.৬ ব্যক্তিগত ও সামাজিক পর্যায়ে (ঐশীদানের প্রতি) কৃতজ্ঞতা প্রকাশ

এটা সাধারণত দেখা যায় যে কারো কোনো শিশু জন্মালে কিংবা (কোনো দেশের) স্বাধীনতা অর্জিত হলে ওই উপলক্ষটি মহা জাঁকজমকের সাথে উদযাপন করা হয়। এই উদযাপন ব্যক্তিগত ও সামাজিক উভয় পর্যায়েই হয়ে থাকে। সর্বশক্তিমান আল্লাহতা’লা ইচ্ছা করেন যে প্রিয়নবী (দ:)-এর মহাসম্মানিত বেলাদত তথা ধরণীতলে শুভাগমন দিবস যখন সমাগত হয়, তখন আমাদের এ উপলক্ষে অনুভূত খুশি ও সুখ যেন অন্যান্য সকল আনন্দ-ফুর্তিকে ছাপিয়ে ওঠে।

মহানবী (দ:)-এর বেলাদত দিবস উদযাপনের উদ্দেশে ধর্মীয় সমাবেশ ও জশনে জুলূসের আয়োজন করতে প্রত্যেকেরই অর্থব্যয় হয়, এটা স্পষ্ট। কেউ কেউ এতে আপত্তি করেন এই বলে যে, এতে কোনো ফায়দা/উপকার নেই; এ অর্থ গরিব ও দুঃস্থদের দান করলে ভালো হতো নয় কি? কিম্বা কোনো মসজিদ বা মাদ্রাসায়? আমরা এই নেতিবাচক মনোভাবের জবাব দিতে চাই এই বলে, ওপরোক্ত খাতগুলোতে সেগুলোর নিজস্ব গুরুত্বানুসারে অর্থব্যয় করা একদম সঠিক; কিন্তু আল্লাহতা’লা উম্মতের সামাজিক সুখ-শান্তির প্রতি অধিকতর অগ্রাধিকার দিয়ে এ নেতিবাচক মনোভাবকে নাকচ করে দিয়েছেন। আল্লাহতা’লা তাঁরই খাতিরে দান-সদকাহ করতে আমাদের নিষেধ করেননি বটে, তবে স্রেফ কিছু দান-সদকাহ’র খাতে এ অর্থব্যয় করা উচিত বলে কারোরই পিছটান দেয়া উচিত নয়। কেননা আল্লাহতা’লা এই ধারণাকে রদ করেছেন এই বলে, “মুসলমানদের আনন্দ প্রকাশ করা উচিত।” অতঃপর এ কথাকে আরো স্পষ্টভাবে বোঝাতে গিয়ে বলেছেন, ‘তা তাদের সমস্ত (সঞ্চিত) ধন-দৌলত অপেক্ষা শ্রেয়’। অর্থাৎ, প্রিয়নবী (দ:)-এর বেলাদত উপলক্ষে অর্থব্যয় করা অন্যান্য উদ্দেশ্যে অর্থ সঞ্চয়ের চেয়েও শ্রেষ্ঠতর।

৪.৫.৭ এই আয়াতে পাকে অনেক তাকিদমূলক শব্দের প্রয়োগ

মওলিদুন্নবী (দ:) উদযাপনের আদেশসম্বলিত আয়াতটিতে প্রাপ্ত তাকিদের সংখ্যা প্রসঙ্গে বলতে হয়, খুব কম সংখ্যক আয়াতে করীমা-ই ওরকম তাকিদের সংখ্যা নিয়ে নাযেল হয়েছে। আলোচ্য এই আয়াতটি সম্পর্কে বিস্তারিত জানার জন্যে লক্ষ্য করলে আমরা তাতে দশটি তাকিদ দেখতে পাবো:

১/ ক্বুল: ‘বলুন’ শব্দটি দিয়ে আয়াতটির সূচনা করে তাকিদ দেয়া হয়েছে; এটা শ্রোতার মনোযোগ আকর্ষণের একটি মাধ্যম।

২/বি-ফাদলিল্লাহ (মানে ‘আল্লাহরই অনুগ্রহ’): প্রশ্ন ওঠে যে এই অনুগ্রহটি কী? মস্তিষ্কে এ চিন্তার উদ্রেক করে  শ্রোতা উত্তর প্রত্যাশা করেন। এটা তাকিদ সৃষ্টির আরেকটি মাধ্যম।

৩/ওয়া  বি-রাহমাতিহী  (‘এবং তাঁরই করুণা’): এটা তৃতীয় তাকিদ যা দ্বারা করুণাটি কী মর্মে শ্রোতার মনে একটি প্রশ্ন উত্থাপন করা হয়েছে।

৪/ ’ফযল’ তথা অনুগ্রহের পরে ‘রাহমা’ (করুণা) শব্দটির উল্লেখ-ও একটি তাকিদ।

৫/ ‘ফা’ (অতঃপর) শব্দটির হেকমত:  ‘বি-যালিকা’ (সেটার জন্যে) কথার আগে (’ফা’) শব্দটি ব্যবহৃত হয়েছে, যা আরবী ব্যাকরণগত তাকিদ সৃষ্টির উদ্দেশ্যে করা হয়েছে।

৬/ ‘বি-যালিকা’ (সেটার জন্যে): ‘অনুগ্রহ’ ও ‘করুণা’ শব্দগুলোর পরে দূর নির্দেশাত্মক সর্বনামটির ব্যবহারও তাকিদের খাতিরেই করা হয়েছে।

৭/ ‘ফা’ল-এয়াফরাহূ’ বাক্যে ‘ফা’ শব্দটি (অতঃপর মুসলমানদের আনন্দ প্রকাশ করা উচিত) যুক্ত হয়েছে তাকিদের জন্যে।

৮/ ‘ফা’ল-এয়াফরাহূ’ (অতঃপর মুসলমানদের আনন্দ প্রকাশ করা উচিত) বাক্যে ‘লাম’ অক্ষরটিও তাকিদের উদ্দেশ্যে দেয়া হয়েছে।

৯/ ‘হুয়া খায়র’ (অপেক্ষা শ্রেয়): এই সর্বনাম-ও তাকিদেরই জন্যে।

১০/ ‘মিম্মা এয়াজমা’ঊন’ (তাদের সঞ্চিত ধনসম্পদ হতে): এটাও তাকিদ দেয়ার জন্যে প্রয়োগকৃত।

ওপরের  এ আয়াতে করীমায় আল্লাহতা’লা দশটি তাকিদ প্রদান করেছেন, যা দ্বারা তিনি তাঁর ’ফযল’ (অনুগ্রহ) ও ‘রাহমা’ (করুণা)-প্রাপ্তির প্রতি আমাদেরকে খুশি প্রকাশ করতে আদেশ করেছেন। সাধারণত কোনো ভাষণে বা বক্তব্যে এতোগুলো তাকিদ ব্যবহার করাটা ওই সাধারণ বক্তব্যের প্রতিনিধিত্ব করে না। কিন্তু যেহেতু খোদায়ী এই আদেশটি প্রিয়নবী (দ:)-এর সাথে সম্পর্কিত, সেহেতু এর শোভা আরো বর্ধনের উদ্দেশ্যে এতোগুলো তাকিদ প্রদান করা হয়েছে, যাতে করে কোনো অস্বীকৃতির সম্ভাবনা না থাকে। এতোগুলো তাকিদের পরে বক্তব্যের শেষে এই খুশি প্রকাশকে মুসলমানদের সঞ্চিত ধনসম্পদের চেয়েও শ্রেষ্ঠতর বলাতে এর তাৎপর্য যে কতোটুকু, সে সম্পর্কে স্পষ্ট বোঝা যায়।

এসব তাকিদের পুনরাবৃত্তির দ্বারা কী প্রভাব সৃষ্টি করা হয়েছে? এই প্রশ্নের উত্তর বোধগম্য হবে একটি উদাহরণে: কোনো পিতা তাঁর সন্তানকে কোনো কাজ করার আদেশ দিতে চাইলে তিনি শুধু বলেন, ‘অমুক কাজটি করো।’ সন্তান বুদ্ধিমান হলে এই আদেশ-ই যথেষ্ট হবে। কিন্তু এমন পিতা পাওয়া অসাধারণ/অস্বাভাবিক নয় যিনি তাঁর সন্তানকে বলেন, ‘বৎস, আমি তোমাকে অমুক কাজটি করতে বলছি।’ ওই সন্তান যখন এ কথা শোনে, তখন-ই সে বুঝতে পারে যে তার বাবা তাকে গুরুত্বপূর্ণ কোনো কাজ করতে আদেশ করেছেন; এটা এই আদেশে নিহিত অতিরিক্ত তাকিদের কারণেই হয়েছে। উপরন্তু, কখনো কখনো পিতা তাঁর আদেশকে আরো বেশি তাকিদপূর্ণ  করতে পারেন এ কথা বলে, ‘বৎস, শোনো। আমি সুনির্দিষ্টভাবে তোমাকে জরুরিভিত্তিতে অমুক কাজটি করার জন্যে আদেশ করছি।’ এই আদেশটিতে অনেকগুলো তাকিদ থাকায় বোঝা যায়, সন্তানটির পক্ষে তার পিতার আদেশ না মেনে গত্যন্তর নেই।

প্রথম আদেশটিতে ওই সন্তানের জন্যে তার পিতার আদেশ অমান্য করাটা অশ্রদ্ধাশীলতার পরিচায়ক হবে; কিন্তু যখন তার পিতা নিজের আদেশে অতিরিক্ত তাকিদ যোগ করেন, তখন তিনি যেন বলেন, ‘আমি চাই তুমি শুধু অমুক কাজটি-ই করো।’ সন্তান এটা জেনেও তার বাবাকে অমান্য করলে সে সত্যি বড় এক হতভাগা বটে। আমাদের এই উদাহরণ পেশের উদ্দেশ্য হচ্ছে কেবল প্রতিপাদ্য বিষয়টিকে ব্যাখ্যা করতে সহায়তা করা। নচেৎ বিশ্বজগতের মহান প্রভু ও রক্ষাকর্তার সাথে কোনো পিতার তুলনা কীভাবে চলতে পারে? (মানে চলতে পারে না)

সর্বশক্তিমান আল্লাহতা’লা তাঁর প্রিয়নবী (দ:)-কে অদেশ করেন: “হে মাহবূব! আমার পক্ষ থেকে তাদের বলুন, আল্লাহর সর্বশেষ নবী (দ:)-এর আকারে তারা যে ‘ফযল’‘রাহমা’ লাভ করেছে, কৃতজ্ঞতা প্রকাশের মাধ্যম হিসেবে জোর তাকিদসহ তা উদযাপিত হওয়া উচিত।” মওলিদুন্নবী (দ:)-এর খুশি উদযাপনে আল্লাহতা’লা একমাত্র যে মানদণ্ড স্থাপন করেছেন, তা হলো প্রিয়নবী (দ:)-কে আল্লাহরই বান্দা ও রাসূল হিসেবে স্বীকার করা; এই নির্ধারিত সীমা লঙ্ঘন না করে কেউ যতোই খুশি প্রকাশ ও উদযাপন করুন না কেন, তা কখনোই যথেষ্ট হবে না। আর তা হবেই বা কীভাবে, যখন আল্লাহতা’লা নিজেই এর উদযাপনের কোনো সীমারেখা বেঁধে দেননি?

মহান আল্লাহতা’লা তাঁর আজ্ঞাতে এ ইঙ্গিত করেছেন যে (মওলিদুন্নবীতে) খুশি প্রকাশের দ্বারা অর্জিত পুরস্কারের পরিমাণ অনুমানেরও অতীত। আর পরকালীন জীবনের জন্যে যা-ই প্রস্ততি নেয়া হোক না কেন, তা আল্লাহর দৃষ্টিতে মহানবী (দ:)-এর বেলাদত তথা ধরাধামে শুভাগমন উপলক্ষে খুশি উদযাপনে অর্জিত পুরস্কারের মতো নয়। আল্লাহতা’লা এরশাদ ফরমান, ‘তা তাদের সমস্ত (সঞ্চিত) ধন-দৌলত অপেক্ষা শ্রেয়[আল-ক্বুরআন, ১০:৫৮]

এটা স্পষ্ট যে এই (খোদায়ী) অনুগ্রহ ও করুণার আবির্ভাবে কেউ নিজের খুশির অনুভূতি প্রকাশ না করলে তার এবাদত-বন্দেগী ও ধর্মীয় সাধনা-ই আল্লাহতা’লার কাছে গণ্য হবে না; প্রিয়নবী (দ:)-এর বেলাদত উপলক্ষে খুশি হওয়াটা (যা ঈমানদারির চিহ্ন/লক্ষণ বটে) অধিকতর বিবেচ্য হবে। নিশ্চয় ওই সব আমল পালন করা বাধ্যতামূলক, কিন্তু ওর সাথে সাথে আল্লাহর প্রিয় হাবীব (দ:)-এর ধরণীতলে শুভাগমনের ব্যাপারে খুশি থাকাও একান্ত আবশ্যক হবে।

৪.৫.৮ “তা তাদের সমস্ত (সঞ্চিত) ধন-দৌলত অপেক্ষা শ্রেয়” মর্মে আয়াতটির তাফসীর (ব্যাখ্যা)

এই আয়াতটির সাধারণ অর্থ হলো, আল্লাহতা’লার ‘ফযল’ (অনুগ্রহ) ও ‘রাহমা’ (করুণা)-প্রাপ্তিতে খুশি হওয়াটা আমাদের যাবতীয় সঞ্চয় হতে শ্রেয়তর। এখানে প্রশ্ন দাঁড়াচ্ছে, কী কী জিনিস সঞ্চয় করা যায়? নিম্নোল্লিখিত দুটি বস্তু সঞ্চয় করা সম্ভব:

১. পার্থিব জীবনের সাথে সম্পর্কিত অর্থ-সম্পদ সঞ্চয় ও বিভিন্ন উপায়-উপকরণ সংগ্রহ করা সম্ভব; এবং

২. পারলৌকিক জীবনের সাথে সম্পৃক্ত নেক আমল তথা পুণ্যদায়ক কর্মের অনুশীলন, যেমন নামায-রোযা, দান-সদকাহ ও হজ্জ্ব।

তবে ক্বুরআন মজীদ এ দুটোর কোনোটাকেই নির্দিষ্ট করেনি, কেননা (আয়াতে ব্যবহৃত) আরবী ‘মা’ (যা) শব্দটি ‘আম’ তথা সার্বিক অর্থে প্রয়োগ করা হয়েছে, যা‘তে আমাদের সঞ্চিত/সংগৃহীত যাবতীয় বস্তু-ই অন্তর্ভুক্ত রয়েছে; অর্থাৎ, এটা পার্থিব ও পারলৌকিক উভয় জীবনের বেলাতেই প্রযোজ্য।

এই দুটো বিষয়কে মাথায় রেখে ওপরের আয়াতটিকে ব্যাখ্যা করা যেতে পারে এভাবে: ওহে মানবকুল! তোমরা জমি-জিরাত ও বাড়িঘর কিনে এ দুনিয়ার ধনসম্পদ আহরণ করলে কিংবা সোনা-রূপা জমিয়ে থাকলে সেটা আমার প্রিয়নবী (দ:)-এর ধরণীতলে শুভাগমনের প্রতি তোমাদেরই ব্যক্ত খুশির চেয়ে শ্রেষ্ঠতর নয়। আর যদি তোমরা পারলৌকিক জীবনে সাফল্য লাভের জন্যে নফল এবাদত-বন্দেগী ও রোযা পালনের মাধ্যমে সাধনা করো এ উদ্দেশ্যে যে তোমাদের নেকীর পাল্লা ভারী হবে, তাহলে এমন কি সেটাও প্রিয়নবী (দ:)-এর মীলাদ তথা ধরাধামে শুভাগমন উদযাপনের মাধ্যমে তোমাদের প্রদর্শিত কৃতজ্ঞতার চেয়ে শ্রেয়তর নয়; কেননা তোমরা তাঁর বেলাদত উপলক্ষে খুশি প্রকাশ না করলে তোমরা তোমাদের (যাবতীয়) নেক আমলের প্রতি সেগুলোর প্রাপ্য হক্ব/অধিকার আদায় করতে সক্ষম হবে না; এটা এ কারণে যে তাঁর ধরাধামে শুভাগমনের্ দরুন-ই প্রথমতঃ তোমরা ওই নেক আমলগুলো পেয়েছো। ক্বুরআন মজীদ ও প্রতিটি পুণ্যকর্ম, হোক তা নামায-রোযা ও দান-সদকাহ, কিংবা হোক তোমাদের ইসলাম ধর্ম ও ঈমানদারি, সবই তাঁর পবিত্র সত্তার বদৌলতে এসেছে।

হ্যাঁ, এ কথা সত্য যে এই তাবৎ বিষয়াদি যিনি মঞ্জুর করেছেন, তিনি স্বয়ং খোদাতা’লা; কিন্তু এসব প্রাপ্তির অসীলা তাঁরই প্রিয়নবী (দ:)। অতএব, যাঁর মাধ্যমে এসব আশীর্বাদ আমাদের প্রতি মঞ্জুর হয়েছে, সেই মহান সত্তার প্রতি খুশি প্রকাশ করা আল্লাহতা’লারই প্রতি শুকরিয়া আদায় করা ছাড়া কিছু নয়; আর এই (পুণ্যদায়ক) কাজটি অন্য সব কিছুর চেয়ে বেশি বেশি পালন করা উচিত।

৪.৬ খোদায়ী মহা অনুগ্রহের প্রতি কৃতজ্ঞতা প্রদর্শনের নিদর্শন-ই মওলিদুন্নবী (দ:)-এর উদযাপন

বিশ্বজগতের স্রষ্টা মহান আল্লাহতা’লা মানবজাতির প্রতি অসীম ও অবারিত ঐশী দান ও আশীর্বাদ মঞ্জুর করেছেন। তিনি আমাদেরকে খাদ্য, পানীয়, সৌন্দর্য ও সুখ-স্বাচ্ছন্দ্য দ্বারা আশীর্বাদধন্য করেছেন। রাত ও দিনের নিয়ম-ও তিনি আমাদের জন্যে জারি করেছেন। আমাদের আশপাশের দুনিয়াকে আমাদেরই কল্যাণে শাসন করার অনুমতি তিনি আমাদেরকে দিয়েছেন। তাঁর করুণা ও ক্ষমাশীলতা, এ গুণগুলোর কারণে তিনি মানুষকে আশরাফুল মাখলূক্বাত তথা সৃষ্টির সেরা জীবের মর্যাদা দান করেছেন; আর তিনি মানুষকে সর্বসেরা উপাদান ও আকৃতিতে গড়েছেন। তিনি আমাদেরকে পরিবার ও আত্মীয়তার সম্পর্ক-ও মঞ্জুর করেছেন। আমরা অবগত নই এমন নেয়ামত/আশীর্বাদ-ও বিদ্যমান; অথচ এতোসব সত্ত্বেও তিনি আমাদের প্রতি রহমত-বরকত বর্ষণের বিষয়ে কোনো রকম বড়াই করেননি। এটা এ কারণে যে, তিনি হলেন সবচেয়ে উদার; আর কেউ তাঁর প্রতি ঈমান আনুক বা না-ই আনুক, তথাপিও তিনি আমাদের প্রতি তাঁর রহমত-বরকত-নেয়ামত-আশীর্বাদ বর্ষণ করে চলেছেন। তিনি তা মঞ্জুর করছেন, কিন্তু সে ব্যাপারে দম্ভ করছেন না। তবে মানবজাতির জন্যে আল্লাহতা’লার এমন একটি আশীর্বাদ রয়েছে, তাঁর নেয়ামতগুলোর মধ্যে যেটা সম্পর্কে তিনি শুধু উল্লেখ করেই ক্ষান্ত হননি, বরঞ্চ তা স্মরণ-ও করেছেন এবং (আরবী) ‘লা’ম’‘ক্বাদ’ তাকিদসূচক শব্দ দুটো ব্যবহারের দ্বারা তাতে জোরও দিয়েছেন। আল্লাহতা’লা এরশাদ ফরমান:

“নিশ্চয় আল্লাহর মহান অনুগ্রহ হয়েছে ঈমানদার মুসলমানদের প্রতি এ মর্মে যে, তাদের মধ্যে তাদেরই মধ্য থেকে একজন রাসূল প্রেরণ করেছেন।” [আল-ক্বুরআন, ৩:১৬৪]

এই আয়াতে এ বিষয়টি স্পষ্ট যে আল্লাহতা’লা (যেন) বলছেন, “ওহে মানবকুল! এটা তোমাদের প্রতি আমার সেরা আশীর্বাদ যে আমি আমার সবচেয়ে প্রিয় সৃষ্টিকে তোমাদেরই মধ্য হতে আবির্ভূত (বেলাদত) করেছি। তাঁরই মাধ্যমে তোমাদের ভাগ্য ফিরেছে – পথভ্রষ্টতার অন্ধকার হতে তোমরা হেদায়াতের আলোতে এসে সম্মানিত হয়েছো। অতএব, তোমাদের জানা উচিত যে এর থেকে বড় নেয়ামত আর কখনোই হয়নি। আমার মাহবূব (দ:), যাঁর ওয়াস্তে (অথবা খাতিরে) সমগ্র সৃষ্টিজগত অস্তিত্বশীল হয়েছে, আমি যখন তাঁকে তোমাদের মাঝে প্রেরণ করেছি, তখন বিশ্বজগতের প্রভু হিসেবে তোমাদের প্রতি আমার এ আশীর্বাদকে স্মরণ করিয়ে দেয়াটা গুরুত্বপূর্ণ; যাতে তোমরা অকৃতজ্ঞ হয়ে আবার না ভাবো, এটা বুঝি অন্য যে কোনো ঐশী দানের মতোই আরেকটি নেয়ামত।”

এই আশীর্বাদকে স্মরণ করে উম্মতের স্বার্থের প্রতি  খেয়াল রাখা হয়েছে। আল্-ক্বুরআন প্রত্যেক একত্ববাদীর কাছে এ কথা স্পষ্ট করেছে যে আল্লাহতা’লার সর্বসেরা রহমতের ব্যাপারে তাদের নীরব থাকা উচিত নয়; বরঞ্চ উদযাপনের মাধ্যমে খুশি ও সুখ প্রকাশ করে এই আশীর্বাদের প্রতি তাদের কৃতজ্ঞতা জ্ঞাপন করা উচিত।

৪.৭ ঐশী করুণা ও আশীর্বাদের প্রতি কৃতজ্ঞতা প্রকাশ কেন জরুরি?

সর্বশক্তিমান আল্লাহতা’লা যে নেয়ামত/আশীর্বাদ বর্ষণ করেন, তার প্রতি কারো কৃতজ্ঞতা প্রকাশ করা গোলামি বা খেদমতগারির একটি চিহ্ন। ক্বুরআন মজীদে খোদায়ী রহমত-বরকতপ্রাপ্তির প্রতি শুকরিয়া আদায়ের প্রয়োজনীয়তা সংক্রান্ত আরেকটি হেকমত তথা সূক্ষ্ম জ্ঞান বর্ণিত হয়েছে। আল্লাহতা’লা এরশাদ ফরমান:

“যদি তোমরা কৃতজ্ঞ হও, তবে আমি তোমাদেরকে আরো অধিক (নেয়ামত) দেবো, এবং যদি অকৃতজ্ঞ হও, তবে আমার শাস্তি কঠোর।” [আল-ক্বুরআন, ১৪:৭]

ওপরে উল্লেখিত আয়াতে করীমা অনুযায়ী, খোদায়ী কোনো আশীর্বাদপ্রাপ্তিতে কৃতজ্ঞতা প্রকাশ করা আরো অধিক নেয়ামত লাভের মাধ্যমবিশেষ। অর্থাৎ, বান্দা শোকরগুজার তথা কৃতজ্ঞ হলে আল্লাহতা’লা আরো আশীর্বাদ বর্ষণ করেন। তবে অকৃতজ্ঞতা এমন-ই ঘৃণিত এক কর্ম যে, আল্লাহতা’লা এর দায়ে দুষ্ট কৃতঘ্ন ব্যক্তিকে চরম শাস্তি দেবেন বলে হুঁশিয়ারি উচ্চারণ করেছেন। এই কারণেই অন্যান্য ঐশী দানের যোগ্য হওয়ার খাতিরে মহানবী (দ:)-এর ধরাধামে শুভাগমনে আল্লাহতা’লার প্রতি কৃতজ্ঞতা প্রকাশ করা প্রত্যেকের জন্যে একান্তভাবে জরুরি।

৪.৮ কৃতজ্ঞতা প্রকাশের বিভিন্ন প্রচলিত পদ্ধতি

এই পরিচ্ছেদ শেষ করার আগে আমরা আল-ক্বুরআনের আলোকে আল্লাহতা’লার নেয়ামত/আশীর্বাদের প্রতি কৃতজ্ঞতা প্রকাশের বিভিন্ন পদ্ধতি বা পন্থা সংক্ষেপে আলোচনা করতে চাই। মহানবী (দ:)-এর বেলাদতের এ আশীর্বাদ লাভের প্রতি কৃতজ্ঞতা প্রকাশ নিম্নবর্ণিত যে কোনো উপায়ে করা সম্ভব:

৪.৮.১ খোদায়ী নেয়ামতের স্মরণ ও উল্লেখ (যিকর-তাযকেরা)

ক্বুরআন মজীদে বর্ণিত আল্লাহতা’লার প্রতি কৃতজ্ঞতা প্রকাশের একটি পদ্ধতি হচ্ছে তাঁরই নেয়ামতের স্মরণ। সূরা বাক্বারায় এরশাদ হয়েছে:

“হে এয়াক্বুবের বংশধরবৃন্দ! স্মরণ করো, আমার ওই অনুগ্রহকে যা আমি তোমাদের প্রতি করেছি। আর এটাও যে, আমি তোমাদেরকে তোমাদের যুগে সমগ্র বিশ্বের ওপর শ্রেষ্ঠত্ব দিয়েছি।” [আল-ক্বুরআন, ২:৪৭]

সূরা আলে এমরা’নে আল্লাহতা’লা মনুষ্যকুলকে সম্বোধন করে বলেন:

“এবং নিজেদের প্রতি আল্লাহর অনুগ্রহকে তোমরা স্মরণ করো, যখন তোমাদের মধ্যে শত্রুতা ছিলো, তিনি তোমাদের অন্তরগুলোতে সম্প্রীতি সৃষ্টি করে দিয়েছেন। সুতরাং তাঁরই অনুগ্রহক্রমে তোমরা পরস্পর ভ্রাতৃত্ব-বন্ধনে আবদ্ধ হয়ে গিয়েছো।” [আল-ক্বুরআন, ৩:১০৩; মুফতী আহমদ এয়ার খাঁন (রহ:) কৃত নূরুল এরফান]

রাসূলুল্লাহ (দ:)-এর পবিত্র বেলাদত/মীলাদ (ধরণীতলে আবির্ভাব), তাঁর সৌন্দর্য ও হায়াতে তাইয়্যেবা, গুণাবলী ও মো’জেযা (অলৌকিকত্ব) এবং তাঁরই অনুপম বৈশিষ্ট্যাবলীকে স্মরণ করা আল্লাহতা’লার প্রতি কৃতজ্ঞতা প্রকাশের একটি অন্যতম মাধ্যম। এই মহিমান্বিত আশীর্বাদকে স্মরণ করে আমরা কেবল নিজেদেরকেই লাভবান করছি; কেননা প্রিয়নবী (দ:)-এর যিকর-তাযকেরা সর্বদা-ই আল্লাহতা’লা কর্তৃক পালিত হচ্ছে। প্রতিটি মুহূর্তে পালিত মহানবী (দ:)-এর যিকর/স্মরণকে অনুরূপ স্মরণে অতিক্রান্ত পূর্ববর্তী মুহূর্তের চেয়ে অধিকতর মর্যাদা দেয়া হচ্ছে। আল্লাহতা’লা এরশাদ ফরমান:

“এবং নিশ্চয় পরবর্তী জীবন আপনার জন্যে পূর্ববর্তী জীবনের চেয়ে (মাহাত্ম্যে ও সম্মানে) উত্তম।” [আল-ক্বুরআন, ৯৩:৪]  

“এবং আমি আপনার জন্যে আপনার স্মরণকে (বিশ্বজগতের সর্বত্র ও পরকালে আমারই স্মরণের সাথে যুক্ত করে) সমুন্নত করেছি।” [আল-ক্বুরআন, ৯৪:৪]

এ থেকে আমরা দেখতে পাই যে মহানবী (দ:)-এর যিকর-তাযকেরা (স্মরণ) দ্বারা আমরাই লাভবান হচ্ছি, অন্য কারো লাভের জন্যে এটা নয়। তাঁর বেলাদত শরীফ উপলক্ষে আল্লাহতা’লার প্রতি কৃতজ্ঞতা প্রকাশ করা আমাদের পরকালীন জীবনের উন্নতিরই একটি অসীলা বা মাধ্যম। ইমাম আহমদ রেযা খাঁন সাহেব (১২৭২-১৩৪০ হিজরী) কী সুন্দর বলেছেন তাঁর কবিতায়:

‘ওয়া রাফা’না লাকা যিকরাক’-এর ছায়ায় আপনি আচ্ছাদিত,

কেননা, আপনারই (পবিত্র) বাণী ও স্মরণকে করা হয়েছে উন্নীত। [ইমাম আহমদ রেযা খাঁন রচিত ‘হাদা’য়েক্বে বখশিশ’, ১:১৮]

৪.৮.২ এবাদত ও বন্দেগী

আল্লাহতা’লার এবাদত ও বন্দেগী/গোলামি করাও (তাঁর প্রতি) কৃতজ্ঞতা প্রকাশের একটি মাধ্যম। এরকম কৃতজ্ঞতা প্রকাশের সেরা মাধ্যমগুলোর মধ্যে কয়েকটি হলো, নামায, রোযা, হজ্জ্ব ও (গরিবের) প্রাপ্য যাকাত।

কৃতজ্ঞতা প্রকাশের পন্থা হিসেবে গরিব-দুঃস্থকে দান-সদকাহ করা এবং এতিম ও অভাবীদের দেখ-ভাল করাও প্রশংসনীয় আমল হিসেবে পরিগণিত।

৪.৮.৩ প্রাপ্ত আশীর্বাদের ঘোষণা প্রদান

কৃতজ্ঞতা প্রকাশের আরেকটি পন্থা হলো আল্লাহতা’লা কর্তৃক আমাদের প্রতি বর্ষিত আশীর্বাদের ব্যাপারে খুশি প্রকাশ করে তার বেশি বেশি উল্লেখ করা এবং অন্যদেরকেও তা জানানো। ক্বুরআন মজীদে এরশাদ হয়েছে:

“এবং আপন রব্বের নেআমতের খুব চর্চা করুন।” [আল-ক্বুরআন, ৯৩:১১]    

পূর্ববর্তী পৃষ্ঠায় আল্লাহতা’লার নেয়ামত স্মরণ করার পক্ষে একটি আদেশ জারি করা হয়েছিল; অর্থাৎ, নেয়ামত অন্তরে স্মরণ করতে হবে এবং জিহ্বা দ্বারা ঘোষণা/উল্লেখ করতে হবে। তবে এই স্মরণটি অন্য কারো জন্যে ছিল না, বরং স্রেফ আল্লাহতা’লার জন্যে ছিল। কিন্তু উপরোক্ত আয়াতে করীমায় নেয়ামতটি ঘোষণা করার আদেশ দেয়া হয়েছে, যার মানে তা অন্যদেরও জানানো উচিত। অতএব, এই দুইয়ের (স্মরণ ও আশীর্বাদের ঘোষণার) মধ্যকার মৌলিক পার্থক্য হলো এই যে, পূর্ববর্তীটি স্রেফ আল্লাহর সাথে সম্পর্কিত, অপরদিকে পরবর্তীটি সৃষ্টিকুলের সাথে সম্পর্কিত। উদাহরণস্বরূপ, আল্লাহতা’লা এরশাদ ফরমান:

“সুতরাং আমার স্মরণ করো, আমিও তোমাদের চর্চা করবো। আর আমার কৃতজ্ঞতা স্বীকার করো এবং আমার প্রতি অকৃতজ্ঞ হয়ো না।” [আল-ক্বুরআন, ২:১৫২]

এখানে স্মরণ করার সহজ মানে হচ্ছে আল্লাহতা’লাকে স্মরণ করা উচিত; অপরদিকে স্বীকার/ঘোষণা করার মানে কিন্তু স্রেফ স্মরণ নয়, বরং তা এমনভাবে প্রকাশ করা যা’তে সৃষ্টিকুল-ও এ সম্পর্কে সচেতন হয়; আর এই ঐশী আজ্ঞার আওতায় যাতে যতো বেশি সংখ্যক মানুষকে সম্ভব আনা যায়।

’নেয়ামতের ঘোষণা’ প্রদানের সবচেয়ে বড় হেকমত তথা ঐশী জ্ঞান-প্রজ্ঞা হলো, অন্যরাও এব্যাপারে সচেতন হয়ে ওঠে। ফলে পূর্ববর্তীটির সাথে পরবর্তীটির আরেকটি পার্থক্য এই যে, পূর্ববর্তীটি একাকী পালন করা যায়; পক্ষান্তরে পরবর্তীটির জন্যে ধর্মীয় সভা-সমাবেশের প্রয়োজন হয়। বস্তুতঃ এই প্রকাশ্য নেয়ামতের শোকরগুজারি (তথা কৃতজ্ঞতা প্রকাশ) করার জন্যে বড় বড় সভা-সমাবেশের আয়োজন করা উচিত, যাতে যতো বেশি সম্ভব মানুষকে এর সাথে সম্পৃক্ত করা যায়।

৪.৮.৩.১ এই আশীর্বাদের ঘোষণা আমরা কীভাবে দেবো?

প্রিয়নবী (দ:)-এর বেলাদত তথা ধরাধামে শুভাগমনের মতো এমন মহা আশীর্বাদপ্রাপ্তি উপলক্ষে তাঁর উম্মতের দ্বারা তা ঘোষণা করার দায়িত্ব পালন একটি লক্ষণীয় বিষয়। মহানবী (দ:), তাঁর গুণাবলী ও মহৎ চরিত্র, তাঁর শুভাগমন, সৌন্দর্য ও সদাচারের প্রশংসাসূচক কবিতা আবৃত্তি এবং তাঁর প্রতি সালাত-সালাম পাঠের মাধ্যমেই এটা করা হয়ে থাকে। আর এগুলোর সবই “এবং আপন রব্বের নেআমতের খুব চর্চা করুন” (৯৩:১১) – আয়াতটির তাফসীরের আওতায় পড়ে; উপরন্তু, এই নেয়ামত/আশীর্বাদকে স্মরণ করার আরো অনেক পন্থা বিদ্যমান। কেউ যদি একটু চিন্তা করতেন, তাহলে উপলব্ধি করতে পারতেন যে মওলিদুন্নবী (দ:)-এর সমস্ত সভা-সমাবেশ/মাহফিল-ই সাধারণভাবে এরকম (যিকর তথা স্মরণের) বিষয়, আর এসব মাহফিলে এগুলো (বিশেষ) তাৎপর্য বহন করে।

মনে প্রশ্ন দেখা দিতে পারে: রাসূলুল্লাহ (দ:)-এর মওলিদ শরীফ আমরা কীভাবে পালন করবো? তাঁর যিকর-তাযকেরা’র সীমারেখা-ই বা কতোটুকু? তাঁর প্রশংসা ও গুণের বন্দনা আমাদের কীভাবে করা উচিত? এসব প্রশ্নের উত্তর স্পষ্টভাবে ব্যাখ্যা করা হয়েছে তাঁরই শানে রচিত ইমাম শরফউদ্দীন বুসীরী (৬০৮-৬৯৬ হিজরী)-এর কাব্যে:

“খৃষ্টানবর্গ তাদের পয়গম্বর সম্পর্কে যে (খোদায়ী) দাবি করেছে, তা ছাড়ো,

অতঃপর মহানবী (দ:)-এর শানে যেমনে চাও, উত্তম পন্থায় প্রশংসা করো,

তাঁর সত্তা মোবারকের প্রতি যে সম্মান ও মাহাত্ম্য দিতে চাও, করো তেমনে বন্দনা,

কারণ রাসূলুল্লাহ (দ:)-এর শ্রেষ্ঠত্ব সীমাহীন, কারো মুখে করা সম্ভব নয় তা বর্ণনা।”   

ওপরের এই কবিতার ভিত্তিতে প্রিয়নবী (দ:)-এর শানে যতো কবিতা আবৃত্তি করা হয়, সবগুলোই প্রশংসনীয় বলে সাব্যস্ত হবে – যতোক্ষণ তা সর্বশক্তিমান আল্লাহতা’লা ও তাঁর রাসূল (দ:)-এর মধ্যে পার্থক্য বজায় রাখবে। (অর্থাৎ, আল্লাহতা’লা স্রষ্টা এবং রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম হলেন তাঁরই সৃষ্ট বান্দা, এটা ঈমানের একটা শর্ত)।

৪.৮.৪ ঈদ-উৎসব হিসেবে পালন   

খোদাতা’লার আশীর্বাদকে স্মরণ ও উল্লেখ করার পাশাপাশি তাঁর প্রতি আপন কৃতজ্ঞতা প্রকাশ ও তা প্রদর্শনের আরেকটি মাধ্যম হলো ঈদ উদযাপন করে খুশি প্রকাশ। পূর্ববর্তী জাতিগুলোও এভাবে নিজেদের কৃতজ্ঞতা জানিয়েছিল (ইতিপূর্বে আলোচনা করা হয়েছে)। আর এটা পয়গম্বর (আ:)-বৃন্দেরও আচরিত প্রথা, যাঁরা এ রকম বিশেষ আশীর্বাদ অবতীর্ণ হওয়ার দিনগুলোকে ঈদ হিসেবে গ্রহণ করতেন। পয়গম্বর ঈসা (আ:) সর্বশক্তিমান আল্লাহতা’লার কাছে আরয করেন:

“হে আল্লাহ, হে আমাদের রব্ব! আমাদের প্রতি আকাশ থেকে (আশীর্বাদস্বরূপ) একটা ‘খাদ্য-ভর্তি খাঞ্চা’ অবতীর্ণ করুন, যা (অবতরণের দিন হিসেবে) আমাদের জন্যে ঈদ হবে – আমাদের পূর্ববর্তী ও পরবর্তীদের জন্যে এবং তা (মানে খাদ্য-খাঞ্চা) হবে আপনার কাছ থেকে এক নিদর্শন।” [আল-ক্বুরআন, ৫:১১৪; মুফতী আহমদ এয়ার খাঁন কৃত ‘নূরুল এরফান’]

এখানে স্মর্তব্য যে, খাদ্য-খাঞ্চার মতো এ রকম একটি সময়গত বা সময়সীমায় আবদ্ধ আশীর্বাদপ্রাপ্তি সত্ত্বেও পয়গম্বর ঈসা (আ:) এটাকে ঈদ হিসেবে উল্লেখ করেছেন। আরো কৌতূহলোদ্দীপক ব্যাপার হচ্ছে এই যে, খৃষ্টান সমাজ অদ্যাবধি কৃতজ্ঞতাস্বরূপ এই আশীর্বাদপ্রাপ্তির দিবস রোববারকে সম্মান প্রদর্শন করে থাকেন।

আমাদের প্রিয়নবী (দ:) যিনি সকল সৃষ্টির সেরা, তাঁকে রাসূল হিসেবে জগতে প্রেরণের সাথে একটি খাদ্য-খাঞ্চাপ্রাপ্তি কীভাবে তুলনীয় হতে পারে? খাদ্য-খাঞ্চা ছিল একটি ক্ষণস্থায়ী নেয়ামত, আর মহানবী (দ:)-এর ধরাধামে শুভাগমন একটি চিরস্থায়ী নেয়ামত/আশীর্বাদ। রহমতুললিল্ আলামীন তথা বিশ্বজগতের জন্যে খোদার করুণা প্রিয়নবী (দ:) হলেন চিরকালের জন্যে এক আশীর্বাদ; তা ইহকাল ও পরকাল উভয় ক্ষেত্রেই প্রযোজ্য। অতএব, এ দুই আশীর্বাদের মধ্যে তুলনা কীভাবে চলতে পারে? একটু জিরিয়ে নিচের প্রশ্নটি নিজেদের প্রতি পেশ করলে তা আমাদের চিন্তার খোরাক হবে: আমরা কি এই নেয়ামতের প্রতি এর প্রাপ্য কৃতজ্ঞতা প্রদর্শন করতে পেরেছি?

মূল বিবেচ্য বিষয় হলো মহানবী (দ:)-এর আশীর্বাদপূর্ণ বেলাদত তথা ধরণীতলে শুভাগমনের সাথে খাদ্য-খাঞ্চার তুলনা না করা। আমাদের মনোযোগ পাওয়ার যোগ্য ঐতিহাসিক বাস্তবতাকে (সবার সামনে) তুলে ধরাই এখানে গুরুত্বপূর্ণ। খৃষ্টান জাতি ঘনঘন প্রতি রোববার তাদের কৃতজ্ঞতা প্রকাশ করে থাকেন, যেহেতু এই দিনেই খাদ্য-খাঞ্চাটি তাদের প্রতি অবতীর্ণ হয়েছিল। আল-ক্বুরআনে উল্লেখিত খাদ্য-খাঞ্চার মতো নানা নেয়ামত লাভ করে পূর্ববর্তী জাতিগুলো আল্লাহতা’লার রেযামন্দি তথা সন্তুষ্টি অনুযায়ী এবং তাদের পয়গম্বর (আ:)-বৃন্দের আচরিত সুন্নাহ তথা রীতির সাথে সঙ্গতি রেখে খুশি উদযাপন করতো। সুতরাং আম্বিয়া (আ:)-মণ্ডলী যদি কোনো সামগ্রিক আশীর্বাদপ্রাপ্তির দিনকে ঈদ হিসেবে গ্রহণ করতে পারেন, তাহলে মওলিদুন্নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহে ওয়া সাল্লামকে ঈদ উদযাপন হিসেবে গ্রহণ করার মধ্যে কী-ই বা ভুল হওয়ার সম্ভাবনা থাকতে পারে? রাসূলুল্লাহ (দ:)-এর এ ধরায় শুভাগমন এমনই এক মহা আশীর্বাদ, যার সূত্রে আমরা অন্যান্য সব আশীর্বাদ লাভ করেছি। এমতা্বস্থায় আমাদের প্রিয়নবী (দ:)-এর বেলাদতে আমরা কেন খুশি প্রকাশ করতে পারবো না?

এই অধ্যায়ে প্রদত্ত বিস্তারিত বিবরণ দ্বারা এ কথা নিজে থেকেই স্পষ্ট যে মওলিদুন্নবী (দ:)-এর উদযাপন আল-ক্বুরআন দ্বারা প্রতিষ্ঠিত (সাবেত)। এর প্রতি কোনো রকম আপত্তি উত্থাপন ক্বুরআনী শিক্ষায় নিজের অজ্ঞতাই প্রকাশ করবে। এই বিষয়ের বৈধতার ব্যাপারে মতভেদ না করে এবং একে বিতর্কের বিষয় না বানিয়ে মহানবী (দ:)-এর বেলাদত শরীফের প্রতি স্রেফ খুশি প্রকাশ করা এবং এরই ফলশ্রুতিতে আল্লাহর নেয়ামতের ভাগিদার হওয়া প্রত্যেকের জন্যে বিহিত কর্তব্য-কর্ম।

পঞ্চম অধ্যায়

মওলিদুন্নবী (দ:)-এর সমর্থনে হাদীসের দলিল

পূর্ববর্তী অধ্যায়ে আল্-ক্বুরআন ও এর তাফসীরের আলোকে মওলিদুন্নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহে ওয়া সাল্লামের অনুমতি ও উদযাপন সংক্রান্ত একটি বিস্তারিত আলোচনা পেশ করা হয়েছে। এই অধ্যায়ে এর অনুমতি/বৈধতা হাদীস দ্বারা প্রমাণ করা হবে: সবচেয়ে সদয় ও করুণাশীল পয়গম্বর হযরত মুহাম্মদ সাল্লাল্লাহু আলাইহে ওয়া সাল্লামের আশীর্বাদপূর্ণ বেলাদত তথা ধরণীতলে শুভাগমনের প্রতি খুশি ও সুখ-শান্তি প্রকাশ করার শরঈ বৈধতার একটি বিশ্লেষণ এতে উপস্থাপন করা হবে।

৫.১ ‘এয়াওমে আশুরা’ (মহররমের ১০ তারিখ) পালনের দলিল

সবচেয়ে সম্মানিত পয়গম্বর হযরত মুহাম্মদ সাল্লাল্লাহু আলাইহে ওয়া সাল্লাম হলেন আল্লাহতা’লার ফযল (অনুগ্রহ) ও রাহমা (করুণা); মানবজাতির প্রতি তিনি-ই আল্লাহ পাকের সর্বশ্রেষ্ঠ দয়াশীলতার নিদর্শন। তাই সেরা এই আশীর্বাদের জন্যে আল্লাহর প্রতি কৃতজ্ঞতা প্রকাশ করা এ উম্মতের জন্যে এক বাধ্যবাধকতা বটে। সর্বশক্তিমান আল্লাহ পাক তাদেরকেই ভালোবাসেন, যারা তাঁর প্রতি কৃতজ্ঞ, আর পালিত এ রীতিটি পয়গম্বর (আলাইহিমুস্ সালাম)-বৃন্দের সুন্নাহ-ও।

কৃতজ্ঞতা প্রকাশের বহু পন্থা রয়েছে: ব্যক্তিগত পর্যায়ে কেউ আল্লাহর প্রতি কৃতজ্ঞতা প্রকাশ করতে পারেন নফল এবাদত-বন্দেগী ও দান-সদকাহ করে; কিন্তু সম্প্রদায়গত পর্যায়ে, যেখানে (আল্লাহর) কোনো নেয়ামত একটি জাতির প্রতি বর্ষিত হয়েছে, সেখানে সামষ্টিকভাবে কৃতজ্ঞতা প্রকাশ করা উচিত। যেহেতু প্রিয়নবী (দ:)-এর বেলাদত শরীফ ও রাসূল হিসেবে তাঁর প্রেরণ সমগ্র মানবজাতির উদ্দেশ্যেই হয়েছে, সেহেতু এই ব্যাপক আকারের আশীর্বাদের প্রতি কৃতজ্ঞতা প্রকাশ সমষ্টিগত পর্যায়ে করাটা একান্ত জরুরি। আর সম্প্রদায়গত প্রকৃতির যে কোনো কাজ, সেই সমাজের সংস্কৃতি ও ঐতিহ্যের ভিত্তিতেই হবে।

মহানবী (দ:)-এর মীলাদ দিবস সংস্কৃতিগত ভিত্তিতে উদযাপন করা হয়, ঈদ উৎসবের মতোই। এই শুভক্ষণ পালন পূর্ববর্তী জাতিগুলোর আচরিত কৃতজ্ঞতা প্রকাশের আমলের ওপর দৃঢ় প্রতিষ্ঠিত এবং তা প্রমাণিত-ও। নিম্নে ‘এয়াওমে আশূরা’-সম্পর্কিত হাদীসগুলো বর্ণনা করা হলো, যেগুলো মওলিদুন্নবী (দ:) উদযাপনের বৈধতা বা অনুমতি প্রমাণের পক্ষে ব্যবহার করা হয়ে থাকে।

৫.১.১ পয়গম্বর মূসা (আ:)-এর দিবসটি উদযাপন

’এয়াওমে আশূরা’ (আশূরা দিবস) হচ্ছে সেই দিনটি, যেদিন ফেরাউনের বিরুদ্ধে পয়গম্বর মূসা আলাইহিস সালামকে বিজয় দান করা হয়েছিল। এ দিনটিতেই বনূ ইসরাঈল জাতিকে ফেরাউনের জুলুম-অত্যাচার ও নিপীড়ন হতে মুক্তি দেয়া হয়েছিল। তাই এটা ছিল হযরত মূসা (আ:)-এর বিজয় দিবস এবং বনূ ইসরাঈলের মুক্তি দিবস। কৃতজ্ঞতাস্বরূপ এই দিনে পয়গম্বর মূসা (আ:) রোযা রাখতেন।

মহানবী (দ:) যখন মদীনা মোনাওয়ারায় হিজরত করেন, তখন তিনি দেখতে পান সেখানকার ইহুদীরা ওই দিনটিতে রোযা পালন করছেন। তিনি এ ব্যাপারে জিজ্ঞেস করলে তারা জবাবে তাঁকে ওপরে প্রদত্ত তথ্য প্রদান করেন। এ কথা শুনে প্রিয়নবী (দ:) উত্তর দেন, “তোমাদের চেয়ে হযরত মূসা (আ:)-এর ওপর আমার (পয়গম্বর হিসেবে) আরো বড় হক্ক/অধিকার রয়েছে।” এরই ফলশ্রুতিতে পয়গম্বর মূসা (আ:)-এর প্রতি বর্ষিত খোদাতা’লার নেয়ামতের প্রতি কৃতজ্ঞতা প্রকাশের নিদর্শনস্বরূপ প্রিয়নবী (দ:) ওই দিন রোযা রাখেন এবং তাঁর সকল মহান সাহাবা-এ-কেরাম (রা:)-কেও রোযা রাখার নির্দেশ প্রদান করেন। ’এয়াওমে আশূরা’র রোযার পক্ষে নিচে কিছু হাদীস পেশ করা হলো:

/ – হযরত আবদুল্লাহ ইবনে আব্বাস (রা:) বর্ণনা করেন: রাসূলুল্লাহ (দ:) মদীনায় এলে দেখতে পান ইহুদীরা রোযা পালন করছেন। তিনি জিজ্ঞেস করেন, “এটা কী?” তারা জবাব দেন, “এটা আশীর্বাদধন্য এক দিবস; এমনই এক দিন, যখন আল্লাহতা’লা বনূ ইসরাঈল জাতিকে তাদের শত্রু হতে রক্ষা করেন। এই দিনটিতে তাই পয়গম্বর মূসা (আ:) রোযা রেখেছিলেন।” (এতদশ্রবণে) মহানবী (দ:) বলেন, “তোমাদের চেয়ে হযরত মূসা (আ:)-এর ওপর আমার (পয়গম্বর হিসেবে) আরো বড় হক্ক/অধিকার রয়েছে।” অতঃপর তিনি ওই দিনটিতে রোযা রাখেন, আর (সবাইকে) রোযা রাখতে নির্দেশ দেন। [আল-বুখারী বর্ণিত ‘সহীহ’: কিতাব আল-সওম (রোযা-বিষয়ক বই), ‘এয়াওমে আশূরার রোযা’ অধ্যায়, ২:৭০৪ #১৯০০; আহমদ ইবনে হাম্বল প্রণীত ‘মুসনাদ’. ১:২৯১ #২৬৪৪; আবূ এয়ালা কৃত ‘মুসনাদ’, ৪:৪৪১ #২৫৬৭; এবং ইবনে কাসীর রচিত ‘তাফসীর আল-ক্বুরআন আল-আযীম’, ১:৯২]  

/ – হাদীস শরীফের আরেকটি এসনাদে হযরত আবদুল্লাহ ইবনে আব্বাস (রা:) বর্ণনা করেন: “রাসূলুল্লাহ (দ:) মদীনায় গমন করলে তিনি ইহুদীদেরকে ‘এয়াওমে আশূরা’র দিনে রোযা রাখতে দেখেন। তাদেরকে এ ব্যাপারে জিজ্ঞেস করা হলে তারা জবাব দেন, ‘এই দিনে আল্লাহতা’লা পয়গম্বর মূসা (আ:) ও বনূ ইসরাঈলকে ফেরাউনের ওপর বিজয় দেন। তাই আমরা দিনটির সম্মানার্থে রোযা রেখে থাকি।’ এমতাবস্থায় মহানবী (দ:) বলেন, ‘মূসা (আ:)-এর ওপর তোমাদের চেয়ে আমাদের হক্ক আরো বেশি।’ অতঃপর তিনি এই দিনে রোযা রাখার আদেশ দান করেন।” [আল-বুখারী বর্ণিত ‘সহীহ’: ’কিতা’ব আল-ফাদা’ইল আল-সাহা’বা’ (সাহাবাবৃন্দের গুণাবলী সংক্রান্ত বই), ‘মহানবী (দ:)-এর মদীনায় আগমন উপলক্ষে ইহুদীদের দ্বারা সাক্ষাৎপ্রার্থী হওয়া’ শীর্ষক অধ্যায়, ৩:১৪৩৪ #৩৭২৭; সহীহ মুসলিম: ‘কিতা’ব আল-সিয়্যা’ম’ (রোযা বিষয়ক বই), ‘আশূরা দিবসের রোযা’ শীর্ষক অধ্যায়, ২:৭৯৫ #১১৩০; এবং আবূ দাউদ কৃত ‘সুনান’: ‘কিতা’ব আল-সওম’ (রোযা বিষয়ক বই), ‘আশূরা দিবসের রোযা’ শীর্ষক অধ্যায়, ২:৩২৬ #২৪৪৪]    

/ – হাদীসের আরেকটি বর্ণনায় ইহুদীদের উত্তর ও প্রিয়নবী (দ:)-এর আদেশ নিম্নবর্ণিতভাবে বিধৃত হয়েছে: ইহুদীরা উত্তর দেয়, ‘এটা মহান দিবস। এই দিনে আল্লাহতা’লা মূসা (আ:) ও তাঁর জাতিকে মুক্তি দেন এবং ফেরাউন ও তার লোকদেরকে পানিতে ডুবিয়ে দেন। তাই এ দিনে পয়গম্বর মূসা (আ:) কৃতজ্ঞতাস্বরূপ রোযা রাখেন, আর আমরাও তা পালন করি।’ এমতাবস্থায় (খোদায়ী) আশীর্বাদধন্য মহানবী (দ:) বলেন, ‘পয়গম্বর মূসা (আ:)-এর প্রতি আমাদের হক্ক (অধিকার) তোমাদের চেয়ে বেশি।’ অতঃপর তিনি ওই দিন রোযা রাখেন এবং রোযা রাখতে আদেশ করেন। [সহীহ মুসলিম: ‘কিতা’ব আল-সিয়া’ম’ (রোযা-সম্পর্কিত পুস্তক), ’এয়াওমে আশূরা দিবসের রোযা’ শীর্ষক অধ্যায়, ২:৭৯৬ #১১৩০; সহীহ বুখারী: ‘কিতা’ব আল-আম্বিয়া’ (পয়গম্বরবৃন্দ সংক্রান্ত পুস্তক), ‘আল্লাহর বাণী: মূসা (আ:)-এর সংবাদ পৌঁছেছে কি?’ শীর্ষক অধ্যায়, ৩:১২৪৪ #৩২১৬; ইবনে মা’জাহ কৃত আল-সুনান: ‘কিতা’ব আল-সিয়া’ম’ (রোযা-বিষয়ক পুস্তক), ‘এয়াওমে আশূরা’র রোযা’ শীর্ষক অধ্যায়, ১:৫৫২ #১৭৩৪; আহমদ ইবনে হাম্বল প্রণীত ‘আল-মুসনাদ’, ১:৩৩৬ #৩১১২]

ওপরে উল্লেখিত হাদীসগুলো হতে বোঝা যায়, বনূ ইসরাঈল জাতি ফেরাউনের অত্যাচার-নির্যাতনের শিকার হয়েছিলেন, যার দরুন তাদের নিজেদের ধর্ম পালন করা কঠিন হয়ে দাঁড়িয়েছিল। তবে পয়গম্বর মূসা (আ:)-এর অধ্যবসায়ে অবশেষে সেদিনের উদয় হয়, যেদিনটিতে বনূ ইসরাঈল দাসত্বশৃঙ্খল হতে মুক্তি পেতে সক্ষম হন, এবং যার ফলশ্রুতিতে ফেরাউন ও তার সেনাবাহিনী নিশ্চিহ্ন হয়ে যায়। এই উপায়ে বনূ ইসরাঈল সম্প্রদায় জুলুম-নিপীড়ন হতে মুক্তি লাভ করেন এবং আল্লাহতা’লা কর্তৃক বিজয় লাভের আশীর্বাদ দ্বারা ধন্য হন। ফলে পয়গম্বর মূসা (আ:) কৃতজ্ঞতা প্রকাশের মাধ্যম হিসেবে ওই দিন রোযা রাখেন, আর ইসরাঈল বংশ-ও রোযা রেখে দিনটিকে পালন করেন; আর অদ্যাবধিও এই দিনটি মুক্তি ও স্বাধীনতার দিবস হিসেবে উদযাপিত হচ্ছে। প্রিয়নবী (দ:)-ও পয়গম্বর মূসা (আ:)-এর সাথে তাঁর সংশ্লিষ্টতার সূত্রে এই দিনটিতে রোযা রেখে এর প্রতি সম্মান প্রদর্শন করেন, আর তিনি মুসলমানদেরকেও তা পালনের নির্দেশ দেন। ইমাম তাহাবী (২২৯-৩২১ হিজরী) বিবৃত করেন, রাসূলুল্লাহ (দ:) ফেরাউনের ওপর পয়গম্বর মূসা (আ:)-কে আধিপত্য বিস্তার করতে দেয়ার কা্রণে আল্লাহতা’লার প্রতি কৃতজ্ঞতা প্রকাশের উদ্দেশ্যেই যে রোযা রেখেছিলেন, তা (এ দলিলে) সুস্পষ্ট। [আল-তাহাবী প্রণীত ‘শরহে মা’আনী আল-আসা’র’: ‘কিতা’ব আল-সওম’ (রোযা সংক্রান্ত পুস্তক), ‘আশূরা দিবসের রোযা’ শীর্ষক অধ্যায়, ২:১৩২ #৩২০৯]

এখানে একটি গুরুত্বপূর্ণ বিষয় লক্ষণীয় যে, ইহুদী জাতিগোষ্ঠী যদি তাদের পয়গম্বরের (আ:) প্রাপ্ত বিজয় ও মুক্তির দিনটি উদযাপন করতে পারেন, তাহলে মুসলমান জাতি কেন তাঁদের প্রিয়নবী (দ:)-এর বেলাদত তথা ধরণীতলে শুভাগমন দিবসটির প্রতি সম্মান প্রদর্শন করতে পারবেন না? পুতঃপবিত্র রাসূলুল্লাহ (দ:) যিনি আম্বিয়াকুল প্রধান, তাঁকে মানুষের মাঝে প্রেরণ করা হয় আল্লাহতা’লার অনুগ্রহ ও করুণা হিসেবে; তাঁরই মাধ্যমে মানব সভ্যতা অসাম্য ও অন্যায়ের নাগপাশ হতে মুক্তি লাভ করে। আল্লাহতা’লা এরশাদ ফরমান:

“(রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহে ওয়া সাল্লাম) তাদের ওপর থেকে ওই কঠিন কষ্টের বোঝা ও গলার শৃঙ্খল যা তাদের ওপর ছিল (নিজেদের অবাধ্যতাহেতু), তা নামিয়ে অপসারিত করবেন (মানে মুক্তি দ্বারা আশীর্বাদধন্য করবেন)।” [আল-ক্বুরআন, ৭:১৫৭; মুফতী আহমদ এয়ার খাঁন সাহেব কৃত ‘নূরুল এরফান’]

সবচেয়ে দয়াবান পয়গম্বর (দ:)-এর ধরাধামে শুভাগমন ছিল এমন-ই এক অসীলা, যা দ্বারা মানবজাতি অন্যায়-অবিচার হতে মুক্তি লাভ করে। তাঁর বেলাদত ছিল এমন-ই এক শুভক্ষণ, যা’তে গোটা সৃষ্টিকুল এর উদযাপনে জড়িত হয়ে পড়ে। একজন ঈমানদারের জন্যে এটা তাঁর জীবনের সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ সুখের বিষয়; এটা উম্মতের প্রতি আল্লাহতা’লার সবচেয়ে বড় অনুগ্রহ-ও বটে। এই দিনটি (আমাদের) সমস্ত শ্রদ্ধা ও মর্যাদা পাওয়ার যোগ্য, আর এরই বিপরীতে আমাদেরকেও কৃতজ্ঞতার মূর্তপ্রকাশ হওয়া বাঞ্ছনীয়। এই দিনটিকে হৃদয়-জুড়ে ভালোবাসা ও ভক্তিসহকারে এর প্রাপ্য সম্মান দেয়ার উদ্দেশ্যে সম্ভাব্য সর্ব প্রকারের অনুমতিপ্রাপ্ত পন্থা অবলম্বন করা একান্তভাবে উচিত।

৫.১.২ মহানবী (দ:) কর্তৃক ওই দিবসটি পালন মূসা (আ:)-এর সাথে তাঁর সংশ্লিষ্টতার কারণেই

ওপরে উদ্ধৃত হাদীসগুলো থেকে আরেকটি বিষয়ে সিদ্ধান্ত নেয়া যায় এই মর্মে যে, প্রিয়নবী (দ:) ‘আশূরা দিবস’কে স্মরণার্থে উদযাপন করেছিলেন পয়গম্বর মূসা (আ:)-এর সাথে তাঁর (আত্মিক) সংশ্লিষ্টতার খাতিরে। এর থেকে আমরা শিক্ষা গ্রহণ করতে পারি যে কোনো (ধর্মীয়) তাৎপর্যপূর্ণ দিনকে স্মরণার্থে উদযাপন করাটা আপনাআপনি-ই মনোনীত পয়গম্বর সাল্লাল্লাহু আলাইহে ওয়া সাল্লামের সুন্নাহ (রীতিনীতি)। একজন ঈমানদারের কাছে রাসূলুল্লাহ (দ:)-এর বেলাদত দিবস (ঈদে মীলাদুন্নবী)-এর চেয়ে বেশি তাৎপর্যপূর্ণ দিন আর কোনটি হতে পারে? অতএব, ঈদে মীলাদুন্নবী দিবস (দ:) উদযাপন করা সুন্নাতেরই আওতায় পড়ে, আর তা পালন করে মুসলমান সাধারণ মনোনীত পয়গম্বর সাল্লাল্লাহু আলাইহে ওয়া সাল্লামেরই পদাঙ্ক অনুসরণ করে থাকেন।

৫.১.৩ ইহুদীদের ‘এয়াওমে আশুরা’কে ঈদ উৎসব হিসেবে পালন      

কিছু কিছু মানুষের মনে এই আপত্তি দেখা দিতে পারে যে ইহুদী জাতি তাদের স্বাধীনতা দিবস ‘এয়াওমে আশূরা’কে রোযা রেখে স্মরণ করতেন, অথচ মওলিদুন্নবী (দ:)-কে অপর দিকে ঈদ হিসেবে উদযাপন করা হয়; কেননা এই দিনে কেউই তো রোযা রাখেন না।

এই আপত্তির জবাব হলো, কোনো আশীর্বাদের উপলক্ষকে খুশির দিন হিসেবে উদযাপন করা প্রিয়নবী (দ:)-এর সুন্নাহ। যতোক্ষণ তা শরীয়তের নির্ধারিত সীমারেখার মধ্যে থাকবে, ততোক্ষণ তা যে কোনো উপায়ে বা পন্থায় উদযাপন করা যাবে। ইহুদী জাতির আশূরা দিবসে রোযা রাখার মানে এই নয় যে অন্যান্য সব পন্থায় কৃতজ্ঞতা প্রকাশের বাস্তবতা এতে নাকচ হয়ে যাবে, কেননা কৃতজ্ঞতা প্রকাশ স্রেফ রোযা পালনের মধ্যেই সীমাবদ্ধ নয়। উপরন্তু, কৃতজ্ঞতা প্রকাশের একমাত্র মাধ্যম রোযা রাখা মর্মে ওপরোক্ত সিদ্ধান্তটি এসব উৎস (মানে দলিল) হতে গ্রহণ করা যায় না। বাস্তবতা হচ্ছে ইহুদী জাতি খুশির এই উপলক্ষে অতিরিক্ত পুণ্যদায়ক কর্মের অনুশীলনী (তথা আমল) হিসেবেই রোযা রাখতেন।

ইসলাম-পূর্ববর্তী যুগে আরবদের মাঝেও ‘এয়াওমে আশূরা’ উদযাপিত হতো, কিন্তু তাদের উদযাপনের উদ্দেশ্য ছিল ভিন্ন; এই বিষয়টি পরে ব্যাখ্যা করা হবে। প্রিয়নবী (দ:) যখন মদীনা মোনাওয়ারায় বসবাস আরম্ভ করেন, তখন তিনি দেখতে পান ইহুদীরা ‘এয়াওমে আশূরা’য় রোযা রাখার পাশাপাশি দিনটিকে ঈদ হিসেবেও উদযাপন করছেন। এটা নিচের হাদীসটি দ্বারা সপ্রমাণিত:

/ – ইমাম আল-বুখারী (১৯৪-২৫৬ হিজরী) বর্ণনা করেন হযরত আবূ মূসা আল-আশআরী (রা:) হতে; তিনি বলেন: “ইহুদী সম্প্রদায় ‘এয়াওমে আশূরা’ (আশূরা দিবস)-কে ঈদ হিসেবে বিবেচনা করতেন। (এমতাবস্থায় মুসলমানদের প্রতি আদেশ দিয়ে) মহানবী (দ:) বলেন, ‘এই দিনে তোমাদের রোযা রাখা উচিত’।” [আল-বুখারী, সহীহ: কিতা’ব আল-সওম (রোযা-বিষয়ক পুস্তক), ‘এয়াওমে আশূরা’র রোযা’ অধ্যায়, ২:৭০৪-৭০৫ #১৯০১]

/ – ইমাম মুসলিম (২০৬-২৬১ হিজরী)-ও হযরত আবূ মূসা আশআরী (রা:) হতে বর্ণনা করেন; তিনি বলেন: “আশূরা’র দিবসকে ইহুদী সম্প্রদায় ভক্তি-শ্রদ্ধা করতেন; আর তারা এটাকে ঈদ হিসেবে গ্রহণ করেছিলেন। (তাই মুসলমানদের প্রতি আদেশ দিয়ে) মহানবী (দ:) বলেন, “এই দিনে তোমাদের রোযা রাখা উচিত।” [মুসলিম, সহীহ: ‘কিতা’ব আল-সিয়্যাম’ (রোযা-সংক্রান্ত পুস্তক), ‘আশূরা দিবসের রোযা’ অধ্যায়, ২:৭৯৬ #১১৩১; আল-নাসাঈ কৃত ‘আল-সুনান আল-কুবরা’, ২:১৫৯ #২৮৪৮; আল-তাহাবী রচিত ‘শরহে মাআনী আল-আ’সা’র’: ‘কিতা’ব আল-সওম’ (রোযা-সম্পর্কিত বই), ‘এয়াওমে আশূরার রোযা’ অধ্যায়, ২:১৩৩ #৩২১৭; এবং আল-বায়হাক্বী প্রণীত ‘আল-সুনান আল-কুবরা’, ৪:২৮৯ #৮১৯৭]    

ইমাম তাহাবী (২২৯-৩২১ হিজরী) ওপরে উদ্ধৃত হাদীসের প্রসঙ্গে বলেন যে ‘এয়াওমে আশূরা’ উপলক্ষে মহানবী (দ:) কর্তৃক মুসলমানদেরকে রোযা রাখার নির্দেশ দানের একমাত্র কারণ ছিল এই যে, ওই দিনটিতে ইহুদী সম্প্রদায় রোযা পালন করতেন।

৩/ – ইমাম মুসলিম (২০৬-২৬১ হিজরী) আরেকটি হাদীস বর্ণনা করেন হযরত মূসা আল-আশআরী (রা:) হতে, যা’তে বিবৃত হয়: “খায়বার অঞ্চলের বাসিন্দাবর্গ ‘এয়াওমে আশূরা’কে ঈদ হিসেবে গ্রহণ করে রোযা রাখতেন। তারা তাদের মহিলাদেরকে অলঙ্কার ও (ধর্মীয়) চিহ্নসম্বলিত বস্তু দ্বারা সাজতে দিতেন। এমতাবস্থায় মহানবী (দ:) (মুসলমানদের প্রতি নির্দেশ দিয়ে) বলেন, ‘তোমাদের এ দিনে রোযা রাখা উচিত’।” [ইমাম মুসলিম রচিত ‘সহীহ’ গ্রন্থ: ‘কিতাব আল-সিয়্যাম’ (রোযা-বিষয়ক পুস্তক), ‘আশূরা দিবসের রোযা’ শীর্ষক অধ্যায়, ২:৭৯৬ #১১৩১; আবূ নু’আইম কৃত ‘আল-মুসনাদ আল-মুসতাখরাজ ‘আলা সহীহ আল-ইমাম মুসলিম’, ৩:২১২ #২৫৭৫; আল-ইসমাঈলী প্রণীত ’মু’জাম শুইঊখ আবী বকর আল-ইসমাঈলী’, ৩:৭২২ #৩৩৭; এবং আল-আসক্বালানী লিখিত ‘ফাতহুল বারী’, ৪:২৪৮]

সর্ব-ইমাম বুখারী (রহ:) ও মুসলিম (রহ:) বর্ণিত এসব হাদীস থেকে আমরা নিচের সিদ্ধান্তগুলো নিতে পারি:

১/ – ‘এয়াওমে আশূরা’ ইহুদীদের জন্যে ছিল এক বিজয় দিবস। দীর্ঘকাল যাবত তারা এটাকে নিজেদের সম্প্রদায়গত পর্যায়ে ঈদ হিসেবে উদযাপন করে আসছিলেন।

২/ – ইহুদীবর্গ এই দিনটিকে ঈদ হিসেবে গ্রহণ করে এর প্রতি সম্মান প্রদর্শন করেন। রোযা পালনের দ্বারা অতিরিক্ত আমল করে তারা নিজেদের কৃতজ্ঞতা প্রকাশ করেন।

৩/ – এই দিনটিকে স্রেফ রোযা পালনের মধ্যেই সীমাবদ্ধ রাখা হয়নি, বরঞ্চ এটা ছিল উদযাপনের কেবল একটি দিক।

৪/ – সাযুজ্য দেখিয়ে কেউ যদি আপত্তি উত্থাপন করেন এ কথা বলে যে, রোযা না রেখে মওলিদুন্নবী (দ:) উদযাপন করার কোনো অনুমতি নেই, তাহলে এই ধরনের আপত্তি সঠিক হবে না। কেননা এ সিদ্ধান্ত (উদ্ধৃত) হাদীসগুলো থেকে নেয়া সম্ভব নয়।

রাসূলুল্লাহ (দ:) ইতোমধ্যে জানতেন ইহুদী জাতি ‘এয়াওমে আশূরা’কে ঈদ হিসেবে গ্রহণ করেছিলেন। এ কারণে তিনি কখনোই এ ব্যাপারে জিজ্ঞেস করেননি; বরঞ্চ তিনি তাদেরকে কেন তারা রোযা পালন করছেন সে ব্যাপারেই জিজ্ঞেস করেন। তারা উত্তরে বলেন যে এটা শ্রদ্ধাস্বরূপ এবং কৃতজ্ঞতা প্রকাশেরও নিদর্শনস্বরূপ। আর এই উত্তরের পরিপ্রেক্ষিতেই মহানবী (দ:) আশূরা দিবসে রোযা রাখেন এবং তাঁর সাহাবা-এ-কেরাম (রা:)-কেও অনুরূপ আমল পালন করার নির্দেশ দান করেন।

৫.১.৪ মওলিদুন্নবী (দ:)-এর পক্ষে ইমাম আসকালানী (রহ:)-এর প্রামাণিক দলিল

ইমাম ইবনে হাজর আসক্বালানী (৭৭৩-৮৫২ হিজরী) ওপরে উদ্ধৃত হাদীসগুলোর ভিত্তিতে ‘এয়াওমে আশূরা’র শরঈ বৈধতা সম্পর্কে বেশ গভীর গবেষণা করেছেন এবং তা থেকে মওলিদুন্নবী (দ:) উদযাপন জায়েয হওয়ার বিষয়টিকে প্রতিষ্ঠিত করেছেন। ইমাম জালালউদ্দীন সৈয়ূতী (৮৪৯-৯১১ হিজরী) ইমাম আসক্বালানী (রহ:)-এর ওই সিদ্ধান্ত লিপিবদ্ধ করেন নিচে:

এই যুগের হাফেয, শায়খুল ইসলাম আবূল ফযল ইবনে হাজর আসক্বালানী (রহ:)-কে মওলিদের অনুশীলন সম্পর্কে জিজ্ঞেস করা হয়, আর তিনি জবাবে বলেন:

“মওলিদের যে একটি প্রতিষ্ঠিত ভিত্তি আছে, তা আমি জানতে পেরেছি; আর তা সহীহাইন (বুখারী ও মুসলিম) গ্রন্থগুলোতে পাওয়া যায়। (ওগুলোর বর্ণনামতে) মহানবী (দ:) মদীনা মোনাওয়ারায় প্রবেশ করেন এবং তিনি ইহুদীদেরকে ‘এয়াওমে আশূরা’য় রোযা রাখতে দেখেন। তিনি তাদেরকে জিজ্ঞেস করলে তারা উত্তরে বলেন, ‘এই দিনটিতে আল্লাহতা’লা ফেরাউনকে পানিতে ডুবিয়ে মারেন এবং পয়গম্বর মূসা (আ:)-কে রক্ষা করেন। আল্লাহর প্রতি কৃতজ্ঞতার নিদর্শনস্বরূপ আমরা এই দিনে রোযা পালন করে থাকি।’

“কোনো নির্দিষ্ট দিনে আল্লাহতা’লা কর্তৃক বর্ষিত আশীর্বাদ অথবা দুঃখকষ্ট হতে তাঁর প্রদত্ত সুরক্ষাপ্রাপ্তি উপলক্ষে সর্বশক্তিমান প্রভুর প্রতি কৃতজ্ঞতা প্রকাশের রীতি ও প্রতি বছর তা স্মরণার্থে পালন এই দলিলে বৈধ সাব্যস্ত হয়।

”আল্লাহতা’লার প্রতি কৃতজ্ঞতা বিভিন্ন ধরনের এবাদত-বন্দেগী দ্বারা প্রকাশ করা যায়, যার মধ্যে রয়েছে, সেজদা (নামায), রোযা, দান-সদকাহ ও ক্বুরআন তেলাওয়াত। অতঃপর রহমতের নবী (দ:)-এর এই ধরণীতলে শুভাগমন দিবসের চেয়ে শ্রেষ্ঠতর খোদায়ী আশীর্বাদের উপলক্ষ আর কী হতে পারে?” [ইমাম সৈয়ূতী (রহ:) কৃত ‘হুসন আল-মাক্বসিদ ফী আমল আল-মওলিদ’, ৬৩ পৃষ্ঠা; ইমাম সৈয়ূতী প্রণীত ‘আল-হাওয়ী লিল-ফাতাওয়াঈ’, ২০৫-২০৬ পৃষ্ঠা; আল-সালেহী রচিত ‘সুবুল আল-হুদা’ ওয়াল-রাশা’দ ফী সীরায়ে খায়র আল-এবা’দ’, ১:৩৬৬; আল-যুরক্বানী লিখিত ‘শরহে মাওয়া’হিব আল-লাদুন্নিয়া বিল-মিনাহ আল-মুহাম্মদীয়া’, ১:২৬৩; শায়খ আহমদ যাইনী দাহলান মক্কী কৃত ‘আল-সীরা আল-নববীয়্যা’, ১:৫৪; এবং ইমাম নাবহানী প্রণীত ‘হুজ্জাত আল্লাহ ’আলাল আলামীন ফী মো’জিযাতে সাইয়্যেদ আল-মুরসালীন’, ২৩৭ পৃষ্ঠা]

ইমাম ইবনে হাজর আসক্বালানী (রহ:) মওলিদুন্নবী (দ:) উদযাপনের ভিত্তিস্বরূপ সহীহ বুখারী ও মুসলিমের হাদীসগুলোকেই তাঁর উত্তরে পেশ করেছেন। এসব হাদীসে প্রিয়নবী (দ:) ইহুদীদের আচরিত প্রথাকে সমর্থন করেছেন, যা দ্বারা তাদের প্রতি বর্ষিত আশীর্বাদের উপলক্ষে তারা কৃতজ্ঞতার নিদর্শনস্বরূপ উৎসব পালনের বিভিন্ন কর্মকাণ্ডের মাধ্যমে খুশি প্রকাশ করতেন। মহানবী (দ:)-এর অনুমোদনের ফলে এ প্রথাটি সুন্নাহ’র মর্যাদা পেয়েছে।

প্রিয়নবী (দ:) যেদিন এই ধরাধামে শুভাগমন করেন, তার চেয়ে শ্রেষ্ঠতর দিবস আর কী-ই বা হতে পারে? এমতাবস্থায় মওলিদুন্নবী (দ:)-কে ঈদ হিসেবে উদযাপন করা যাবে না কেন? ইমাম জালালউদ্দীন সৈয়ূতী (রহ:) ইমাম ইবনে হাজর আসক্বালানী (রহ:)-এর সিদ্ধান্তকে সমর্থন করেছেন, যা তাঁরই ফতোওয়াসমূহের সংকলন ‘আল-হা’ওয়ী লিল-ফাতা’ওয়া’ঈ’ শীর্ষক গ্রন্থের ২০৫-২০৬ পৃষ্ঠাগুলোতে বিদ্যমান। ইমাম ইবনে হাজর আসক্বালানী (রহ:) আশূরা’র রোযাকে দালিলিক প্রমাণ হিসেবে ব্যবহার করেছেন; যদিও পয়গম্বর মূসা (আ:)-কে প্রদত্ত বিজয় বহুকাল আগেকার ঘটনা ছিল, তথাপিও আশূরা দিবসকে কৃতজ্ঞতা প্রকাশের উপলক্ষ হিসেবে বছরের অন্যান্য দিন হতে আলাদাভাবে বেছে নেয়া হয়েছে। এ থেকে আমরা দেখতে পাই যে, ঘটনাটির পুনরাবৃত্তি না ঘটলেও ওই দিনের মহত্ত্ব বারবার প্রকাশ পায়; ঠিক যেমনটি জানা যায় মহানবী (দ;)-এর বেলাদত দিবস প্রতি সোমবারে আবূ লাহাবের আযাব (শাস্তি) লাঘব হয় [অনুবাদকের জ্ঞাতব্য: কেননা ওই দিন খুশি হয়ে সে আঙ্গুলের ইশারায় হুযূরের বেলাদতের সুসংবাদ বহনকারিনী দাসী সোয়াইবিয়াকে মুক্ত করে দিয়েছিল]।

রমযান মাসের রোযা ফরয হওয়ার আগে ‘এয়াওমে আশূরা’র রোযা মুসলমানদের জন্যে ফরয ছিল [আল-তাহাবী কৃত ‘শরহে মা’আনী আল-আসার: কিতাব আল-সওম (রোযা-বিষয়ক পুস্তক), ‘এয়াওমে আশূরা’র রোযা অধ্যায়’, ২:১২৯-১৩২; এবং আল-আঈনী প্রণীত ‘উমদাত আল-ক্বারী শরহে সহীহ আল-বুখারী’, ১১:১২০]। রমযান মাসের রোযা ফরয হওয়ার পর এই বিধান রহিত করা হয় [ইমাম বুখারী (রহ:) হযরত মা আয়েশা (রা:) হতে বর্ণনা করেন যে মহানবী (দ:) এয়াওমে আশূরা’র রোযা পালনের আদেশ দেন। (কিন্তু) যখন রমযান মাসের রোযা পালন বাধ্যতামূলক করা হয়, তখন এয়াওমে আশূরা’র রোযা পালন করা বা না করা প্রত্যেকের নিজ নিজ পছন্দের ওপর ছেড়ে দেয়া হয়। (ইমাম বুখারী রচিত ‘সহীহ’: কিতাব আল-সওম, ‘এয়াওমে আশূরা’র রোযা’ শীর্ষক অধ্যায়, ২:৭০৪ #১৮৯৭-১৮৯৮)]। কিছু মানুষের মনে হয়তো এই বিভ্রান্তি দেখা দিতে পারে যে এয়াওমে আশূরা পালনের আদেশ রহিত হয়ে যাওয়ার দরুন বর্তমানে এর ফযীলত/পুণ্য নিঃশেষ হয়ে গিয়েছে। এর জবাব হলো, রমযান মাসের রোযা ফরয হওয়ার পরে অন্য কোনো মাসে রোযা রাখার বাধ্যবাধকতা আর অবশিষ্ট ছিল না। এতদসত্ত্বেও আশূরা’র রোযা পালনের অনুমতি বহাল আছে। এটা এ কারণে যে রাসূলূল্লাহ (দ:) আশূরা’র রোযার বাধ্যবাধকতা রহিত করার পর এ কথা বলেননি, “আমাদের আর এরপর থেকে পয়গম্বর মূসা (আ:)-এর ওপর কোনো হক্ব বা অধিকার নেই।” অথচ এর বিপরীতে ওই রোযা বাধ্যতামূলক করার সময় তিনি ঘোষণা করেছিলেন, “তোমাদের (মানে ইহুদীদের) চেয়ে পয়গম্বর মূসা (আ:)-এর ওপর আমাদের আরো বেশি হক্ক (তথা অধিকার) রয়েছে।”

আশূরা’র রোযা রহিতকরণ সত্ত্বেও এর ফযীলত সম্পর্কে বেশ কিছু হাদীস পাওয়া যায়। এই দিনে রোযা পালন এর রহিতকরণের আগে পুণ্যদায়ক ছিল, আর এটার ফযীলত এর রহিতকরণের পরও জারি আছে। অধিকন্তু এটা একটা গৃহীত বিষয় যে ফযীলত কখনো রহিত হয় না। এই কারণেই এয়াওমে আশূরা’র রহিতকরণ ইমাম ইবনে হাজর আসক্বালানী’র (৭৭৩-৮৫২ হিজরী) নেয়া সিদ্ধান্তের ওপর কোনো প্রভাবই ফেলে না।

আমাদের যদি (যুক্তির খাতিরে) গ্রহণ করতেও হয় যে আশূরা’র রোযার ফযীলত রহিত হয়ে গিয়েছে, তবুও সেটা মওলিদুন্নবী (দ:)-এর পক্ষে পেশকৃত আমাদের প্রামাণ্য দলিলের ওপর কোনো প্রভাব ফেলে না। কেননা নিশ্চিতভাবে যাঁরা ওই দিন সবচেয়ে বেশি খুশি হবেন, তাঁরাই (প্রকৃতপ্রস্তাবে) পয়গম্বর মূসা (আ:)-এর ওপর সর্বাধিক হক্কের দাবিদার ব্যক্তিবৃন্দ। প্রিয়নবী (দ:) কর্তৃক আশূরা’র দিন রোযা রাখার কারণ ছিল তিনি এই বাস্তবতার প্রতি দৃষ্টি আকর্ষণ করতে চেয়েছিলেন যে, কোনো পয়গম্বর (আ:)-এর বিজয়ে কৃতজ্ঞতা প্রকাশ করার অনুমতি যদি বহাল থাকে, তাহলে রাসূল (দ:)-এর বেলাদত দিবসে কেন কৃতজ্ঞতা প্রকাশ করার অনুমতি থাকবে না? প্রিয়নবী (দ:)-এর মহৎ প্রকৃতির কারণে তিনি তাঁর বেলাদত দিবসে রোযা রেখে তা উদযাপন করতে তাঁর উম্মতকে প্রকাশ্যে নির্দেশ দেননি; এর পরিবর্তে তিনি প্রতি সোমবার (আপন বেলাদত দিবসে) দৃষ্টান্ত স্থাপন করে রোযা রেখেছেন; আর তিনি এমন কি তা প্রকাশও করেননি, যতোক্ষণ না কেউ তাঁকে এব্যাপারে জিজ্ঞেস করেছিলেন।

৫.২ পয়গম্বর নূহ (আ:)-এর দিবস উদযাপনের পক্ষে দালিলিক প্রমাণ

ইমাম আহমদ ইবনে হাম্বল (১৬৪-২৪১ হিজরী) ও হাফেয ইবনে হাজর আসক্বালানী (৭৭৩-৮৫২ হিজরী) হযরত আবূ হোরায়রা (রা:) হতে একটি হাদীস বর্ণনা করেন এই মর্মে যে, ‘এয়াওমে আশূরা’ (১০ই মহররম) ওই দিবস যা’তে আল্লাহতা’লা পয়গম্বর নূহ (আ:) ও তাঁর জাতির প্রতি আপন করুণা ও আশীর্বাদ বর্ষণ করেন; এটা ছিল এমন-ই এক দিন যখন তাঁরা আল-জূদী পর্বতে (الجودي) নিরাপদে অবতরণ করেন। পয়গম্বর নূহ (আ:) ও তাঁর উম্মত এই দিনটিকে কৃতজ্ঞতা প্রকাশের দিবস হিসেবে উদযাপন করেন, আর তাঁদের উত্তরসূরীরাও এটাকে সম্মান প্রদর্শন করেন।

হযরত আবূ হোরায়রা (রা:) বর্ণনা করেন যে সবচেয়ে করুণাশীল রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহে ওয়া সাল্লাম যখন ইহুদীদেরকে ‘এয়াওমে আশূরা’ দিবসে তাদের রোযা পালন সম্পর্কে জিজ্ঞেস করেন, তখন তারা বনূ ইসরাঈল বংশের মুক্তি ও ফেরাউনের সলিল সমাধির কথা উল্লেখ করার পর বলেন:

“অধিকন্তু, এই দিনে নূহ (আ:)-এর কিস্তি নিরাপদে জূদী পর্বতে ভিড়ে। তাই সর্ব-পয়গম্বর নূহ (আ:) ও মূসা (আ:) আল্লাহর প্রতি কৃতজ্ঞতা প্রকাশার্থে এদিনটিতে রোযা রাখতেন।”

এমতাবস্থায় মহানবী (দ:) বলেন: “পয়গম্বর মূসা (আ:)-এর ওপর আমার হক্ক (অধিকার) আরো বেশি, আর তাই এই দিনে রোযা রাখার হক্ক-ও আমারই সবচেয়ে বেশি।” [ইমাম আহমদ ইবনে হাম্বল কৃত ‘আল-মুসনাদ’, ২:৩৫৯-৩৬০ #৮৭০২; এবং আল-আসক্বালানী প্রণীত ‘ফাতহুল বারী’, ৪:২৪৭] 

অতঃপর প্রিয়নবী (দ:) তাঁর মহান সাহাবা (রা:)-বৃন্দকেও রোযা পালনের নির্দেশ দেন।

মানবজাতির দ্বিতীয় পিতা পয়গম্বর নূহ (আ:) তাঁর উম্মতকে সাথে নিয়ে রক্ষা পাওয়ার ফলে মনুষ্যকুল পৃথিবীতে টিকে যায়। তাঁর উম্মত ওই দিনটি উদযাপন করেন এবং আল্লাহর প্রতি চিরকৃতজ্ঞ হন। এ থেকে আমরা শিক্ষা পাই যে ঈমানদারবৃন্দ যেসব ঘটনায় (খোদাপ্রদত্ত) নিরাপত্তা ও মুক্তি লাভ করেন, সেগুলোতে সামষ্টিক পর্যায়ে কৃতজ্ঞতা জ্ঞাপন করতে হবে। এটা ইসলামী সভ্যতা ও সংস্কৃতির অবিচ্ছেদ্য অংশ। এভাবেই মহানবী (দ:)-এর আশীর্বাদপূর্ণ বেলাদত তথা ধরণীতলে শুভাগমন দিবস ঈমানদারদের জন্যে শেষ বিচার দিবস অবধি ঈদ হিসেবে বরণীয় হবে।

৫.৩ কা’বা শরীফের আচ্ছাদন পরিবর্তন দিবস পালনের প্রামাণ্য দলিল   

জাহেলীয়া তথা অজ্ঞতার যুগে ক্বুরাইশ গোত্র আশূরা দিবসে রোযা পালন করতো, আর তারা দিনটিকে ঈদ হিসেবে উদযাপন করতো। সর্বাধিক করুণার নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহে ওয়া সাল্লাম-ও মদীনা মোনাওয়ারায় হিজরত করার আগে রোযা রেখে এদিনটি উদযাপন করতেন। তাঁদের এটা পালনের কারণ ছিল এই যে, এদিনেই কা’বা শরীফকে সর্বপ্রথম আচ্ছাদন দেয়া হয়েছিল। এটাই ছিল সুনির্দিষ্ট পটভূমি যার জন্যে মহানবী (দ:) মদীনা মোনাওয়ারায় হিজরতের পরে ইহুদীদেরকে তাদের রোযা রাখার কারণ জিজ্ঞেস করেন।

/ – ইমাম বুখারী (রহ:) ঈমানদারদের মা হযরত আয়েশা (রা:)-এর কথা বর্ণনা করেন, যিনি বলেন: “ক্বুরাইশ গোত্র অজ্ঞতার যুগে আশূরা’ দিবসের রোযা পালন করতো; অার মহানবী (দ:)-ও সেদিন রোযা রাখতেন।” [আল-বুখারী রচিত ‘সহীহ’: ‘কিতাব আল-সওম’ (রোযার পুস্তক), ‘এয়াওমে আশূরা’র রোযা’ অধ্যায়, ২:৭০৪ #১৮৯৮; আল-বুখারী প্রণীত ‘সহীহ’: ‘কিতাব আল-মানাক্বিব’ (সৎ গুণাবলীর বই), ‘অজ্ঞতার যুগ’ অধ্যায়, ৩:১৩৯৩ #৩৬১৯; মুসলিম কৃত ‘আল-সহীহ’: ‘কিতাব আল-সিয়াম’ (রোযার পুস্তক), ‘আশূরা দিবসের রোযা’ অধ্যায়, ২:৭৮২ #১১২৫; আল-তিরমিযী লিখিত ‘আল-জামেউস্ সহীহ’: ‘কিতাব আল-সওম’ (রোযার পুস্তক), ‘আশূরা দিবসের রোযা পালনসম্পর্কিত বর্ণনাসমূহ’ অধ্যায়, ৩:১২৭ #৭৫৩]

অজ্ঞতার যুগে কা’বা শরীফ যখন সর্বপ্রথম আচ্ছাদিত হয়, সেদিনটি ছিল ১০ই মহররম। সে সময় হতে মক্কাবাসী মানুষ প্রতি বছর ওই দিনে রোযা পালন করতেন, আর তারা দিনটিকে ঈদ হিসেবেও উদযাপন করতেন। তাদের এই আচরিত প্রথা রাসূলুল্লাহ (দ:)-এর বেলাদত শরীফের পরেও জারি থাকে, আর প্রিয়নবী (দ:) নিজেও কা’বা শরীফের আচ্ছাদনের সে দিনটিতে নিয়মিত রোযা রাখতেন।

/ – ইমাম বুখারী (রহ:) হযরত মা আয়েশা (রা:) হতে আরেকটি বর্ণনা লিপিবদ্ধ করেন, যা’তে তিনি বলেন: “রমযান মাসের রোযা ফরয হবার আগে তারা (আরব জাতি) আশূরা’র রোযা রাখতো। কেননা এই দিনে কা’বা শরীফের ওপর বস্ত্রের আচ্ছাদন দেয়া হতো। রমযান মাসের রোযা ফরয হওয়ার পর মহানবী (দ:) এরশাদ ফরমান, ‘কেউ আশূরা’র রোযা রাখতে চাইলে রাখতে পারে, আর কেউ ছেড়ে দিতে চাইলে তাও সে করতে পারে’।” [আল-বুখারী কৃত ‘সহীহ’: কিতাবুল হজ্জ্ব, ‘আল্লাহর কালাম: আল্লাহ কা’বাকে পবিত্র গৃহ বানিয়েছেন’ শীর্ষক অধ্যায়, ২:৫৭৮ #১৫১৫; আল-তাবারানী রচিত ‘আল-মু’জাম আল-আওসাত’, ৭:২৭৮ #৭৪৯৫; আল-বায়হাকী প্রণীত ‘আল-সুনান আল-কুবরা’, ৫:১৫৯ #৯৫১৩; এবং ইবনে আবদ আল-বার্র লিখিত ‘আল-তামহীদ লিমা ফী আল-মুওয়াত্তা মিন আল-মা’আনী ওয়া আল-আসানীদ’, ৭:২০৪]  

ইমাম ইবনে হাজের আল-আসক্বালানী (৭৭৩-৮৫২ হিজরী) এই হাদীস সম্পর্কে নিজ ভাষ্যে বলেন:

“এটা বোঝা যায় যে আইয়ামে জাহেলীয়্যা তথা অজ্ঞতার যুগেও তারা স্মরণাতীত কাল হতে কা’বা শরীফকে (বস্ত্র দ্বারা) আচ্ছাদন করে এর প্রতি সম্মান প্রদর্শন করতো। এটা তাদের প্রতিষ্ঠিত একটি আচার ছিল। [আল-আসক্বালানী রচিত ‘ফাতহুল বারী’, ৩:৪৫৫]    

ইমাম ইবনে হাজর আসক্বালানী (রহ:) তাঁর বইয়ের আরেক জায়গায় অপর একটি কারণ প্রদর্শন করেন:

“ক্বুরাইশ গোত্র কর্তৃক আশূরা’র রোযা রাখার ব্যাপারটি এ-ও হতে পারে যে তারা পূর্ববর্তী শরীয়ত হতে এটা পেয়েছিল, আর এ কারণেই তারা সে দিনটিতে কা’বা শরীফকে আচ্ছাদন করে এর প্রতি শ্রদ্ধা জ্ঞাপন করতো।” [প্রাগুক্ত ‘ফাতহুল বারী’, ৪:২৪৬]  

ইমাম তাবারানী (২৬০-৩৬০ হিজরী) কা’বা শরীফের ওপর বস্ত্রের আচ্ছাদন দেয়ার ব্যাপারে নিজ ‘আল-মু’জাম আল-কবীর’ (৫:১৩৮ #৪৮৭৬) গ্রন্থে হযরত যায়দ ইবনে সাবেত (রা:)-কে উদ্ধৃত করেন, যিনি বলেন:

“এয়াওমে আশূরা এমন দিন নয় যেমনটি মানুষেরা ধারণা করেন। এটা কেবল ওই দিন-ই, যা’তে কা’বা শরীফের আচ্ছাদন দেয়া হয়; আর এ দিনটি সারা বছর ঘুরে ঘুরে আসতো।” [আল-হায়তামী কৃত ‘মজমাউল যওয়াঈদ ওয়া মানবা’আ আল-ফাওয়াঈদ’, ৩:১৮৭; আল-আসক্বালানী প্রণীত ‘ফাতহুল বারী’, ৪:২৪৮; এবং আল-আসক্বালানী রচিত ‘ফাতহুল বারী’, ৭:২৭৬]      

কা’বা শরীফের আ্চ্ছাদনের দিনটিকে সম্মান করা কিছু মানুষের জন্যে বিভ্রান্তির উৎস হয়ে দাঁড়িয়েছে। তারা বলেন, কা’বাকে বস্ত্র দ্বারা আচ্ছাদন করা হলে ওর প্রতি শ্রদ্ধা জ্ঞাপনের কী দরকার? তাদের এই বক্তব্য সঠিক নয়, কেননা মহাসম্মানিত নবী করীম (দ:) খোদ এই দিনটির প্রতি শ্রদ্ধা প্রদর্শন করেছেন। অনুরূপভাবে, আরো কিছু মানুষের সন্দেহ (বাতিক) রয়েছে যে মহানবী (দ:)-কে (দুনিয়াতে) প্রেরণের মুল উদ্দেশ্য ছিল আমাদেরকে ক্বুরআন-সুন্নাহ শিক্ষাদান, উপরন্তু তাঁর বেলাদত তথা ধরাধামে শুভাগমন দিবস বহুদিন আগের ঘটনা; প্রিয়নবী (দ:) তাঁর দায়িত্ব ও কর্তব্য পূর্ণ করেছেন দেখে তাঁর মীলাদ উদযাপনের প্রয়োজনীয়তা কোথায়? তাঁর সুন্নাহ’কে আঁকড়ে ধরা এবং তাঁর শিক্ষাকে আমাদের জীবনে বাস্তবায়ন করাই কি যথেষ্ট নয়?

এই প্রশ্ন ও এ জাতীয় অন্যান্য প্রশ্নের জবাব দেয়ার আগে সকল ঈমানদারের পক্ষে মহানবী (দ:)-এর প্রকৃত মর্যাদা ও গুণগত বৈশিষ্ট্য সম্পর্কে সচেতন হওয়া একান্ত জরুরি; মানবজাতির মাঝে রাসূলুল্লাহ (দ:)-কে প্রেরণের উদ্দেশ্য, তাঁর নিখুঁত অনুকরণীয় দৃষ্টান্ত এবং ক্বুরআন নাযেল ইত্যাদি বিষয়ে আগে উপলব্ধি করা গুরুত্বপূর্ণ; ইসলামী সভ্যতার সূচনালগ্ন থেকে ধাপে ধাপে তার উন্নয়ন সম্পর্কে সমঝদারিও এখানে গুরুত্বপূর্ণ।

যেদিনটিতে কা’বাকে আচ্ছাদিত করা হয়, তা বছর ঘুরে আপনাআপনি ফিরে ফিরে আসে। আরব জাতি কা’বা শরীফের খাতিরেই ওই দিনটিকে সম্মান প্রদর্শন করতেন। আর এটা পরবর্তীকালে স্বাধীন একটা উদযাপনেও পরিণত হয়। এ কারণেই মীলাদুন্নবী (দ:)-এর দিনটি, যদিও বহু শতাব্দী আগে তা ঘটেছিল, তবূও তা প্রতিবার বছর ঘুরে এলে (আমাদের) শ্রদ্ধা পাওয়ার যোগ্য; এই দিনটিকে শ্রদ্ধা করা এবং এতে খুশি প্রকাশ করা একদম অপরিহার্য। এমন কি আবূ লাহাব-ও মহানবী (দ:)-এর বেলাদত-লগ্নে খুশি হয়ে (বার্তা বহনকারিনী) তার দাসী সোয়াইবিয়াকে (আঙ্গুলের ইশারায়) মুক্ত করে দিয়েছিল, যার ফলশ্রুতিতে প্রতি সোমবার তার (পারলৌকিক) শাস্তি লাঘব হয়। প্রিয়নবী (দ:) স্বয়ং দুনিয়াবী হায়াতে থাকাকালীন তাঁর মীলাদ দিবসকে উদযাপন করতেন। অতএব, মওলিদুন্নবী (দ:)-এর উদযাপন শুধু জায়েয তথা অনুমতিপ্রাপ্ত-ই নয়, বরং তা মনোনীত পয়গম্বর (দ:)-এর সুন্নাহ হিসেবেও সুপ্রতিষ্ঠিত।

৫.৪ দ্বীন-ইসলামের পূর্ণতাপ্রাপ্তি দিবসকে ঈদ হিসেবে উদযাপনের দলিল

সূরা মা’ইদা’র ৩য় আয়াতটি (“আজ আমি তোমাদের জন্যে তোমাদের দ্বীনকে পরিপূর্ণ করে দিলাম”) নাযেল হওয়ার পর ইহুদীবর্গ এটাকে মুসলমানদের সাথে একটি আলোচনার বিষয়বস্তুতে পরিণত করেন। নিম্নবর্ণিত হাদীস শরীফে খলীফা হযরত উমর ফারূক্ব (রা:) ও জনৈক ইহুদীর মধ্যকার আলাপের বিবরণ দেয়া হয়েছে, যেটা মওলিদুন্নবী (দ:) উদযাপনের বৈধতা/অনুমতির পক্ষে প্রামাণ্য দলিলস্বরূপ:

১/ – ইমাম বুখারী (১৯৪-২৫৬ হিজরী) বর্ণনা করেন খলীফা হযরত উমর (রা:)-এর কথা, যিনি বলেন যে জনৈক ইহুদী ব্যক্তি তাঁর কাছে আরয করেন, ‘হে আমিরুল মো’মেনীন! আপনাদের পবিত্র ধর্মগ্রন্থে আপনাদেরই পঠিত এমন একটি আয়াত আছে, যা আমাদের, অর্থাৎ, ইহুদীদের প্রতি অবতীর্ণ হলে আমরা সেটাকে (মানে আয়াতটি নাযেলের ওই দিনটিকে) ঈদ উৎসবের দিন হিসেবে পালন করতাম।’ হযরত উমর (রা:) জিজ্ঞেস করেন, ‘সেটা কোন্ আয়াত?’ ইহুদী উত্তর দেন, ‘আজ আমি তোমাদের জন্যে তোমাদের দ্বীনকে পরিপূর্ণ করে দিলাম এবং তোমাদের প্রতি আমার অনুগ্রহ সম্পূর্ণ করলাম, আর তোমাদের জন্যে ইসলামকে দ্বীন (তথা পূর্ণাঙ্গ জীবন বিধান) মনোনীত করলাম।’ খলীফা উমর ফারূক্ব (রা:) বলেন, ‘নিশ্চয়, আমরা ওই দিনটি সম্পর্কে জানি এবং মহানবী (দ:)-এর প্রতি আয়াতটি কোথায় নাযেল হয়েছিল, তাও জানি; তিনি সে সময় আরাফাতে দণ্ডায়মান ছিলেন, আর দিনটি ছিল শুক্রবার।’ [আল-বুখারী প্রণীত ‘সহীহ’: ‘কিতাবুল ঈমান’ (বিশ্বাসবিষয়ক পুস্তক), ‘ঈমানের হ্রাস-বৃদ্ধি’ শীর্ষক অধ্যায়, ১:২৫ #৪৫; আল-বুখারী কৃত ‘সহীহ’: ‘কিতাব আল-মাগাযী’ (গযওয়া/ধর্মযুদ্ধবিষয়ক পুস্তক), ‘বিদায়ী হজ্জ্ব’ শীর্ষক অধ্যায়, ৪:১৬০০ #৪১৪৫; আল-বুখারী রচিত ‘সহীহ’: ‘কিতাব আল-তাফসীর আল-ক্বুরআন’ (ক্বুরআন ব্যাখ্যামূলক পুস্তক), ‘আল্লাহর বাণী: আজ আমি তোমাদের জন্যে তোমাদের দ্বীনকে পরিপূর্ণ করে দিলাম’ শীর্ষক অধ্যায়, ৪:১৬৮৩ #৪৩৩০; আল-বুখারী লিখিত ‘সহীহ’: ‘কিতাব আল-এ’তেসাম বি আল-কিতাব ওয়া আল-সুন্নাহ’ (ক্বুরআন ও সুন্নাহ’র অনুসরণবিষয়ক পুস্তক), ৬:২৬৫৩ #৬৮৪০; সহীহ মুসলিম শরীফ: ‘কিতাব আল-তাফসীর’ (তাফসীর-সম্পর্কিত পুস্তক), ৪:২৩১৩ #৩০১৭; আল-তিরমিযী কৃত ‘আল-জামেউস্ সহীহ’: ‘আবওয়াব আল-তাফসীর আল-ক্বুরআন’ (ক্বুরআনের তাফসীরের অধ্যায়গুলো), ‘সূরা মা’ইদা হতে’ শীর্ষক অধ্যায়, ৫:২৫০ #৩০৪৩; এবং আল-নাসাঈ প্রণীত ‘আল-সুনান’: ‘কিতাব আল-ঈমান’ (বিশ্বাসসম্পর্কিত পুস্তক), ‘ঈমানের বৃদ্ধি’ শীর্ষক অধ্যায়, ৮:১১৪ #৫০১২]  

এখানে উল্লেখযোগ্য হলো এই যে, দ্বীন-ইসলামের পূর্ণতা দানের ঘোষণাসম্বলিত আয়াতটি ইহুদীদের প্রতি অবতীর্ণ হলে তারা ওই দিনটিকে ঈদ উৎসব হিসেবে পালন করতেন বলে ইহুদী ব্যক্তিটি মন্তব্য করেছিলেন। তাদের একটি ভ্রান্ত ধারণা ছিল যে মুসলমানবৃন্দ বুঝি ওই দিনটিকে অন্য যে কোনো দিনের মতোই মনে করতেন। এর প্রতি উত্তরটি এরকম-ই হওয়া উচিত ছিল; তবে খলীফা হযরত উমর (রা:) তার পরিবর্তে বলেন: ‘নিশ্চয়, আমরা ওই দিনটি সম্পর্কে জানি এবং মহানবী (দ:)-এর প্রতি আয়াতটি কোথায় নাযেল হয়েছিল, তাও জানি।’

সেদিনটি ছিল শুক্রবার, আর উপলক্ষ ছিল হজ্জ্বের উদ্দেশ্যে আরাফাতের ময়দানে উপস্থিতি। দৃশ্যতঃ প্রশ্ন ও উত্তরের মাঝে কোনো সামঞ্জস্য নেই; কিন্তু বাস্তবে হযরত উমর (রা:)-এর উত্তরটি পুরোপুরিভোবে প্রশ্ন অনুযায়ী প্রদত্ত হয়েছে। ‘আরাফাত’ ও শুক্রবারের কথা উল্লেখ করে তিনি ইঙ্গিতে সম্পূর্ণ উত্তর দিয়েছেন এ মর্মে যে উভয় দিন-ই মুসলমানদের জন্যে ঈদস্বরূপ; অর্থাৎ, এই দিনটি সাপ্তাহিক (মানে শুক্রবার) ও বার্ষিক (মানে আরাফাত) পর্যায়ে ঈদ হিসেবে উদযাপিত হয়ে থাকে। এ কারণেই ওই ইহুদী ব্যক্তি নিশ্চুপ হয়ে যান এবং তার প্রশ্নটি আর দ্বিতীয়বার করেননি, কেননা খলীফা উমর (রা:) তার প্রশ্নের সম্পূর্ণ জবাব দিয়েছিলেন।


খলীফা হযরত উমর (রা:)-এর এই উত্তরের প্রসঙ্গে ইমাম ইবনে হাজর আসক্বালানী (৭৭৩-৮৫২ হিজরী) বলেন: “আমার দৃষ্টিতে এই বিবরণটি ইশারা দ্বারা যথেষ্ট (বলে সপ্রমাণিত)।” [আল-আসক্বালানী কৃত ‘ফাতহুল বারী’, ১:১০৫ #৪৫]   

২/ – হযরত কা’আব আল-আহবার (রহ:)-এর বর্ণনাগুলোর একটিতে তিনি খলীফা হযরত উমর ফারূক (রা:)-এর কথাকে আরো খোলাসা করেছেন। তিনি বিবৃত করেন যে তিনি খলীফা উমর (রা:)-কে বলেছিলেন তিনি এমন এক জাতিকে চেনেন যারা এই আয়াতটি (ওপরোক্ত আয়াত – ‘অাল-এয়াওমা আকমালতু লাকুম দ্বীনাকুম’) তাদের প্রতি নাযেল হলে (নাযেলের) ওই দিনটিকে ঈদ হিসেবে উদযাপন করতেন। হযরত উমর (রা:) জিজ্ঞেস করেন, “সেটা কোন্ আয়াত?” হযরত কা’আব (রহ:) উত্তর দেন:

আজ আমি তোমাদের জন্যে তোমাদের দ্বীনকে পরিপূর্ণ করে দিলাম এবং তোমাদের প্রতি আমার অনুগ্রহ সম্পূর্ণ করলাম, আর তোমাদের জন্যে ইসলামকে দ্বীন (তথা পূর্ণাঙ্গ জীবন বিধান) মনোনীত করলাম।’ [অাল-ক্বুরআন, ৫:৩]

এমতাবস্থায় খলীফা হযরত উমর ফারূক্ব (রা:) উত্তর দেন: “নিশ্চয় আমি জানি এই আযাতটি (‘অাল-এয়াওমা আকমালতু লাকুম দ্বীনাকুম’) কোন্ দিন অবতীর্ণ হয়েছিলো; সেদিন ছিলো শুক্রবার এবং আরাফাতের দিবস; আর ওই দুটো দিন-ই আমাদের জন্যে ঈদের দিন।” [আল-তাবারানী কৃত ‘আল-মু’জাম আল-আওসাত’, ১:২৫৩ #৮৩০; আল-আসক্বালানী প্রণীত ‘ফাতহুল বারী’, ১:১০৫ #৪৫; ইবনে কাসীর রচিত ‘তাফসীর আল-ক্বুরঅান আল-আযীম’, ২:১৪]

ওপরের বর্ণনা হতে হয়তো প্রমাণ করা যেতে পারে যে ওই ইহুদীর দৃষ্টিভঙ্গি সঠিক ছিলো, কেননা খলীফা উমর ফারূক্ব (রা:) তা নিশ্চিত করেছিলেন। অন্যথা তিনি সেটা প্রত্যাখ্যান করতেন এ কথা বলে যে আমাদের শরীআতে ঈদের দিনগুলো নির্ধারিত আছে; এ কারণেই আমরা এটাকে ঈদ হিসেবে গ্রহণ করতে পারি না। কিন্তু খলীফা তা বলেননি। বরঞ্চ তিনি ওই ইহুদীকে বলেন যে তোমাদের প্রতি এটা নাযেল হলে তোমরা ঈদ হিসেবে গ্রহণ করতে বটে, কিন্তু আমরা (মুসলমান সমাজ) এটাকে দুইটি ঈদের দিনের মতো গ্রহণ করেছি: আরাফাতের দিবস ও শুক্রবার (জুমুআ)।

৩/ – এই অভিমতের পক্ষে আরেকটি ঘটনা আছে, যা হযরত আবদুল্লাহ ইবনে আব্বাস (রা:)-এর বেলায় ঘটেছিলো। হযরত আম্মার ইবনে আবী আম্মার (রা:) বর্ণনা করেন যে হযরত ইবনে আব্বাস (রা:) তেলাওয়াত করেন ওপরের আয়াতটি [‘আজ আমি তোমাদের জন্যে তোমাদের দ্বীনকে পরিপূর্ণ করে দিলাম এবং তোমাদের প্রতি আমার অনুগ্রহ সম্পূর্ণ করলাম, আর তোমাদের জন্যে ইসলামকে দ্বীন (তথা পূর্ণাঙ্গ জীবন বিধান) মনোনীত করলাম।’], আর একজন ইহুদী এসে তাঁকে বলেন, “এই আয়াতখানি যদি আমাদের প্রতি নাযেল হতো, তাহলে আমরা এর নাযেলের দিনকে ঈদ হিসেবে গ্রহণ করতাম।” হযরত ইবনে আব্বাস (রা:) উত্তর দেন, “এটা দুটো ঈদের দিনে নাযেল হয়েছিলো: জুমুআ (শুক্রবার) ও আরাফাতের দিবসে।” [তিরমিযী লিখিত ‘আল-জামেউস্ সহীহ’: ‘কিতাব আল-তাফসীর আল-ক্বুরআন’ (ক্বুরআন ব্যাখ্যামূলক পুস্তক), ‘সূরা মা-ইদা হতে’ অধ্যায়, ৫:২৫০ #৩০৪৪; আল-তাবারানী কৃত ‘আল-মু’জাম আল-কবীর’, ১২:১৮৪ #১২,৮৩৫; আল-তাবারী প্রণীত ‘জামেউল বয়ান ফী তাফসীর আল-ক্বুরআন’, ৬:৮২; আল-মারূযী রচিত ‘তা’যীম ক্বদর আল-সালাহ’, ১:৩৫২ #৩৫৪; ইবনে কাসীর লিখিত ‘তাফসীর আল-ক্বুরআন আল-আযীম’, ২:১৪; এবং ইবনে মূসা আল-হানাফী প্রণীত ‘মু’তাসার আল-মুখতাসার’, ২:১৬৯]

হযরত আবদুল্লাহ ইবনে আব্বাস (রা:) ওই ইহুদীর অভিমত প্রত্যাখ্যান করেননি, বরঞ্চ তিনি তা সমর্থন করেছেন এ কথা বলে যে আয়াতখানি শুক্রবার ও আরাফত দিবসে নাযেল হয়েছিলো; আর এই দুটো দিন-ই মুসলমানদের কাছে এক-একটি ঈদের দিন।

এসব হাদীস এই ধারণাটি সমর্থন করে যে কোনো নেআমত তথা আশীর্বাদ অবতীর্ণ হওযার দিনকে উদযাপন করা জায়েয বা অনুমতিপ্রাপ্ত। তাই দ্বীন-ইসলামের পূর্ণতা দেয়ার দিনটিকে যেমনভাবে ঈদ হিসেবে (হাদীসগুলোতে) ঘোষণা করা হয়েছে, ঠিক তেমনিভাবে রাহমাতুল্লিল আলামীন তথা জগতসমূহের জন্যে খোদায়ী করুণা মহানবী সাল্লাল্লাহু আলাইহে ওয়া সাল্লামের ধরাধামে শুভাগমন দিবস ঈদে মীলাদুন্নবী (দ:)-ও ঈদের দিন (হিসেবে সাব্যস্ত) হয়েছে। মওলিদুন্নবী (দ:)-এর উদযাপন ঈমানেরই মিষ্টস্বাদ বটে। এই বাস্তবতা কেউ উপলব্ধি করার আগে এটা অনুধাবন করা বাধ্যতামূলক যে ঈমানদারির ভিত্তিস্তম্ভ-ই হচ্ছে মহানবী (দ:)-এর প্রতি এশক্ব-মহব্বত/ভালোবাসা। এ কেমন ব্যাপার যে আপনারা ঈমানদারির দাবি করেন, অথচ আপনাদের ঈমানের হাল-অবস্থা আপনাদেরই নবী (দ:)-এর বেলাদতে আপনাদেরকে খুশি প্রকাশের অনুমতি দেয় না?

আলোচ্য সূরা মায়েদার আয়াতখানি সবচেয়ে সদয় রাসূলুল্লাহ (দ:)-এর প্রতি অবতীর্ণ হয়। আর এটা খোশ-খবরী নিয়েই এসেছিলো। যেদিন এ আয়াত নাযেল হয়, সেদিনটিকে দুটো ঈদের দিন হিসেবে চিহ্নিত করা হয়: জুমুআ বা শুক্রবারের ঈদ ও আরাফাত দিবসের ঈদ। অতএব, ঈমানদারবৃন্দের জন্যে এই বিষয়টি উপলব্ধি করা মোটেও দুষ্কর নয় যে সর্বশেষ পয়গম্বর (সাল্লাল্লাহু আলাইহে ওয়া সাল্লাম) যেদিনটিতে ধরণীতলে শুভাগমন করেন, সেদিনটি বছরের সর্বশ্রেষ্ঠ দিন। সংখ্যাগরিষ্ঠ মুসলমান সভা-সমাবেশ/মাহফিল অনুষ্ঠানের মাধ্যমে খুশি প্রকাশ করেন এবং আল্লাহতা’লার এই নেআমতের জন্যে তাঁর প্রতি কৃতজ্ঞতাও জ্ঞাপন করেন; কেননা এই দিনে খুশি প্রকাশ করা ঈমানেরই লক্ষণ। অধিকাংশ মুসলমান-ই এই দিনকে ধারাবাহিকভাবে সম্মান প্রদর্শন করে থাকেন, আর ১২ই রবিউল আউয়াল শরীফে তাঁরা এর সম্মানার্থে মাহফিল-ও অনুষ্ঠান করেন।

কেউ কেউ আপত্তি উত্থাপন করেন এই বলে যে ঈদুল ফিতর ও ঈদুল আযহা ছাড়া অন্য কোনো দিনের প্রতি ঈদ শব্দটি আরোপ করা জায়েয নয়। তাদের এ আপত্তিকে হযরত আবদুল্লাহ ইবনে আব্বাস (রা:)-এর নিম্নোক্ত বক্তব্য দ্বারা খণ্ডন করা যায়; তিনি বলেন: “ফা-ইন্নাহা নাযালাত্ ফী এয়াওমে ঈদায়নে: ফী এয়াওমিল জুমুআতে ওয়া এয়াওমে আরাফাহ” – অর্থাৎ, “এটা দুটো ঈদের দিনে অবতীর্ণ হয়: শুক্রবার ও আরাফাত দিবসে।”

কেউ কেউ আবার হয়তো বলতে পারেন যে আরাফাত দিবস তো ঈদুল আযহারই দিন। এর প্রতি আমাদের জবাব হলো, সর্ব-হযরত খলীফা উমর ফারূক্ব (রা:) ও আবদুল্লাহ ইবনে আব্বাস  (রা:) দু জন-ই শুক্রবারকে ঈদের দিন বলে ঘোষণা করেছেন। সবচেয়ে উচ্চমর্যাদাসম্পন্ন সাহাবাবৃন্দের মতে জুমুআ দিবস যদি ঈদ হতে পারে, তাহলে মওলিদুন্নবী (দ:) দিবস কেন ঈদ হবে না? বস্তুতঃ তাঁর মীলাদ দিবস হলো সকল ঈদের সেরা, কেননা আমরা ক্বুরআন মজীদ ও খোদায়ী হেদায়াত তথা পথপ্রদর্শনের আশীর্বাদ লাভ করেছি (শুধুমাত্র) মহানবী (দ:)-এর আশীর্বাদপূর্ণ যাত/সত্তা মোবারকের মাধ্যমেই।

৫.৫ জুমুআ’ দিবসের মাহাত্ম্য: পয়গম্বর আদম (আ:)-এর সৃষ্টি হয় এদিনে

জুমুআ’ দিবস আপন বিশেষ গুরুত্ব ও শ্রেষ্ঠত্বের সুবাদে সপ্তাহের প্রধান দিন (সাইয়্যেদ আল-আইয়্যাম) হিসেবে অভিহিত হয়েছে। এই দিনে গোসল করা, নতুন বস্ত্র পরিধান করা এবং সুগন্ধি মাখা সুন্নাত। মুসলমানদেরকে ব্যবসা-বাণিজ্য, কর্মস্থল ছেড়ে মসজিদে জামাআতে নামায পড়তে যেতে হয়। মহানবী (দ:) তাঁর উম্মতদেরকে এই দিবসে তাঁর প্রতি সালাত-সালাম প্রেরণের জন্যে আদেশ করেছেন।

হযরত আওস ইবনে আওস (রা:) বর্ণনা করেন যে রাসূলুল্লাহ (দ:) এরশাদ ফরমান: “তোমাদের দিনগুলোর মধ্যে সেরা দিন হলো জুমুআ’ তথা শুক্রবার; এদিন পয়গম্বর আদম (আ:)-কে সৃষ্টি করা হয়, আর এই এক-ই দিন তিনি বেসালপ্রাপ্ত হন; এই দিন (পুনরুত্থানের জন্যে) শিঙ্গায় ফুঁক দেয়া হবে এবং বজ্রাঘাত করবে। অতএব, এই দিনে তোমরা আমার প্রতি ঘনঘন সালাত-সালাম পেশ করো, কেননা তোমাদের প্রেরিত সালাত-সালাম আমার কাছে পৌঁছুনো হবে” [আবূ দাউদ রচিত ‘অাল-সুনান’: কিতা’ব আস্ সালাহ (নামায/দুআ’র বই); ‘জুমুআ’/শুক্রবারের শ্রেষ্ঠত্ব’, ’জামাআতে নামাযের দিন’ এবং ‘শুক্রবারের রাত’-বিষয়ক অধ্যায়, ১:২৭৫ #১০৪৭; আবূ দাউদ প্রণীত ‘আল-সুনান’, ‘আবওয়াব আল-বিতর’ (বিতরের অধ্যায়গুলেো), ‘তওবা-সম্পর্কিত’ অধ্যায়, ২:৮৮ #১৫৩১; ইবনে মাজাহ কৃত ‘আল-সুনান: ‘কিতাব  আল-এক্বামা আল-সালাহ ওয়া সুন্না ফীহা (নামায ক্বায়েম-বিষয়ক বই ও তাতে নিহিত সুন্নাত), ‘শুক্রবারের শ্রেষ্ঠত্ব’ অধ্যায়, ১:৩৪৫ #১০৮৫; আল-নাসাঈ রচিত ‘আল-সুনান: কিতাব আল-জুমুআ’ (শুক্রবার সংক্রান্ত বই), ‘শুক্রবার দিনগুলোতে মহানবী (দ:)-এর প্রতি অত্যধিক সালাত-সালাম পেশ’ শীর্ষক অধ্যায়, ৩:৯১ #১৩৭৫; আল-নাসাঈ লিখিত ‘আল-সুনান আল-কুবরা’, ‘শুক্রবারে মহানবী (দ:)-এর প্রতি অত্যধিক সালাওয়াৎ পাঠের নির্দেশ’ শীর্ষক অধ্যায়, ১:৫১৯ #১৬৬৬; আল-দারিমী প্রণীত ‘আল-সুনান’, ১:৪৪৫ #১৫৭২; ইবনে আবী শায়বা কৃত ‘আল-মুসান্নাফ’, ২:২৫৩ #৮৬৯৭; আল-তাবারানী রচিত ‘আল-মু’জাম আল-কবীর’, ১:২১৬ #৫৮৯; আল-বায়হাক্বী লিখিত ‘আল-সুনান আল-কুবরা’, ৩:২৪৮ #৫৭৮৯; আল-বায়হাক্বী প্রণীত ‘আল-সুনান আল-সুগরা’, ১:৩৭২ #৬৩৪; এবং আল-হায়তামী রচিত ‘মাওয়ারিদ আল-যাম’আন ইলা যাওয়াঈদ ইবনে হিব্বান’, ১:১৪৬ #৫৫০]

জুমুআ’ হচ্ছে ঈদের দিন। অনেক মুহাদ্দেস আলেম এ কথা তাঁদের বইপত্রে উল্লেখ করেছেন:

১/ – ইমাম ইবনে মাজাহ (২০৯-২৭৩ হিজরী) বর্ণনা করেন যে হযরত আবদুল্লাহ ইবনে আব্বাস (রা:) রাসূলুল্লাহ (দ:)-এর কথা উদ্ধৃত করেন, যিনি বলেন: “নিশ্চয় এই দিনটি (জুমুআ’) ঈদ দিবস। আল্লাহ এটা মুসলমানদের জন্যে (ঈদ) করেছেন। যে ব্যক্তি জুমুআ’র (নামাযের) জামাআতে যায়, সে যেনো গোসল করে, আর সম্ভব হলে কিছু সুগন্ধি ব্যবহার করে; তবে মিসওয়াক তোমাদের জন্যে বাধ্যতামূলক।” [ইবনে মাজাহ কৃত ‘আল-সুনান: কিতাব এক্বামা আল-সালাহ’ (নামায ক্বায়েম-সম্পর্কিত বই), ‘জুমুআ’র দিনের শোভা বর্ধন’ শীর্ষক অধ্যায়, ১:৩৪৯ #১০৯৮; আল-তাবারানী প্রণীত ‘আল-মু’জাম আল-আওসাত’, ৭:২৩০ #৭৩৫৫; এবং আল-মুনযিরী লিখিত ‘আল-তারগীব ওয়াল তারহীব মিন আল-হাদীস আল-শরীফ’, ১:২৮৬ #১০৫৮]  

২/ – ইমাম আহমদ ইবনে হাম্বল (রহ:) হযরত আবূ হোরায়রা (রা:) হতে বর্ণনা করেন যে মহানবী (দ:) বলেন: “জুমুআ’র দিন হচ্ছে ঈদের দিন। অতএব, তোমাদের ঈদ দিবসকে রোযা রাখার দিন করো না, কেবল ওর আগের দিন বা পরের দিন রোযা রাখতে পারো।” [ইমাম আহমদ রচিত ‘আল-মুসনাদ’, ২:৩০৩ ও ৫৩২ #৮০১২ ও ১০,৯০৩; ইবনে খুযায়মা কৃত ‘আল-সহীহ’, ৩:৩১৫ ও ৩১৮ #২১৬১ ও ২১৬৬; ইবনে রাহওয়াইহ প্রণীত ‘আল-মুসনাদ’, ১:৪৫১ #৫২৪; এবং আল-হাকিম লিখিত ‘আল-মুসতাদরাক’, ১:৬০৩ #১৫৯৫]

৩/ – ইমাম ইবনে হিব্বান (২৭০-৩৫৪ হিজরী) বর্ণনা করেন আবূ আওবার (রহ:)-এর কথা, যিনি বলেন: “আমি হযরত আবূ হুরায়রা (রা:)-এর সাথে বসেছিলাম। এমন সময় এক ব্যক্তি তাঁর কাছে আগমন করেন এবং বলেন, ‘আপনি জুমুআ’র দিনগুলোতে রোযা রাখাকে নিষেধ করেছেন।’ তিনি উত্তর দেন, ‘অামি মানুষকে জুমুআ’র দিন রোযা রাখা হতে নিষেধ করিনি, কিন্তু আমি হুযূর পাক (দ:)-কে বলতে শুনেছি: শুক্রবার দিনগুলোতে রোযা রেখো না, কেননা তা ঈদের দিন; তবে তা (অন্যান্য) দিনের সাথে মিলিয়ে রাখতে পারো’।” [ইবনে হিব্বান রচিত ‘আল-সহীহ’, ৮:৩৭৫ #৩৬১০]

প্রশ্ন উঠতে পারে যে জুমুআ’ দিবসের এতো উচ্চমর্যাদা কেন? কেন-ই বা একে সপ্তাহের প্রধান দিন অভিহিত করা হয়েছে? এর উত্তর ওপরের হাদীসগুলোতে বিদ্যমান। জুমুআ’ দিবসের মাহাত্ম্য ও শ্রেষ্ঠত্বের কারণ ব্যাখ্যা করে রাসূলুল্লাহ (দ:) এরশাদ ফরমান: “ফীহি খুলিক্বা আদামু” – অর্থাৎ, “এই দিনে পয়গম্বর আদম (আ:)-কে সৃষ্টি করা হয়।”

শুক্রবার দিনটিতে মানবজাতির আদি পিতা পয়গম্বর আদম (আ:)-কে সৃষ্টি করা হয়। এটা তাঁরই মওলিদ/মীলাদের দিন, আর একে ঈদ হিসেবে ঘোষণা করা হয়েছে। যদি পয়গম্বর আদম (আ:)-এর মীলাদের দিন শুক্রবার হওয়ার দরুন সেটাকে সম্মান করা যায়, তাহলে সর্বশেষ পয়গম্বর হজরত রাসূলুল্লাহ (দ:)-এর মীলাদকে কেন সম্মান করা যাবে না? কেউ হয়তো বলতে পারেন যে পয়গম্বর আদম (আ:)-এর মীলাদ উদযাপিত হয় এ কারণে যে তাঁকে বিশেষ উপায়ে সৃষ্টি করা হয়েছিলো, কিন্তু আমাদের এ আলোচনার ওপর এর কোনো প্রভাব পড়বে না। এটা এ কারণে যে পয়গম্বর আদম (আ:)-কে শুক্রবার দিন সৃষ্টি করা হয়েছিলো যার ফলে ওই দিনটি সপ্তাহের প্রধান দিবসে পরিণত হয় – যেহেতু ওই দিনটি ছিলো প্রথম পয়গম্বর ও মানবজাতির আদি পিতা (আ:)-এর সৃষ্টির দিন। এরই ভিত্তিতে বলা চলে যেদিন প্রিয়নবী (দ:)-এর বেলাদত তথা ধরণীতলে শুভাগমন হয়, সেদিনটি হলো সকল ঈদের সেরা ঈদ। কেননা এই দিনেই জগতসমূহের প্রতি আল্লাহর অশেষ করুণা এবং সকল পয়গম্বরের সেরা পয়গম্বর ধরাধামে শুভাগমন করেন।

৫.৫.১ জুমুআ’ দিবস: (রাসূল-দ:-এর প্রতি) সালাওয়াত ও সালাম প্রেরণের দিন

জুমুআ’ তথা শুক্রবারের জন্যে নেয়া প্রস্তুতি মওলিদুন্নবী (দ:)-এর জন্যে নেয়া প্রস্তুতিরই অনুরূপ; যেমন গোসল গ্রহণ, সুগন্ধি মাখা এবং জামাআতে নামায আদায়ের উদ্দেশ্যে ব্যবসা-বাণিজ্য বা কর্মস্থল ত্যাগ করে মসজিদে গমন। হাদীসের বইপত্রে এগুলো ছাড়াও অন্যান্য আরো কিছু প্রস্তুতির উল্লেখ আছে। এসব অতিরিক্ত প্রস্তুতি মূলতঃ মহানবী (দ:)-এর সাথে সম্পৃক্ত; যথা – তাঁর প্রতি সালাত-সালাম প্রেরণ। এই দিনটিকে পয়গম্বর আদম (আ:)-এর মওলিদ দিবস হওয়ার কারণেই বেছে নেয়া হয়েছে। ইতিপূর্বে যেমনটি বলা হয়েছে, রাসূলুল্লাহ (দ:) এরশাদ ফরমান: “ফাআকসিরূ আলাইয়া মিনাস্ সলা-তি ফীহি” – অর্থাৎ, “অতএব, তোমরা এই দিনে আমার প্রতি বেশি বেশি বা ঘনঘন সালাত-সালাম প্রেরণ করো।”

এটাই হচ্ছে নবীপ্রেমিকদের প্রার্থনা সঙ্গীত; যাঁদের অন্তরে প্রিয়নবী (দ:)-এর প্রতি প্রকৃত ভালোবাসা আছে তাঁরা এই দিনে জমায়েত হয়ে সমবেতভাবে দুআ-দুরুদ পাঠ করেন। এই দিনে মীলাদুন্নবী (দ:)-এর বিশেষ মাহফিল অনুষ্ঠিত হয়ে থাকে; সালাত-সালাম পাঠের হালাক্বা/মজলিশ বসে। একদিকে এ দিনটিকে পয়গম্বর আদম (আ:)-এর মীলাদের দিবস বলে তাঁর প্রতি আরোপ করা হয়, অপরদিকে এটা প্রিয়নবী (দ:)-এর প্রতি সালাম-সালাম প্রেরণের দিন হিসেবেও ধার্য করা হয়। আর এক দিনেই দু জন পয়গম্বরের (আ:) প্রতি খুশি প্রকাশ করা হয়।

ওপরে উদ্ধৃত একই হাদীসে সাহাবা-এ-কেরাম (রা:) জিজ্ঞেস করেন: “এয়া রাসূলাল্লাহি! ওয়া কাইফা তু’রাদু সলা-তুনা আলাইকা ওয়া ক্বাদ আরিমতা?” অর্থাৎ, “হে আল্লাহর রাসূল, আমরা যে সালাত-সালাম আপনার প্রতি প্রেরণ করবো তা কীভাবে আপনার কাছে পেশ হবে যখন আপনি-ই বেসালপ্রাপ্ত?” এই প্রশ্নের জবাবে মহানবী (দ:) উত্তর দেন, “ইন্নাল্লাহা আযযা ওয়া জাল্লা হার্রামা আলাল্ আরদি আজসা-দাল্ আম্বিয়্যায়ি” – অর্থাৎ, “নিশ্চয় আল্লাহতা’লা পয়গম্বরবৃন্দের দেহ মোবারককে মাটির জন্যে হারাম করেছেন” (মানে মাটি গ্রাস করতে অক্ষম)। [ইমাম আবূ দাউদ রচিত ‘আল-সুনান’: ‘কিতাব আল-সালাত (দরুদের বই), ‘জুমুআ দিবসের মাহাত্ম্য ও জুমুআ’র রাত’ শীর্ষক অধ্যায়, ১:২৭৫ #১০৪৭; আবূ দাউদ কৃত ‘আল-সুনান’: আবওয়াব আল-বিতর’ (বিতরের অধ্যায়গুলো), ‘অনুতাপ’ শীর্ষক অধ্যায়, ২:৮৮ #১৫৩১; ইবনে মাজাহ প্রণীত ‘আল-সুনান’: কিতাব এক্বামা অাল-সালাহ ওয়া সুন্না ফীহা’ (সালাত ক্বায়েম ও তাতে নিহিত সুন্নাহ), ‘জুমুআ দিবসের মাহাত্ম্য’ শীর্ষক অধ্যায়, ১:৩৪৫ #১০৮৫; আল-নাসাঈ লিখিত ‘আল-সুনান’: ‘কিতাব আল-জুমুআ’ (জুমুআ দিবসের পুস্তক), ‘শুক্রবারে মহানবী (দ:)-এর প্রতি ঘনঘন/ বেশি বেশি সালাত-সালাম প্রেরণ’ শীর্ষক অধ্যায়, ৩:৯১ #১৩৭৫; আল-নাসাঈ রচিত ‘আল-সুনান আল-কুবরা’: ‘জুমুআ দিবসে রাসূল (দ:)-এর প্রতি বেশি বেশি সালাত-সালাম প্রেরণের আদেশ’ শীর্ষক অধ্যায়, ১:৫১৯ #১৬৬৬; আল-দারিমী কৃত ‘আল-সুনান’, ১:৪৪৫ #১৫৭২; ইবনে আবী শায়বা প্রণীত ‘আল-মুসান্নাফ’, ২:২৫৩ #৮৬৯৭; আল-তাবারানী লিখিত ‘আল-মুজাম আল-কবীর’, ১:২১৬ #৫৮৯; আল-বায়হাক্বী রচিত ‘আল-সুনান আল-কুবরা’, ৩:২৪৮ #৫৭৮৯; আল-বায়হাক্বী কৃত ‘আল-সুনান আল-সুগরা’, ১:৩৭২ #৬৩৪; এবং আল-হায়তামী প্রণীত ‘মাওয়ারিদ আল-যাম’আন ইলা যাওয়াঈদ ইবনে হিব্বান’, ১:১৪৬ #৫৫০]  

এ বর্ণনায় বোঝা যায়, প্রিয়নবী (দ:) তাঁর মহৎ সাহাবা (রা:)-বৃন্দকে জানিয়েছেন যে এ পৃথিবীতে তাঁর প্রকাশ্য জিন্দেগীর পরও তিনি (আপন রওযা পাকে) সশরীরে (এক রূহানী/আধ্যাত্মিক হায়াতে) জীবিত থাকবেন। অতএব, জুমুআ’ দিবসে ঘনঘন বা বেশি বেশি তাঁর প্রতি সালাত-সালাম প্রেরণের চর্চা গড়ে তোলা প্রত্যেকের জন্যে (অতীব) গুরুত্বপূর্ণ।

৫.৬ পয়গম্বর ঈসা (আ:)-এর জন্মস্থানের গুরুত্ব ও এর যেয়ারত  

হযরত আনাস বিন মালেক (রা:) বর্ণনা করেন যে মহানবী (দ:) মে’রাজ রজনীতে (ঊর্ধ্বাকাশে) ভ্রমণকালে হযরত জিবরাঈল ফেরেশতা (আ:) বেথলেহেম (বাইতে লাহাম) নামের জায়গায় থামেন এবং রাসূলুল্লাহ (দ:)-কে বোররাক্ব হতে অবতরণ করে নামায পড়ার জন্যে অনুরোধ করেন। নামায শেষ হলে জিবরাঈল আমীন (আ:) তাঁকে বলেন: “আতাদরী আয়না সল্লাইতা? সল্লাইতা বি-বাইতি লাহমি হাইসু উলিদা ঈসা” – অর্থাৎ, আপনি কি জানেন কোথায় নামায পড়েছেন? আপনি ‘বাইতে লাহাম’ স্থানে নামায পড়েছেন, যেখানে পয়গম্বর ঈসা (আ:)-এর বেলাদত হয়েছিলো। [নাসাঈ কৃত ‘আল-সুনান’: কিতাব আল-সালাহ (নামাযের বই), ‘নামাযের বাধ্যবাধকতা’ শীর্ষক অধ্যায়, ১:২২২ #৪৫০; আল-তাবারানী প্রণীত ‘মুসনাদ আল-শা’মিয়্যীন’, ১:১৯৪ #৩৪১। নিম্নের সংকলনগুলোতে এই বর্ণনা এসেছে শাদ্দাদ ইবনে আউস (রা:) হতে: আল-বাযযার রচিত ‘আল-বাহর আল-যুখা’র’ (আল-মুসনাদ), ৮:৪১০ #৩৪৮৪; আল-তাবারানী লিখিত ‘আল-মু’জাম আল-কবীর, ৭:২৮৩ #৭১৪২; আল-হায়তামী প্রণীত ‘মজমাউল যওয়া’ঈদ ওয়া মানবা’আ আল-ফওয়াঈদ’, ১:৭৩; এবং আল-আসক্বালানী কৃত ‘ফাতহুল বারী’, ৭:১৯৯] 

এই হাদীস থেকে বোঝা যায়, জুমুআ’ (শুক্রবার) যেমন পয়গম্বর আদম (আ:)-এর সৃষ্টির দিন হিসেবে সম্মান লাভ করেছে, তেমনি বেথলেহেমকেও সম্মানিত করা হয়েছে পয়গম্বর ঈসা (আ:)-এর জন্মস্থান হিসেবে – পয়গম্বরবৃন্দের (আ:) বেলাদতের সময় ও স্থান উভয়কেই করা হয়েছে সম্মানিত। হযরত ঈসা নবী (আ:)-এর বেলাদত (পয়দায়েশ) যেখানে হয়, সেই জায়গায় আমাদের মহানবী (দ:) নামায পড়েন, যেটা কোনো পয়গম্বর (আ:)-এর বেলাদতের স্থানকে সম্মান প্রদর্শনের গুরুত্ব সাব্যস্ত করে। এই কারণেই প্রিয়নবী (দ:)-এর অাশেক্ব-মণ্ডলী তাঁর বেলাদত স্থান যেয়ারত করে থাকেন। এমন এক সময় ছিলো যখন মক্কাবাসী মুসলমানবৃন্দ মওলিদ উদযাপনের উদ্দেশ্যে ওই পবিত্র স্থান হতে জুলূস-মিছিল বা শোভাযাত্রা বের করতেন। উপরন্তু, কোনো পয়গম্বর (আ:)-এর বেলাদত-স্থান যদি আশীর্বাদধন্য হতে পারে, যা ওপরোক্ত হাদীস দ্বারা সাবেত/প্রমাণিত, তাহলে মহানবী (দ:)-এর ধরণীতলে শুভাগমনের সন্ধিক্ষণ কেন আশীর্বাদধন্য হবে না?

৫.৭ মহানবী (দ:) নিজের বেলাদত-দিবস উদযাপন করেন রোযা পালনের মাধ্যমে

মওলিদুন্নবী (দ:)-এর বৈধতার ব্যাপারে এ প্রশ্ন উঠতে পারে যে, মহানবী (দ:) কি তাঁর নিজের মীলাদ দিবস উদযাপনের পক্ষে কোনো সুনির্দিষ্ট আদেশ বা দিকনির্দেশনা দিয়েছিলেন? এর উত্তর হ্যাঁ-সূচক হবে। মহানবী (দ:) আল্লাহতা’লার প্রতি কৃতজ্ঞতা প্রকাশের মাধ্যম হিসেবে নিজেই খুশি প্রকাশ করতেন; আর তিনি তাঁর মহান সাহাবা-বৃন্দ (রা:)-কে একই  রকম করতে উৎসাহিত করতেন। নিচের রওয়ায়াতটি অনুযায়ী সাবেত হয় যে প্রিয়নবী (দ:) তাঁর মওলিদের সময় রোযা রাখতেন।

ইমাম মুসলিম (২০৬-২৬১ হিজরী) বর্ণনা করেন আবূ ক্বাতাদা (রা:) হতে এই মর্মে যে, রাসূলুল্লাহ (দ:)-কে সোমবার দিন তাঁর রোযা রাখার ব্যাপারে জিজ্ঞেস করা হয়: “আন্না রাসূলাল্লাহি সুয়িলা ‘আন সওমিল ইসনাইনে”; [তিনি (উত্তরে) বলেন] “ফাক্বালা ফীহি উলিদতু ওয়া ফীহি উনযিলা ‘আলাইয়া” – অর্থাৎ, ওই দিনটিতে আমার বেলাদত (ধরাধামে শুভাগমন) হয়েছিলো এবং ওই দিনেই (নবী হিসেবে) আমার প্রতি ওহী নাযেল হয়।” [সহীহ মুসলিম: ‘কিতা’ব আল-সিয়া’ম’ (রোযা-সম্পর্কিত পুস্তক), ‘প্রতি মাসে তিন দিন রোযা রাখার কাম্যতা’ শীর্ষক অধ্যায়, ২:৮১৯ #১১৬২; আল-বায়হাক্বী কৃত ‘আল-সুনান আল-কুবরা’, ৪:২৮৬ #৩৮,১৮২। নিম্নের বর্ণনায় এই কথা বিদ্যমান: ‘ওই দিনে আমার প্রতি নবুওয়্যত অবতীর্ণ হয়’: আল-নাসাঈ প্রণীত ‘আল-সুনান আল-কুবরা’, ২:১৪৬ #২৭৭৭; আহমদ ইবনে হাম্বল রচিত ‘আল-মুসনাদ’, ৫:২৯৬-২৯৭ #২২,৫৯০-২২,৫৯৪; আবদুর রাযযাক্ব লিখিত ‘আল-মুসান্নাফ’, ৪:২৯৬ #৭৮৬৫; আবূ এয়া’লা কৃত ‘মুসনাদ’, ১:১৩৪ #১৪৪; আল-বায়হাক্বী প্রণীত ‘আল-সুনান আল-কুবরা’, ৪:৩০০ #৮২৫৯]      

সোমবার দিনটির বিশেষত্ব এই কারণে যে, এটা মহানবী (দ:)-এর আশীর্বাদধন্য বেলাদত দিবস। শরীয়তে এই দিনটির বিশেষ গুরুত্ব ও মাহাত্ম্য বিরাজমান। হুযূর পূর নূর (দ:) স্বয়ং এই দিনে কৃতজ্ঞতাস্বরূপ (নফল) রোযা রেখেছিলেন; আর এর দরুন এই আমল বা অনুশীলিত কর্মটি তাঁর উম্মতের জন্যে সুন্নাহ’র মর্যাদা পেয়েছে। এমন কি আজো এই সুন্নাহ পালনের জন্যে সারা বিশ্বজুড়ে মো’মেন মুসলমানবৃন্দ সোমবার দিন রোযা রেখে থাকেন।

দ্বীন-ইসলামে জন্ম দিবস উদযাপনের বিশেষ গুরুত্ব বিদ্যমান; যারা দাবি করেন যে ইসলাম ধর্মে জন্মদিনের কোনো তাৎপর্য নেই, তারা শরীয়তের শিক্ষাসমূহের ব্যাপারে একেবারেই অনবধান। প্রিয়নবী (দ:) এরশাদ ফরমান, “ওই দিন-ই আমার বেলাদত (ধরাধামে শুভাগমন) হয়েছিলো।” আর এ কথা বলে তিনি ইসলামে মীলাদ উদযাপনের একটি স্পষ্ট ধারণা দিয়েছেন। একইভাবে আল্-ক্বুরআন-ও পয়গম্বর (আ:)-বৃন্দের মীলাদ সম্পর্কে উল্লেখ করেছে, যা ইতিপূর্বেকার অধ্যায়গুলোতে ব্যাখ্যা করা হয়েছে। এ থেকে প্রতীয়মান হয় যে মহা পরাক্রমশালী আল্লাহতা’লা তাঁর পয়গম্বর (আ:)-বৃন্দের বেলাদত দিবসকে উচ্চপর্যায়ে মূল্যায়ন করেন। আমরা এই দৃষ্টিকোণ থেকে দেখলে দেখা যাবে যে নবী করীম (দ:)-এর মওলিদ সবচেয়ে উঁচু স্তরে অধিষ্ঠিত। এই দিনটি উদযাপনের বিভিন্ন পন্থা বিদ্যমান, যা ক্বুরআন ও সুন্নাহ দ্বারা সুপ্রতিষ্ঠিত। ওপরে বর্ণিত হাদীসে উল্লেখিত একটি উপায় হলো রোযা রাখা; তবে অন্যান্য পদ্ধতিও রয়েছে, যেমন – দান-সদকাহ ও খাদ্য বিতরণ। কোনো নেআমত/আশীর্বাদপ্রাপ্তির খাতিরে আল্লাহতা’লার কাছে কৃতজ্ঞতা জ্ঞাপন করার বিভিন্ন পদ্ধতি সম্পর্কে আমরা ইতিপূর্বেকার অধ্যায়ে অলোচনা করেছি।  

৫.৮ মহানবী (দ:) নিজের বেলাদত-দিবস উদযাপন করেন পশু কুরবানীর মাধ্যমে

আল্লাহতা’লার কাছে কৃতজ্ঞতা প্রকাশের মাধ্যম হিসেবে প্রিয়নবী (দ:) নিজের বেলাদত দিবস নিজেই পালন করেন। তিনি তাঁর মীলাদের উপলক্ষে একটি পশু ক্বুরবানী করেছিলেন এবং মেহমান খাইয়েছিলেন।

১/ – ইমাম বায়হাক্বী (৩৮৪-৪৫৮ হিজরী) হযরত আনাস বিন মালেক (রা:) হতে বর্ণনা করেন, যিনি বলেন: “ইন্নান্নাবি-ইয়্যা সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লামা ‘আক্কা ’আন নাফসিহি বা’আদান্নুবূও-ওয়াতি”; অর্থাৎ, ‘রাসূলুল্লাহ (দ:) নুবূওয়্যত ঘোষণার পর নিজের জন্যে একটি আক্বীক্বাহ পালন করেন।’ [আল-বায়হাক্বী প্রণীত ‘আল-সুনান আল-কুবরা’, ৯:৩০০ #৪৩; আল-মাক্বদিসী কৃত ‘আল-আহাদীস আল-মুখতারা’, ৫:২০৫ #১৮৩৩; আল-নববী রচিত ‘তাহযীব আল-আসমা’ ওয়াল-লুগা’ত’, ২:৫৫৭ #৯৬২; আল-আসক্বালানী লিখিত ‘ফাতহুল বারী’, ৯:৫৯৫; আল-আসক্বালানী প্রণীত ‘তাহযীব আত্ তাহযীব’, ৫:৩৪০ #৬৬১; এবং আল-মিযযী কৃত ‘তাহযীব আল-কামা’ল ফী আসমা’ আল-রিজা’ল’, ১৬:৩২ #৩৫২৩]

২/ – জিয়া’ আল-মাক্বদিসী (৫৬৯-৬৪৩ হিজরী) বর্ণনা করেন হযরত আনাস বিন মালেক (রা:)-এর কথা, যিনি বলেন: “ইন্নান্নাবি-ইয়্যা সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লামা ‘আক্কা ‘আন্ নাফসিহি বা’আদা মা বু’ঈসা নাবি-ইয়্যান্”; অর্থাৎ, ‘মহানবী (দ:) পয়গম্বর হিসেবে আবির্ভূত হওয়ার পর নিজের জন্যে আক্বীক্বা পালন করেন।’ [আল-মাক্বদিসী লিখিত ‘আল-আহাদীস আল-মুখতা’রা’, ৫:২০৫ #১৮৩২; আল-তাবারানী রচিত ‘অাল-মু’জাম আল-আওসাত’, ১:২৯৮ #৯৯৪; এবং আল-রূএয়ানী কৃত ‘মুসনাদ আল-সাহা’বা’, ২:৩৮৬ #১৩৭১]

৩/ – হযরত আবদুল্লাহ ইবনে আব্বাস (রা:) বর্ণনা করেন: “লাম্মা উলিদান্নাবিই-ইউ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লামা ’আক্কা ‘আনহু ‘আবদুল মুত্তালিবি বি কাবশিন্”; অর্থাৎ, ‘যখন রাসূলুল্লাহ (দ:)-এর বেলাদত তথা ধরাধামে শুভাগমন হয়, তখন আবদুল মুত্তালিব তাঁর পক্ষ হয়ে একটি মদ্দা ভেড়া ক্বুরবানী করেন।’ [ইবনে আসাকির রচিত ‘তারীখে দিমাশক্ব আল-কবীর’, ৩:৩২; আল-হালাবী লিখিত ‘ইনসান আল-‘উয়ূন ফী সীরা আল-আমীন আল-মা’মূন’, ১:১২৮; এবং আল-সুয়ুতী প্রণীত ‘কিফা’য়াত আল-তা’লিব আল-লাবীব ফী খাসা’ইস আল-হাবীব’, ১:১৩৪]   

৪/ – হযরত আবদুল্লাহ ইবনে আব্বাস (রা:) আরো বর্ণনা করেন: “ইন্না ‘আবদাল মুত্তালিবি জা’আলা লাহু মা’দুবাতা ইয়াওমা সা’বি’আতিন্’; অর্থাৎ, ‘হুযূর (দ:)-এর (আক্বীক্বার) খাতিরে আবদুল মুত্তালিব সপ্তম দিবসে এক মেজবান খানার বন্দোবস্ত করেন।’ [ইবনে আবদ আল-বার্র কৃত ‘আল-তামহীদ লিমা ফীল মুওয়াত্তা মিনাল মা’আনী ওয়াল-আসা’নীদ’, ২১:৬১; ইবনে আবদ আল-বার্র রচিত ‘আল-ইস্তি’আব ফী মা’রিফা আল-আসহা’ব’, ১:৫১; ইবনে হিব্বান প্রণীত ‘অাল-সিক্বা’ত’, ১:৪২; আল-ক্বুরতুবী লিখিত ‘আল-জামে’ লি-আহকামিল ক্বুরআন’, ২:১০০; এবং ইবনে আল-ক্বাইয়্যেম কৃত ‘যা’দ আল-মা’আদ ফী হুদা’ খায়র আল-’এবাদ’, ১:৮১]

মহানবী (দ:)-এর ধরণীতলে শুভাগমনের সপ্তম দিবসে তাঁর দাদা আবদুল মুত্তালিব কর্তৃক তাঁর পক্ষে আক্বীক্বা পালনের ব্যাপারে উলামাবৃন্দের মাঝে কোনো মতপার্থক্য নেই। হাদীসের আলোকে আক্বীক্বা হলো শিশুর মুক্তির একটি মাধ্যম। তাহলে এটা কীভাবে সম্ভব যে রাসূলুল্লাহ (দ:) নিজের আক্বীক্বা-ই চল্লিশ বছর পর্যন্ত পিছিয়ে দিয়েছিলেন? সামরা বিন জুনদুব (রা:) বর্ণনা করেন যে মহানবী (দ:) এরশাদ ফরমান: “কোনো শিশু তার আক্বীক্বা দ্বারাই মুক্তি লাভ করে। (তাই) তার পক্ষে সপ্তম দিবসে একটি ক্বুরবানী দেয়া উচিত।” [আল-তিরমিযী রচিত ‘আল-জা’মে’ আল-সহীহ’: কিতা’ব আল-আদা’হী’ (পশু ক্বুরবানী পুস্তক), ‘আক্বীক্বা’ অধ্যায়, ৪:১০১ #১৫২২; আবূ দাউদ কৃত ‘আল-সুনান’: কিতা’ব আল-দাহা’ইয়্যা (পশু ক্বুরবানীর বই), ‘আক্বীক্বা’ অধ্যায়, ৩:১০৬ #২৮৩৭; এবং ইবনে মা’জাহ লিখিত ‘আল-সুনান’: ‘কিতা’ব আল-যাবা’ইহ্ (পশু জবাই-সংক্রান্ত পুস্তক), ‘আক্বীক্বা’ অধ্যায়, ২:১০৫৬ #৩১৬৫]      

কেউ হয়তো প্রশ্ন করতে পারেন, মহানবী (দ:) তাঁর নুবূওয়্যত লাভের পর কোন্ আক্বীক্বা পালন করেছিলেন? যেহেতু আক্বীক্বা দু বার পালন করা হয় না, সেহেতু এক্ষেত্রে প্রিয়নবী (দ:) নিজ বেলাদত উপলক্ষে খুশি প্রকাশের উদ্দেশ্যে একটি পশু ক্বুরবানী করেন; সর্বশক্তিমান আল্লাহর প্রতি কৃতজ্ঞতা প্রদর্শনের জন্যে তিনি একটি মেজবান খাওয়ানোর আয়োজন করেন। কিছু লোক হয়তো বলতে পারেন, এটা ছিলো স্রেফ একখানি আক্বীক্বা যা তিনি পালন করেছিলেন। আমাদের যদি এটাকে আক্বীক্বা হিসেবে ধরতেই হয়, তাহলে প্রশ্ন দাঁড়ায়: আক্বীক্বা মানে কী? বস্তুতঃ এই আক্বীক্বা আপনাআপনি-ই কোনো শিশুর জন্মোপলক্ষে খুশি প্রকাশ ও (আল্লাহর প্রতি) শোকরিয়া/কৃতজ্ঞতা জ্ঞাপনকে বোঝায়। এটাকে কেউ যে নামে ডাকতে চান ডাকতে পারেন, তবে বিষয়বস্তু একই থাকবে; অর্থাৎ, কোনো ব্যক্তির জন্মোপলক্ষে খুশি প্রকাশ করা।

ইমাম জালালউদ্দীন সৈয়ূতী (৮৪৯-৯১১ হিজরী) তাঁর লেখা ‘হুসনু আল-মাক্বসিদ ফী ‘আমল আল-মওলিদ’ পুস্তকের ৬৪-৬৫ পৃষ্ঠায় হাফেয ইবনে হাজর আসক্বালানী (৭৭৩-৮৫২ হিজরী) প্রদত্ত প্রামাণ্য দলিলের সমর্থনে মওলিদুন্নবী (দ:)-এর বৈধতার পক্ষে নিজস্ব একটি মজবুত দলিল পেশ করেন; তিনি লেখেন: ”(এর উদযাপনের) আরেকটি ভিত্তি আলোতে এসেছে, যা বর্ণনা করেছেন ইমাম বায়হাক্বী (রহ:) সাহাবী হযরত আনাস (রা:) হতে; তিনি বলেন যে রাসূলুল্লাহ (দ:) তাঁর নুবূওয়্যত ঘোষণা করার পরে নিজের জন্যে একটি আক্বীক্বা করেন, যদিও (বাস্তব) ঘটনা হলো তাঁর দাদা ‘আবদুল মুত্তালিব তাঁরই বেলাদত তথা ধরণীতলে শুভাগমনের সপ্তম দিবসে তাঁর পক্ষে একটি আক্বীক্বা পালন করেছিলেন। আক্বীক্বা দ্বিতীয়বার পালন করা হয় না। এ থেকে সিদ্ধান্ত নেয়া যায় যে, মহানবী (দ:)-কে বিশ্বজগতের জন্যে খোদায়ী রহমত/করুণা ও উম্মতের জন্যে মহাসম্মান হিসেবে প্রেরণের খাতিরে তিনি আল্লাহতা’লার প্রতি কৃতজ্ঞতার বহিঃপ্রকাশস্বরূপ ওই আমলটি পালন করেন। অতএব, আমাদের জন্যে এটা প্রশংসনীয় হবে যে আমরা-ও নিজেদের কৃতজ্ঞতা ও খুশি প্রকাশের উদ্দেশ্যে সমবেত হই, খাদ্য বিতরণ করি এবং অনুরূপ ভক্তিমূলক/পুণ্যদায়ক কাজ করি।” [আল-সৈয়ূতী প্রণীত ‘হুসনু আল-মাক্বসিদ ফী ‘আমল আল-মওলিদ’, ৬৪-৬৫ পৃষ্ঠা; আল-সৈয়ূতী কৃত ‘আল-হাউয়ী লি আল-ফাতাওয়া’, ২০৬ পৃষ্ঠঅ; আল-সালেহী রচিত ‘সুবুল আল-হুদা ওয়া আল-রাশাদ ফী সীরা খায়র আল-’এবাদ’, ১:৩৬৭; আল-যুরক্বানী লিখিত ‘শরহে আল-মাওয়াহিব আল-লাদুনিয়া বি আল-মিনাহ আল-মুহাম্মাদীয়্যা’, ১:২৬৩-২৬৪; এবং আল-নাবাহানী প্রণীত ‘হুজ্জাত আল্লাহ ‘অালাল আলামীন ফী মু’জেযাত সাইয়্যেদ আল-মুরসালীন’, ২৩৭ পৃষ্ঠা]

ইমাম জালালউদ্দীন সৈয়ূতী (রহ:) স্বয়ং এই প্রশ্নটি অন্তরে পোষণ করেন এবং এর উত্তরে বলেন যে বাস্তবে এটা কোনো আক্বীক্বা ছিলো না। এমন কি মূল লিপিতেও যদি এ কথা বিবৃত হয় যে আক্বীক্বা পালিত হয়েছিলো, তবুও আমাদের বুঝতে হবে যে শব্দটির পারিভাষিক অর্থ এতে ঊহ্য নেই। এর সহজ মানে হলো প্রিয়নবী (দ:)-এর বেলাদত উপলক্ষে খুশি প্রকাশ করতে একটি পশু ক্বুরবানী করা হয়েছিলো। এটার কারণ ছিলো মহানবী (দ:)-এর দাদা আবদুল মুত্তালিব ইতোমধ্যেই তাঁর নাতির বেলাদতের সপ্তম দিবসে আক্বীক্বা করেছিলেন। ইমাম জালালউদ্দীন সৈয়ূতী (রহ:) তাঁর কথার সপক্ষে যুক্তিস্বরূপ বিবৃত করেন যে আক্বীক্বা জীবনে স্রেফ একবারই পালন করা হয়, দু বার নয়।

কেউ হয়তো আপত্তি করতে পারেন এ কথা বলে, ’আমরা যদি ধরেও নেই রাসূলুল্লাহ (দ:)-এর দাদা তাঁর পক্ষে আক্বীক্বা পালন করেছিলেন, তথাপিও আমরা তা গ্রহণ করতে পারি না; কেননা তা আইয়ামে জাহেলীয়াত তথা অন্ধকার যুগে পালিত হয়েছিলো। এই কারণেই মহানবী (দ:) তা দ্বিতীয় দফা পালন করেন।’ বস্তুতঃ এই আপত্তির কোনো বৈধ ভিত্তি নেই। যদি তা বৈধ হতো, তাহলে রাসূলুল্লাহ (দ:)-এর সাথে তাঁর স্ত্রী হযরত খাদিজা (রা:)-এর বিয়েও বৈধ নয় বলে আমাদের স্বীকার করতে হতো। এই বিয়ের মহরানা আবূ তালেব পরিশোধ করেন। আক্বীক্বা স্রেফ দান-সদকাহ’রই একটি আমল, অপর দিকে বিয়ে হচ্ছে স্বামী-স্ত্রী দু জনের মাঝে একটি চুক্তিনামা। এই আপত্তি যদি সঠিক হতো, তাহলে মহানবী (দ:) ও হযরত খাদিজা (রা:)-এর মধ্যকার বৈবাহিক চুক্তিনামাও পুনরায় নবায়ন করতে হতো, আর এর পাশাপাশি মহরানাও পুনর্নির্ধারণ করতে হতো। এই আপত্তি অগ্রাহ্য করার কারণ হলো, অন্ধকার যুগে ঘটে যাওয়া যে কোনো অনুমতিপ্রাপ্ত কাজ শরীয়তে গৃহীত। শরীয়তের বিধি-নিষেধ বলবৎ হয় কেবল তা প্রকাশ হওয়ার পরই।

“(এই আদেশের) আগে যা হয়ে গিয়েছে (তা মাফ)” – সূরা নিসা’র (২২ নং) এই আয়াত অনুযায়ী, ইসলাম ধর্মে অন্ধকার যুগের যে কোনো ভুল কাজকে ক্ষমা করা হয়েছে। এ ধরনের প্রত্যেকটি পাপ/ভুল হতে আলাদাভাবে তওবা (অনুতাপ প্রকাশ) করার কোনো প্রয়োজন নেই। অনুরূপভাবে, ওই সময় সংঘটিত সকল প্রশংসনীয় কাজ, যেমন বিয়ে-শাদী, আক্বীক্বা, শপথ ইত্যাদি বহাল আছে এবং সেগুলো বাতিল হয়নি। এ কারণেই ইমাম সৈয়ূতী (রহ:) বিবৃত করেন যে শরীয়তে কোনো বৈধ প্রয়োজনীয়তা না থাকার দরুন আক্বীক্বা দু বার করার দরকার নেই। অতএব, এই গোটা আলোচনা থেকে এব্যাপারে নিশ্চিত হওয়া যায় যে মহানবী (দ:) তাঁর নুবূওয়্যত ঘোষণার পর নিজের বেলাদত উপলক্ষে খুশি ও কৃতজ্ঞতা প্রকাশের উদ্দেশ্যে একটি পশু ক্বুরবানী করেছিলেন।

ওপরে পেশকৃত প্রামাণিক দলিল হতে এটা স্পষ্ট যে মওলিদুন্নবী (দ:) উদযাপন করা আল্লাহতা’লা, মহানবী (দ:) ও তাঁর মহৎ সাহাবাবৃন্দ (রা:)-এর সুন্নাত। এই কারণে মুহাদ্দেসীনে কেরাম (রহ:) ও আউলিয়া-দরবেশবৃন্দ (রহ:) এটার গুণাবলী ও ফায়দাগুলোর ওপর আলোকপাত করেছেন, যেমনটি সীরাহ ও ইতিহাসের বিভিন্ন বইপত্রে বিস্তারিত ব্যাখ্যা করা হয়েছে। এই প্রসঙ্গে ইমাম বুখারী (১৯৪-২৫৬ হিজরী) তাঁর ‘সহীহ’ গ্রন্থের ‘কিতা’ব আল-নিকা’হ’ অধ্যায়ে একটি বিখ্যাত ঘটনা বর্ণনা করেছেন। তবে এ ঘটনা সম্পর্কে আলোচনার আগে কোনো অবিশ্বাসী পরকালে তার কর্মফলের দ্বারা উপকার পায় না মর্মে ক্বুরআন, সুন্নাহ ও উম্মতের (উলামাদের) এজমা’ তথা ঐকমত্য হতে গৃহীত একটি মূলনীতিকে প্রতিষ্ঠা করা জরুরি হবে: অর্থাৎ, তার সৎকর্মের কোনো প্রতিদান নেই, আর তার শাস্তিও লাঘব করা হবে না। তার সৎকর্মের প্রতিদান এ জগতেই সে পাবে [ইমাম আসক্বালানী প্রণীত ‘ফাতহুল বারী’, ৯:১৪৫; এবং আল-আইনী কৃত ‘উমদাত আল-ক্বারী শরহে সহীহ আল-বুখারী’, ২০:৯৫; এ সম্পর্কে আল-ক্বুরআনে এরশাদ হয়েছে: ‘যে ব্যক্তি পার্থিব জীবন ও সেটার সাজ-সজ্জা কামনা করে, আমি তাতে তাদের (কৃতকর্মের) পূর্ণ ফল দিয়ে দেবো এবং এর মধ্যে কম দেবো না। এরা হচ্ছে ওইসব লোক, যাদের জন্যে পরলোকে কিছু নেই, কিন্তু আগুনই; এবং নিষ্ফল হয়েছে যা কিছু ওখানে করতো এবং বিলীন হয়েছে যা তাদের কৃতকর্ম ছিলো (১১:১৫-১৬)। অন্যত্র এরশাদ হয়েছে: ’এবং যারা কাফির হয়েছে তাদের কর্ম এমনই, যেমন কোনো মরুভূমিতে রোদে চমকিত বালু; পিপাসার্ত সেটাকে পানি মনে  করে। (একইভাবে পরলোকে) শেষ পর্যন্ত যখন সেটার কাছে আসলো তখন দেখতে পেলো সেটা কিছুই নয় এবং আল্লাহকে নিজের কাছে পেলো। অতঃপর তিনি তার হিসেব পূর্ণমাত্রায় দিলেন; এবং আল্লাহ দ্রুত হিসেব গ্রহণ করেন‘ (২৪:৩৯)। আরো এরশাদ হয়েছে: ‘এবং যা কিছু তারা কাজ করেছিলো, আমি ইচ্ছা করে সেগুলোকে ক্ষুদ্র ক্ষুদ্র ধূলিকণার বিক্ষিপ্ত অণু-পরমাণু করে দিয়েছি, যা ভেন্টিলেটরের মধ্য দিয়ে পতিত আলোকরশ্মিতে দৃষ্টিগোচর হয়’ (২৫:২৩)]। পরকালে প্রতিদানের সুবিধা স্রেফ মুসলমানদেরই প্রাপ্য হবে, কেননা তাঁরাই আল্লাহতা’লার প্রতি প্রকৃত বিশ্বাস স্থাপন করেছেন (মানে ঈমান এনেছেন) [এ সম্পর্কে ক্বুরআন মজীদে ঘোষিত হয়েছে: ‘তারা আনন্দ উদযাপন করে আল্লাহর নি’মাত ও অনুগ্রহের প্রতি এবং এ জন্যে যে, আল্লাহ মুসলমানদের প্রতিদান বিনষ্ট করেন না। ওই সব লোক, যারা আল্লাহ ও রসূলের আহ্বানে সাড়া দিয়ে হাজির হয়েছে এরপর যে, তারা জখমপ্রাপ্ত হয়েছিলো; তাদের মধ্যকার নেককার (তথা পুণ্যবান) ও পরহেযগারদের জন্যে মহা সওয়াব রয়েছে’ (৩:১৭১-২)। অন্যত্র এরশাদ হয়েছে: ‘এবং আমি সৎকর্মপরায়ণদের শ্রমফল বিনষ্ট করি না। এবং নিশ্চয় পরকালের পুরস্কার তাদের জন্যে উত্তম, যারা ঈমান এনেছে এবং পরহেযগার রয়েছে’ (১২:৫৬-৭)। আরো এরশাদ হয়েছে: ‘নিশ্চয় যারা ঈমান এনেছে এবং সৎকর্ম করেছে, আমি তাদের শ্রমফল বিনষ্ট করি না’ (১৮:৩০)। আরো এরশাদ হয়েছে: ‘এবং শেষ ময়দান পরগেযগারদের হাতে’ (৭:১২৮) এবং ’পরকালের শুভ-পরিণাম খোদাভীরুদেরই’ (২৮:৮৩)]

চলুন, এবার আমরা ইমাম বুখারী (রহ:)-এর সেই রওয়ায়াত বা বর্ণনার দিকে দৃষ্টিপাত করি। রাসূলুল্লাহ (দ:)-এর চাচাদের মধ্যে একজন, আবূ লাহাব, যে অবিশ্বাসী হিসেবে মারা গিয়েছিলো, তার কথা এতে উল্লেখিত আছে। আবূ লাহাব প্রিয়নবী (দ:)-এর বেলাদত তথা ধরাধামে শুভাগমন উপলক্ষে খুশি প্রকাশ করেছিলো; আর এরই ফলশ্রুতিতে আল্লাহতা’লা তাকে পরলোকে ফায়দা দান করেন, যদিও সে দ্বীন-ইসলামের সবচেয়ে বড় একজন শত্রু ছিলো। এই ব্যক্তি এমন-ই চরমভাবে লা’নত/অভিসম্পাতপ্রাপ্ত যে ক্বুরআন মজীদের একটি (গোটা) সূরা তারই সম্পর্কে নাযেল হয়েছে: “ধ্বংস হোক আবূ লাহাবের দু হাত এবং সে ধ্বংস হয়েই দিয়েছে। তার কোনো কাজে আসেনি তার সম্পদ এবং না কাজে এসেছে যা সে উপার্জন করেছিলো। এখন ধ্বসে যাচ্ছে লেলিহান আগুনে।” [আল্-ক্বুরআন, ১১১:১-৩]  

এই বিখ্যাত ঘটনাটি ঘটেছিলো হুযূর পাক (দ:)-এর বেলাদত শরীফের আগে এবং এটা হাদীস শরীফের বইপত্রে লিপিবদ্ধ আছে। সুওয়াইবিয়া নামে আবূ লাহাবের এক দাসী মা আমিনা’র ডেলিভারীর সময় তাঁর খেদমতে ছিলেন। মহানবী (দ:)-এর বেলাদত শরীফ হলে পরে সুওয়াইবিয়া দৌড়ে আবূ লাহাবের কাছে তার ভাতিজার বেলাদতের সুখবরটি পৌঁছে দিতে যান। এই খোশ-খবরী শুনে অাবূ লাহাব আনন্দে আপ্লুত হয় এবং তার দুই আঙ্গুলের ইশারায় সুওয়াইবিয়াকে (দাসত্ব থেকে) মুক্ত করে দেয়।

দ্বীন-ইসলাম (ইসলাম ধর্ম) গ্রহণ না করে আবূ লাহাব মারা যওযার পরে প্রিয়নবী (দ:)-এর চাচা হযরত আব্বাস (রা:) তাকে স্বপ্নে দেখেন এবং তার অবস্থা সম্পর্কে তাকে জিজ্ঞেস করেন। সে উত্তর দেয় যে রাত-দিন তাকে শাস্তি পেতে হয়, তবে সোমবার দিনগুলোতে তার শাস্তি লাঘব হয় এবং তার আঙ্গুলগুলো হতে তার জন্যে স্বস্তিদায়ক পানি নির্গত হয়। সোমবার দিনগুলোতে শাস্তি লাঘবের কারণ হলো, ওই দিন তার ভাতিজা হযরত মুহাম্মাদুর রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহে ওয়া সাল্লামের বেলাদত তথা ধরণীতলে শুভাগমনের সুসংবাদ শুনে সে আনন্দিত হয়ে ওই সুখবর বয়ে আনা দাসী সুয়াইবিয়াকে দুই আঙ্গুলের ইশারায় মুক্ত করে দিয়েছিলো।

এই ঘটনা বর্ণনা করেন হযরত যাইনাব বিনতে আবী সালামা (রা:), আর অনেক মুহাদ্দেসীন উলামা এটা রওয়ায়াত করেন। ইমাম বুখারী (রা:) তাঁর ‘আল-সহীহ’ পুস্তকে বর্ণনা করেন: “আবূ লাহাব যখন মারা যায়, তখন তার পরিবারসদস্যদের কেউ কেউ তাকে (স্বপ্নে) কঠিন মসীবতে দেখতে পান। তারা তাকে জিজ্ঞেস করেন, ‘তোমার কী পরিণতি হয়েছে?’ আবূ লাহাব উত্তর দেয়, ‘তোমাদের ছেড়ে আসার পর আমার কোনো ভালাই হয়নি, স্রেফ (মহানবী সাল্লাল্লাহু আলাইহে ওয়া সাল্লামের বেলাদত উপলক্ষে আনন্দিত হওয়ার সূত্রে আঙ্গুলের ইশারায়) সুয়াইবিয়াকে মুক্ত করে দেয়ার কর্মের দরুন আমার তেষ্টা (পানি দ্বারা) মেটানো হয়’।” [আল-বুখারী প্রণীত ‘সহীহ বুখারী’: ‘কিতাব আল-নিকাহ’ (বিয়ে-শাদীর পুস্তক), ‘এবং আপনার লালন-পালনকারিনী মায়েরা’ শীর্ষক অধ্যায়, ৫:১৯৬১ #৪৮১৩; আবদুর রাযযাক্ব কৃত ‘আল-মুসান্নাফ’, ৭:৪৭৮ #১৩,৯৫৫; আবদুর রাযযাক্ব লিখিত ‘আল-মুসান্নাফ’, ৯:২৬ #১৬,৩৫০; আল-মারূযী রচিত ‘আল-সুন্নাহ’, ৮২ পৃষ্ঠা #২৯০; আল-বায়হাক্বী প্রণীত ‘আল-সুনান আল-কুবরা’, ৭:১৬২ #১৩,৭০১; আল-বায়হাক্বী রচিত ‘শু’আব আল-ঈমান’, ১:২৬১ #২৮১; আল-বায়হাক্বী লিখিত ‘দালায়েল আল-নবুওয়্যা ওয়া মা’রেফা আহওয়াল সাহেব আল-শরীয়া’(দ:), ১:১৪৯; ইবনে সাআদ কৃত ‘আল-তাবাক্বাত আল-কুবরা’, ১:১০৮; ইবনে আবী দুনইয়া নিজ প্রণীত ‘কিতাব আল-মানা’মাত’, ১৫৪ পৃষ্ঠা, #২৬৩ পুস্তকে ‘হাসান’ এসনাদে এটা বর্ণনা করেন; আল-বাগাবী রচিত ‘শরহে সুন্নাহ’ ৯:৭৬ #২২৮২; ইবনে জাওযী লিখিত ‘সাফওয়া আল-সাফওয়া’, ১:৬২; আল-সুহায়লী কৃত ‘আল-রওদ আল-উনুফ ফী তাফসীর আল সীরা’ আল-নববীয়া লি ইবনে হিশাম’, ৩:৯৮-৯৯; আল-যায়লাঈ প্রণীত ‘নসব আল-রা’য়া লি-আহাদীস আল-হিদায়া’, ৩:১৬৮; ইবনে আসা’কির রচিত ‘তারীখে দিমাশক্ব আল-কবীর’ ৬৭:১৭১-৭২; ইবনে কাসীর লিখিত ‘আল-বেদায়া ওয়াল-নেহায়া’, ২:২২৯-২৩০; আল-আসক্বালানী কৃত ‘ফাতহুল বারী’, ৯:১৪৫; আল-আইনী প্রণীত ‘উমদাত আল-ক্বারী শরহে সহীহ আল-বুখারী’, ২০:৯৫; আল-শায়বানী রচিত ‘হাদায়েক্ব আল-আনওয়ার’, ১:১৩৪; আল-আমিরী লিখিত ‘শরহে বাহজাত আল-মাহা’ফিল’, ১:৪১; এবং আনওয়ার শাহ কাশমিরী কৃত ‘ফায়দ আল-বারী ’আলা সহীহ আল-বুখারী’, ৪:২৭৮]  

ওপরের রওয়ায়াত/বর্ণনাটি যদিও ‘মুরসাল’ (নিচে ‘নোট’ দেখুন), তবুও এটা গৃহীত; কেননা এর বর্ণনাকারী ইমাম বুখারী (১৯৪-২৫৬ হিজরী) নিজ ’সহীহ’ গ্রন্থে এটা লিপিবদ্ধ করেছেন। আর অনেক মুহাদ্দেসীন উলামা এর ওপর নির্ভর করেছেন, যা এর নির্ভরযোগ্যতার সাক্ষ্য বহন করছে। উপরন্তু, এই বর্ণনাটি হালাল (বৈধ) বা হারাম (অবৈধ)-সম্পর্কিত নয়; বরঞ্চ এর বিষয়বস্তু ধর্মীয় পুণ্য-সংক্রান্ত। পুণ্য-সংক্রান্ত বিষয়গুলো নির্ধারণের মানদণ্ড হতে হালাল-হারাম বিষয়গুলো প্রমাণের জন্যে প্রয়োজনীয় মানদণ্ডের পার্থক্য সম্পর্কে উলামাবৃন্দ সম্যক অবগত। [নোট: উসূলে হাদীস তথা হাদীস-মৌলনীতিবিষয়ক শাস্ত্রে ’মুরসাল’ হচ্ছে এমন হাদীস যার সনদ (পরম্পরা) তাবেঈ তথা সাহাবাবৃন্দের পরবর্তী প্রজন্ম পর্যন্ত ফেরত পৌঁছেছে; কিন্তু এই সনদে সাহাবাবৃন্দের নামের উল্লেখ নেই (আল-যাহাবী রচিত ‘আল-মূ’ক্বিযা, ৩৮ পৃষ্ঠা; ইবনে কাসীর প্রণীত ‘অাল-বায়েস্ অাল-হাসীস’, ৪৮ পৃষ্ঠা; ইবনে হাজর আসক্বালানী কৃত ‘শরহে নুখবা আল-ফিকর’, ৩৬-৩৭ পৃষ্ঠা; এবং আল-সাখাভী লিখিত ‘আল-গায়্যা ফী শরহে আল-হেদায়া’, ১:২৭২)। এব্যাপারে সিদ্ধান্ত হলো, কোনো কর্তৃত্বশীল তাবেঈর কাছে ফেরত গিয়ে যদি বর্ণনার সনদ শেষ হয়, তাহলে তা দলিল হিসেবে গৃহীত হবে (আল-যাহাবী, ‘আল-মু’ক্বিযা’, ৩৯ পৃষ্ঠা)। মযহাবের তিন ইমাম, যথা সর্ব-ইমাম আবূ হানীফা (রহ:), মালেক (রহ:) ও আহমদ (রহ:) এবং মুহাদ্দেসীন উলামাবৃন্দের সংখ্যাগরিষ্ঠের মতানুযায়ী মুরসাল হাদীস গৃহীত হওয়ার শর্ত এই যে, যিনি এটা সাহাবী (রা:)-এর নাম বাদ দিয়ে বর্ণনা করেন, তাঁকে নির্ভরযোগ্য হতে হবে এবং যাঁর (অর্থাৎ, যে সাহাবীর) কাছ থেকে তিনি এটা গ্রহণ করেছেন, তাঁকেও নির্ভরযোগ্য হতে হবে (আল-সাখাভী, ‘আল-গায়্যা ফী শরহে আল-হেদায়া’, ১:২৭৩; ইবনে কাসীর, ‘আল-বায়েস্ আল-হাসীস’, ৪৮ পৃষ্ঠা; এবং আবদুল হক্ক মুহা্দ্দিসে দেহেলভী, ‘মুক্বাদ্দেমা ফী উসূলিল হাদীস’, ৪২-৪৩ পৃষ্ঠা)। তাঁদের (মুহাদ্দেসীনের) প্রমাণ হচ্ছে কোনো তাবেঈর সম্পৃক্ততা এখানে নিশ্চিত হওয়াটা, আর তাবেঈ একথা বলবেন না, ‘রাসূল (দ:) বলেছেন’, কিংবা ‘মহানবী (দ:) করেছেন’, অথবা ‘হুযূরের (দ:) উপস্থিতিতে এই ঘটনা ঘটেছিলো’, যতোক্ষণ না তাঁরা (মুহাদ্দেসীন) এটা কোনো নির্ভরযোগ্য বর্ণনাকারীর কাছ থেকে প্রাপ্ত হন। ইবনে হাজর আসক্বালানী (রহ:) তাঁর ‘নুযহা আল-নযর বি-শরহে নুখবা আল-ফিকর’ (৩৭ পৃষ্ঠা) গ্রন্থে লেখেন: “ইমাম আহমদ (রহ:)-এর একটি বক্তব্য এবং মালেকী ও হানাফী মযহাবের (অন্তর্ভুক্ত) ইমামমণ্ডলীর সিদ্ধান্ত মোতাবেক এটা নিঃশর্তভাবে গৃহীত। ইমাম শাফেঈ (রহ:)-এর দৃষ্টিতে তা যদি অন্য আরেকটি সনদে সমর্থিত হয় – সেটা সংযুক্ত হোক বা মুরসালই হোক – তাহলে তা গৃহীত হবে।” মোল্লা আলী ক্বারী (ইন্তেক্বাল: ১০১৪ হিজরী) নিজ ‘শরহে শরহে নুখবা আল-ফিকর’ পুস্তকে বলেন: “ইবনে জরীর তাবারী বর্ণনা করেন যে তাবেঈনদের মাঝে এটা গ্রহণযোগ্য হওয়ার ব্যাপারে এজমা’ তথা ঐকমত্য প্রতিষ্ঠিত হয়েছে। তাঁদের কাছ থেকে বা ২০০ হিজরী পর্যন্ত তাঁদের পরবর্তী সময়ে আগত ইমামবৃন্দের কাছ থেকেও এর অগ্রহণযোগ্যতার পক্ষে কোনো বর্ণনা নেই। আর তাঁরা হলেন সেরা প্রজন্মসমূহ, যাঁদের ধার্মিকতা সম্পর্কে (স্বয়ং) রাসূলুল্লাহ (দ:)-ই সাক্ষ্য দিয়েছেন।”]     

এই রওয়ায়াত (মানে আবূ লাহাবের ঘটনার বর্ণনা)-কে মওলিদুন্নবী (দ:) উদযাপনের পক্ষে দলিল হিসেবে যে সকল উলামা-এ-কেরাম গ্রহণ করেছেন, নিম্নে তাঁদের ফতোয়াসমূহের একটি সংকলন পেশ করা হলো:

১/ – হাফেয শামস আল-দ্বীন মুহাম্মদ বিন আব্দিল্লাহ আল-জাযারী (জন্ম: ৬৬০ হিজরী) যিনি ‘উরফ আল-তা’রীফ বিল-মওলিদ আল-শরীফ’ গ্রন্থের প্রণেতা, তিনি লেখেন: “অবিশ্বাসী আবূ লাহাব যার শাস্তির বর্ণনায় ক্বুরঅান মজীদে (সূরা) নাযেল/অবতীর্ণ হয়েছে, সে যদি মহানবী (দ:)-এর বেলাদত শরীফের রাতে খুশি প্রকাশের কারণে স্বস্তি পেতে পারে, তাহলে ওই মুসলিমের কী অবস্থা হবে যিনি আল্লাহর একত্ববাদে বিশ্বাস স্থাপনকারী ও উম্মতে মুহাম্মদী (দ:)-এর সদস্য হিসেবে রাসূলুল্লাহ (দ:)-এর বেলাদত শরীফে খুশি প্রকাশ করেন এবং তাঁরই মহব্বতে আপন সামর্থ্য অনুযায়ী ব্যয় করেন? আমার জীবনের শপথ, তাঁর পুরস্কার রয়েছে পরম করুণাময় আল্লাহরই তরফ থেকে, আর তিনি আল্লাহরই অনুগ্রহে বেহেশতের বাগানে প্রবেশ করবেন।” [আল-সৈয়ূতী, ‘আল-হাওয়ী লিল-ফাতাওয়া,’ ২০৬ পৃষ্ঠা; আল-সৈয়ূতী, ‘হুসনু আল-মাক্বসিদ ফী আমল আল-মওলিদ’, ৬৫-৬৬ পৃষ্ঠা; আল-কসতলানী, ‘আল-মাওয়াহিব আল-লাদুনিয়া বিল-মিনাহ আল-মুহাম্মদিয়া’, ১:১৪৭; আল-যুক্বানী, ‘শরহ আল-মাওয়াহিব আল-লাদুন্নিয়া বিল-মিনাহ আল-মুহাম্মদিয়া, ১:২৬০-২৬১; আল-সালেহী, ‘সুবুল আল-হুদা ওয়াল-রাশাদ ফী সীরাত খায়র আল-েএবাদ, ১:৩৬৬-৩৬৭; এবং আল-নাবহানী, ‘হুজ্জাত আল্লাহ আলাল-আলামীন ফী মু’জাযাত সাঈয়েদ আল-মুরসালীন’, ২৩৭-২৩৮ পৃষ্ঠা]

২/ –  হাফেয শামস আল-দ্বীন মুহাম্মদ বিন নাসির আল-দ্বীন আল-দিমাশক্বী (৭৭৭-৮৪২ হিজরী) নিজ ‘মওরিদ আল-সাদী ফী মওলিদ আল-হাদী’ গ্রন্থে লেখেন: “এটা সঠিক যে আবূ লাহাবের জন্যে দোযখের শাস্তি সোমবার দিনগুলোতে লাঘব করা হয় এ কারণে যে, মহানবী (দ;)-এর বেলাদত শরীফ উপলক্ষে খুশি হয়ে (ওই দিন) সে সুওয়াইবিয়াকে মুক্ত করে দিয়েছিলো।” এরপর লেখক এব্যাপারে কিছু দ্বিচরণ (কবিতা) বর্ণনা করেন:

“এই অবিশ্বাসী, যার উদ্দেশ্যে অবতীর্ণ ভর্ৎসনাপূর্ণ ঐশীবাণী,

জাহান্নামের আগুনে স্থায়ীভাবে ধ্বংসপ্রাপ্ত যার দুই পাণি,

খুশি প্রকাশের ফলে নিরন্তর সোমবারে যার লাঘব হয় শাস্তি,

তাহলে মহানবী (দ:)-এর ওই গোলামের ভাগ্যে মঞ্জুর কতোই না স্বস্তি,

মাহবূব (দ:)-এর প্রতি সন্তুষ্টিসহ হয়েছে যাঁর বিশ্বাসীর বেসালপ্রাপ্তি।” [ভাবানুবাদ]

৩/ –  শায়খ আবদুল হক্ব মুহাদ্দীসে দেহেলভী (৯৫৮-১০৫২ হিজরী) এই রওয়ায়াতের ব্যাপারে সুচিন্তিত মতামত ব্যক্ত করতে লেখেন: “এই বর্ণনা মওলিদুন্নবী (দ:) উদযাপনের বৈধতার ও তাতে সর্বাত্মক প্রয়াসের পক্ষে একটি (উৎকৃষ্ট) দলিল। আবূ লাহাব, যার উদ্দেশ্যে নিন্দাসূচক ক্বুরআনের একখানি সূরা নাযেল হয়েছে, তার যদি (হুযূরের বেলাদত উপলক্ষে খশি প্রকাশার্থে) দাসীকে মুক্ত করে দেয়ার কারণে শাস্তি লাঘব হতে পারে, তবে ওই মুসলমান যিনি মহানবী (দ:)-এর মীলাদ উপলক্ষে খুশি হন এবং অাপন সম্পদ ব্যয় করেন, তাঁর কী (শানদার) অবস্থা হবে? আর হ্যাঁ, অবৈধ নাচ-গানের (বা বর্তমানের ব্যান্ড সঙ্গীতের) মতো বেদআত (নতুন উদ্ভাবিত প্রথা) ও অন্যান্য হারাম কর্মকাণ্ড বর্জন করতে হবে; নতুবা এর আশীর্বাদ থেকে বঞ্চিত হতে হবে।” [আবদুল হক্ব দেহেলভী, ‘মাদারিজ আল-নবুওয়া’, ২:১৯]

৪/- আবদুল হাই ফারাঙ্গী মহল্লী লাখনৌভী (১২৬৪-১৩০৪ হিজরী) লেখেন: “অতএব, আবূ লাহাবের মতো অবিশ্বাসী রাসূলুল্লাহ (দ:)-এর বেলাদত উপলক্ষে খুশি প্রকাশ করে যদি কম শাস্তি পেতে পারে, তাহলে যে মুসলমান হুযূর (দ:)-এর মীলাদে খুশি প্রকাশ করেন এবং তাঁরই মহব্বতে নিজের সম্পদ ব্যয় করেন – তিনি কি কোনো পুরস্কার পাবেন না? একথা-ই ইবনে জাওযী (৫১০-৫৭৯ হিজরী) ও আবদুল হক্ব দেহেলভী (৯৫৮-১০৫২ হিজরী) লেখেছেন।” [আবদুল হাই লাখনৌভী, ‘মজমু’আয়ে ফাতাওয়া’, ২:২৮২]

৫/ – রশীদ আহমদ লুধইয়ানভী (মৃত্যু: ১৩৪১ ‍হিজরী) লেখেন: “আবূ লাহাবের মতো দণ্ডিত অবিশ্বাসী যদি রাসূলুল্লাহ (দ:)-এর আশীর্বাদপূর্ণ বেলাদত/মীলাদ উপলক্ষে খুশি প্রকাশের কারণে কম শাস্তি পেতে পারে, তাহলে যে মুসলমান ওই উপলক্ষে খুশি প্রকাশ করেন এবং (হুযূরের প্রতি) আপন মহব্বতের খাতিরে নিজ সম্পদ থেকে সামর্থ্যানুযায়ী ব্যয় করেন, তিনি কি কোনো পুরস্কার লাভ করবেন না?” [লুধইয়ানভী, ‘আহসান আল-ফাতাওয়া’, ১:৩৪৭-৩৪৮]

সুয়াইবিয়া’র মুক্তির এই ঘটনাটিকে দালিলিক প্রমাণ হিসেবে পেশ হতে এটা স্পষ্ট যে এই রওয়ায়াত/বর্ণনা সহীহ তথা নির্ভরযোগ্য বা বিশুদ্ধ। মওলিদুন্নবী (দ:)-এর বৈধতার পক্ষে এটা একটা (অকাট্য) প্রমাণ্য দলিল-ও বটে।

৫.৯.১ কেন এক কাফেরের শাস্তি লাঘব করা হয়েছে?

ওপরে উপস্থাপিত বর্ণনা হতে এ প্রশ্নের উদ্ভব হতে পারে: ক্বুরআন, হাদীস ও উম্মতের এজমা’ তথা ঐকমত্য স্পষ্টভাবে যেখানে ব্যক্ত করেছে যে কোনো অবিশ্বাসীরই (নেক) কর্ম পরলোকে পুরস্কৃত হবার নয়, সেখানে আবূ লাহাবের শাস্তি লাঘব করা হয়েছে কেন? এই প্রশ্নের উত্তর হলো, কর্মটি যেহেতু মহানবী (দ:)-এর সাথে সুনির্দিষ্টভাবে জড়িত, সেহেতু এটাকে পুরস্কৃত করা হয়েছে: আবূ লাহাব প্রিয়নবী (দ:)-এর বেলাদত (ধরাধামে শুভাগমন) উপলক্ষে খুশি প্রকাশ করতেই দাসী সুয়াইবিয়াকে মুক্ত করে দিয়েছিলো; এ কারণেই আল্লাহতা’লা পরকালে শাস্তি লাঘব করে তার প্রতি দয়া করেছেন। এটা স্পষ্ট যে মহানবী (দ:)-এর সাথে জড়িত কোনো উত্তম কর্ম কোনো অবিশ্বাসী সম্পাদন করলে তা পুরস্কারবিহীন রবে না।

প্রতি সোমবার আবূ লাহাবের শাস্তি লাঘব হওয়াটা তার দ্বারা স্রেফ সুয়াইবিয়াকে মুক্ত করার কারণে হয়নি। বরঞ্চ তা একমাত্র তার দ্বারা হুযূর পাক (দ:)-এর বেলাদত উপলক্ষে খুশি প্রকাশের সুবাদেই হয়েছে। সর্বশক্তিমান আল্লাহতা’লা এটা দেখেন না কে (নেক) কর্মটি করেছে, বরং দেখেন কার জন্যে করা হয়েছে। ওই কর্মটি আবূ লাহাবের মতো অবিশ্বাসী করেছে, সেটা দেখার বিষয় নয়, বরঞ্চ আল্লাহতা’লার মহব্বত কেবলমাত্র তাঁর রাসূল (দ:)-এরই জন্যে (সুনির্দিষ্ট)।

এই বিষয়টিকে আরো প্রতিপাদন করার উদ্দেশ্যে মুহাদ্দীস তথা হাদীসশাস্ত্রের উলামাদের খোলাসা বয়ান নিচে পেশ করা হলো:

১/ – ইমাম আল-বায়হাক্বী (৩৮৪-৪৫৮ হিজরী) নিজ ‘শু’আব আল-ঈমান’ গ্রন্থে মহানবী (দ:)-এর জন্যে খাস তথা সুনির্দিষ্ট এই বিষয়টি সম্পর্কে বলতে গিয়ে লেখেন যে এমন কি একজন অবিশ্বাসীও হুযূর পাক (দ:)-এর প্রতি আপন খেদমতের মাধ্যমে লাভবান হতে পারেন: “ওয়া হাযা’ আয়দা’ন লিয়ান্নাল্ এহসা’না কা’না মারজা’উহু ইলা সোয়া’হেবেন্নুবূওয়্যাতে ফালাম এয়াদিঈ” – অর্থাৎ, এবং উপরন্তু এই এহসান তথা দয়া/অনুগ্রহ মহানবী (দ:)-এর সূত্রে হওয়ার কারণে এটা বিফলে যায়নি। [আল-বায়হাক্বী, ‘শু’আবুল ঈমান’, ১:২৬১ #২৮১]

২/ – ইমাম আল-বাগাভী (৪৩৬-৫১৬ হিজরী) লেখেন: এটা রাসূলাল্লাহ (দ:)-এরই জন্যে সুনির্দিষ্ট; তাঁরই মহাসম্মানের খাতিরে কৃত। [আল-বাগাভী, ‘শরহে সুন্নাহ’, ৯:৭৬]           

৩/ – ইমাম সুহায়লী (৫০৮-৫৮১ হিজরী) একই মত পোষণ করে বলেন: আবূ লাহাব বিবৃত করেছিলো, ‘তোমাদেরকে ছেড়ে আসার পর আমি কোনো স্বস্তি পাইনি, স্রেফ এথেকে তেষ্টা মেটোনো ব্যতিরেকে’ – সে একথা বলার সময় নিজের তর্জনী ও বুড়ো আঙ্গুলের মাঝখানটা দেখিয়েছিলো; সে আরো বলে, ‘এটা সুয়াইবিয়াকে মুক্ত করার কারণে হয়েছে।’ সহীহ আল-বুখারী ছাড়া অন্যান্য সূত্রে বর্ণিত, তার আত্মীয়স্বজনের মধ্যে যে ব্যক্তি তাকে স্বপ্নে দেখেছিলেন, তিনি তারই ভাই হযরত আব্বাস (রা:)। তিনি বর্ণনা করেন, “পুরো একটি বছর অতিক্রান্ত হলেও আমি আবূ লাহাবকে স্বপ্নে দেখিনি। অতঃপর আমি তাকে মসীবতে দেখতে পাই। সে বলে, ‘তোমাদের ছেড়ে আসার পর আমি কোনো স্বস্তি পাইনি, শুধু সোমবার দিনগুলোতেই আমার শাস্তি লাঘব করা হয়।’ এটা এ কারণে যে রাসূলুল্লাহ (দ:) সোমবারে ধরণীতলে শুভাগমন করেন। সুয়াইবিয়া আবূ লাহাবকে হুযূর (দ:)-এর বেলাদতের সুসংবাদ এনে দেন একথা বলে, ‘আপনি কি জানেন আপনার ভ্রাতা আবদুল্লাহ’র ঔরসে এক পুত্র সন্তানের মা হয়েছেন আমিনা (রা:)?’ একথা শুনে আবূ লাহাব তাকে বলে, ‘যাও, তুমি মুক্ত!’ এটাই (অর্থাৎ, মহানবী সাল্লাল্লাহু আলাইহে ওয়া সা্লামের বেলাদতে খুশির এই অভিব্যক্তিটি) তার উপকারে আসে। [আল-সুহায়লী, ‘আল-রওদ আল-উনুফ ফী তাফসীর আল-সীরাত আল-নববীয়্যা লি-ইবনে হিশা’ম’, ৩:৯৮-৯৯] 

৪/ – শীর্ষস্থানীয় তাফসীরকারক ইমাম আল-ক্বুরতুবী (বেসাল: ৬৭১ হিজরী) লেখেন: এই (শাস্তি) লাঘব এক্ষেত্রেই খাস্ তথা সুনির্দিষ্টকৃত এবং তাদের ক্ষেত্রেও সুনির্দিষ্ট হবে যাদের কথা ধর্মশাস্ত্রলিপিতে উল্লেখিত হয়েছে। [আল-আইনী, ‘উমদাত আল-ক্বারী শরহে সহীহ আল-বুখারী’, ২০:৯৫]

৫/ – সহীহ বুখারীর ব্যাখ্যাকারী ইমাম আল-কিরমানী (৭১৭-৭৮৬ হিজরী) লেখেন: মহানবী (দ:)-এর সাথে সংশ্রিষ্ট (কোনো অবিশ্বাসীর কৃত) নেক কর্মের সেই ক্ষেত্রবিশেষে সুনির্দিষ্ট (মানে খাস্) হওয়াটা সম্ভব। [আল-কিরমানী, ‘আল-কাওয়া’কিব আল-দারা’রী ফী শরহে সহীহ আল-বুখারী’, ১৯:৭৯]

৬/ – সহীহ বুখারীর ব্যাখ্যাকারী ইমাম বদর আল-দ্বীন আল-আইনী (৭৬২-৮৫৫ হিজরী) লেখেন: “এয়াহ্‘তামিলু আইঁয়্যাকূনা মা এয়াতা’আল্লাক্বু বিন্নাবিইয়্যা সাল্লাল্লাহু আলাইহে ওয়া সাল্লামা মাখসূসা’ম্মান যালিকা” – অর্থাৎ, রাসূলুল্লাহ (দ:)-এর সাথে সম্পৃক্ত যা-ই কিছু করা হোক না কেন, তা ওই ক্ষেত্রে খাস্ বা সুনির্দিষ্ট হওয়াটা সম্ভব। [আল-আইনী, ‘উমদাত আল-ক্বারী শরহে সহীহ আল-বুখারী’, ২০:৯৫]

৭/ – ইমাম জালালউদ্দীন সৈয়ূতী (৮৪৯-৯১১ হিজরী) নিজ ‘হুসন আল-মাক্বসিদ ফী ’আমল আল-মওলিদ’‘আল-হাউঈ লিল-ফাতা’ওয়া’ গ্রন্থ দুটোতে সুস্পষ্টভাবে এই অবস্থানের পক্ষ সমর্থন করেছেন।

৮/ – ইমাম আবদুর রাহমান বিন দাবী আল-শায়বা’নী (৮৬৬-৯৪৪ হিজরী) লেখেন: আবূ লাহাবের শাস্তি লাঘব স্রেফ মহানবী (দ:)-এর শান-মানের ওয়াস্তে করা হয়েছিলো। [আল-শায়বানী, ‘হাদা’য়েক্ব আল-আনওয়া’র’, ১:১৩৪]

এসব ব্যাখ্যা-বিশ্লেষণ হতে এটা স্পষ্ট প্রতীয়মান হয় যে এমন কি আবূ লাহাবের মতো কট্টর অবিশ্বাসী-ও মহানবী (দ:)-এর বেলাদত উপলক্ষে প্রকাশিত তার উদ্দেশ্যবিহীন খুশির কারণে পরলোকে শেষ বিচার দিবস অবধি পুরস্কৃত হয়েছে। আর একমাত্র সর্বোচ্চ মর্যাদাবান পয়গম্বর (দ:)-এর সাথে সংশ্লিষ্টতার কারণেই কোনো অবিশ্বাসীকে পুরস্কৃত করা হয়ে থাকে।

৫.৯.২ একটি আপত্তি ও তার জবাব

ওপরে উদ্ধৃত (আবূ লাহাবের) বিবরণের ব্যাপারে কিছু লোক আপত্তি উত্থাপন করে বলে যে এ ঘটনা স্বপ্নে ঘটেছিলো, আর ওই স্বপ্ন দেখার সময় হযরত আব্বাস (রা:) (তখনো) ইসলাম ধর্ম গ্রহণ করেননি; অতএব, এটা ইসলামী শরীয়তে কেন বৈধতার ভিত্তি পাবে? এই আপত্তির জবাব নিম্নরূপ:

প্রথমতঃ আমরা যখন মওলিদুন্নবী (দ:) উদযাপনের পক্ষে এই ঘটনাকে প্রামাণ্য দলিল হিসেবে গ্রহণ করি, তখন আমরা আবূ লাহাবের বক্তব্যকে আমাদের (বক্তব্যের) ভিত্তি হিসেবে ব্যবহার করি না, বরং আমাদের ভিত্তি হচ্ছে হযরত আব্বাস (রা:)-এর কথা বা বাণী।

দ্বিতীয়তঃ যদিও হযরত আব্বাস (রা:)-এর ইসলাম ধর্ম গ্রহণের আগে এই ঘটনাটি ঘটেছিলো, তবুও এটাকে প্রামাণ্য দলিল হিসেবে ব্যবহারের ক্ষেত্রে কোনো সমস্যা-ই নেই। কেননা হযরত আব্বাস (রা:) যখন এ ঘটনা বর্ণনা করেন, তখন তিনি মুসলমান হয়ে গিয়েছিলেন, আর এ বিষয়ে কোনো দ্বিমত-ই নেই। তিনি এটা মহানবী (দ:)-এর একজন সাহাবী বা সাথী হিসেবেই বর্ণনা করেন। সুতরাং এই রওয়ায়াত তথা বর্ণনার ওপর নির্ভর করা যায়।

এবং সর্বোপরি, ইমাম বুখারী’র (১৯৪-২৫৬ হিজরী) মতো (উচ্চপর্যায়ের) মুহাদ্দীস-আলেম তাঁর ‘আল-সহীহ’ গ্রন্থে এই বর্ণনাকে উদ্ধৃত করার দরুন এর চেয়ে উত্তম কর্তৃত্বসম্পন্ন ও গ্রহণযোগ্য প্রামাণ্য দলিল আর কী-ই বা হতে পারে? ইমাম বুখারী (রহ:)-এর মতানুসারে যদি এই রওয়ায়াত নির্ভরযোগ্য না হতো, তাহলে কেন তিনি এটাকে তাঁরই সহীহ হাদীসের সংকলনে অন্তর্ভুক্ত করলেন? তিনি তো সরাসরি তা নাকচ করে দিতে পারতেন।

ইমাম বুখারী (রহ:) ছাড়াও তাঁর শিক্ষক ইমাম আবদুর রাযযাক্ব বিন হাম্মা’ম আল-সান’আনী (১২৬-২১১ হিজরী) এই রওয়ায়াত উদ্ধৃত করেন। ইমাম মারওয়াযী (২০২-২৯৪ হিজরী) ‘আল-সুন্নাহ’ গ্রন্থে এটা বর্ণনা করেন; ইমাম বায়হাক্বী (৩৮৪-৪৫৮ হিজরী) তাঁর তিনটি সংকলনে এটা বর্ণনা করেন: (ক) ‘আল-সুনান আল-কুবরা’, (খ) ’শু’আব আল-ঈমান’ ও (গ) ‘দালায়েল আল-নুবুওয়্যা ওয়া মা’রেফা আহওয়াল সা’হেব আল-শরীআ’; ইবনে কাসীর (৭০১-৭৭৪ হিজরী) এটাকে নিজ ‘আল-বেদায়া ওয়াল-নেহায়া’ গ্রন্থে উদ্ধৃত করে; ইবনে সা’আদ (১৬৮-২৩০ হিজরী) ‘আল-তাবাক্বাত আল-কুবরা’ পুস্তকে এটা বর্ণনা করেন; ইমাম আল-বাগাভী (৪৩৬-৫১২ হিজরী) এই বর্ণনা তাঁর ‘শরহে আল-সুন্নাহ’ কেতাবে উদ্ধৃত করেন; ইবনে জাওযী (৫১০-৫৭৯ হিজরী) নিজ ‘সাফওয়া আল-সাফওয়া’ পুস্তকে এর উল্লেখ করেন; আল-সুহায়লী (৫০৮-৫৮১ হিজরী) ‘আল-রওদ আল-উনুফ ফী তাফসীর আল-সীরা’হ আল-নববীয়্যা লি ইবনে হিশা’ম’ গ্রন্থে এটা বর্ণনা করেন; এবং ইবনে আসা’কির (৪৯৯-৫৭১ হিজরী) ‘তা’রীখ দিমাশক্ব আল-কবীর’ কিতাবে এর উল্লেখ করেন।

এই বর্ণনা যদি সহীহ তথা বিশুদ্ধ/নির্ভরযোগ্য না হতো, আর মহানবী (দ:)-এর পবিত্র বেলাদত/ধরাধামে শুভাগমন উপলক্ষে আবূ লাহাবের প্রকাশিত খুশির কারণে তার (পারলৌকিক) শাস্তি লাঘব না হতো, তাহলে উপরোল্লিখিত উলামামণ্ডলী ও ধর্মীয় কর্তৃত্বসম্পন্ন ব্যক্তিবৃন্দ তাঁদের বইপত্রে (কখনোই) এটা বর্ণনা করতেন না। ইসলামী জ্ঞান বিশারদবৃন্দ শুধু এই রওয়ায়াত গ্রহণ-ই করেননি, বরং তাঁরা এর জ্ঞানভিত্তিক ব্যাখ্যা-বিশ্লেষণ পেশ করে এর ওপর নির্ভর-ও করেছিলেন, যা আর বিস্তারিত আলোচনার অবকাশ রাখে না।

মোদ্দা কথা হলো, আমাদের দৃষ্টিতে এই বর্ণনা যে হযরত আব্বাস (রা:) প্রদান করেছেন এবং ইমাম বুখারী (রহ:) তা লিপিবদ্ধ করেছেন আর অনেক মুহাদ্দীস-আলেম গ্রহণ করে নিয়েছেন, এটাই এর বিশুদ্ধতার ও নির্ভরযোগ্যতার প্রামাণ্য দলিল হওয়ার জন্যে যথেষ্ট। এ থেকে মওলিদুন্নবী (দ:) উদযাপনের বৈধতা প্রমাণিত হয়।  

৫.৯.৩ একটি সতর্কতামূলক উপদেশ

ওপরে উল্লেখিত (আবূ লাহাবের) ঘটনা হতে বাস্তবতা যা বেরিয়ে এসেছে তা হলো, কোনো কর্ম (তা এক মিনিটের জন্যে হলেও) যদি প্রিয়নবী (দ:)-এর খাতিরে করা হয়, তাহলে তা আল্লাহ পাকের দৃষ্টিতে উচ্চমর্যাদাসম্পন্ন – এমন কি যদি তা কোনো অবিশ্বাসী দ্বারাও সংঘটিত হয়ে থাকে। অপর দিকে, ঈমানদারবৃন্দকে সতর্ক করে দেয়া হয়েছে এই মর্মে যে, এমন কি তাঁরা যদি সারা জীবন নেক তথা পুণ্যদায়ক আমল/কর্ম সম্পন্ন করেও থাকেন অথচ মহাসম্মানিত রাসূল (দ:)-এর শানে সামান্যতম অশ্রদ্ধা প্রদর্শন বা বেয়াদবি করেন, তাহলে তাঁদের সমস্ত নেক-কর্ম শূন্যে পরিণত হবে। আল্লাহতা’লা এরশাদ ফরমান:

“হে ঈমানদারবর্গ! নিজেদের কণ্ঠস্বরকে উঁচু করো না ওই অদৃশ্যের সংবাদদাতা (নবী)-এর কণ্ঠস্বরের ওপর এবং তাঁর সামনে চিৎকার করে কথা বলো না যেভাবে পরস্পরের মধ্যে একে অপরের সামনে চিৎকার করো” [আল-ক্বুরআন, ৪৯:২]।

এই আয়াতে করীমায় আসহাব-এ-কেরাম (রা:)-বৃন্দকে নির্দেশ দেয়া হয়েছে যেনো তাঁরা তাঁদের গলার স্বরকে নিচু রাখেন; আর একে অপরের সাথে তাঁরা যখন কথা বলেন, তখন যেনো তাঁদের কণ্ঠস্বর মহাসম্মানিত নবী (দ:)-এর মধুর কণ্ঠস্বরের চেয়ে উচ্চ আওয়াজের না হয়। মহাপরাক্রমশালী আল্লাহতা’লা-ই এখানে মহৎ সাহাবা-এ-কেরাম (দ:)-কে তাঁর মাহবূব তথা প্রেমাস্পদের (দ:) প্রতি ভক্তি-শ্রদ্ধা শিক্ষা দিচ্ছেন। আয়াতটি আরো ব্যক্ত করে যে, কেউ হুযূরে পূর নূর (দ:)-এর প্রতি নিজ আচরণে সতর্ক না হলে তার নিম্নের সতর্কবাণী মনে রাখা বাঞ্ছনীয়:

“যেনো কখনো তোমাদের কর্মসমূহ নিষ্ফল না হয়ে যায় আর তোমাদের (সে ব্যাপারে) খবর-ও থাকবে না।” [আল-ক্বুরআন, ৪৯:২]

এখানে সর্বশক্তিমান আল্লাহতা’লার একত্ব যেমন প্রত্যাখ্যাত হয়নি, তেমনি হয়নি মহানবী (দ:)-এর সুন্নাহ-ও। আখেরাত, নামায, রোযা, দান-সদকাহ কিংবা হজ্জ্ব হতেও ঘটেনি বিচ্যুতি। এই সতর্কবাণী স্রেফ মহাসম্মানিত রাসূল (দ:)-এর পবিত্র কণ্ঠস্বর হতে কারোর নিজ গলার স্বর উঁচু করার একটিমাত্র (বেয়াদবিমূলক) কাজের বিরুদ্ধে উচ্চারিত হয়েছে। প্রিয়নবী (দ:)-এর প্রতি সম্মান প্রদর্শনে ঘাটতি থাকলে কারো নেক আমল বরবাদ হয়ে যাবে।

এই আলোচনার আলোকে এটা জ্ঞাত হওয়া উচিত যে, একদিকে লক্ষ লক্ষ নেক আমল থাকা সত্ত্বেও অপর দিকে যদি সর্বাধিক সম্মানিত নবী করীম (দ:)-এর প্রতি ন্যূনতম পরিমাণ বেয়াদবিমূলক কাজ-ও সংঘটিত হয়, তবে আখেরাতের জীবনে ওই গোস্তাখ ব্যক্তি সমস্ত নেক আমলের পুরস্কার হতে বঞ্চিত হবে। পক্ষান্তরে, ইসলামের শত্রু ও আল্লাহর একত্ব অস্বীকারকারী কোনো অবিশ্বাসী সবচেয়ে মর্যাদাবান রাসূল (দ:)-এর আশীর্বাদপূর্ণ বেলাদত তথা ধরণীতলে শুভাগমনের সম্মানে স্রেফ একটি কর্ম সংঘটন করলে তাকে এই কাজের জন্যে আত্মার পাপমোচনমূলক জগতে এবং আখেরাতে পুরস্কৃত করা হবে। মওলানা আহমদ রেযা খাঁন সাহেব বলেন:

“একথা প্রতিষ্ঠিত যে সকল ফরয-কর্তব্য (মূলের) অনুষঙ্গ,

সব মূলের মূল মহানবী (দ:)-এরই প্রতি গোলামিপূর্ণ সঙ্গ।” (ভাবানুবাদ) [’হাদায়েক্বে বখশিশ’, ১:১৩৫]

কোনো মুসলমান-ব্যক্তির রেয়াযত-সাধনার শ্রেষ্ঠত্ব ও গ্রহণযোগ্যতা প্রিয়নবী (দ:)-এর প্রতি এশক্ব-মহব্বতের ওপরই ভিত্তিশীল। তাঁর প্রতি অন্তরে কোনো ভালোবাসা না থাকলে সমস্ত নেক আমল পুরস্কারের অযোগ্য বলে আল্লাহতা’লার কাছে বিবেচিত হবে। এই কারণেই আশেক্ব-ভক্ত পুণ্যাত্মাবৃন্দ ‍প্রিয়নবী (দ:)-এর পবিত্র দরবারে নিজেদের আর্জি পেশ করেন এই বলে:

“হে মহত্ত্বের প্রতীক, আপনার বদান্যতা এতো বিশাল,

কেউই তৃষ্ণার্ত রয় না হতে আপনার দরাজদিল,

আপনার আশীর্বাদপূর্ণ নজর হতে কীভাবে আশেক্ব রয় বঞ্চিত,

যবে এমন কি শত্রুকেও আপনি রাখেন না গরিবিতে অধঃপতিত।” (ভাবানুবাদ) [শায়খ সা’দী, গুলিস্তাঁ, ৬৬ পৃষ্ঠা]

এই অধ্যায় হতে স্পষ্ট প্রতীয়মান হয় যে মওলিদুন্নবী (দ:)-এর উদযাপন রাসূলুল্লাহ (দ:)-এর বাণী ও কর্ম দ্বারা সুপ্রতিষ্ঠিত। তাঁর বেলাদত তথা ধরাধামে শুভাগমনকে স্মরণ করা শরীয়ত-বিরোধী কোনো বিষয় নয়; বরঞ্চ তা সর্বশক্তিমান আল্লাহতা’লা ও তাঁর রাসূল (দ:)-এর নির্দেশের সাথে পুরোপুরি সঙ্গতিপূর্ণ বিষয়। বস্তুতঃ এটা ইসলাম ধর্মের একটি আবশ্যিক শর্ত। এর আশীর্বাদ হতে এমন কি অবিশ্ববাসীরাও বঞ্চিত নয়। অতএব, মহানবী (দ:)-এর বেলাদত উপলক্ষে উম্মতের কোনো পাপী সদস্য যদি খুশি প্রকাশ করেন, তাহলে কীভাবে এটা হতে পারে যে ওই কাজের জন্যে আল্লাহতা’লা তাঁকে পুরস্কৃত করবেন না?

ষষ্ঠ অধ্যায়

মওলিদুন্নবী (দ:) উদযাপনের ব্যাপারে মুহাদ্দেসীন-এ-কেরাম ও ইমামবৃন্দের দৃষ্টিভঙ্গি

মওলিদুন্নবী (দ:) উদযাপনের পক্ষে ক্বুরআন-সুন্নাহভিত্তিক বিস্তারিত প্রামাণ্য দলিলাদি পেশের পর এই অধ্যায়ে আমরা এতদসংক্রান্ত বিষয়ের সমর্থনে মতামত প্রকাশকারী ইমামবৃন্দের দলিলগুলো উপস্থাপন করবো। বিভিন্ন ইসলামী দেশ ও সময়কালের সাথে সম্পৃক্ত তাঁদের দৃষ্টিভঙ্গি এক্ষেত্রে ঐতিহাসিক দৃষ্টিকোণ থেকে বর্ণনা করা হবে।

মীলাদের এই অনুশীলিত প্রথা ইসলাম ধর্মের মধ্যে সাম্প্রতিক সংযোজন (বেদআত) কিংবা এধরনের রীতি ভারত উপমহাদেশীয় মুসলমানদের দ্বারা-ই কেবল প্রবর্তিত বলাটা একেবারেই ভুল এবং তা বাস্তবতারও পরিপন্থী। বাস্তবতা হলো, মওলিদুন্নবী (দ:) স্রেফ পাকিস্তান বা ভারতের মুসলমানদের অনুশীলিত রীতি নয়, কিংবা এটা বেদআত-ও নয়। সমসাময়িককালের মুসলমান সমাজ এই প্রথার প্রবর্তক নন। বস্তুতঃ মওলিদুন্নবী (দ:) এমন একটি আনন্দঘন ধর্মীয় অনুষ্ঠান যা দুটি পবিত্র স্থান মক্কা মোয়াযযমা ও মদীনা মোনাওয়ারা এবং গোটা আরব জাহান শতাব্দীর পর শতাব্দী যাবত পালন করে আসছে। ইসলামী বিশ্বের অনারব অংশে এই প্রথা পরবর্তীকালে চালু হয়।

মওলিদুন্নবী (দ:) উদযাপনের পক্ষে নেতৃস্থানীয় ইমামমণ্ডলী ও হাদীসবেত্তাবৃন্দের অভিমত ও শরঈ সিদ্ধান্ত নিচে দেয়া হলো:

৬.১ হুজ্জা আল-দীন ইমাম মুহাম্মদ বিন যুফার (৪৯৭-৫৬৫ হিজরী)    

হুজ্জা আল-দ্বীন ইমাম আবূ আবদিল্লাহ মুহাম্মদ বিন আব্দিল্লাহ বিন যুফার আল-মক্কী (১১০৪-১১৭০ খৃষ্টাব্দ) বর্ণনা করেন যে ‘আল-দুর্রুল মুনতাযিম’ পুস্তকে উদ্ধৃত হয়েছে: “মহানবী (দ:)-এর বেলাদত তথা ধরণীতলে শুভাগমনের প্রতি খুশি প্রকাশার্থে তাঁরই আশেক্ব-ভক্তবৃন্দ বড় বড় ভোজের আয়োজন করেন। এসবের মধ্যে সম্মানিত কায়রো নগরীতে অবিশ্বাস্য বড় এক ভোজের আয়োজন যিনি করেন, তিনি হচ্ছেন শায়খ আবূল হাসান, ইবনে ক্বুফুল নামে যিনি সমধিক প্রসিদ্ধ – আল্লাহ তাঁর (আধ্যাত্মিক) রহস্যকে পবিত্রতা দান করুন। তিনি আমাদের শিক্ষক আবূ আবদিল্লাহ মুহাম্মদ বিন আল-নু’মান সাহেবের শিক্ষক। তাঁর আগে মওলিদ অনুষ্ঠানের আয়োজন করতেন জামালউদ্দীন আল-আজামী আল-হামাযা’নী। অন্যান্যরা, যেমন মিসরের ইঊসুফ আল-হাজ্জার, এই অনুষ্ঠান পালনে সর্বাত্মক করতেন; বস্তুতঃ তিনি (এক স্বপ্নে) মহানবী (দ:)-কে দেখেন যিনি তাঁকে এই পুণ্যদায়ক কর্ম জারি রাখার ব্যাপারে উৎসাহিত করেন।” [আল-সালেহী, ‘সুবুল আল-হুদা’ ওয়াল-রাশা’দ ফী সীরাতে খায়র আল-’এবা’দ’, ১:৩৬৩]  

৬.২ শায়খ মুঈন আল-দীন উমর বিন মুহাম্মদ আল-মাল্লা (জন্ম: ৫৭০ হিজরী)

শায়খ মু’ঈনউদ্দীন আবূ হাফস ‘উমর বিন হাফস্ বিন খিদার আল-ইরবিলী আল-মূসিলী তাঁর আল-মাল্লা’ খেতাবের জন্যে সুপ্রসিদ্ধ। মসুল নগরীর অধিবাসীদের মধ্যে তিনি ছিলেন অত্যন্ত ধর্মপরায়ণ, আশেক্ব-ভক্ত ও গভীর জ্ঞানী আলেম। বিবৃত আছে: “ওয়া কা‘না আও-ওয়ালু মান ফাআলা যালিকা বিল-মাওসিলিশ্ শায়খু উমারুবনু মুহাম্মাদিল্ মুল্লা আহাদুস্ সোয়ালেহীনাল্ মাশহূরীন; ওয়া বিহিক্বতাদা’ ফী যালিকা সোয়াহিবু ইরবিলা ওয়া গায়রুহু রাহিমাহুমুল্লা’হু তাআলা” – অর্থাৎ, মসুল নগরীতে প্রথম যে ব্যক্তি মওলিদ মাহফিলের আয়োজন করেন তিনি হচ্ছেন বিখ্যাত পুণ্যাত্মা শায়খ উমার বিন মুহাম্মদ মাল্লা’। এই রীতির অনুশীলনে ইরবিলের শাসক ও অন্যান্যরা তাঁর অনুসরণ করেন – আল্লাহর করূণা তাঁদের সবার প্রতি বর্ষিত হোক (আমীন)। [আবূ শা’মা প্রণীত ‘আল-বায়েস আলা ইনকার আল-বিদআ ওয়াল-হাওয়া’দিস’, ২৪ পৃষ্ঠা; আল-সা’লেহী কৃত ‘সুবুল আল-হুদা’ ওয়াল-রাশা’দ ফী সীরাতে খায়র আল-’এবাদ’, ১:৩৬৫]  

৬.৩ ইবনে আল-জাওযী (৫১০-৫৭৯ হিজরী)

বহু গ্রন্থপ্রণেতা জামালউদ্দীন আবূল ফারাজ আবদুর রহমান বিন আলী ইবনে আল-জাওযী (১১১৬-১২০১ খৃষ্টাব্দ) মওলিদুন্নবী (দ:) বিষয়ে দুটি বই সংকলন করেন:

১/ – বয়া’ন আল-মীলাদ আল-নববী

২/ – মওলিদ আল-উরূস্

ইবনে জাওযী তাঁর ‘বয়া’ন আল-মীলাদ আল-নববী’ গ্রন্থে লেখেন: “রবীউল আউয়াল মাসের আগমনীবার্তা নিয়ে নতুন চাঁদ উদিত হলে হারামাঈন শরীফাইনের (তথা মক্কা ও মদীনার) পাশাপাশি মিসর, ইয়েমেন, ভূ-মধ্যসাগরের পূর্বাঞ্চল এবং আরব রাজ্যের পূর্ব হতে পশ্চিমের সকল মানুষ মহানবী (দ:)-এর ধরাধামে শুভাগমন উপলক্ষে খুশি প্রকাশার্থে মীলাদ উদযাপন অব্যাহত রাখেন। তাঁরা (তাঁরই শানে) ধর্মীয় সঙ্গীত (সেমা-কাউয়ালী) ও মওলিদ পাঠে সাধ্যমতো প্রয়াস পান; আর এরই ফলশ্রুতিতে তাঁরা আশীর্বাদপূর্ণ পুরস্কার ও মহাবিজয় অর্জন করবেন।” [ইবনে আল-জাওযী, ‘বয়া’ন আল-মীলা’দ আল-নববী’, ৫৮ পৃষ্ঠা]

ইবনে জাওযী তাঁর ‘মওলিদ আল-উরূস’ গ্রন্থে বর্ণনা করেন: “যে ব্যক্তি রাসূলুল্লাহ (দ:)-এর মওলিদ উপলক্ষে খুশি হন, তিনি জাহান্নামের আগুন হতে (রহমতের) চাদর দ্বারা আবৃত। মওলিদ পালনের উদ্দেশ্যে যিনি এক দিরহাম ব্যয় করেন, রাসূলুল্লাহ (দ:) তাঁর জন্যে সুপারিশ করবেন, আর আল্লাহতা’লা-ও তাঁর ব্যয়িত প্রত্যেক দিরহামের বদলে দশ দিরহাম পরিশোধ করবেন। ওহে উম্মতে মুহাম্মদী (দ:), তোমাদের জন্যে সুসংবাদ। নিশ্চয় তোমরা এই জগৎ ও পরলোকে অগণিত খায়র-বরকত (মঙ্গল) অর্জন করেছো। সৌভাগ্যবান সেই ব্যক্তি যিনি মনোনীত (নবী) আহমদ সাল্লাল্লাহু আলাইহে ওয়া সাল্লামের মওলিদে অংশগ্রহণ করেন এবং এরই ফলশ্রুতিতে (খোদায়ী) কল্যাণ, মর্যাদা, আশীর্বাদ ও মহিমা/গৌরব অর্জন করেন। তিনি বেহেশ্তের বাগানে মুক্তোর মুকুট ও সবুজ আলখাল্লা পরে প্রবেশ করবেন।” [ইবনে আল-জাওযী, ‘মওলিদ আল-উরূস্’, ১১ পৃষ্ঠা]

ইরবিলের বাদশাহ আবূ সাঈদ আল-মুযাফফর আল-কাওকাবরী কর্তৃক মওলিদুন্নবী (দ:) উদযাপন ও তাতে বড় ব্যয় করার প্রসঙ্গে ইবনে জাওযী বলেন: “লাও লাম এয়াকুন্ ফী যালিকা ইল্লা এরগা’মুশ্ শায়তোয়ানি ওয়া এদআমু আহলিল্ ঈমা’ন” – অর্থাৎ, ‘এই মীলাদ (অনুষ্ঠান) শয়তানকে ক্রুদ্ধ করে এবং ঈমানদারদের আনন্দিত/উৎফুল্ল করে।’ [আল-সালেহী, ‘সুবুল আল-হুদা’ ওয়া রাশা’দ ফী সীরাতে খায়র আল-এবা’দ’, ১:৩৬৩]

আরেক কথায়, মীলাদের মজলিশগুলো শয়তানের জন্যে পরাজয় বয়ে আনে, আর অপরদিকে বিশ্বাসীদেরকে সুসংহত করে থাকে।

৬.৪ আবূ আল-খাত্তাব বিন দিহ্ইয়া আল-কালবী (৫৪৪-৬৩৩ হিজরী)

মহাবিচারক আবূল আব্বাস শামস আল-দ্বীন আহমদ বিন মুহাম্মদ বিন আবী বকর বিন খিলকা’ন নিজের ‘ওয়াফাএয়া’ত আল-আ’এয়া’ন ওয়া আবনা’ আল-যামা’ন’ শীর্ষক গ্রন্থে (৩:৪৪৮-৪৫০) হাফেয আবূ আল-খাত্তাব বিন দিহ্ইয়া আল-কালবী (৫৪৪-৬৩৩ হিজরী) সম্পর্কে উল্লেখ করেন: “তিনি ছিলেন প্রসিদ্ধ হক্কানী উলামা ও পুণ্যাত্মাদের একজন। তিনি ৬০৪ হিজরী সালে মাগরেব তথা পশ্চিমাঞ্চল হতে সফর করে সিরিয়া ও ইরাক্ব এলাকায় প্রবেশ করেন এবং ইরবিল অতিক্রম করেন। সেখানে তিনি দেখতে পান ইরবিলের শাসক সুলতান মুযাফফার আল-দ্বীন বিন যাইন আল-দ্বীন ঈদে মীলাদুন্নবী (দ:)-এর উদযাপন উপলক্ষে ব্যাপক প্রস্তুতিমূলক পরিকল্পনা গ্রহণ করেছেন। তাই তিনি বাদশাহ’র উদ্দেশ্যে ‘আল-তানভীর ফী মওলিদিল বাশীর আল-নাযীর’ (সুসংবাদ প্রদানকারী ও সতর্ককারীর মীলাদ/বেলাদতে বিচ্ছুরিত নূরের জ্যোতি) শীর্ষক একখানি বই রচনা করেন। বাদশাহ’র উপস্থিতিতে তিনি বইটি বাদশাহকে পাঠ করে শোনান, আর (ফলশ্রুতিতে) তাঁকে এক সহস্র দিনার পুরস্কার দেয়া হয়। আমরা ৬২৫ হিজরী সালে ছয়টি আলাদা আলাদা সমাবেশে (খোদ) বাদশাহ’র কাছ থেকে এই ঘটনার বিবরণ শুনেছিলাম।” [আল-সৈয়ূতী কৃত ‘হুসন আল-মাক্বসিদ ফী আমালিল মওলিদ’, ৪৪-৪৫ পৃষ্ঠা; আল-সৈয়ূতী প্রণীত ‘আল-হা’ওয়ী লিল-ফাতা’ওয়া’, ২০০ পৃষ্ঠা; এবং আল-নাবহানী রচিত ‘হুজ্জাত-আল্লাহি আলাল-আলামীন ফী মু’জেযাত-এ-সাঈয়্যেদিল মুরসালীন’, ২৩৬-২৩৭ পৃষ্ঠা]

৬.৫ শামস আল-দীন আল-জাযারী (বেসাল: ৬৬০ হিজরী)

ক্বুরআন মজীদের শীর্ষস্থানীয় ক্বারী শামস আল-দ্বীন মুহাম্মদ বিন আবদ-আল্লাহ আল-জাযারী আল-শাফেঈ (জন্ম: ১২৬২ খৃষ্টাব্দ) নিজ ‘উরফ আল-তা’রীফ বিল-মওলিদিশ্ শরীফ’ শীর্ষক সংক্ষিপ্তসারমূলক পুস্তকে লেখেন: “মৃত্যুর পর এক স্বপ্নে আবূ লাহাবকে দেখা যায়। তাকে জিজ্ঞেস করা হয়, ‘তোমার কী পরিণতি হয়েছে?’ সে জবাব দেয়, ‘আমি জাহান্নামের আগুনে পুড়ছি। তবে প্রতি সোমবারে আমার শাস্তি লাঘব হয় এবং আমি এসব আঙ্গুলের আগা হতে পানি পান করতে সক্ষম হই (এসময় সে তার তর্জনী ও মধ্যমাঙ্গুল দুটো দেখায়)। আর এটা হয়েছে এ কারণে যে আমি দাসী সুয়াইবিয়াকে মুক্ত করে দিয়েছিলাম, যখনই সে মহানবী (দ:)-এর বেলাদতের সুসংবাদ আমার কাছে নিয়ে এসেছিলো; আর ওই মুক্তির ফলে সে মহানবী (দ:)-এর সেবা করতে পেরেছিলো।’

“এ-ই যদি হয় আবূ লাহাবের অবস্থা, যে অবিশ্বাসীকে আল-ক্বুরআনে অভিসম্পাত দেয়া হয়েছে, অথচ রাসূলুল্লাহ (দ:)-এর বেলাদতের রাতে খুশি হওয়ার দরুন তার শাস্তি করা হয়েছে লাঘব, এমতাবস্থায় ওই মুসলমানের কতোটুকু উচ্চমর্যাদা হবে, যিনি আল্লাহর একত্বে বিশ্বাস করেন ও মহানবী (দ:)-এর উম্মত হন, আর যিনি হুযূরের (দ:) মীলাদ/বেলাদত উপলক্ষে খুশি হন এবং তাঁরই প্রতি এশক্ব-মহব্বতের খাতিরে সাধ্যমতো অর্থব্যয় করেন? নিশ্চয় মহানুভব আল্লাহতা’লার তরফ থেকে তাঁর পুরস্কার হবে এই যে, আল্লাহ পাক তাঁকে নিজ বিশাল নেআমতের ভাণ্ডার হতে দান করবেন এবং তাঁকে সুখ-শান্তির বেহেশ্তে প্রবেশের অনুমতি দেবেন!” [আল-সৈয়ূতী লিখিত ‘আল-হাওয়ী লিল-ফাতা’ওয়া’, ২০৬ পৃষ্ঠা; আল-সৈয়ূতী কৃত ‘হুসন আল-মাক্বসিদ ফী আমালিল-মওলিদ’, ৬৫-৬৬ পৃষ্ঠা; আল-কসতলানী রচিত ‘আল-মাওয়া’হিবুল লাদুন্নিয়া বিল- মিনাহ আল-মুহাম্মদীয়া’, ১:১৪৭; আল-যুরক্বানী মালেকী প্রণীত ‘শরহ-এ-মাওয়া’হিব আল-লাদুন্নিয়া বিল-মিনাহ্ অাল-মুহাম্মদীয়া’, ১:২৬০-২৬১; আল-সালেহী লিখিত ‘সুবুল আল-হুদা’ ওয়াল-রাশা’দ ফী সীরাতে খায়র আল-এবা’দ’, ১:৩৬৬-৩৬৭; এবং আল-নাবহানী কৃত ‘হুজ্জাত-আল্লাহি আলাল-আলামীন ফী মু’জিযাতে সাঈয়েদিল মুরসালীন’, ২৩৭-২৩৮ পৃষ্ঠা]

লেখক আরো যোগ করেন: “মওলিদ উদযাপনের অনন্য বৈশিষ্ট্যগুলোর একটি, যার অভিজ্ঞতা সঞ্চিত হয়েছে, তা এই যে এটা সারা বছর জুড়ে নিরাপত্তার উৎস এবং অন্বেষণকৃত প্রতিটি উত্তম বস্তুর সুসংবাদ হয়।” [আল-সালেহী রচিত ‘সুবুল আল-হুদা’ ওয়াল-রাশা’দ ফী সীরাতে খায়র আল-’এবাদ’, ১:৩৬৫-৩৬৬]    

৬.৬ ইমাম আবূ শা’মা (৫৯৯-৬৬৫ হিজরী)

ইমাম আবূ শা’মা আবদ্ আল-রাহমান বিন ইসমাঈল (১২০২-১২৬৭ খৃষ্টাব্দ) হলেন ‘সহীহ মুসলিম শরীফের’ ব্যাখ্যাকারী ইমাম নববী (৬৩১-৬৭৭ হিজরী/১২৩৩-১২৭৮ খৃষ্টাব্দ)-এর শায়খ। তিনি তাঁর ‘আল-বা’য়েস ’আলা এনকা’র আল-বিদ’আ ওয়াল-হাওয়া’দিস’ পুস্তকে লেখেন: “আমাদের যুগে প্রবর্তিত সেরা বিষয়গুলোর মধ্যে একটি হচ্ছে মহানবী (দ:)-এর বেলাদত বার্ষিকীর দিনটির উদযাপন। ওই দিন দান-সদকাহ করা হয়, নেক আমল পালন করা হয়, আর উত্তম পোশাক পরা এবং খুশি প্রকাশ করা হয়। এধরনের কর্ম, গরিবদের প্রতি দয়াপরবশ হওয়া ছাড়াও, ইঙ্গিত করে যে মহানবী (দ:)-এর প্রতি মানুষের অন্তরে এশক্ব-মহব্বত, শ্রদ্ধা ও (তাঁর) মহিমা (উপলব্ধিসূচক) অনুভূতি বিরাজমান; আর পাশাপাশি আল্লাহর প্রতিও কৃতজ্ঞতা বিদ্যমান এই কারণে যে তিনি রাসূলুল্লাহ (দ:)-কে সৃষ্টি করে জগতসমূহের জন্যে তাঁরই (খাস) রহমত হিসেবে প্রেরণ করে তাদেরকে আশীর্বাদধন্য করেছেন।” [আবূ শা’মা প্রণীত ‘আল-বা’য়েস ‘আলা এনকা’র আল-বিদআ’ ওয়াল-হাওয়া’দিস’, ২৩-২৪ পৃষ্ঠা; আল-সা’লেহী কৃত ‘সুবুল অাল-হুদা’ ওয়াল-রাশা’দ ফী সীরাতে খায়র আল-’এবা’দ’, ১:৩৬৫; আল-হালাবী, ‘ইনসা’ন আল-উয়ূন ফী সীরাতে আল-আমীন আল-মা’মূন’, ১:৮৪; আহমদ ইবনে যাইনী দাহলা’ন মক্কী, ‘আল-সীরাতে নবববীয়্যা’, ১:৫৩; এবং আল-নাবহানী, ‘হুজ্জাত-আল্লাহি ‘আলাল-’আলামীন ফী মু’জিযা’তে সাইয়্যেদিল মুরসালীন’, ২৩৩ পৃষ্ঠা]

ইরবিলের বাদশাহ আবূ সাঈদ আল-মুযাফফর আল-কাওকাবুরী কর্তৃক মীলাদুন্নবী (দ:) উদযাপন ও এই উপলক্ষে তাঁর বিপুল ব্যয় সম্পর্কে আবূ শা’মা বলেন: “এই উত্তম কাজ প্রশংসনীয় এবং এর অনুশীলনকারী গৃহীত ও প্রশংসিত জন।” [আল-সালেহী কৃত ‘সুবুল আল-হুদা’ ওয়াল-রাশা’দ ফী সীরাতে খায়র আল-এবা’দ’, ১:৩৬৩]

৬.৭ ইমাম সদর আল-দীন মাওহূব বিন উমর আল-জাযারী (বেসাল: ৬৬৫ হিজরী)

মিসরের শীর্ষস্থানীয় ফক্বীহ ইমাম সদর আল-দ্বীন মাওহূব বিন উমর আল-জাযারী আল-শাফেঈ লেখেন: “মওলিদের এই উদযাপন নির্দোষ বেদআত তথা প্রবর্তিত প্রথা। সুন্নাহ’র সাথে সাংঘর্ষিক না হওয়া পর্যন্ত বেদআতসমূহকে মন্দ/দূষণীয় বিবেচনা করা হয় না। আর যতোক্ষণ সেগুলো সুন্নাহের খেলাফ না হয়, ততোক্ষণ সেগুলোকে খারাপ বলে বিচার করা হয় না; অধিকন্তু, মহানবী (দ:)-এর মীলাদ উদযাপনে খুশি ও সুখ প্রকাশের সময় কারো নিয়্যত বা উদ্দেশ্য অনুসারেই (কেবল) তিনি পুরস্কৃত হয়ে থাকেন।”

অন্যত্র ইমাম সাহেব আরো বলেন: “মওলিদের উদযাপন একটি বেদআত; তবে এটা নির্দোষ বেদআত। এতদসত্ত্বেও মানুষের কাছে (এর ব্যয় নির্বাহের খাতে) টাকা চাওয়ার কোনো অনুমতি নেই – যদি না নিশ্চিতভাবে জানা যায়, যার কাছে অর্থ চাওয়া হয়েছে তিনি খুশি মনে স্বেচ্ছায় তা দান করতে আগ্রহী। এরকম মানুষের কাছে অর্থ চাওয়া জায়েয, আর আমি আশা করবো তা ‘কারা’হা’ তথা মন্দের পর্যায়ে যেনো না পৌঁছে।” [আল-সা’লেহী প্রণীত ‘সুবুল আল-হুদা’ ওয়াল-রাশা’দ ফী সীরাতে খায়র আল-’এবা’দ’, ১:৩৬৫-৩৬৬]

৬.৮ ইমাম যাহীর আল-দ্বীন জা’ফর আল-তাযনাতী (বেসাল: ৬৮২ হিজরী)

ইমাম যাহীর আল-দ্বীন জা’ফর বিন ইয়াহইয়া বিন জা’ফর আল-তাযনাতী আল-শাফেঈ (বেসাল: ১২৮৩ খৃষ্টাব্দ) বলেন: “মহানবী (দ:)-এর প্রতি পরম ভক্তিশ্রদ্ধা ও এশক্ব-মহব্বত থাকা সত্ত্বেও পুণ্যবান সালাফ আস-সালেহীনের প্রাথমিক যুগে এই (মীলাদের) প্রথা বা রীতি চালু ছিলো না। আমাদের কেউই, এমন কি আমরা সবাই একত্রিত হলেও, কখনোই তাঁদের স্রেফ একজনের এশক্ব-মহব্বত ও ভক্তিশ্রদ্ধারও সমকক্ষ হবো না, যা এমন কি (তাঁদের এশক্ব ও ভক্তির) এক অণূকণার সমান ওজন-ও হবে না। এটা উত্তম বেদআত/নতুন প্রবর্তিত প্রথা হবে – যদি উদযাপনকারী ব্যক্তির নিয়্যত হয় ধার্মিক মানুষদেরকে একত্রিত করে মহানবী (দ:)-এর প্রতি সালাত-সালাম প্রেরণ ও গরিব-দুঃস্থ (ফকীর/মিসক্বীন)-দের মাঝে খাদ্য বিতরণ। এই বিবরণের সাথে খাপ খেলে এবং এসব শর্ত পূরণ করলেই (কেবল) সকল সময়ের জন্যে এটা পুরস্কার বয়ে আনবে।” [আল-সা’লেহী রচিত প্রাগুক্ত ‘সুবুল আল-হুদা’, ১:৩৬৪]

৬.৯ ইবনে তাইমিয়্যা (৬৬১-৭২৮ হিজরী)                    

তক্বী আল-দ্বীন আহমদ বিন আবদ্ আল-হালীম বিন আবদ্ আল-সালা’ম বিন তাইমিয়্যা (১২৬৩-১৩২৮ খৃষ্টাব্দ) নিজ ‘এক্বতেদা’ অাল-সিরা’ত আল-মুস্তাক্বীম লি-মুখা’লাফাতে আসহা’ব আল-জাহীম’ পুস্তকে লেখে: “অনুরূপভাবে, কিছু মানুষের দ্বারা যা প্রবর্তিত হয়েছে, খৃষ্টানদের যীশু খৃষ্টের জন্মদিন পালনের প্রতিদ্বন্দ্বিতাস্বরূপ হোক কিংবা মহানবী (দ:)-এর প্রতি ভক্তিশ্রদ্ধা ও এশক্ব-মহব্বতের নিদর্শনস্বরূপ-ই হোক, আল্লাহতা’লা হয়তো তাদের এই মহব্বত ও উদ্যমের খাতিরে (তাদেরকে) পুরস্কৃত করতে পারেন – (কিন্তু) মওলিদকে আনন্দোৎসব হিসেবে গ্রহণের বেদআতের খাতিরে নয়।” [ইবনে তাইমিয়্যা লিখিত ‘এক্বতেদা’ আল-সিরা’ত আল-মুস্তাক্বীম লি-মুখালা’ফাতে আসহা’ব আল-জাহীম’, ৪০৪ পৃষ্ঠা]

উক্ত পুস্তকের অন্য অংশে লেখক আরো বলে: “অতএব, মওলিদের প্রতি সম্মান প্রদর্শন ও একে মওসেম তথা (উদযাপনের) মৌসূম হিসেবে গ্রহণ করা, যেমনটি অনেকে অনুশীলন করে থাকেন, তাতে নি্যেতের বিশুদ্ধতা ও মহানবী (দ:)-এর প্রতি ভক্তিশ্রদ্ধার কারণে নিহিত রয়েছে মহা পুরস্কার। ইতিপূর্বে যেমনটি বলা হয়েছে, কিছু লোক হয়তো সেসব বিষয়কে উত্তম বলে বিবেচনা করতে পারেন, যেগুলোকে ঈমানদারবৃন্দ নিন্দনীয়/দূষণীয় হিসেবে দেখেন।” [ইবনে তাইমিয়ার প্রাগুক্ত ‘এক্বতেদা’ আল-সিরা’ত আল-মুস্তাক্বীম’শীর্ষক পুস্তক, ৪০৬ পৃষ্ঠা]  

৬.১০ ইমাম আবূ আবদ-আল্লাহ বিন আল-হাজ্জ আল-মালেকী (বেসাল: ৭৩৭ হিজরী)

মওলিদুন্নবী (দ:)-এর ফযীলত সম্পর্কে ইমাম আবূ আবদিল্লাহ বিন আল-হাজ্জ্ব মুহাম্মদ বিন মুহাম্মদ বিন মুহাম্মদ আল-মালেকী (জন্ম: ১৩৩৬ খৃষ্টাব্দ) নিজ ‘আল-মাদখাল ইলা’ তানমিয়া আল-’আমল বি তাহসীন আল-নিই্যয়া’ত ওয়াল-তানবীহ ‘আলা কাসীর মিনাল-বিদ’ আল-মুহদিসা ওয়াল-’আওয়াঈদ আল-মুনতাহালা’ গ্রন্থে লেখেন:

মহানবী (দ:)-কে সোমবার দিন রোযা রাখার কারণ জিজ্ঞাসাকারীর প্রতি উত্তর দেয়ার সময় তিনি এই চমৎকার বৈশিষ্ট্যমণ্ডিত মাসের বাড়তি গুণ সম্পর্কে ইঙ্গিত করেছেন। তিনি বলেন, “এই (সোমবার) দিনে আমার বেলাদত (তথা ধরাধামে শুভাগমন) হয়েছে।” এই দিনটির প্রতি সম্মান প্রদর্শনের মধ্যে অন্তর্ভুক্ত তাঁর বেলাদতের মাসটি-ও। তাই এটাকে সবচেয়ে উচ্চমর্যাদা দেয়া ও এর প্রতি শ্রদ্ধা প্রদর্শন করা আমাদের দায়িত্ব ও কর্তব্য; আর এর পাশাপাশি আল্লাহতা’লা যেভাবে পবিত্র মাসগুলোকে পছন্দ করেছেন, ঠিক সেভাবে এই মাসকেও আমাদের পছন্দ করা উচিত। কেননা এই মাসটি সেসব মাসেরই একটি, যেমনটি নবী পাক (দ:) ফরমান: “আমি বনূ আদম তথা আদম-সন্তান/মনুষ্যজাতির সাইয়্যেদ বা সরদার। আর এটা কোনো ফখর বা অহঙ্কার/দম্ভ নয়। পয়গম্বর আদম (আ:) ও তাঁর পরবর্তীরা (সবাই) আমার পতাকাতলে (অবস্থিত)।”

বিভিন্ন স্থান ও সময়ের সাথে সম্পৃক্ত ফযীলতগুলো আল্লাহতা’লার সুনির্দিষ্টকৃত এবাদত-বন্দেগীর কারণে হয়েছে। এসব স্থান ও সময়ের নিজস্ব সহজাত কোনো মাহাত্ম্য/শ্রেষ্ঠত্ব নেই; বরং এগুলোর মাহাত্ম্য কেবল এগুলোর সাথে সম্পৃক্ত ওই সব বিশেষ পছন্দের সূত্রেই প্রতিষ্ঠিত। এমতাবস্থায় এই (রবিউল আউয়াল) মাস ও সোমবারের জন্যে আল্লাহতা’লার সুনির্দিষ্টকৃত মাহাত্ম্যগুলো বিবেচনা করুন। আপনি কি সোমবারে রোযা রাখার মহা ফযীলতকে দেখতে পান না – যেহেতু (স্রেফ) প্রিয়নবী (দ:) এই দিনেই ধরণীতলে শুভাগমন করেছিলেন?

এই মাস এলে ওপরে উল্লেখিত প্রামাণ্য দলিলের ভিত্তিতে একে সম্মান প্রদর্শন, এর মহিমা বর্ধন ও এর প্রাপ্য পরম শ্রদ্ধা জ্ঞাপন করতে হবে। এটা করা উচিত রাসূলুল্লাহ (দ:)-এর প্রতি আনুগত্যস্বরূপ, ঠিক যেমনটি তিনি সুনির্দিষ্টকৃত ফযীলতসম্পন্ন সময়গুলোতে নেক আমল/পুণ্যদায়ক কর্ম পালন ও প্রচুর দান-সদকাহ করতেন। আপনি কি বিবেচনা করেননি (বুখারী শরীফে উদ্ধৃত) হযরত ইবনে আব্বাস (রা:)-এর বাণীকে যিনি বিবৃত করেন, “রাসূলুল্লাহ (দ:) ছিলেন মানুষের মাঝে সবচেয়ে মহানুভব ও উদার, আর তিনি রমযান মাসে সর্বাধিক বদান্যতা প্রদর্শন করতেন?” অতএব, আমাদেরও উচিত হবে আমাদের সাধ্যানুসারে এ মাসের মহিমা বৃদ্ধির চেষ্টা করা, ঠিক যেমনটি রাসূলুল্লাহ (দ:) মহিমাপূর্ণ ক্ষণগুলোতে করতেন।

কেউ হয়তো কূটতর্ক করতে পারে এ কথা বলে: “এসব মহিমাপূর্ণ সময়ে পালিত মহানবী (দ:)-এর ‍পুণ্যদায়ক আমল/কর্ম সবাই জানেন, কিন্তু তিনি যেভাবে অন্যান্য মাসে খাস/সুনির্দিষ্ট আমল পালন করেছিলেন, সেভাবে এই (রবিউল আউয়াল) মাসে তিনি কোনো সুনির্দিষ্ট আমল পালন করেননি।” এর জবাবে আমরা বলি: এটা মহানবী (দ:) হতে জ্ঞাত উম্মতের প্রতি তাঁরই সদাশয় যত্ন ও আরাম/স্বস্তিদানের আকাঙ্ক্ষার কারণে হয়েছে; বিশেষ করে এটা সেসব বিষয়ের ক্ষেত্রেই হয়েছে, যেগুলো তাঁর আপন যাত/সত্তার সাথে সম্পর্কিত। এর উদাহরণ ও বিষয়বস্তু হলো, প্রিয়নবী (দ:) যখন মদীনা মোনাওয়ারাকে হারাম তথা অলঙ্ঘনীয় (স্থান) ঘোষণা করেন, যেভাবে পয়গম্বর ইবরাহীম (আ:) মক্কা মোয়াযযমাকে অলঙ্ঘনীয় (স্থান) ঘোষণা করেছিলেন, তখন হুযূর পূর নূর (দ:) প্রাণি শিকার অথবা গাছের ডালপালা কাটার দায়ে শাস্তি বিধান করেননি। এটা তাঁর উম্মতের প্রতি করুণাস্বরূপ, আর তাদের ওপর হতে বোঝা হাল্কা করার খাতিরেই করা হয়েছে। উম্মতের ওপর থেকে বোঝা সহজ করার জন্যে মহানবী (দ:) নিজের সাথে সম্পর্কিত আদেশগুলো ছেড়ে দিতেন, এমন কি যদি তা পুণ্যদায়ক/ফযীলতপূর্ণ-ও হতো। [ইবনে আল-হাজ্জ্ব কৃত ‘আল-মাদখাল ইলা’ তানমিয়া আল-’আমল বি তাহসীন আল-নিই্যয়া’ত ওয়াল-তানবীহ ‘আলা কাসীর মিনাল-বিদ’ আল-মুহদিসা ওয়াল-’আওয়াঈদ আল-মুনতাহালা’,২:২-৪; আল-সৈয়ূতী প্রণীত ‘হুসন আল-মাক্বসিদ ফী ’আমল আল-মওলিদ’, ৫৭-৫৯ পৃষ্ঠা; আল-সৈয়ূতী রচিত ‘আল-হা’ওয়ী লিল-ফাতা’ওয়া’, ২০৩-২০৪ পৃষ্ঠা; এবং আল-সা’লেহী লিখিত ‘সুবুল আল-হুদা’ ওয়াল-রাশা’দ ফী সীরাতে খায়র আল-’এবা’দ’, ১:৩৭১-৩৭২]

ইবনে আল-হাজ্জ্ব আল-মক্কী আরো লেখেন:

কেউ হয়তো প্রশ্ন করতে পারেন, রবিউল আউয়াল মাসের সোমবারে মহানবী (দ:)-এর মীলাদ শরীফ হওয়ার পেছনে হেকমত তথা (ঐশী) প্রজ্ঞাটা কী? কেন তিনি ক্বুরআন নাযিল হওয়া রমযান মাসে ও তাতে আবির্ভূত ক্বদরের রাতে (লাইলাতুল ক্বদর), কিংবা আল্লাহতা’লার দ্বারা বিধানকৃত অন্যান্য পবিত্র মাসে, অথবা শা’বান মাসের ১৫ তারিখের রাতে বা শুক্রবারে কিংবা ওর রাতে ধরাধামে শুভাগমন করেননি?

এর প্রত্যুত্তর চারটি দৃষ্টিকোণ থেকে দেয়া যায়:

প্রথমতঃ একটি হাদীস শরীফে বর্ণিত হয়েছে যে মহান স্রষ্টা আল্লাহ পাক সোমবার দিন সমস্ত গাছ-গাছালি সৃষ্টি করেন। এটা এক মহা ইশারা ধারণ করে; কেননা এতে পরিদৃষ্ট হয় যে সোমবারে রিযক্ব, খাদ্য, ফল/ফসল ও (অনুরূপ) অন্যান্য সকল উত্তম বস্তু সৃষ্টি করা হয়। এগুলো দ্বারাই আদম-সন্তান তথা মনুষ্যকুল বেঁচে থাকে এবং (জীবনকে) উপভোগ করে। রবিউল আউয়াল মাসের এই দিনে মহানবী (দ:)-এর আশীর্বাদপূর্ণ মীলাদ/বেলাদত হওয়াটা চোখের শীতলতা ও স্বস্তি বটে; আর তাঁর শুভাগমন দ্বারা উম্মতে মুহাম্মদীকে খায়র তথা ভালাই/কল্যাণের প্রাচুর্য ও মহা বরকত/আশীর্বাদ দান করা হয়।

দ্বিতীয়তঃ আমরা যদি শব্দতাত্ত্বিক দৃষ্টিকোণ হতে আরবী ‘রবীঈ’ শব্দটি বিবেচনা করি, তাহলে (দেখতে পাবো) এতে নিহিত রয়েছে সূক্ষ্ম ইঙ্গিত ও শুভ লক্ষণ। আবূ আবদির রাহমান আল-সাক্বলী বলেন, ‘প্রত্যেক ব্যক্তি-ই তার নামের কিছু অংশের ভাগিদার হন।’ এই মাসের শুভ লক্ষণ হলো, প্রিয়নবী (দ:)-এর উম্মতকে তাঁর মঙ্গলজনক শুভাগমনের সুসংবাদ দেয়া হয়েছিলো।

তৃতীয়তঃ বসন্তকাল (আল-রবীঈ’) হচ্ছে সব মৌসূমের মধ্যে সবচেয়ে ভারসাম্যপূর্ণ এবং সেরা মওসূম; আর মহানবী (দ:)-এর পবিত্র (ঐশী) বিধান হচ্ছে সবচেয়ে ন্যায়পূর্ণ এবং তা ঐশী বিধানগুলোর মধ্যে সবচেয়ে ভারসাম্যপূর্ণ-ও।

চতুর্থতঃ সর্বশক্তিমান আল্লাহতা’লা আপন মহানতম পয়গম্বর সাল্লাল্লাহু আলাইহে ওয়া সাল্লামের ধরণীতলে শুভাগমনের দিন-ক্ষণকে সম্মানিত করতে চেয়েছিলেন; রাসূলুল্লাহ (দ:) উপরোক্ত (অন্য) সময়গুলোতে শুভাগমন করলে কেউ হয়তো এই ভুল ধারণা পোষণ করতে পারতো যে তিনি ওই সময়ে শুভাগমন করায় সম্মানিত হয়েছেন। [ইবনে আল-হজ্জ্ব, ‘আল-মাদখাল ইলা’ তানমিয়া আল-’আমল বি তাহসীন আল-নিই্যয়া’ত ওয়াল-তানবীহ ‘আলা কাসীর মিনাল-বিদ’ আল-মুহদিসা ওয়াল-’আওয়াঈদ আল-মুনতাহালা’, ২:২৬-২৯; আল-সৈয়ূতী, ‘হুসনু আল-মাক্বসিদ ফী আমল আল-মওলিদ’, ৬৭-৬৮ পৃষ্ঠা; আল-সৈয়ূতী, আল-হাওয়ী লিল-ফাতা’ওয়া’, ২০৭ পৃষ্ঠা; এবং আল-নাবহানী, ‘হুজ্জাত-আল্লাহ ‘আলাল-’আলামীন ফী মু’জেযাত-এ-সাইয়্যেদ আল-মুরসালীন’, ২৩৮ পৃষ্ঠা]     

৬.১১ ইমাম শামস আল-দীন আল-যাহাবী (৬৭৩-৭৪৮ হিজরী)   

ইমাম শামস আল-দ্বীন আবূ আবদিল্লাহ মুহাম্মদ বিন আহমদ বিন উসমা’ন আল-যাহাবী (১২৭৪-১৩৪৮ খৃষ্টাব্দ) মুসলিম জাহানের সেরা ইতিহাসবিদ ও মুহাদ্দীস উলামাদের একজন হিসেবে প্রশংসিত। তিনি ‘তাজরীদ আল-উসূল ফী আহা’দীসির রাসূল’, ‘মীযা’ন আল-এ’তেদা’ল ফী নাক্বদ আল-রিজা’ল, ‘আল-মুশতাবা ফী আসমা’ আল-রিজা’ল’, ‘তাবাক্বা’ত আল-হুফফা’য’ ইত্যাদির মতো বেশ কিছু সংখ্যক বই সংকলন করে হাদীস-শাস্ত্রের মৌলনীতি (উসূলে হাদীস) ও ‘এলম আল-রিজা’ল’ তথা জীবনী মূল্যায়ন বিদ্যার ক্ষেত্রে বড় অবদান রেখেছেন। তাঁর লেখা জনপ্রিয় ইতিহাসগ্রন্থ হচ্ছে ’তা’রীখ আল-ইসলাম ওয়া ওয়াফিয়্যা’ত আল-মাশা’হীর ওয়াল-আ’লাম’। ‘এলম আল-রিজা’ল’ শাস্ত্রে তাঁর লেখা ‘সিয়্যার আ’লাম আল-নুবালা’ একটি চমৎকার বই, যা’তে লেখক হাদীসের রাবী তথা বর্ণনাকারীদের জীবনীর পরিপ্রেক্ষিত/পটভূমি তুলে ধরেছেন; এই বইটি পণ্ডিতদের মাঝে এক বিশেষ আসন অধিকার করে আছে।

ইমাম যাহাবী তাঁর লেখনীতে সুলতান সালা’হ আল-দ্বীন আল-আইয়ূবী’র ভগ্নিপতি ইরবিল রাজ্যের সুলতান মুযাফফার আল-দ্বীন আবূ সাঈদ আল-কাওকাবুরী (বেসাল: ৬৩০ হিজরী) সম্পর্কে বিস্তারিত প্রশংসাসূচক বর্ণনা প্রদান করেন। বাদশাহ আল-কাওকাবুরী ছিলেন এক অতিশয় উদার ও অতিথিপরায়ণ ব্যক্তি যিনি মরণ-ব্যাধিগ্রস্ত ও অন্ধদের জন্যে চারটি হাসপাতাল প্রতিষ্ঠা করেন; আর সেগুলো তিনি প্রতি সোমবার ও বৃহষ্পতিবার পরিদর্শন করতে যেতেন। তিনি অভিভাবকহীন বিধবা নারী, এতিম-অনাথ ও শিশুদের জন্যেও গৃহ নির্মাণ করে দেন, আর তিনি নিয়মিতভাবে অসুস্থদের দেখতে যেতেন। সুলতান কাওকাবুরী হানাফী ও শাফেঈ মযহাবের শিক্ষার্থীদের জন্যে আলাদা আলাদা শিক্ষা প্রতিষ্ঠান বা বিদ্যায়তন প্রতিষ্ঠা করেন এবং সুফীদের জন্যে বসবাসের আস্তানা/খানেগাহ গড়ে দেন। ইমাম যাহাবী লেখেন যে এই সুলতান আক্বীদা-বিশ্বাসে সুন্নী মুসলমান ছিলেন, আর নির্মল আত্মাবিশিষ্ট এবং ধার্মিক-ও ছিলেন। ইমাম সাহেব নিজের ‘সিয়্যার আ’লাম আল-নুবালা’ এবং ‘তা’রীখ আল-ইসলাম ওয়া ওয়াফিয়্যা’ত আল-মাশা’হীর ওয়াল-আ’লাম’ উভয় পুস্তকেই এর বিস্তারিত বিবরণ প্রদান করেন।

সুলতান কাওকাবুরী কর্তৃক মওলিদুন্নবী (দ:) উদযাপন সম্পর্কে ইমাম যাহাবী তাঁর বিবরণে বলেন: “সুলতানের মওলিদ উদযাপন মুখে বর্ণনারও অতীত! ইরাক্ব ও আরব উপদ্বীপ (জাযিরাতুল আরব) হতে মানুষেরা তাঁর উৎসব আয়োজনে শরীক হবার জন্যে যাত্রা করতেন….তিনি বিশাল সংখ্যক গরু, উট ও ভেড়া/ছাগল/দুম্বা (এই উদ্দেশ্যে) ক্বুরবানী করতেন এবং বিভিন্ন ধরনের রান্নার আয়োজন করতেন। সুফী/দরবেশমণ্ডলীকে উঁচু মর্যাদার ভূষণ দ্বারা সম্মানিত করতেন। শহরের প্রধান চত্বরে ওয়ায়েযীনবৃন্দকে শ্রোতাদের উদ্দেশ্যে বয়ান রাখার সুযোগ দেয়া হতো, আর সুলতান (এসব আয়োজনে) বিপুল পরিমাণ অর্থব্যয় করতেন। মহানবী (দ:)-এর পবিত্র মীলাদ সম্পর্কে ইবনে দিহইয়া একখানি বই লিখেন, যার পুরস্কারস্বরূপ সুলতান তাঁকে এক সহস্র দিনার এনাম দেন। সুলতান মুযাফফার শাহ ছিলেন বিনয়ী ও প্রকৃত সুন্নী মুসলমান যিনি গরিব মানুষ ও মুহাদ্দীসীনবৃন্দকে মহব্বত করতেন। সিবত্ আল-জাওযী বলেন, ‘মওলিদ উদযাপন বাবদ সুলতান মুযাফফার শাহের বাৎসরিক ব্যয় হতো তিন লক্ষ দিনার; আর তিনি দুই লক্ষ দিনার খরচ করতেন সুফীদের জন্যে খানেগাহ/আস্তানা নির্মাণ বাবদ….আল-মুযাফফার শাহের আয়োজিত মওলিদ অনুষ্ঠানে অংশগ্রহণকারী জনৈক ব্যক্তি উল্লেখ করেন যে রাজকীয় দস্তরখানে এক লক্ষ মাটির গেলাস/পানপাত্র, পাঁচ হাজার ছাগলের মাথা, দশ হাজার মোরগ, এক লক্ষ প্লেটভর্তি শুকনো ফল ও ত্রিশ হাজার প্লেটভর্তি মিষ্টি পরিবেশিত হতো….’।” [আল-যাহাবী, ‘সিয়্যার আ’লা’ম আল-নুবালা’, ১৬:২৭৪-২৭৫; আল-যাহাবী, ‘তা’রীখ আল-ইসলাম ওয়া ওয়াফায়্যাত আল-মাশা’হীর ওয়াল-আ’লা’ম’ (৬২১-৬৩০ হিজরী), ৪৫:৪০২-৪০৫]  

৬.১২ ইমাম কামাল আল-দীন আল-আদফাউয়ী (৬৮৫-৭৪৮ হিজরী)

ইমাম কামা’ল আল-দ্বীন আবূ আল-ফাদল জা’ফার বিন সা’লাব বিন জা’ফার আল-আদফাউয়ী (১২৮৬-১৩৪৭ খৃষ্টাব্দ) নিজের লেখা ‘আল-তা’লী’ আল-সাঈদ আল-জা’মী’ লি-আসমা’ নুজাবা’ আল-সাঈদ’ পুস্তকে লেখেন: “আমাদের বিশ্বস্ত বন্ধু না’সির আল-দ্বীন মাহমূদ বিন আল-’এমা’দ আমাদেরকে জানান যে আবূ আল-তাইয়্যাব মুহাম্মদ বিন ইবরা’হীম আল-সাবতী আল-মা’লেকী যিনি ফূস্ নগরীর অধিবাসী ও অন্যতম নেককার আলেম, তিনি মকতব (বিদ্যালয়) অতিক্রমের সময় বলতেন, ‘ওহে আলেম! আজ খুশির দিন; শিশুদের বেরোতে দাও।’ এমতাবস্থায় তাঁকে (না’সিরুদ্দীন ’এমা’দকে) বেরোতে দেয়া হতো।”

এটা তাঁর কাছ থেকে (অকাট্য) প্রমাণ যে তিনি মওলিদ উদযাপনকে গ্রহণ করতেন এবং এর সমালোচনা করতেন না; আর তিনি ছিলেন বিভিন্ন বিদ্যাশাস্ত্রে পারদর্শী মালেকী মযহাবের ফক্বীহ ও নীতিপরায়ণ ব্যক্তি। (পণ্ডিত) আবূ হাইয়্যান ও অন্যান্যরা তাঁর কাছে শিক্ষাগ্রহণ করেন। ৬৯৫ হিজরী সালে তিনি বেসালপ্রাপ্ত হন। [আল-সৈয়ূতী, ‘হুসন আল-মাক্বসিদ ফী ’আমল আল-মওলিদ’, ৬৬-৬৭ পৃষ্ঠা; আল-সৈয়ূতী, ‘আল-হা’ওয়ী লিল-ফাতা’ওয়া’, ২০৬ পৃষ্ঠা; আল-নাবহা’নী, ‘হুজ্জাত-আল্লাহ ’আলা’ল-’আলামীন ফী মু’জেযা’ত-এ-সাইয়্যেদিল-মুরসালীন’, ২৩৮ পৃষ্ঠা]

৬.১৩ তকী আল-দীন আবূ আল-হাসান আল-সুবকী (৬৮৩-৭৫৬ হিজরী)

ইমাম তক্বী আল-দ্বীন আবূ আল-হাসান ‘আলী বিন ‘আবদ্ আল-কা’ফী আল-সুবকী (১২৮৪-১৩৫৫ খৃষ্টাব্দ) সম্পর্কে শায়খ ইসমাঈল হাক্কী (১০৬৩-১১৩৭ হিজরী) নিম্নের বক্তব্য পেশ করেন: “ইমাম তক্বীউদ্দীন সুবকী (রহ:)-এর সমসাময়িক উলামাবৃন্দের একটি বড় দল তাঁরই সদরতে (পরিচালনায়) সমবেত হতেন (মীলাদের মজলিশে)। আল-সারসারী আল-হাম্বলী (রহ:)-এর রচিত মহানবী (দ:)-এর প্রশংসাসূচক কবিতা কোনো আবৃত্তিকার পাঠ করে শোনাতেন:

“আল-মুস্তাফা (দ:)-এর প্রশংসায় অপর্যাপ্ত,

স্বর্ণ যা সুন্দরতম লিপিবিদ্যায় কাগজে অঙ্কিত,

গণ্যমান্য সবাই তাঁর কথা হলে শ্রুত,

তাঁর প্রতি অভিবাদন করেন ব্যক্ত,

হয়ে সারিবদ্ধ বা হাঁটু গেড়ে, অবনত।” (ভাবানুবাদ) [ইসমাঈল হাক্কী কৃত ‘তাফসীরে রূহুল বয়া’ন’, ৯:৫৬; এবং আল-হালাবী প্রণীত ‘ইনসান আল-’উয়ূন ফী সীরাতিল-আমীন আল-মা’মূন’, ১:৮৪]

৬.১৪ ’ইমাদ আল-দীন বিন কাসীর (৭০১-৭৭৪ হিজরী)

আল-হাফেয ‘ইমাদ আল-দ্বীন আবূ আল-ফিদা’ ইসমাঈল বিন কাসীর (১৩০১-১৩৭৩ খৃষ্টাব্দ) প্রসিদ্ধ ক্বুরআন-এ-করীমের ব্যাখ্যাকারী (মুফাসসির), হাদীস-শাস্ত্রজ্ঞ (মুহাদ্দীস), ইতিহাসবিদ ও ফক্বীহ (ইসলামী বিধানশাস্ত্রজ্ঞ) ছিলেন। তার লেখা ‘তাফসীর আল-ক্বুরআন আল-’আযীম’ শীর্ষক গ্রন্থটি ক্বুরআন-ব্যাখ্যাশাস্ত্রে অতীব পাণ্ডিত্যপূর্ণ। ‘জামেউ’ল-মাসা’নীদ ওয়াল-সুনান’ শীর্ষক পুস্তকে তিনি বিপুল পরিমাণ হাদীস শরীফ নক্বল করেন। ইতিহাসের বিদ্যায় তার লেখা ‘আল-বেদা’য়া ওয়ান-নেহা’য়া’ বইটি বিখ্যাত ও চমৎকার। এই বইটিতে তিনি ইরবিলের রাজা আবূ সাঈদ মোযাফফার আল-দ্বীন শাহের মওলিদ-উৎসব উদযাপনের বিস্তারিত এক বিবরণ লিপিবদ্ধ করেছেন। এছাড়াও ইবনে কাসীর একটি পুস্তিকা রচনা করেন যার শিরোনাম ‘যিকরে মওলিদে রাসূলিল্লাহে ওয়া রাদা’ইহী’। ইবনে কাসীর লেখেন:

“মহানবী (দ:)-এর সেবাযত্ন প্রথম যে মহিলা করেন, তিনি (হুযূরের চাচা) আবূ লাহাবের মুক্তিপ্রাপ্তা দাসী সোয়াইবা। তিনি-ই আবূ লাহাবের কাছে রাসূল (দ:)-এর ধরাধামে শুভাগমনের সুসংবাদ নিয়ে এসেছিলেন, যার ফলশ্রুতিতে আবূ লাহাব খুশি হয়ে তাঁকে মুক্তি দিয়েছিলো। তার ভাই হযরত আব্বাস ইবনে আবদ্ আল-মুত্তালিব (রা:) তার মৃত্যুর পর তাকে (স্বপ্নে) সঙ্কটাপন্ন দেখেতে পান; তিনি তাকে জিজ্ঞেস করেন, ‘তোমার কী হয়েছে?’ আবূ লাহাব (এর উত্তরে) বলে, ‘আমি জাহান্নামের আগুনে আছি। তবে প্রতি সোমবারের রাতে আমার শাস্তি লাঘব করা হয় এবং আমি এ আঙ্গুলগুলোর ডগা হতে পানি পান করতে সক্ষম হই (সে তার তর্জনী ও মধ্যমা আঙ্গুল দুটো দেখিয়ে বলেছিলো এ কথা)। আর এটা সোয়াইবা’কে মুক্ত করার কারণেই হয়েছে, যখন-ই সে মহানবী (দ:)-এর মীলাদের খোশ-খবর আমার কাছে নিয়ে এসেছিলো।’ এই হাদীসের সূত্র সহীহাইন (বুখারী ও মুসলিম) গ্রন্থগুলোতে লিপিবদ্ধ রয়েছে।

“যেহেতু দাসত্ব থেকে মুক্ত করে দেয়া এই মহিলা রাসূলুল্লাহ (দ:)-কে বুকের দুধ পান করিয়েছিলেন, সেহেতু ওই সেবার উপকার তাঁর চাচা আবূ লাহাবের কাছে প্রতিদান হিসেবে মঞ্জুর করা হয়েছিলো; আর তাই সে তেষ্টা মেটাতে সক্ষম হয়েছিলো এরই কারণে, যদিও আল্-ক্বুরআনের একটি গোটা সূরা তার প্রতি অভিশাপস্বরূপ অবতীর্ণ হয়েছিলো।

৬.১৪.১ আবূ সাঈদ আল-মুযাফফর (সুলতান গাযী সালাহউদ্দীনের ভগ্নিপতি) কর্তৃক উদযাপিত মওলিদুন্নবী (দ:)

ক্রুসেড-বিজয়ী সুলতান সালা’হ আল-দ্বীন আল-আইয়ূবী’র (৫৩২-৫৮৯ হিজরী/১১৩৮-১১৯৩ খৃষ্টাব্দ) ভগ্নিপতি ছিলেন বাদশাহ আবূ সাঈদ অাল-মোযাফফর (ইন্তেক্বাল: ৬৩০ হিজরী)। সুলতানের আপন বোন রাবী’আ খা’তূন ছিলেন তাঁর স্ত্রী। সুলতান সালা’হ আল-দ্বীন বাদশাহকে খুব পছন্দ করতেন। এই দু জন নিজেদের অন্তরাত্মা দিয়ে পারস্পরিক সহযোগিতার ভিত্তিতে দ্বীন-ইসলামের প্রভূত সেবা করেন। বাদশাহ মোযাফফর শাহ ধার্মিক, নেককার ও মহানুভব ছিলেন। বাদশাহ’র সুউচ্চ ধর্মীয় ও আধ্যাত্মিক হাল-অবস্থা এবং এর পাশাপাশি ইসলাম ধর্মের প্রতি তাঁর খেদমত দেখে সুলতান সালা’হ আল-দ্বীন তাঁর সাথে আপন বোনকে বিয়ে দেন।

সুলতান সালা’হ আল-দ্বীনের জবানিতে আবূ সাঈদ মোযাফফর শাহের বর্ণনা এভাবে দেয়ার পর ইবনে কাসীর বাদশাহের উন্নত বৈশিষ্ট্যগুলোর বিশদ ব্যাখ্যা দেয়ার জন্যে একটি প্যারাগ্রাফ লেখেন, যা’তে তিনি বাদশাহের জীবনী ও তাঁর অন্তরের সততা, ধার্মিকতা ও প্রকৃতি তুলে ধরেন। বাদশাহ কর্তৃক মওলিদুন্নবী (দ:) উদযাপনের একটি দীর্ঘ বিবরণ তিনি তাতে লিপিবদ্ধ করেন। এই পবিত্র দিন উপলক্ষে খুশি ও সুখ-শান্তি প্রকাশার্থে বাদশাহের প্রচেষ্টা ও উৎসাহ-উদ্দীপনার একটি চিত্র ইবনে কাসীর তুলে ধরেছেন। ইবনে কাসীর লেখেন:

বাদশাহ মোযাফফর শাহ: তাঁর নাম আবূ সাঈদ কাওকাবুরী বিন যাইন আল-’আবেদীন ‘আলী বিন বাকতগীন; তিনি মহানুভব ও জ্যেষ্ঠ বাদশাহদের একজন। তিনি অনেক ভালো কাজ রেখে গিয়েছেন এবং ক্বা’সইয়ূন পর্বতের ওপরে আল-মোজাফফর জামে’ মসজিদ নির্মাণ করেছিলেন। কোনো এক পর্যায়ে তিনি বারযা হতে পানি প্রণালী দ্বারা মসজিদকে সংযুক্ত করতে চেয়েছিলেন, কিন্তু আল-মু’আযযাম তাঁকে এথেকে নিবৃত্ত করেন; কেননা এটা পর্বত চূড়োয় অবস্থিত মুসলমানদের কবরস্থানের ওপর দিয়ে অতিক্রম করার সম্ভাবনা ছিলো।

পবিত্র রবীউল আউয়াল মাসে বাদশাহ মওলিদ অনুষ্ঠানের আয়োজন করতেন এবং তাতে মহা জাঁকজমকের সাথে অংশগ্রহণ করতেন। তিনি ছিলেন খালেস তথা একনিষ্ঠ অন্তরের, সাহসী, বুদ্ধিমান ও শিক্ষিত ব্যক্তি। আল্লাহ পাক যেনো তাঁর প্রতি আপন করুণা বর্ষণ করেন এবং আখেরাতে বা পরকালে তাঁকে রফে’ মানযিলাত (উচ্চ মর্যাদাপূর্ণ আবাসস্থল) মঞ্জুর করেন।

শায়খ আবূ আল-খাত্তা’ব বিন দিহইয়া বাদশাহের উদ্দেশ্যে একটি বই লিখেছিলেন, যেটা মহানবী (দ:)-এর মীলাদ তথা ধরাধামে শুভাগমন দিবস উদযাপন উপলক্ষে ব্যবহৃত হতো। এর শিরোনাম ছিলো ‘আল-তানউয়ীর ফী মওলিদিল-বাশীর আল-নাযীর’ (সুসংবাদদানকারী ও সতর্ককারীর ধরণীতলে শুভাগমনের রোশনাই)। মোযাফফর শাহ এই বইটির জন্যে ইবনে দিহইয়াকে এক সহস্র দিনার দান করেন। বাদশাহ (সিরিয়ার) সালা’হীয়্যা নগরীতে ক্ষমতাসীন ছিলেন, যতোদিন না আক্কা নগরী অবরুদ্ধ হয় এবং ক্রুসেডার গোষ্ঠীর অবরোধে আক্কায় তিনি ইন্তেক্বাল করেন (৬৩০ হিজরী); আর এই বইটি তাঁর সাথে ছিলো ওই পুরোটুকু সময়-ই। তিনি ছিলেন প্রশংসনীয় চরিত্র ও ধার্মিকতার অধিকারী।

সিবত ইবনে আল-জাওযী বলেন: “আল-মোযাফফর শাহের উদযাপিত মওলিদ অনুষ্ঠানে অংশগ্রহণকারী জনৈক ব্যক্তি উল্লেখ করেন যে শাহী খাবার টেবিলে পাঁচ হাজার ছাগলের মাথা, দশ হাজার মোরগ, এক লাখ মাটির পাত্রভর্তি দুধ ও ত্রিশ হাজার প্লেটভর্তি মিষ্টি থাকতো।” [ইবনে কাসীর, ‘আল-বেদায়া ওয়ান-নেহায়া’, ৯:১৮; মুহিবী, ‘খুলাসা আল-আসার ফী আ’এয়া’ন আল-ক্বার্ন আল-হা’দী ‘আসহার’, ৩:২৩৩; আল-সৈয়ূতী, ‘হুসন আল-মাক্বসিদ ফী ‘আমলিল মওলিদ’, ৪২-৪৪ পৃষ্ঠা; আল-সৈয়ূতী, ‘আল-হা’উয়ী লিল-ফাতা’ওয়া’, ২০০ পৃষ্ঠা; আহমদ বিন যাইনী দাহলান, ‘আল-সীরাত আল-নববীয়্যা’, ১:৫৩-৫৪]      

এক্ষণে ইবনে কাসীরের নিম্নোক্ত বক্তব্যটি সম্পর্কে ভাবুন:

প্রখ্যাত উলামা-এ-হক্কানী/রব্বানী ও সূফীবৃন্দ এই মওলিদ অনুষ্ঠানে অংশগ্রহণ করতেন; আর বাদশাহ মোযাফফার শাহ তাঁদেরকে রাজকীয় সম্মানসূচক জুব্বা উপহার দিতেন। তিনি সূফীদের সমাবেশে সেমা’ তথা আধ্যাত্মিক/মরমী/কাউয়ালী গানের মাহফিলসমূহ আয়োজন করতেন যা যোহরের নামাযের পর হতে আসরের নামাযের আগ পর্যন্ত চলতো; আর তিনিও সূফীমণ্ডলীর সাথে ওয়াজদ/রকস্ তথা (ঘুরে ঘুরে) দৈহিক স্পন্দন দ্বারা (ঐশী ভাবোন্মত্ততায়) আধ্যাত্মিকতার পরশ লাভ করতেন। বিভিন্ন রাজ্য হতে আগত প্রতিনিধি দলের জন্যে তিনি একটি মেহমানখানা (অতিথিশালা) রেখেছিলেন, আর নানা পেশার মানুষেরা বিভিন্ন এলাকা থেকে সেখানে আসতেন। তিনি উত্তম কাজে ও তা’আত তথা ধর্মীয় আনুগত্যমূলক কর্মে (প্রচুর) দান করতেন; এভাবে তিনি হারামাঈন শরীফাইন (মক্কা মোয়াযযমা ও মদীনা মোনাওয়ারা) ও অন্যান্য পবিত্র স্থানের জন্যে দান-সদকাহ করতেন এবং প্রতি বছর বিশাল সংখ্যক ‘ফারান্জ’ (খৃষ্টান ক্রুসেডার) বন্দিদের মুক্ত করে দিতেন। কথিত আছে যে তিনি সর্বমোট ষাট হাজার বন্দিকে মুক্ত করেন।

বাদশাহ’র স্ত্রী রাবী’আ খা’তূন বিনতে আইয়ূব (যাঁর ভাই সুলতান সালা’হ আল-দ্বীন আল-আইয়ূবী তাঁকে বাদশাহের সাথে আক্কা নগরীতে বিয়ে দিয়েছিলেন) বিবৃত করেন, “বাদশাহ’র আলখাল্লা পাঁচ দিরহামের বেশি দামি ছিলো না। আমি তাঁর জামাকাপড়ের পছন্দ নিয়ে সমালোচনা করলে তিনি আমায় বলেন, ‘আমার জামাতে পাঁচ দিরহাম ব্যয় করে বাকি অর্থ দান-সদকাহ করা আমার কাছে দামি কাপড় পরে দরিদ্র ও বঞ্চনায় ক্ষুব্ধ মানুষকে অবহেলা করার চেয়ে অধিক প্রিয়’।” মওলিদ বাবদ তাঁর বাৎসরিক ব্যয়ের পরিমাণ দাঁড়াতো তিন লাখ দিনার, আর তিনি অতিথিশালার রক্ষণাবেক্ষণে প্রতি বছর ব্যয় করতেন দুই লাখ দিনার। পবিত্র হারামাঈন শরীফাইনের জন্যে এবং হেজায অঞ্চলে অবস্থিত সমস্ত পানি সেচ কেন্দ্রগুলোর রক্ষণাবেক্ষণে তিনি বাৎসরিক আরো ব্যয় করতেন ত্রিশ হাজার দিনার। আমাদের লক্ষ্য করা উচিত যে এসব ব্যয়ের কোনোটাতেই মোযাফফার শাহের গোপন দান অন্তর্ভুক্ত ছিলো না। তিনি ইরবিলের দুর্গে ইন্তেক্বাল করেন এবং এই মর্মে অসীয়ত করে যান যেনো তাঁকে দাফনের জন্যে মক্কা মোয়াযযমায় নেয়া হয়; তবে তা সম্ভব না হওয়ায় মাশাদ ’আলী’তে তাঁকে দাফন করা হয়। [ইবনে কাসীর, ‘আল-বেদায়া ওয়ান্ নেহায়া’, ৯:১৮; আল-সৈয়ূতী, ‘হুসন আল-মাক্বসিদ ফী আমলিল-মওলিদ’, ৪৪ পৃষ্ঠা; আল-সৈয়ূতী, আল-হা’উয়ী লিল-ফাতা’ওয়া’, ২০০ পৃষ্ঠা; আল-সা’রেহী, ‘সুবুল আল-হুদা’ ওয়াল-রাশা’দ ফী সীরাতে খায়র আল-’এবা’দ’, ১:৩৬২-৩৬৩; এবং আল-নাবহা’নী, হুজ্জাতুল্লা’হি ‘আলা’ল ‘আলামীন ফী মো’জেযাতে সাইয়্যেদিল মুরসালীন’, ২৩৬ পৃষ্ঠা]    

মওলিদ অনুষ্ঠান উদযাপনে বাদশাহ তিন লাখ দিনার ব্যয় করতেন। স্পষ্টতঃ ইবনে কাসীর এই বিপুল ব্যয়কে অনুমোদন করেছিলেন। কেননা তিনি এর সমালোচনায় একটি শব্দ-ও উচ্চারণ করেননি। মনে রাখবেন যে (তখনকার) এক দিনার সমান বর্তমানের আনুমানিক দুই বৃটিশ পাউন্ড স্টারলিং; সে মোতাবেক মওলিদুন্নবী (দ:) উদযাপন উপলক্ষে ব্যয়িত অর্থের পরিমাণ ছয় লাখ বৃটিশ পাউন্ড স্টারলিং। অধিকন্তু, আমরা প্রায় ৮০০ বছর আগের প্রেক্ষাপটে ছয় লাখ বৃটিশ পাউন্ডের কথা বলছি। এই পরিমাণ অর্থ যদি বর্তমানের মানদণ্ডে আমাদেরকে তুলনা দিতে হতো, তাহলে এ কথা বলা যেতে পারতো যে এক দিনার সমান কম করে হলেও স্বর্ণের এক আউন্সের (প্রায় আধ ছটাকের) এক-চতুর্থাংশ (বা সিকি); এটা আমাদের সময়কার চার হাজার পাকিস্তানী রুপী হবে। অনুরূপভাবে, এক দিনার সমান বর্তমানের চল্লিশ বৃটিশ পাউন্ড স্টারলিং হবে। অতএব, চল্লিশ পাউন্ডকে তিন লক্ষ পাউন্ড দ্বারা গুণ দেয়া হলে তা বারো লক্ষ পাউন্ড স্টারলিংয়ের সমান হবে। তবে এটা স্রেফ একটা হিসেব মাত্র।

৬.১৫ বুরহান আল-দীন বিন জামা’আ (৭২৫-৭৯০ হিজরী)

বুরহা’ন আল-দ্বীন আবূ এসহা’ক্ব ইবরা’হীম বিন আবদ আল-রাহীম বিন ইবরা’হীম বিন জামা’আ আল-শা’ফেঈ (১৩২৫-১৩৮৮ খৃষ্টাব্দ) ছিলেন একজন প্রসিদ্ধ বিচারক (কাজী) ও ক্বুরআন ব্যাখ্যাকারী (তাফসীরকার)। তিনি কিতা’বুল্লাহ শরীফের একটি দশ খণ্ডবিশিষ্ট তাফসীরগ্রন্থ লিখেছিলেন। মওলিদ সংক্রান্ত তাঁর দৃষ্টিভঙ্গি বর্ণনা করতে গিয়ে মোল্লা আলী ক্বারী (ইন্তেক্বাল: ১০১৪ হিজরী) নিজ ‘আল-মওরিদ আল-রাওয়ী ফী মওলিদিল নববী ওয়া নাসাবিহি আল-তা’হির’ গ্রন্থে লিপিবদ্ধ করেন: আমাদের কাছে (এ তথ্য) এসেছে যে যুহদ তথা দুনিয়ার মোহত্যাগী ও পুণ্যবানের জ্বলন্ত নিদর্শন আবূ এসহাক্ব ইবরাহীম বিন আবদ আল-রাহীম বিন ইবরাহীম বিন জামা’আ (রহ:) যখন রাসূলে খোদা সল্লাল্লাহু আলাইহে ওয়া সাল্লামের মদীনা নগরীতে অাগমন করতেন, তখন তিনি মওলিদ উদযাপন উপলক্ষে খাবার তৈরি করতেন এবং ঘোষণা করতেন, ‘আমার যদি সামর্থ্য থাকতো, তাহলে আমি মাসের প্রতিটি দিনই মওলিদ মাহফিলের আয়োজন করতাম।’ [মোল্লা আলী ক্বারী, ‘আল-মওরিদ আল-রাওয়ী ফী মওলিদিল নববী ওয়া নাসাবিহি আল-তা’হির’, ১৭ পৃষ্ঠা]    

৬.১৬ যাইন আল-দীন বিন রাজাব আল-হাম্বলী (৭৩৬-৭৯৫ হিজরী)

ইমাম যাইন আল-দ্বীন ‘আবদ আল-রাহমা’ন বিন আহমদ বিন রাজাব আল-হাম্বলী (১৩৩৬-১৩৯৩ খৃষ্টাব্দ) হাম্বলী মাযহাবের একজন প্রসিদ্ধ ফক্বীহ ও ইসলামী গবেষক যিনি অনেক বই লিখেছিলেন। তাঁর রচিত ‘লাতা’য়েফ আল-মা’আরিফ ফী-মা’ লি-মাওয়া’সিম আল-’আম মিন আল-ওয়াযা’য়েফ’ শীর্ষক পুস্তকে তিনি বিভিন্ন ইসলামী মাস এবং সেগুলোর ফযীলত তথা উৎকৃষ্ট বৈশিষ্ট্যাবলী সম্পর্কে, আর সেগুলোতে যেসব এবাদত ও নেক আমল পালন করা উচিত সে সম্পর্কেও বিস্তারিত বিবরণ লিপিবদ্ধ করেন। পবিত্র রবীউল আউয়াল মাসের জন্যে তিনি ওই বইয়ে তিনটি অধ্যায় সংরক্ষণ করেন। দুটি অধ্যায় প্রিয়নবী (দ:)-এর পবিত্র বেলাদত তথা ধরণীতলে শুভাগমন ও নবুওয়্যতের সূচনা নিয়ে ব্যাপৃত; অপরদিকে, তৃতীয় অধ্যায়টি তাঁর যাহেরী বা বাহ্যিক তিরোধান তথা বেসালপ্রাপ্তি সম্পর্কে আলোকপাত করে। রবীউল আউয়াল অধ্যায়টিতে লেখক এই মাসে ঘটে যাওয়া নানা ঘটনা-সংক্রান্ত বেশ কিছু হাদীস সংকলন করেন এবং এগুলোকে মওলিদুন্নবী (দ:)-সম্পর্কিত হাদীসগুলোর মাঝে অন্তর্ভুক্ত করেন। তিনি বিবৃত করেন:

ইমাম আহমদ ইবনে হাম্বল (রহ:) উদ্ধৃত করেন হযরত ’এরবা’দ ইবনে সা’রিয়্যা আল-সুলামী (রা:)-এর বিবরণটি, যা’তে তিনি মহানবী (দ:)-এর নিম্নোক্ত বাণী নক্বল করেন: ‘নিশ্চয় আমি তখনো নবুওয়্যতের সীল-মোহরপ্রাপ্ত (মানে পয়গম্বর) ছিলাম যখন আদম (আ:)-এর কায়া মাটি ছিলো। আমি তোমাদেরকে এর অর্থ কী তা বলছি: আমি হলাম আমার পিতৃপুরুষ পয়গম্বর ইবরাহীম (আ:)-এর দুআর ফল [আল-ক্বুরআন, ২:১২৯]; পয়গম্বর ঈসা (আ:) কর্তৃক তাঁর জাতিকে প্রদত্ত (আগাম) সুসংবাদের পরিপূর্ণতা [আল-ক্বুরআন, ৬:৬১]; আর আমার মহীয়সী মায়ের দেখা (অলৌকিক) স্বপ্নের বাস্তবায়ন। তিনি তাতে তাঁর পবিত্র শরীর মোবারক থেকে বিচ্ছুরিত এমন প্রভা দেখতে পেয়েছিলেন যা সিরিয়ার প্রাসাদগুলো পর্যন্ত আলোকিত করেছিলো। বস্তুতঃ আম্বিয়া (আ:)-এর মাতাবৃন্দ এ ধরনের স্বপ্ন দেখেছেন।’ [ইমাম আহমদ ইবনে হাম্বল প্রণীত ‘আল-মুসনাদ’, ৪:১২৭-১২৮ #১৭,১৯০-১৭১৯১ ও ১৭,২০৩; ইবনে হিব্বা’ন কৃত ‘সহীহ’, ১৪:৩১২ #৬,৪০৪; আল-হাকিম লিখিত ‘আল-মোস্তাদরাক’, ২:৬৫৬ #৪১৭৪; আল-তাবারা’নী রচিত ‘আল-মু’জাম আল-কবীর’১৮:২৫৩ #৬৩১; আল-তাবারা’নী প্রণীত ‘মুসনাদ আল-শা’মিয়্যীন’, ২:৩৪০ #১৪৫৫; ইবনে সাআ’দ কৃত ‘আল-তাবাক্বাত আল-কুবরা’, ১:১৪৯; আল-হায়তামী লিখিত ‘মাওয়া’রিদ আল-যাম’আন ইলা’ যাওয়া’ইদে ইবনে হিব্বা’ন’, ৫১২ পৃষ্ঠা #২০৯৩; আল-হায়তামী রচিত ‘মজমাউল যাওয়া’ঈদ ওয়া মানবাআ’ আল-ফাওয়া’ঈদ’, ৮:২২৩; আল-’আসক্বালা’নী প্রণীত ‘ফাতহুল বা’রী’, ৬:৫৮৩; এবং ইবনে কাসীর কৃত ‘আল-বেদা’য়া ওয়াল-নেহা’য়া’, ২:৩২১]

অতঃপর লেখক এতে [ইবনে রাজাব হাম্বলী রচিত ‘লাতা’য়েফ আল-মা’আরিফ ফীমা’ লি-মাওয়া’সিম আল-’আম মিন আল-ওয়াযা’য়েফ’, ১৫৮-২১৬ পৃষ্ঠা] বেশ কিছু হাদীসের উল্লেখ করেন যার দরুন স্পষ্ট হয় যে প্রিয়নবী (দ:)-এর বেলাদতের সময়কাল রবীউল আউয়াল মাসে সংঘটিত অলৌকিক ঘটনাবলীর বর্ণনাগুলো গ্রহণযোগ্য, সম্মানিত ও চমৎকার বিষয়।

৬.১৭ ওলী আল-দীন আবূ যুর’আ আল-ইরাক্বী (৭৬২-৮২৬ হিজরী)   

ওলী আল-দ্বীন আবূ যুর’আ আহমদ বিন আবদ্ আল-রাহীম বিন হুসাইন আল-’ইরা’ক্বী (১৩৬১-১৪২৩ খৃষ্টাব্দ) হাদীস ও ফেক্বাহ-শাস্ত্রের প্রখ্যাত আলেম। একবার তাঁকে জিজ্ঞেস করা হয় এ মর্মে যে, মওলিদুন্নবী (দ:)-এর উদযাপন মোস্তাহাব (প্রশংসনীয়), না দূষণীয়/বর্জনীয়; নাকি এ বিষয়ের সাথে সম্পৃক্ত অন্য কোনো ফতোয়া বিদ্যমান। তিনি উত্তর দেন:

অন্যদের খাদ্য দান করা সর্বদা-ই মোস্তাহাব; অতএব, এর সাথে যদি নবুওয়্যতের নূর তথা জ্যোতির আলোকে এই (রবীউল আউয়াল) মাসে খুশি প্রকাশ করা হয়, তাহলে তা হবে আরো আশীর্বাদময়। এটা প্রাথমিক যুগের ‘সালাফ’/পুণ্যাত্মাবৃন্দ কর্তৃক অনুশীলিত হয়েছে কি না, তা আমরা জানি না ঠিক; তবে এটা নতুন প্রচলন (বেদআত) হওয়ার বাস্তবতা এই নয় যে একে অপছন্দনীয় হতেই হবে। কেননা কতো বেদআত যে মোস্তাহাব, এমন কি বাধ্যতামূলক-ও (তার কোনো ইয়ত্তা নেই)! [আলী বিন ইবরাহীম, ‘তাশনীফ আল-আযা’ন বি-আসরা’র আল-আযা’ন’, ১৩৬ পৃষ্ঠা]   

৬.১৮ শামস আল-দীন মুহাম্মদ আল-দিমাশকী (৭৭৭-৮৪২ হিজরী)

ইমাম শামস আল-দ্বীন মুহাম্মদ বিন না’সির আল-দ্বীন আল-দিমাশক্বী তাঁর রচিত ‘মওলিদ আল-সা’দী ফী মওলিদ আল-হা’দী’ পুস্তকে লেখেন:

“প্রিয়নবী (দ:)-এর বেলাদত/মীলাদ উপলক্ষে খুশি হয়ে সুয়াইবিয়াকে মুক্ত করার ফলে আবূ লাহাবের (পরকালীন) শাস্তি যে প্রতি সোমবার লাঘব করা হয়, তা নির্ভরযোগ্য বর্ণনায় এসেছে….।”

“এই অবিশ্বাসী, যার উদ্দেশ্যে অবতীর্ণ ভর্ৎসনাপূর্ণ ঐশীবাণী,

জাহান্নামের আগুনে স্থায়ীভাবে ধ্বংসপ্রাপ্ত যার দুই পাণি,

খুশি প্রকাশের ফলে নিরন্তর সোমবারে যার লাঘব হয় শাস্তি,

তাহলে মহানবী (দ:)-এর ওই গোলামের ভাগ্যে মঞ্জুর কতোই না স্বস্তি,

মাহবূব (দ:)-এর প্রতি সন্তুষ্টিসহ হয়েছে যাঁর বিশ্বাসীর বেসালপ্রাপ্তি।” (ভাবানুবাদ) [ইমাম সৈয়ূতী, ‘হুসন আল-মাক্বসিদ ফী আমালিল-মওলিদ’, ৬৬ পৃষ্ঠা; আল-সৈয়ূতী, ‘আল-হা’ওয়ী লিল-ফাতা’ওয়ী’, ২০৬ পৃষ্ঠা; আল-সা’লেহী, ‘সুবুল আল-হুদা’ ওয়াল-রাশা’দ ফী সীরাতে খায়রিল ’এবা’দ’, ১:৩৬৭; আহমদ যাইনী দাহলা’ন মক্কী, ‘আল-সীরাত আল-